নেতা পাচ্ছি অভিভাবক কি পাচ্ছি?

আগের সংবাদ

রাজধানীর খাল উদ্ধারে দৃঢ় ভূমিকা দেখতে চাই

পরের সংবাদ

সরকার সরাতে বৃহত্তর গণঐক্যের ডাক বিএনপির

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০২১ , ১০:২০ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১২, ২০২১ , ১০:২৪ অপরাহ্ণ

নিজের দলের এই নড়বড়ে অবস্থান নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামলে ফল কি অনুক‚লে আসবে? অনেকে এটাও মনে করেন যে, করোনার আগের রাজনীতি আর করোনার পরের রাজনীতি এক থাকবে না। উদার গণতান্ত্রিক শাসন ধারা প্রসারিত ও বিস্তৃত হবে, নাকি কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রভাবশালী হয়ে উঠবে, দেখার বিষয় হবে সেটাও। বিএনপির রাজনীতিতে নতুন কিছু উপাদান যুক্ত না হলে এবং শুধু আওয়ামী লীগবিরোধী সাম্প্রদায়িক ধারায় চললে দেশের বাইরে মিত্র পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে।

সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আন্দোলনের পরিকল্পনা নিয়ে বিএনপি অগ্রসর হচ্ছে বলে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইদানীং বলতে শুরু করেছেন। নতুন বছরের প্রথম দিন তিনি বলেছিলেন, এই বছরের মধ্যেই সরকারের পতন ঘটানো হবে। ১১ জানুয়ারি তিনি বলেছেন, নিজেদের অধিকার রক্ষা করার জন্য, ভোটের অধিকার রক্ষা করার জন্য, বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষা করার জন্য সরকার সরানোর বৃহত্তর আন্দোলন শুরু করবে দলটি। সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর গণঐক্য গড়ে তোলার আহ্বানও বিএনপি মহাসচিব জানিয়েছেন। বর্তমান সরকারকে অনির্বাচিত ও ভোট ডাকাতির সরকার হিসেবে অভিহিত করে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন দেশটাতে তারা লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছে। দেশে একটা রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চলেছে।
সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির আন্দোলনের হুমকি নতুন নয়। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকেই আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার হটানোর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সরকার না হটে আরো শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বিএনপির আন্দোলনের সক্ষমতা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা এখন প্রায়ই ঠাট্টা-মশকরা করেন। বলেন, আন্দোলন করার মুরোদ বিএনপির নেই। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন না করে নির্বাচন বন্ধ করার জন্য বিএনপি তার সহযোগী দলগুলো নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিল। দেশে ভয়াবহ সন্ত্রাস ছড়িয়েও নির্বাচন বন্ধ করতে পারেনি। তারপর ২০১৫ সালেও তিন মাসের বেশি সময় ধরে সারাদেশে আগুন-সন্ত্রাসের অসফল আন্দোলন বিএনপি-জামায়াত করেছে। ফল কী হয়েছে তা সবারই জানা।
টানা এক যুগ ধরে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। সরকারের অবস্থান খুব দুর্বল বলে কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করেন না। আবার বিএনপি যে বেহাল অবস্থায় আছে সেটাও কারো অজানা নয়। বিএনপি-দরদি বলে পরিচিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, আজকে বিএনপি করোনাগ্রস্ত। বিএনপি এতটা করোনাগ্রস্ত যে তারা রাস্তায় নামতে পারে না। তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। বিএনপি এখন এত দুর্বল হয়েছে যে তাদের সীমানা এসে গেছে প্রেস ক্লাবের সামনে ৫০ জনের একটা মানববন্ধনে।
