সে তখনো রং ও আলোর ভেতর নিমগ্ন

আগের সংবাদ

নিউজ ফ্ল্যাশ

পরের সংবাদ

সোনালিধূসর ধ্রুব-কুহক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৪, ২০২১ , ৮:২০ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৪, ২০২১ , ৮:২০ অপরাহ্ণ

কবি এলিয়টের কাছে বুধবার ছিল ‘অ্যাশ’ আর আমার কাছে ‘ধ্রুব এষ’ মানে সোনালিধূসর কুহক কিছু। ধ্রুব এষ শিল্পী, ধ্রুব এষ প্রচ্ছদ-কিংবদন্তি। সনজীদা খাতুন আপা যখন বলেন, ‘প্রচ্ছদটা ধ্রুব করবে? তাহলে ঠিক আছে।’
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার যখন বলেন, ‘ধ্রুব প্রচ্ছদ করলে বই বের হওয়ার আগে আর দেখার দরকার নেই। ওর ওপর ভরসা রাখি।’
কলকাতার বন্ধুরা যখন বায়না ধরে, ‘পিয়াস, ধ্রুব এষকে দিয়ে কি একটা প্রচ্ছদ করানো যায়, আমাদের পুজোসংখ্যার?’ তখন বুঝি ধ্রুব এষের প্রচ্ছদকার হিসেবে, শিল্পীরূপে যা কিছু পাওয়ার তা অর্জন হয়ে গেছে।
কিন্তু আমার কাছে তো তারও চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাকার ধ্রুব এষ, কবি ধ্রুব এষ, শিশুসাহিত্যিক ধ্রুব এষ, ভাবুক ধ্রুব এষ, পাঠক ধ্রুব এষ।
‘অমিত্রাক্ষর’-এ আমিনুর রহমান সুলতান ভাই ছেপেছিলেন কবি ধ্রুব এষের পূর্ণাঙ্গ কবিতা-পাণ্ডুলিপি ‘এই শব দিনরাত্রি’। আমি ফিরে ফিরে এখনো পড়ি আর মনে রাখি, এই পাণ্ডুলিপি পড়ে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ ও বেলাল চৌধুরীর আমাকে বলা টুকরো-কথন- ‘পিয়াস, ধ্রুব কিন্তু জাতকবি, পড়ে দ্যাখো পাণ্ডুলিপিখানি।’
পড়ি, ‘এই শব দিনরাত্রি’ এবং ‘দূরের সবুজ বনভ‚মি’। কাহিনীর গোলামি করা আখ্যানবাজির সাহিত্যসমাজে ধ্রুব এষ এই বইয়ের মাধ্যমে বইয়ে দিলেন আমাদের কথাসাহিত্যের নতুন ঝরনামুখ। জীবনানন্দ তো ধ্রুব এষের ভেতরের বিষয় আর বাইরে যেটা, তাহলো সমাজ ও মানুষপৃথিবী। এই দুইয়ের বোঝাপড়া না হওয়া অথবা দ্ব›দ্বজর্জর হতে পারার আনন্দ-অভিজ্ঞানের রক্তকুসুম ‘দূরের সবুজ বনভূমি’।
ধ্রুব এষ গেরিলা গদ্যে এখানে পরাস্ত করেন সমকালীন গয়না-গদ্য বা মরিচা-গদ্যের কায়কারবারিদের। ‘গয়না-গদ্য’ বলি, যেখানে অলঙ্কারের অহংকারী সাধনায় গদ্যকে প্রাণশূন্য করেন আর ‘মরিচা-গদ্য’ বলি, যেখানে শুষ্কং-কাষ্ঠং গল্প বয়ানে শ্বাসশূন্যতার বোধ জাগ্রত হয় পাঠকের মনোসরণিতে। ধ্রুব এষ আমার কাছে সে-ই মাপের কথাশিল্পী যার খণ্ড-পাঠে তাকে পূরিপূর্ণ ভুল বোঝার অভিসন্ধি থাকে। তার প্রতিটি বাক্য এবং পূর্ববাক্য থেকে পরবর্তী-বাক্যের মধ্যস্থিত দূরত্বের পাঠ প্রয়োজন কারণ ধ্রুব এষের প্রতিটি বাক্যযোজনা ও ব্যঞ্জনা একটি যুদ্ধ।
যুদ্ধ, নতুন নির্মাণের
যুদ্ধ, নতুন ধ্বংসের
