পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় জাপানিরাই হতে পারে মডেল

আগের সংবাদ

উগ্র ডান-বাম শক্তি রাষ্ট্রের জন্য কতটা বিপজ্জনক?

পরের সংবাদ

বিদ্যালয় এখন খুলে দেয়া উচিত

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১১, ২০২১ , ৯:২২ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ১১, ২০২১ , ৯:২২ অপরাহ্ণ

স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতেই বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে এবং অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। যদিও অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করার সামর্থ্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেই, অনেক শিক্ষার্থীর বা অভিভাবকের অ্যান্ড্রয়েড ফোন নেই। আবার যাদের আছে ডাটা কিনে পড়া তাদের সবার সম্ভব হয় না। এ অসম্পূর্ণ ব্যবস্থা ও অবস্থার মধ্য দিয়ে প্রায় এক বছর ধরে চলছে দেশের শিক্ষা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন যে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় জোরপূর্বক সঙ্গরোধ ব্যবস্থা চালু হওয়ার কারণে নিঃসঙ্গতা বৃদ্ধি পায়। নিঃসঙ্গতা ও সঙ্গরোধ ব্যবস্থা এক না হলেও এরা একে অপরকে জোরদার করে তোলে। নিঃসঙ্গতা হলো সাহচর্য হারানো বা সাহচর্য না থাকার ব্যক্তিগত অনুভ‚তির অভিজ্ঞতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকের পক্ষে কোভিড-১৯ মহামারির সঙ্গে সম্পর্কিত বিচ্ছিন্নতা ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারা কঠিন হয়ে পড়েছে। করোনার প্রথমদিকে কেউ কেউ সময়টা একাকী কাটাতে পারা উপভোগ করেছে এবং বুঝেছে যে ব্যাপারটা সাময়িক। অন্যরা অসহায় ও দিশাহারা বোধ করেছে। তা থেকে তাদের মন বিষণœ হয়েছে ও একাকিত্ব বোধ করেছে। সামাজিকীকরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ও শেখার পূর্ণতা আসে। এটি মানুষের মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধি সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলির পরিস্ফুটনও প্রকাশ পায়। তাদের কাক্সিক্ষত নাগরিকে পরিণত করে। সাহসী, নিষ্ঠাবান, সৎ, নৈতিকতাবোধসম্পন্ন, দেশাত্মবোধক মানুষে রূপান্তরিত করে। কিন্তু কোভিড ১৯-এর কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছি আমরা। ইউনিসেফ বলছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী মারাত্মকভাবে মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। (১০ ডিসেম্বর নয়া দিগন্ত)। শিক্ষার্থীদের তাই অনলাইন শিক্ষায় যুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু সবাই এর সুফল পাচ্ছে না। আর এটি একমুখী শিক্ষাদান। জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালার মতো। সেখানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ইউনিসেফ বিদ্যালয়ের দ্বার শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার পক্ষপাতি, কারণ এর মাধ্যমে যে ক্ষতি হবে তা সমাজের অন্যান্য ইউনিটের চেয়ে অনেক কম হবে। তারা চাচ্ছেন কঠোর স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসতে দেয়া হোক।
বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে ২০২০ সালে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয়নি পাবলিক পরীক্ষাগুলো। অনলাইনে বা টেলিভিশনে বিকল্প শিক্ষাদানের চেষ্টা হলেও তাতে সাফল্য এসেছে কমই। আর এসব কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে তা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা এখনো যেমন চ‚ড়ান্ত হয়নি তেমনি কবে স্কুল-কলেজ খুলবে তাও এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি সরকার। স্কুলের সার্বিক পরিবেশ অনেক বাচ্চার সঙ্গে মেশা ও শেখা এ এক আলাদা ‘মানসিক তৃপ্তি’, আলাদা সোশ্যালাইজেশন। এখন বাসায় পড়ানোর চেষ্টা করলেও দেখা যায় বাচ্চাদের আগ্রহ নেই। পরীক্ষা হচ্ছে না অনেকদিন ধরে। পরীক্ষা কীভাবে হয় সেটাই আসলে তাদের মনে নেই। পড়ার আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। আচরণে আসছে পরিবর্তন। ক্লাসরুমে সরাসরি শিক্ষকের তত্ত¡াবধানে একযোগে পড়ার মাধ্যমে যে শিক্ষণ প্রক্রিয়া সেটি না থাকায় এ বছরে যা যা শেখা উচিত তার অনেকখানিই হয়নি বলে মনে করছেন অনেক অভিভাবক। তাই সীমিত আকারে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করা নিয়ে ভাবছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০২১ শিক্ষাবর্ষে করোনা পরিস্থিতি কিছুটা অনুক‚লে এলেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সে অনুযায়ী বলা হয়েছে যে, আগামী জুন নাগাদ এসএসসি বা সমমান পরীক্ষা গ্রহণ করার কথা। পাশাপাশি অনলাইন কার্যক্রম যেখাবে চলছে সেগুলোও অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা যাতে শ্রেণিকক্ষে ক্লাস করে পরীক্ষা দিতে পারে সে রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করার চেষ্টা করছে মন্ত্রণালয়।