বিএনপি সক্রিয় না হলে সামনে দলটির আরো দুর্দিন আসছে বলে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে জাফরুল্লাহ চৌধুরী অতিদ্রুত দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করার পরামর্শ দিয়েছেন। (মার্চ মাসের মধ্যে বিএনপির কাউন্সিল করার কথা দলের ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদও বলেছেন)। ডা. জাফরুল্লাহ আরো বলেছেন, খালেদা জিয়াকে দেশবাসী এখনো ভালোবাসে। বাইরে থাকা অবস্থায় (খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তার ছোট ভাই সাঈদ ইস্কান্দার সরকারের কাছে আবেদন করে খালেদা জিয়ার শাস্তি স্থগিত রেখে জামিনের ব্যবস্থা করেছেন। দুই দফায় তাকে মোট এক বছরের জামিন দেয়া হয়েছে। তাই তিনি জেলের বাইরে আছেন। মার্চ মাস থেকে গুলশানের ভাড়া বাড়িতে অবস্থান করছেন। তবে জামিনের শর্ত অনুযায়ী সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন) উনার (খালেদা জিয়ার) দরকার হবে দ্রুত দলের কাউন্সিল মিটিং করা। তিনি তারেক-কন্যা জাইমা রহমানকে রাজনীতিতে আনার পরামর্শও দিয়েছেন। লন্ডনে অবস্থানরত জাইমা সম্প্রতি ব্যারিস্টার হয়েছেন।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এই পরামর্শ খালেদা জিয়া কানে তুলবেন কিনা, তা আমরা জানি না। তা ছাড়া কাউন্সিল করার মতো বাস্তব অবস্থাও বিএনপির আছে বলে মনে হয় না। কাউন্সিল করে দলের নেতৃত্ব জিয়া পরিবারের বাইরে কাউকে দেয়ার সাহসও হয়তো নেই। কাউন্সিল করে আবারো যদি খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে মাথায় রেখে জোড়াতালির একটি কমিটি করা হয় তাহলেও বা কি লাভ? বিএনপিতে নতুন প্রাণপ্রবাহ তৈরি কীভাবে সম্ভব সেটা পরিষ্কার নয় কারো কাছেই।
দেশে একটি কার্যকর বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা অনেকেই অনুভব করেন। মানুষের পক্ষে কথা বলার মতো একটি সৎ ও সাহসী রাজনৈতিক দলের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। সরকারের তোপের মুখে দাঁড়ানোর অবস্থায় নেই বিএনপি। মুখে যত বড় কথাই নেতারা বলুন না কেন, বাস্তবে তারা অনেকটাই অনুগত অবস্থায় আছে।
সবচেয়ে বড় কথা, জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির কেউ নন। দলের কোনো কমিটিতে তিনি নেই। তার অবস্থান অনেকটা গায়ে মানে না আপনি মোড়লের মতো। তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিএনপি এবং বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সেজন্য কেউ কেউ তাকে খালেদা জিয়ার ‘অবৈতনিক পরামর্শক’ বলেও মনে করেন। নানা কারণে দেশের ভেতরে এবং বাইরে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অনেক ভক্ত আছে। তারপরও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি কিছুটা ‘ব্রাত্যজন’। বিএনপি সমর্থক বলে পরিচিত হলেও কেউ কেউ তাকে কিছুটা স্বাধীন চিন্তার মানুষ বলেও মনে করেন। কিন্তু কোনো সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে না থাকায় তার বলা কথাগুলো দ্রুত হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, কোনো পরিণতি পায় না। বয়সের কারণে তিনি হয়তো কথা এবং কাজের ধারাবাহিকতাও রক্ষা করতে পারেন না।
বিএনপি সক্রিয় না হলে সামনে দলটির আরো দুর্দিন আসছে বলে ডা. জাফরুল্লাহ যে মন্তব্য করেছেন সে কারণেই কি বিএনপি সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে? সরকার বদলানোর আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে? ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীদের পরামর্শ শুনে বিএনপি একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বৃহত্তর ঐক্যজোট করে কি কোনো ভালো ফল পেয়েছিল? জোড়াতালির ঐক্যের পরিণতি বিভ্রান্তি বাড়ায়, অর্থহীন আশাবাদও জাগায়। এবার কাদের সঙ্গে নিয়ে বিএনপি বৃহত্তর ঐক্যের কথা ভাবছে? শোনা যাচ্ছে, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জোনায়েদ সাকীর গণসংহতি আন্দোলনের সঙ্গে ঐক্য-আলোচনা চলছে। এই বাম সংগঠনগুলো আওয়ামী লীগের বিরোধিতার জন্য যদি বিএনপির সঙ্গে হাত মিলায় তাহলে বিএনপির কিছু সুবিধা হলেও বাম দলের কি কোনো লাভ হবে। শত্রুর শত্রুকে মিত্র ভাবার রাজনৈতিক কৌশল অতীতে কোনো সুফল দেয়নি।
