রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট ফ্লাইওভারে সড়ক দুর্ঘটনায় যুবক নিহত

আগের সংবাদ

ধ্রুবকথা

পরের সংবাদ

সংসারে এক সন্ন্যাসী মানুষ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৪, ২০২১ , ৯:০২ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১৪, ২০২১ , ৯:১৫ অপরাহ্ণ

ধ্রুব এষকে নিয়ে স্মৃতিগদ্য লেখা খুব কঠিন আমার জন্য। ১৯৮৬ সালে ফেব্রুয়ারির বইমেলায় ধ্রুবর সঙ্গে দেখা। অনিন্দ্য প্রকাশনের স্টলে। তখন বইমেলা ছিল খুব ছিমছাম। অল্প কিছু স্টল। খোলামেলা। বহেরা তলায় ছিল খাবারের স্টল।
ধ্রুব প্রতিদিন আসত অনিন্দ্যর স্টলে। এক ইউনিটের স্টল। কিছু ভালো বই প্রকাশ করে তারা খুব আলোচিত। সেই স্টলে পাওয়া যাবে আমীরুল ইসলামের ‘আমি সাতটা’। স্টলে একটা পোস্টার ঝুলছে। ধ্রুব সেই পোস্টার দেখে বারবার বইটার খোঁজে স্টলে আসত। একদিন বইটা মেলায় এলো। ধ্রুব বইটা কিনল। আমার সঙ্গে টুকটাক কথা হলো। আমি খুব আশ্চর্য! পরদিন ধ্রুব বইটার প্রশংসা করে আমাকে আরও লজ্জায় ফেলে দিল।
তারপর একটা জীবন পরিণত হলো ধ্রুবর সঙ্গে বন্ধুত্বে। হাজার হাজার দুপুর-বিকেল শিল্পসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করে। ছাত্রজীবনে ধ্রুব থাকত নিউ মার্কেটের পাশে শাহনেওয়াজ হলের ৩ নম্বর রুমে। এক তলায় ভাঙা নড়বড়ে একটা চৌকি। জানালার ধারে। ভাঙা টেবিল। জীর্ণ লকার। ছেঁড়া তোষক। পরিচ্ছন্ন চাদর। সেই বিছানায় বহু দুপুর ঘুমিয়েছি। ধ্রুব রুমে এসে আবার কাজে চলে গেছে। আমি হয়তো ঘুমিয়েই আছি।
তখন সদ্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে জড়িত হয়েছি। প্রকাশনা ও ‘আসন্ন’ সম্পাদনা নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কাছাকাছি পৌঁছতে পেরেছি। সকল কাজে ছায়ার মতো আছে ধ্রুব এষ। ধ্রুব তখন ইলাস্ট্রেশন ও বুক কাভার শুরু করেছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠাগারের বই এবং গানের রেকর্ডের কাভারের ডিজাইন নিয়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করি। আমিও পেইন্টিং ও গ্রাফিক ডিজাইন নিয়ে খুব কৌতূহলী। আমাদের শৈশব কেটেছে। শিল্পী ইউসুফ হাসানের কাছে গ্রাফিক ডিজাইনের হাতেখড়ি। আফজাল হোসেন, কাজী হাসান হাবিব, মাসুক হেলাল, আইনুল হক মুন্না, খালিদ হাসান, সৈয়দ ইকবাল প্রমুখ তখন সম্ভাবনাময় শিল্পী হিসেবে বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণের কাজ করছেন। কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন নবী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, গোপেশ মালাকার, প্রাণেশ মণ্ডল, বীরেন সোম, কালাম মাহমুদ প্রমুখ বাংলাদেশের প্রকাশনাকে দাঁড় করিয়েছেন। এই মহান শিল্পীদের পথ ধরেই ধ্রুবর আগমন। ধ্রুব পূর্বসূরিদের ব্যাপারে খুব ভালো পড়াশোনা করেছে। বাংলা গ্রন্থচিত্রণের আদি পর্ব থেকে আধুনিক পর্ব পর্যন্ত সম্যক ধারণা রাখে।
