হাতিরঝিলে ভাসমান লাশ উদ্ধার

আগের সংবাদ

নির্বাচন নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চলছে: কাদের মির্জা

পরের সংবাদ

সময় এসেছে যুক্তিবাদী সিদ্ধান্ত নেয়া এবং প্রয়োগের

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৪, ২০২১ , ১০:০৪ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৪, ২০২১ , ১০:০৯ অপরাহ্ণ

একাত্তরের রণাঙ্গনে রাজধানীর রাজপথে বিশাল প্রতিবাদী মিছিলে কিংবা শহর-গ্রামে স্বাধীনতার স্লোগান শুনে মনে হতো লড়াইটা সর্বজনীন বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্যে- সবাই এক লক্ষ্য অর্জনে এককাট্টা- পূর্বজদের স্মরণে বলতে হয়, ‘জাগে নব বাঙালি জনতা/ এক জাতি এক প্রাণ একতা।’ কিন্তু বিষয়টা পুরোপুরি তেমন চরিত্রের ছিল না।
জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ এবং ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থক সংখ্যা নেহায়েত কম ছিল না। আবেগে-উত্তেজনায় সেদিকে নেতারা সব গর্তে লুকিয়ে ছিল সুযোগমতো বেরিয়ে এসে ছোবল দেয়ার অপেক্ষায়- সাধারণ সমর্থকগণ জনারণ্যে মিশে সুযোগের অপেক্ষায়। আবারো বলি, জয়ের আবেগের তাড়নায় আমরা সেসব আভাস-ইঙ্গিত গ্রাহ্যই করিনি।
সবাই একমত- বিজয় অর্জিত হয়ে গেছে, আর ভয় নেই। আমাদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে বিচক্ষণতা এবং দূরদৃষ্টির কত যে অভাব তা দিনের পর দিন, ঘটনার পর ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে। হয়েছে একাত্তরের চেতনাবিরোধী ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির উত্থানে এবং তৎপরতায়। এক একটি ঘটনায় চোখ খুলেছে, অভিযান চলেছে, আবার বিপরীত শক্তির সংঘবদ্ধ উত্থান ঘটেছে।
ঘটনায় দেখা গেছে রাজনৈতিক মহলে, ঘটেছে সামাজিক বিভিন্ন শ্রেণিতে, এমনকি আমাদের পরম গর্বের স্থান সাংস্কৃতিক ভুবনে- বোমাবাজি থেকে ব্যক্তিগত হামলা এবং বৈচিত্র্যে। এগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, কিন্তু অবস্থার গুরুত্ব উপলব্ধি করে বিষঝাড় শিকড়শুদ্ধ নির্মূল করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা তথা অভিযান কমই নেয়া হয়েছে।
\দুই\
এরপর ঠিকই ঘটে গেল তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক ঘটনা- কুষ্টিয়ার পাঁচ রাস্তার মোড়ে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা এবং তা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (৫.১২.২০২০)। ঘটনা গভীর রাতে ঘটলেও বলতে হবে বিপরীত শক্তি এমন একটি ঘটনা তৎপর হওয়ার সাহস সঞ্চয় করতে পেরেছে- এটাকে রাজনৈতিক অশনিসংকেত হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
সম্ভবত এমন ঘটনা আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে প্রত্যাশিত ছিল না, তাই যথেষ্ট নিরাপত্তামূলক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজনবোধ করা হয়নি। ঘটনার পর একটি দৈনিক পত্রিকার সংবাদ শিরোনাম ‘কঠোর অবস্থানে সরকার।’ এটাই স্বাভাবিক। প্রতিবাদে সারাদেশ উত্থাল-মিছিল, সমাবেশ চড়া ও কড়া সুরের বক্তব্যে। উল্লিখিত প্রতিবেদনে একটি তাৎর্যপূর্ণ বার্তা শিরোনাম : ‘বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি ভয়ঙ্কর বার্তা।’