বিএনপির কাছে যারা আন্দোলন আশা করেন, তারা আসলে বিএনপিকে বুঝতে ভুল করেন। বিএনপি আন্দোলনের দল নয়। বিএনপি হলো ক্ষমতার দল। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থেকে এই দলের জন্ম দিয়েছেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির ভ‚মিকা নিয়ে যারা উচ্চকণ্ঠ তারা ভুলে যান যে বিএনপির একক আন্দোলনে কোনো সাফল্য নেই। বিএনপি আন্দোলন করে কোনো সরকারের কাছে কিছু আদায় করতে সক্ষম হয়েছে তার কোনো রেকর্ড নেই। বিএনপির যা অর্জন তা আসলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থেকে, এককভাবে নয়। তবু কেন যে বিএনপিকে আন্দোলনের দল মনে করে তার কাছ থেকে আন্দোলন আশা করা হয়Ñ এই মিলিয়ন ডলারের প্রশ্নটির উত্তর কারো কাছে পাওয়া যায় না।
বিএনপির প্রচুর সমর্থক আছে। কিন্তু এই সমর্থকরা দলের জন্য জানবাজি রেখে আন্দোলন করার মতো নন। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা হয়তো এটা বুঝেই জামায়াতের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে সন্ত্রাস-সহিংসতার মাধ্যমে সরকার পতনের আন্দোলন করতে গিয়ে সফল না হয়ে দলের শক্তি ক্ষয় করে এখন নির্জীব হয়ে ঘরে বসে আছেন। রাজনীতিতে শেষ কথা নেই বলে একটি চরম সুবিধাবাদী বাক্য আমাদের দেশে অপরাজনীতির জায়গা তৈরির জন্য চালু করা হলেও বাস্তবে সত্য হলো, রাজনীতিতেও শেষ কথা আছে। নীতিহীনতার রাজনীতি এক সময় পথ হারায়।
বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা কিংবা তার জন্য মানুষের ভালোবাসা নিয়ে একটা ভুল ধারণাও অনেকের মধ্যে ক্রিয়াশীল আছে। খালেদা জিয়ার প্রতি এক ধরনের মুগ্ধতা অনেকের ছিল। এখন আর তা অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না। তার মুক্তির দাবিতে দেশে প্রবল আন্দোলন গড়ে না ওঠা থেকেই সেটা বোঝা যায়। বিএনপির বেহাল দশা কী কী কারণে হলো তার কারণ খোঁজা দরকার ছিল দলটির। কিন্তু তা না করে দলের নেতৃত্ব কেবল আকাশকুসুম চয়ন করেছে। জাফরুল্লাহ চৌধুরী বা অন্য যে কেউ সক্রিয় হওয়ার যতই তাগিদ দেন না কেন, তাতে কাজ হওয়ার সাংগঠনিক অবস্থা দলটির নেই। একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয়তার জন্য যেসব উপাদান-উপকরণ দরকার, বিএনপিতে এখন সেগুলোর ঘাটতি আছে। দেশের বাস্তব অবস্থাও আন্দোলনের অনুক‚ল বলে মনে হয় না। সরকারের বিরুদ্ধে কিছু মানুষের ক্ষোভ অবশ্যই আছে। কিন্তু তারা আওয়ামী লীগকে সরিয়ে বিএনপির মতো দলকে ক্ষমতায় বসাতে চায় বলে মনে হয় না। দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বিএনপির যে যোগাযোগ তাতে দলটি গত কয়েক বছরে কোনো বাড়তি সুবিধা পেয়েছে কি?
বিএনপির শাসনও দেশের মানুষ দেখেছে। বিএনপি দেশে দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন নিশ্চিত করেছিল, সেটা কতজন মনে করেন? বরং মানুষের মধ্যে আছে তারেক-ভীতি, হাওয়া ভবন-ভীতি।
অন্যদিকে বিএনপিতে এখন আর খালেদা জিয়ারও একক নেতৃত্ব কার্যকর নেই। তিনি নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছেন। বড় ছেলে তারেক রহমানকে দলের নেতৃত্বে অস্বাভাবিকভাবে টেনে তুলে খালেদা জিয়া খুব দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন বলে মনে হয় না। কৃত্রিম কোনো কিছুই টেকসই হয় না। নেতৃত্ব ওপর থেকে চাপিয়ে দিলে তার ফল ভালো না হওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। এখন খালেদা জিয়া এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। দলের মধ্যে তারেক রহমানের প্যারালাল নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে। খালেদার ভক্তকুল এবং তারেকের ভক্তকুলের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব আছে। তা ছাড়া দলে নবীন-প্রবীণের বিভাজনও বিরাট। তারেকের সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে খালেদা জিয়া একমত হতে পারেন না, আবার খালেদা জিয়ার সঙ্গেও তারেকের মতভিন্নতার কথাও শোনা যায়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সম্প্রতি এক সমাবেশে বলেছেন, সরকারবিরোধী লড়াইয়ের জন্য দেশের মানুষ বিএনপির দিকে তাকিয়ে আছে। বিএনপির নীরবতার সুযোগে অন্য কেউ যদি (আন্দোলনের) ঘোষণা দেন, তাহলে তিনি জিয়াউর রহমানের মতো আকস্মিক প্রসিদ্ধ হয়ে পড়তে পারেন! এসব ধোঁয়াশাপূর্ণ কথায় মানুষের মনে বিএনপির রাজনীতির স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। মনে হবে, কোনো গোপন পথের দিকে চেয়ে আছে দলটি।