ধ্রæব একজন অসাধারণ পাঠক। বাংলা বইয়ের মাতাল পাঠক সে। যে কোনো ধরনের বই সে গভীর মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করে। এমন বুভুক্ষু পাঠক আমাদের সমগ্রকালে আর কাউকে দেখিনি। পদ্মানদীর মাঝি কিংবা মাসুদ রানার ধ্বংস পাহাড় সে একই মনোযোগ দিয়ে পড়ে থাকে। তাই বাংলা বই সম্পর্কে ধ্রুবর অপরিসীম ধারণা। ধ্রুব তাই সহজেই প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে অপরিমেয় যশ ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে অল্প বয়সেই। প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে ধ্রুব কিংবদন্তিতুল্য। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনার বিস্তর পরিসর প্রয়োজন। ধ্রুবর অবদান সম্পর্কে অনেক গবেষণা হতে পারে। অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন। সে আলোচনা অন্যত্র করা যাবে।
ধ্রুব সারাজীবন স্পঞ্জের স্যান্ডেল, জিনসের প্যান্ট, পাতলা টি-শার্ট পরে থাকে। শীতকালে একটা সামান্য চাদর পরিধেয় বস্ত্র।
ভালো-মন্দ খেতে খুব পছন্দ করে ধ্রুব। শুঁটকি মাছের নানা পদ তার পছন্দের তালিকায়। সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় জন্ম বলেই মাছ ধ্রুবর প্রিয় খাদ্য তালিকায়। রুই মাছের বড়ো টুকরা ভাজা, চিতল মাছের কোপতা, করলা ভাজি, ঘন ডাল, ভুনা গরুর মাংস, আমের আচার, লইট্ট্যা শুঁটকি এসবই ধ্রুবর প্রিয় খাদ্য।
পানীয় খুব প্রিয়। হুইস্কি কিংবা ভদকা। পরিমিত পান। সেই ছোটবেলা থেকেই ধ্রুব পানাসক্ত। কত সন্ধ্যা কিংবা কত দুপুর বিকেল আমরা মাতাল হাওয়ায় গান গেয়েছি। স্বপ্নকে ঝুলিয়ে দিয়েছি জানালায়। শিল্প সাহিত্যকে হুইস্কি গ্লাসের পাশে বসিয়ে উদ্ধার করেছি জগৎ সংসার। ধ্রুব- এসবই এখন স্মৃতি হয়ে গেছে। শাহনেওয়াজ হল, এলিফ্যান্ট রোডের চারতলার চিলেকোঠা, পল্টনের তিন তলা- স্মৃতির পাহাড় জমে আছে।
ধ্রুব প্রচুর বই কেনে। পড়ে। ভালো বই হলে আমাকে উপহার দিয়ে দেয়। সংগ্রহ করার মতো বই হলে সুনামগঞ্জ- পৈতৃক ভিটায়।
ধ্রুবর মা বই পড়তে ভালোবাসতেন। প্রতি দুপুরে তিনি গল্পের বই পড়তেন। সে অভ্যাস ধ্রুবরও আছে। বাবা ছিলেন স্বল্পভাষী, উপদ্রবহীন, আত্মমগ্ন এক ব্যক্তি। ধ্রুবর মধ্যে তার পিতার ছায়া লক্ষণযোগ্য। আমার সৌভাগ্য যে, ধ্রুবর বাবার সঙ্গে আমার একবার দেখা হয়েছিল। ধ্রুবরই প্রতিমূর্তি হয়ে বসেছিলেন।
ধ্রুব, রুশ- অনুবাদ বইয়েরও খুব ভালো সংগ্রাহক। সেসব বই খুব পড়ত ধ্রুব। উভয়চর মানুষ, বাবা যখন ছোট, মালাকাইয়ের ঝাঁপি, রূপের ডালিখেলা, গল্প আর ছবি- যেন ধ্রুবর মুখস্থ।
মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন ধ্রুবর স্বপ্নের নায়ক। সেবা প্রকাশনীর বই ও রহস্য পত্রিকা ধ্রুব গোগ্রাসে গিলত। ধ্রুব ঢাকায় এসে কাজীদার সঙ্গেই প্রথম দেখা করতে গিয়েছিল। সেবা প্রকাশনীতে ধ্রুব দীর্ঘদিন কাজ করেছে। ইলাস্ট্রেশন ও মেকাপের কাজ।