পড়াশোনার ও পরীক্ষার পাশাপাশি কো-কারিকুলার কার্যক্রম যেগুলো থাকে সেগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। অনলাইনে তারা হয়তো সিলেবাস শেষ করছে কিন্তু সেটা করছে বেছে বেছে ফলে একটা পাঠের সঙ্গে আরেকটার যে লিংক বাচ্চারা সেটি ধরতেই পারেনি অনেক ক্ষেত্রে। এদিকে ক্লাস পরীক্ষা না হওয়ায় মাধ্যমিক পর্যায়ে একটি সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়ন করে অটো প্রমোশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার এবং সে কার্যক্রম এখন চলছে। অনলাইনে অপর্যাপ্ত শিক্ষাদান, শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া না থাকা, সিলেবাস অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক পাঠ কার্যক্রম পরিপূর্ণ শেষ না হওয়ার জের ধরে প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সর্বত্রই একটি বড় ঘাটতি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। ক্লাসের বিষয় পুরোপুরি শেষ না করলে পরের ক্লাসে গিয়ে অনেক কিছুই বুঝবে না শিক্ষার্থীরা। না বুঝে মুখস্থ করতে চাইবে। সব বিষয়ের মধ্যে আগের ক্লাস বা পাঠের সম্পর্ক থাকে। বলতে গেলে ২০২০ সালে যে যেই ক্লাসের সেই ক্লাসের যা শেখার কথা শিখল না। আবার ২০২০ সালের শিক্ষায় এ ঘাটতির পাশাপাশি যোগ হতে যাচ্ছে ২০২১ সালের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর চ্যালেঞ্জ। একটি সিলেবাস কেন করা হয়। একটি নির্দিষ্ট লেভেলে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয়তার কথা চিন্তা করে। পর্যালোচনা করে বিষয়গুলো সেখানে রাখা হয় যেটি তাদের প্রয়োজন বা বয়সের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এটি ভিত তৈরি করে উপরের লেভেলে পড়াশোনা বা বোঝার জন্য।
স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতেই বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে এবং অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। যদিও অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করার সামর্থ্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেই, অনেক শিক্ষার্থীর বা অভিভাবকের অ্যান্ড্রয়েড ফোন নেই। আবার যাদের আছে ডাটা কিনে পড়া তাদের সবার সম্ভব হয় না। এ অসম্পূর্ণ ব্যবস্থা ও অবস্থার মধ্য দিয়ে প্রায় এক বছর ধরে চলছে দেশের শিক্ষা। কিন্তু কর্মসংস্থানে মানুষ ফিরলেও আমাদের দেশে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরতে পারেনি। করোনাকে পাশে রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। সবকিছু চলমান রেখে শুধু শিক্ষাকার্যক্রমের গতিরোধ করা কতটা যুক্তিযুক্ত সেটিও ভেবে দেখা দরকার। করোনা যদি প্রলম্বিত হতেই থাকে আমরা কি শিক্ষা কার্যক্রম তাহলে আরো বন্ধ রাখব? জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন করোনার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছে এবং হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার ক্ষেত্রেও তেমন চেষ্টা করতে হবে। তবে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার প্রতি যথাযথ গুরুত্বও দিতে হবে। ইতোমধ্যে শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের পক্ষে পরবর্তী ধাপের পাঠ নেয়া কঠিন হবে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে শিক্ষকদেরও ভিন্নতা নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে ভবিষ্যতের জন্য আশানুরূপ মেধা বিকশিত হয় না, যা ব্যক্তিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়। তাই বিকল্প পদ্ধতিতে হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার জোর প্রচেষ্টা চালানো উচিত। হতে পারে, সব শ্রেণিকে একদিন বিদ্যালয়ে না এনে একদিন পর পর নিয়ে আসা, যাতে একটি শ্রেণিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শ্রেণি কার্যক্রম চালানো যায়। কিংবা একটি শ্রেণির এক-তৃতীয়াংশ কিংবা অর্ধেক শিক্ষার্থীকে একদিন পর পর বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা। যেভাবেই হোক, বিদ্যালয় এখন খুলে দেয়া উচিত।

মাছুম বিল্লাহ : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক।
[email protected]

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়