এ বার্তার অন্তর্নিহিত গুরুত্ব বুঝতে পাঠকের কষ্ট হবার কথা নয়- ওরা বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের প্রধান ব্যক্তিটির বিরুদ্ধেই হিসেব-নিকেশ করে লড়াইয়ে নেমেছে। সেটা শুরু ভাস্কর্য ভাঙচুর দিয়ে ধর্মীয় অজুহাতে। ভাস্কর্য শিল্পকলার গুরুত্বপূর্ণ একটি। মূর্তির অজুহাতে শিল্পকলার চরম সৌন্দর্যের অন্যতম ভাস্কর্য ভাঙচুরের অর্থ লড়াইটা সংস্কৃতি ফ্রন্টে শুরু, ক্রমে এগিয়ে আসবে রাজনৈতিক মহলে। আর এ ভাস্কর্যেও রাজনীতি আছে ভাস্কর্যের বিষয়গত কারণে।
সরকার সঙ্গত কারণেই বিষয়টিকে নিয়ে কঠোর অবস্থানে, একে রাষ্ট্রদ্রোহ চরিত্রে চিহ্নিত করে সম্ভবত, ধীরে সুস্থে হলেও এরা এ পর্যায়ে ক্ষান্ত হবে না। কারণ এরপরই আঘাত এসেছে শহীদ বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ওরফে বাঘা যতীনের ভাস্কর্যও ভাঙচুর করা হয়েছে কুষ্টিয়ায়। এরপর কার ওপর আঘাত আসবে বলা কঠিন।
সংস্কৃতি ফ্রন্টে আঘাত শুরুর একটা তাৎপর্য হতে পারে, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মাধ্যমে আমাদের জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীলতার শক্তি সর্বাধিক, যা জাতির রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তি এবং সেই সঙ্গে শক্তিও বটে। কাজেই ওই শক্তিকেই চ্যালেঞ্জ জানানোর পেছনে উল্লিখিত তাৎপর্য খুবই ঘটনা। এর জন্য দরকার জাতীয় জীবনের তথা সমাজের সর্বশ্রেণির স্বাভাবতই সরকারকে ভাস্কর্য ভাঙার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে লড়াইয়ে নামতে হবে বিজয় নিশ্চিত করতে। সেই সঙ্গে সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ লড়াইও নিশ্চিত করতে হবে। গোঁজামিল বা ধামাচাপা দেয়া লড়াই নয়, অপশক্তির শিকড়-নির্মূল করা লড়াইয়ের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করতে হবে, যাতে ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক ও রক্ষণশীল অপশক্তি কদিন পর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। এ পর্যন্ত একাধিক ঘটনার উদাহরণ ও অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা কথাগুলো বলছি।
\তিন\
কারা এই চ্যালেঞ্জ ছুড়ছে, ভাস্কর্য ভাঙার সূচনা ঘটিয়েছে? সাধারণভাবে সবার ধারণা, পূর্বোক্ত জামায়াত থেকে রক্ষণশীল ইসলামি শক্তিগুলো এ অপতৎপরতার পেছনে কাজ করছে। আপাতত ছোট্ট একটি খবরে দেখা যাচ্ছে যে ‘শিক্ষকের ইন্ধনে ভাস্কর্য ভাঙে দুই মাদ্রাসা ছাত্র।’ বিষয়টি অন্য দৈনিকে বিস্তারিত প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে আপাতত তিনটি নাম- বাবুনগরী, মুমিনুল, ফয়জুল- এদের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা।
বিস্ময়কর, যে হেফাজতের সঙ্গে ক্ষমতাসীন সরকার রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি করেছিল আল্লামা শফীকে কেন্দ্র করে, সেই হেফাজতের পূর্বোক্ত তিন শীর্ষ নেতার ভাস্কর্যবিরোধী বক্তৃতার কারণে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা জারি করতে হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ওই দৈনিকেই দুই কলামের সংবাদ শিরোনাম ‘বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে অনড় সরকার।’ তাহলে কী হবে পূর্বোক্ত রাজনৈতিক সমঝোতার? এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট : তারা ভাস্কর্যকে ইসলামবিরোধী মনে করে না। স্বভাবতই পূর্বোক্ত শিরোনাম থেকে এটা স্পষ্ট যে ‘বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ করা হবে, তাতে যত বাধাই আসুক না কেন।’