লুৎফর রহমান রিটন সম্পাদিত ছোটদের কাগজ, মোখতার আহমদ সম্পাদিত কিশোর জগত কিংবা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘আসন্ন’Ñ পত্রিকায় ধ্রুব ডিজাইন করত। নিজের পত্রিকা মনে করে কাজ করত। দৈনিক বাংলার কিশোরদের পাতায়/চাররঙা দুই পাতা প্রথম বই অসাধারণ কাজ করত ধ্রæবÑ তা লিখে বোঝানো যাবে না।
বাংলাদেশের সমস্ত বড়ো প্রকাশনী ধ্রæবর তুলির স্পর্শ ছাড়া অচল। বড় লেখকেরাও অপেক্ষা করেনÑ ধ্রæব ব্র্যান্ডের প্রচ্ছদ পেলে তার বইও সম্পাদিত হবে।
ধ্রæব অনেক বিখ্যাত মানুষের ভালোবাসায় ঋদ্ধ এক ব্যক্তি। সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, নির্মলেন্দু গুণ, সেলিনা হোসেনÑ এদের পূর্ণ ভালোবাসায় ধ্রæব আচ্ছন্ন থাকে।
ধ্রæব সত্যজিৎ রায়ের খুব ভক্ত। তার পথের পাঁচালী ও হীরক রাজার দেশে প্রিয় চলচ্চিত্র। রায়ের প্রচ্ছদ ও গ্রন্থচিত্রণ ধ্রæবকে এখনো বিস্মিত করে। এক ধরনের ঘোরলাগা আচ্ছন্নতার সঙ্গেই কেটে গেল একটি জীবন। সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্প ধ্রæবর খুব প্রিয়। প্রথমবার ধ্রæব আমাদের সঙ্গে কলকাতায় যায় তখন বারবার সে চারমিনার সিগারেট খাওয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। পার্ক স্ট্রিটে অলি পাবে প্রতি সন্ধ্যায় আমি ধ্রæব বসতাম আর মদ্য পান করতাম।
চারমিনার সিগারেট খাওয়ার কারণ কী! কারণ সত্যজিৎ রায়ের গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা চারমিনার সিগারেট খায়। তাই ফেলুদা যে সিগারেট খায়, সেই সিগারেট তাকে খেতেই হবে। সত্যজিৎ রায় বিষয়ক যে কোনো প্রকাশনা ধ্রæব এষ এখনও অতি যতেœর সঙ্গে সংগ্রহ করে থাকে।
খালেদ চৌধুরী, পূর্ণেন্দু পত্রী, সমীর সরকার, সুধীর মৈত্র, যধুজিৎ দাশগুপ্তÑ ওপার বাংলার এই মহান গ্রাফিক্স ডিজাইনারদের ধ্রæব খুব গুণমুগ্ধ। গত ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর ধরে এদের কাজ দেখে যাচ্ছে সে।
ধ্রæবর চেতনার মধ্যে একজন শক্তিমান চিত্রশিল্পী বাস করে। সালভাদর দালি, রেনে ম্যাগ্রিথ, পাবলো পিকাসো তার প্রিয় চিত্রশিল্পী। ধ্রæবর চেতনার মধ্যে পরাবাস্তবতা ও জাদু বাস্তবতা খেলা করে। তাই ধ্রæব খুব অনায়াসেই গ্রন্থ প্রচ্ছদে পরাবাস্তব তুলে আনতে পারে। তাই তার আঁকা প্রচ্ছদের বৈচিত্র্য কখনো শেষ হয় না। বছরে গড়ে পাঁচ হাজার প্রচ্ছদ আঁকলেও তার কোনো পুনর্মুদ্রণ নেই। কারণ ধ্রæবর কল্পনার পৃথিবীতে অসীম আইডিয়া নেচে বেড়াচ্ছে। পেইন্টিংয়ের ইতিহাস যার মস্তিষ্কের ভেতর খেলা করে তার আইডিয়া কোনোদিন ফুরাবে না।
ধ্রæব বুক কাভার ও ইলাস্ট্রেশনের চিত্রশিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। যেন একেকটি আর্ট ওয়ার্ক। ডিজাইনের খপ্পর থেকে বের করে পূর্ণাঙ্গ পেইন্টিংয়ের মর্যাদা পাবে ধ্রæবর অসংখ্য প্রচ্ছদ।