বর্তমান সরকারকে বিতাড়িত করার জন্য একটি যুদ্ধের, একটি লড়াইয়ের ঘোষণা দেয়ার আহŸান জানিয়েছেন গয়েশ্বর রায়। কার প্রতি তিনি এই আহ্বান জানিয়েছেন? খালেদা জিয়া, নাকি তারেক রহমান? খালেদা জিয়া কিংবা তারেক রহমান আহ্বান জানালেই মানুষ লাইন ধরে রাস্তায় নেমে আসবে এমন ধারণা কি খুব বাস্তবসম্মত? তারা তো তেমন ডাক দিয়েছিলেন, মানুষ তাতে সাড়া দেয়নি। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাকে মোকাবিলা করার জন্য বিএনপির অদক্ষতা একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। ষড়যন্ত্রমূলক রাজনীতি আর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যে প্রার্থক্য আছে। এটা বিএনপিকে বুঝতে হবে।
বিএনপি মানুষের সমস্যা নিয়ে তাদের পাশে না দাঁড়িয়ে কেবল মানুষকে রাজপথে সঙ্গে চায় বলে মানুষ এক ধরনের দূরত্ব বজায় রাখে। তা ছাড়া সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে চাইলে বিএনপিকে কতগুলো বিষয় স্পষ্ট করতে হবে। বিএনপি কি জামায়াতকে সঙ্গে রাখবে? কৌশলগত কারণে জামায়াতকে দূরে রাখার ভান করে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে কাছে টানলে সেটা কি মানুষকে খুব উৎসাহিত করবে? বিএনপি কাদের সঙ্গে রাজনৈতিক মৈত্রী করে আওয়ামী লীগ সরকার হটাতে চায় সেটা যেমন পরিষ্কার হতে হবে তেমনি বর্তমান সরকারের চেয়ে কীভাবে উন্নত শাসন ও ভালো শাসন উপহার দেবে এটাও মানুষের কাছে স্পষ্ট হতে হবে। সব থেকে বড় কথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কেও বিএনপিকে তার অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল কোনো রাজনৈতিক দলকে শেষ বিচারে বাংলাদেশের মানুষ আর সমর্থন করবে বলে মনে হয় না।
বিএনপিতে রাজনৈতিক কৌশল এবং নেতৃত্ব নিয়ে মতভিন্নতা আছে। সম্প্রতি মেজর (অব.) হাফিজ এবং শওকত মাহমুদকে শোকজ করার মধ্য দিয়ে দলের সমস্যা বাইরে এসেছে। গয়েশ্বর রায়ও স্বীকার করেছেন যে, আমাদের মধ্যে একটু ঝগড়াঝাটি আছে। দলে পদ নিয়ে টানাটানিতে আছি। একজনের বিরুদ্ধে আরেকজন আছি।
নিজের দলের এই নড়বড়ে অবস্থান নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামলে ফল কি অনুক‚লে আসবে? অনেকে এটাও মনে করেন যে, করোনার আগের রাজনীতি আর করোনার পরের রাজনীতি এক থাকবে না। উদার গণতান্ত্রিক শাসন ধারা প্রসারিত ও বিস্তৃত হবে, নাকি কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রভাবশালী হয়ে উঠবে, দেখার বিষয় হবে সেটাও। বিএনপির রাজনীতিতে নতুন কিছু উপাদান যুক্ত না হলে এবং শুধু আওয়ামী লীগবিরোধী সাম্প্রদায়িক ধারায় চললে দেশের বাইরে মিত্র পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে। জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ নিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি ও শঙ্কা আছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সে বিষয়ে অবস্থান সবারই জানা। কিন্তু এই প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান কি খুব স্পষ্ট? প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়েও বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার হতে হবে। সব ধরনের হঠকারিতা পরিহার করে চলতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। অহেতুক শান্তি বিনষ্ট হোক, জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ুকÑ সেটা কেউ চাইবে না। নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তার ঘাটতি কারো নজর এড়াচ্ছে না। কিন্তু শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা নিয়ে কারো মনে সংশয় তৈরি হওয়ার মতো তথ্য নেই। সরকারকে হটাতে হলে এটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় হওয়া উচিত বৈকি!

বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়