উদয় ও প্রলয়- সবকিছুতে তিনি নতুনের নান্দী। তার গল্প, উপন্যাস, আখ্যানমূলক রচনা আর স্মৃতি-ভ্রমণ-শিশুসাহিত্য-বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী কিংবা প্রবন্ধ; কোনো কিছুর পৃথক বর্গীকরণ কৃত্রিম ও আরোপিত হতে বাধ্য। কারণ তার সব লেখাই পুরনো সাহিত্যচোখে ‘নিউ নরমাল।’ ঠোক্কর খেতেই হবে পিচুটি পড়া সাহিত্য-সমালোচকদের। তারা ধরতেই পারবে না কেন, ধ্রুব এষ পরীর গল্পের সংকলন করে আবার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লিখে? কেন ‘সাহসী পৃথিবীর গল্প’-এর লেখক পরাস্ত মানুষের গোপন দীর্ঘশ্বাসকে আপন করে আঁকে তার অক্ষরের আলপনাতে! কেন ধ্রুবর আখ্যানে আচমকা ঢুকে পড়ে গায়িকা শাকিরা কিংবা নায়িকা স্মিতা পাতিল! অভ্যস্ত ঠিকাদারি রুচির বাটখারায় তারা ধরতেই পারবে না ধ্রুব এষের গদ্যের গহন অরণ্যের সবুজ চাবিকাঠি। এটা জোর দিয়ে মনে করি, যৌনতা সংক্রান্ত সকল ট্যাবুর সফল ভাঙচুর দেখতে চাইলে ধ্রুব এষের গদ্যসমস্তে ঢুকতে হবে; অবশ্যই নাবালক গ্রহীতার চোখকে সাবালকে নবায়ন করে।
ধ্রুব এষ ভাবুক, শুনেন তিনি কথা সবার যেনবা একাই তিনি একশজনের শ্রোতার আসর। কারণ ধ্রুব এষ মনে করেন, এক একটা মানুষ এক একটা গল্প। কারও গল্পকে তিনি ‘উন’ ভাবতে পারেন না। একালে এই বাকোয়াজ বক্তৃতাবাজির মচ্ছবের কালে ধ্রুব এষের জলসায় যাওয়া মানে এক বিরল-নিরাল শ্রোতার সাক্ষাৎ পাওয়া যার নীরব কল্লোল সমুদ্রগর্জনের স্বাদ এনে দেয় নষ্ট হয়ে যাওয়া আমাদের কানে; যখন ক্বচিৎ বলে ওঠেন তিনি, ‘হ্যাঁ, আবুল হাসান বেঁচে থাকলে অনেক কিছুই নতুন করে ভাবতে হতো এ দেশের কবিতার’ কিংবা ‘হুমায়ূন স্যার যাদের পছন্দ করতেন না, এখন তারাই উনার বড় স্মৃতিচারক’।
আমি ধ্রুব এষের প্রতিটি বই পড়ি। বইয়ের উৎসর্গপত্রগুলোও পড়ি। কারণ প্রচ্ছদে বাছবিচার না করলেও সাহিত্য পাঠ ও মূল্যায়নে তিনি নির্মম সৎ- এটা বুঝি। তাই তার উৎসর্গপত্রে লেখকদের নাম দেখে বুঝি, কাদের লেখা তার প্রাণের প্রতিবেশী। ভালো লাগে, যখন আমার পাঠের সঙ্গে মিলে যায়। কৌত‚হলী হই, এর আগে না-পড়া কোনো লেখকের নাম দেখলে। আজ স্বীকার করি, বুলবুল চৌধুরীর মতো অসাধারণ এক লেখকের কথা আমাকে তার সমসাময়িক কোনো লেখকবন্ধু বলেননি বরং বহু আগে ধ্রুব এষের একটি বইয়ের উৎসর্গপত্রে নাম দেখে আমার বুলবুল চৌধুরী-পাঠ শুরু।
ধ্রুব এষের সঙ্গে সামান্যই আড্ডার স্মৃতি আমার। পল্টন তো প্রায়ই যাই কিন্তু কখনো ধ্রুব-বাস্তুকে গন্তব্য করে পল্টন গেলে আমার মনে হয়, আমি যেন ল্যান্সডাউন রোডে যাচ্ছি, দেশপ্রিয় পার্কের মোড়ে টার্ন নিচ্ছি, শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ঢুকছি কারণ আমি জানি প্রতিদিন, প্রতিরাত শব্দ আর রঙের রক্তে জীবনানন্দ হয়ে কাটা পড়ছেন, ট্রামের সঙ্গে কোলাকুলি করছেন, মরছেন- জেগে উঠছেন এবং আমাদের নিরন্তর তারা তীব্র সৃষ্টিপ্রভায় জাগিয়ে রাখছেন, একজন ধ্রুব এষ।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়