ধ্রæব শিল্পীসত্তা অতি একক। ইদানীং সে পেইন্টিংয়ে মনোনিবেশ করেছে। আমরা অতি শীঘ্র ধ্রæবর একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করতে যাচ্ছি। অয়েল, অ্যাক্রিলিক, কলম, পেন্সিল, কাগজ, কোলাজÑ নানা মাধ্যমে করা কাজ সেই প্রদর্শনীতে থাকবে।
ইদানীং আমার ভেতরে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে। ধ্রæবকে কাভার ডিজাইনের জন্য আমিই প্ররোচিত করি। বইপত্র পত্রিকা দেখিয়ে, প্রকাশকদের কাছে গিয়ে ধ্রæবকে প্রচ্ছদের বিপুল পৃথিবীতে ঠেলে দেই। ধ্রæব সৌভাগ্যবান শিল্পী। এক যুগ সন্ধিক্ষণে তার আবির্ভাব। প্রযুক্তির বিকাশ মুদ্রণ শিল্পকে বহুমাত্রিকতায় নিয়ে যায়। বাংলাদেশে বই প্রকাশের বিপুল-ব্যাপক পৃথিবী গড়ে ওঠার পেছনেও ধ্রæব এষের আবির্ভাব একটা বড় ঘটনা। কিন্তু ধ্রæব যদি প্রচ্ছদ না এঁকে ছবি আঁকত তবে কী হতো? আমার ধারণা, ধ্রæব পৃথিবীর চিত্রকলা-সমাজে বড় আসন পেত। প্রকাশনা শিল্পের সেবা করতে গিয়ে, স্বেচ্ছাশ্রæতিময় হয়ে ধ্রæবকে জীবন ধারণ করতে হলো। এ জন্য কিঞ্চিৎ দায়ী হয়তো আমিও।
ধ্রুব ছোটবেলা থেকে লেখালেখি করে। বিশেষ করে ছড়া-কবিতা এবং ছোটদের গল্প লেখায় তার মুনশিয়ানাত্ত খুব। অসম্ভব সৃজনশীল মানুষ সে। নতুন কিছু লিখতে চায়। বলতে চায়। ভাবতে চায়। তাই ধ্রæবর লেখাও হয়ে ওঠে ধ্রæবর মতো নিজস্ব। তার উপন্যাস তো অস্বাভাবিক রকমের আলাদা। নিজের লেখা নিয়েও ধ্রুবর উচ্ছ্বাস কম। কারণ সে ধ্রæপদী চরিত্র। জানে, তার গন্তব্য কোথায়? ধ্রæব নিজে জানে, কোন লেখা ভালো! কোন লেখা টিকে যেতে পারে। কোন লেখায় সারবস্তু আছে। তাই কাজের ব্যাপারে ধ্রæব খুব সচেতন ও উদাসীন।
ধ্রæবর ভেতরে করপোরেটত্ব নেই। খুব সাধারণভাবে অসাধারণ জীবন-যাপন। ভ্রুক্ষেপ রোয়াহীন চরিত্র। যা তার পছন্দ সেখানে সে নাক গলাবে না। যাকে তার অপছন্দ তার সঙ্গে কথা বলবে কপাল কুঁচকে। টাকা আয়ের জন্য নিজেকে কখনো বিক্রি করেনি। আত্মবিক্রয় করার চেয়ে না খেয়ে মরে যাওয়া ভালোÑ এই বিশ^াসে বিশ্বাসী ধ্রæব এষ। একজীবনে যথেষ্ট টাকা আয় করেছে। কিন্তু সঞ্চয় বা সম্পদ বলতে কিছু নেই। টাকা থাকলে দুই হাতে উড়ায়। মানুষের উপকার করে। ধ্রæবকে কেন্দ্র করে অনেকে বেঁচে থাকে। তরুণ সাহায্য প্রার্থীরা তার কাছে বিমুখ হয় না। মানবিক গুণাবলি অনেক। সংসারে একা সন্ন্যাসী সে।
এবার ধ্রæবকে জড়িয়ে নিজের একটু-আধটু আত্মপ্রচার করি, যা আমি খুব অপছন্দ করি। তবু প্রসঙ্গক্রমে বলতে হচ্ছে।
ধ্রæব নিজের লেখা প্রায় বিশটার অধিক বই উৎসর্গ করেছে। প্রতি বছরই এক বা দুইটা উৎসর্গ। হাসতে হাসতে বলে, কারে করুম! খুঁইজা পাই না। কে বুঝবে আমার লেখা? তাই আপনি ছাড়া আমার উৎসর্গ করার কেউ নেই।
আমিও বিশেষ ধরনের অনেক বই ধ্রæবকে উৎসর্গ করেছি। উৎসর্গ পত্রে প্রায়ই লিখে থাকিÑ তুমি ছাড়া কে বুঝবে আমার এই নিরীক্ষা!