ধর্মীয় কারণে হেফাজতে ইসলামের মেরুদণ্ডও যথেষ্ট শক্ত, ধর্মের স্লোগানে অনেক অঘটন, অনেক অর্জন নিশ্চিত করেছে ধর্মবাদী রাজনীতিকরা, বিশ্বে উদাহরণ কম নয়। তবে বাংলাদেশের ভিন্ন একটি চরিত্রও সত্য, তাই দেখা যাক এ দ্বন্দ্বের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। আমার ধারণা জয় ক্ষমতাসীন শাসন শক্তির পক্ষে, মূলত বিষয়গত কারণে, তবে নিরাপত্তার বিষয়টি অনিশ্চিত সন্দেহ নেই।
ভাস্কর্য ভাঙা, প্রতিমা ভাঙার ঐতিহ্য যে বাংলাদেশ থেকে দূর হয়নি এ বিষয়টি এর আগে সরকার কঠোর হাতে মোকাবিলা করেনি, তাই ধীরে ধীরে এ প্রবণতা এবং সক্রিয়তা বেড়েছে বৈ কমেনি। কারণ হিসেবে একটি দৈনিক পত্রের (কালের কণ্ঠ ৭.১২.২০২০) শিরোনামে বলা হয়েছে : ‘ভাস্কর্য ভাঙার বিচার হয় না’ (৭.১২.২০২০)। গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিবেদনটিতে ভাস্কর্য ভাঙার এবং সে অপরাধের যথাযথ বিচার ও শাস্তি না হওয়ার বিবরণ প্রকাশ পেয়েছে।
ভাস্কর্যকে ধর্মীয় অনুভ‚তিতে আঘাতের সঙ্গে একাকার করে নেয়ার রাজনৈতিক দুর্বলতা ভাস্কর্যবিরোধী দুর্বৃত্তদের বর্তমান অবৈধ কর্মকাণ্ডে পৌঁছাতে সাহস জুগিয়েছে, এ তথ্যটি এখন যথেষ্ট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সময়ের এক ফোঁড় অর্থাৎ পূর্বেকার ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনাবলির নিয়মমাফিক বিচার করা হলে, অপরাধী শাস্তি পেলে কুষ্টিয়ার মতো ঘটনা ঘটত বলে মনে হয় না।
সমাজের রক্ষণ শক্তি তখন সতর্ক হতো এবং এ ধরনের হামলায় তৎপর হতে। ভাস্কর্য বিষয়ে পিছু হটার একাধিক ঘটনার বিবরণে না যেয়ে শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখই যথেষ্ট। যেমন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের গোল চত্বরের ‘বাউল ভাস্কার্যে’ হামলা চালায় মৌলবাদী গোষ্ঠী। তাদের তোপের মুখে শেষে বিমানবন্দর এলাকা থেকে ভাস্কর্যটি সরিয়ে নেয়া হয়। বিজয় ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠীর ধর্মীয় রক্ষণশীলতার। এ ধরনের একাধিক ঘটনার বিচারহীনতা থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত দেরিতে হলেও সময়োপযোগী এবং অপরিহার্য সন্দেহ নেই। ধর্মীয় মৌলবাদী চেতনা নিয়ে একটি ঘটনা অবিশ্বাস্যই বলতে হয়। ‘প্রথম আলোতে’ প্রকাশিত (২০.১২.২০২০) সংবাদ শিরোনাম : “বাঘা যতীনের ‘ভাস্কর্য ভাঙচুরে’ জড়িত যুবলীগের নেতা।” এতে আরো জানানো হয় ‘পুলিশ বলছে, কয়া মহাবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে যুবলীগের নেতা আনিচুর এ ঘটনা ঘটান।’
এ ঘটনাকে কি আমরা শর্ষের ভূতের আছর, বলব, নাকি পূর্ববর্তী দুর্বলতার প্রতিফলন বলব? ঘটনা যাই হোক, ভাস্কর্য সম্পর্কে, সময় এসেছে, সরকারের যুক্তিবাদী সিদ্ধান্ত নেয়া এবং প্রয়োগের। আর দেরি করা চলবে না।

আহমদ রফিক : লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়