আমার অনেক বই লেখা হয়েছে ধ্রæবর প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায়। অনেক বই মুদ্রিত হয়েছে ধ্রæবর তত্তা¡বধানে। আমার সমুদ্রিত অনেক বই ধ্রæব তৈরি করে দিয়েছে। এদিক থেকে আমি সৌভাগ্যবান। পিকটোরিয়াল বই, পিকচার বুক- সবই তো ধ্রæবর জন্য লেখা হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে। অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, আমার শিশুসাহিত্য চর্চার অন্যতম প্রেরণা ধ্রæব এষ। আমার অধিকাংশ লেখার প্রথম পাঠক সে। ধ্রæবর আগ্রহ না থাকলে কোথায় ছিটকে নিহত হয়ে আবোল-তাবোল লিখতাম। এ জন্য ধ্রæবর প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা।
আরেকটি ব্যাপারÑ আমি রান্না করতে খুব ভালোবাসি। হারানো দিনের রান্না, সোনালি যুগের রান্না, মায়ের হাতের রান্না, আধুনিক রান্নাÑ সবকিছু নিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আমার রান্নার প্রধান উৎসাহদাতা ও সবচেয়ে বড় ভক্ত শিল্পী ধ্রæব এষ। কথাচ্ছলে ধ্রæব সবাইকে বলে থাকে মানুষের জীবনে মায়ের হাতের রান্না সবচেয়ে প্রিয়। কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয় আমীরুল ভাইয়ের রান্না। ধ্রæবর প্রিয় বলে এখন আমি নানা পদের শুঁটকি রান্না করি। ধ্রæব আমার হাতের অখাদ্য রান্না খেয়েও পরমতৃপ্তি নিয়ে জানায়, অসাধারণ আমীরুল ভাই। কোনো তুলনা নাই!

ধ্রæবর আঁকা অনেক ড্রইং, ডিজাইন, পেইন্টিং আমি খুব যতœ করে সংগ্রহ করি। ধ্রæবর সঙ্গে দেখা হলেই আমার একটাই চাওয়া- ঐ মিয়া, সিগনেচার কইরা ছবিটা দাও।
আমীরুল ভাই, আজ ভালো কিছু নাই। ধ্রæবর কাতর অনুনয়।
খারাপ ছবিটাই দাও। আইজকা নিতেই হইবো। বহুদিন ধইরা ছবি-মবি দাও না। জলদি সই করো।
ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও দু-একটা ড্রইং ধ্রুব সই করে দিয়ে দেয়। আমিও সেসব অতি যতেœ সংগ্রহ করি।
ধ্রæব তো সন্ন্যাসী টাইপ মানুষ। উদভ্রান্ত বাউল। জাগতিক কোনো মোহ তাকে আক্রান্ত করে না। মোহহীন মানুষের দেখা পাওয়া যায় না। ধ্রæব সেই বিরল ব্যক্তি।
আমি আর ধ্রæব বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের খুব খুব খুব ভক্ত। চলচ্চিত্রকে তিনি শিল্পের শীর্ষ আসনে নিয়ে গেছেন। বিমূর্ততা, সম্প্রসারিত বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, জাদু-বাস্তবতাÑ এসব মিলিয়ে তার চলচ্চিত্র বিস্মিত করে আমাদের। বুদ্ধদেবদা অসাধারণ মানুষ। বারবার বলেছেন, আমীরুল তুমি অন্যরকম মানুষ। তোমার নিজস্বতা যেন কোনোদিন হারিয়ে না যায়।
গত জানুয়ারিতে কলকাতা বইমেলায় বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সাম্প্রতিক কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। তিনি চলচ্চিত্রের কবি। আবার সাহিত্যেরও খ্যাতনামা কবি। বইয়ের নাম; ভূতেরা কোথায় থাকে? আশ্চর্য সুন্দর বই। বিশ্ববিখ্যাত এই চলচ্চিত্রকার বইটি উৎসর্গ করেছেন আমাকে ও ধ্রুব এষকে।
সাম্প্রতিককালে এটা আমাদের বিপুল ও ব্যাপক আনন্দ দিয়েছে। নিজেদের জীবনকে এই উৎসর্গ-প্রাপ্তির পর ধন্য মনে হয়েছে। উৎসর্গ দেখে ধ্রæবর চোখে অশ্রæ। কারণ দাদার কিছু কিছু সিনেমা ধ্রুব ৫০-৬০ বারও দেখেছে।
বইটা হাতে নিয়ে আমরা স্তম্ভিত ছিলাম অনেকদিন। ধ্রুব একদিন বলল, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের উৎসর্গ পত্রটি আপনার-আমার বন্ধুত্ব ও সম্পর্ককে চিরকালীন বানিয়ে দিল। আর আত্মপ্রচার নয়। এবার থামি।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়