এগিয়ে গিয়েও বায়ার্নের দ্বিতীয় হার

আগের সংবাদ

সরকারকে পাশে চান মেহেরপুরের শিল্পীরা

পরের সংবাদ

বিকৃত যৌনাচার নাকি ধর্ষণ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৯, ২০২১ , ৯:৩৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ৯, ২০২১ , ১২:০৬ অপরাহ্ণ
  • স্কুলছাত্রী আনুশকার মৃত্যুর তদন্ত নিয়ে ধূম্রজাল।
  • সুরতহাল রিপোর্টে বেশি বয়স লেখা নিয়ে প্রশ্ন।
  • ধর্ষণ করা হয়েছে, অভিযোগ আনুশকার বাবার।
  • বিকৃত যৌনাচারে রক্তক্ষরণে মৃত্যু : ময়নাতদন্ত।
  • সম্মতির ভিত্তিতে সম্পর্ক : অভিযুক্ত দিহান।
  • আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিহানের।

রাজধানীর কলাবাগানে বন্ধু দিহানের বাসায় ইংরেজি মাধ্যম পড়ুয়া স্কুলছাত্রী আনুশকা নূর আমিনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত নিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসকরা বলছেন, ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে ধস্তাধস্তি না হলেও বিকৃত যৌনাচারের ঘটনা ঘটেছে। যার দরুন যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথে রক্তক্ষরণে মারা যায় সে। তবে আনুশকার বাবার অভিযোগ ধর্ষণ করা হয়েছে তার মেয়েকে।

অন্যদিকে অভিযুক্ত ইফতেখার ফারদিন দিহান বলছে, পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মতির ভিত্তিতে মেলামেশা হয় তাদের। তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আনুশকা অজ্ঞান হয়ে গেলে ঘাবড়ে গিয়ে নিজের গাড়িতে করে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আনুশকাকে মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে ভিকটিমের মৃত্যু সনদসহ অন্যান্য কাগজপত্রে নাবালিকা উল্লেখ থাকলেও পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বয়স ১৯ লেখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়া হয়ে থাকে। তবে এ ঘটনায় তা না করে গতকাল শুক্রবার আদালতে হাজির করে জবানবন্দি নেয়া শেষে কারাগারে পাঠানো হয় অভিযুক্ত দিহানকে।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে এ ঘটনার পর রাতে কলাবাগান থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ভিকটিম আনুশকার বাবা মো. আল আমিন বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলা নং-৬। মামলার এজাহারে মো. আল আমিন অভিযোগ করেন, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে তিনি ও তার স্ত্রী কর্মস্থলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন। বেলা সাড়ে ১১টায় আনুশকা কোচিংয়ের পেপার আনতে বাইরে যাচ্ছে বলে ফোনে তার মাকে জানায়। বেলা পৌনে ১২টার দিকে আনুশকা বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এজাহারে বলা হয়, দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে দিহান আনুশকার মাকে ফোন দেয়। সে জানায়, আনুশকা তার বাসায় গিয়েছিল। সেখানে হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়লে তাকে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। এ কথা শুনে আনুশকার মা ১টা ৫২ মিনিটে হাসপাতালে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে তিনি কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছে জানতে পারেন আনুশকাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

আনুশকার বাবা এজাহারে আরো বলেন, তারা বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছেন, দিহান তার মেয়েকে প্রেমে প্রলুব্ধ করে ধর্ষণের উদ্দেশে দুপুর ১২টার দিকে বাসায় ডেকে নিয়ে যায়। পরে দিহান ফাঁকা বাসায় তার মেয়েকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে আনুশকা অচেতন হয়ে পড়ে। পরে ধর্ষণের ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে দিহান আনুশকাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার মেয়েকে মৃত ঘোষণা করেন। আগেই আটক করা দিহানকে পরে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

মামলার তদন্তের বিষয়ে দুপুরে সেগুনবাগিচায় ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন কার্যালয়ের সামনে রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. সাজ্জাদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আনুশকা দিহানের কলাবাগানের বাসায় গিয়েছিলেন। অভিযুক্ত দিহানের ভাষ্যমতে, এখানে আসার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আনুশকাকে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করার আগেই মৃত বলে ঘোষণা করে। তিনি আরো বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে গিয়ে আমরা লাশ উদ্ধারসহ দিহান নামের ওই ছেলেকে আটক করি। তাকে হেফাজতে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এক পর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মতির ভিত্তিতে মেলামেশা হয়। এরপর ওভার ব্লিডিং হয়। এ কারণে আনুশকা সেন্সলেস হয়। তখন হাসপাতালে নেয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে তাদের দৈহিক মেলামেশার বিষয়টি প্রমাণ সাপেক্ষ। এর বাইরে অন্য কোনো কেমিক্যাল বা ট্যাবলেট জাতীয় কিছু ব্যবহার করা হয়েছিল কিনা, সেটি পরীক্ষার জন্য আলামত সংগ্রহের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ ঘটনাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্য খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে উল্লেখ করে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, তার পরিবার বুঝে-শুনে মামলা করেছে। এরপরও এর সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।

এদিকে গতকাল দুপুর ১টার দিকে ইংরেজি স্কুল মাস্টারমাইন্ডের ‘ও লেভেলের’ ছাত্রী আনুশকা নূর আমিনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ। ময়নাতদন্তের পর উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে ধস্তাধস্তি না হলেও বিকৃত যৌনাচারের ঘটনা ঘটেছে। যার দরুন যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথে রক্তক্ষরণে মারা যায় সে। চেতনানাশক কোনো কিছু খাওয়ানো হয়েছিল কিনা- সে জন্য নমুনা সংগ্রহ ও ঘটনাস্থলে একাধিক ব্যক্তি ছিল কিনা নিশ্চিত হতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তার ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, থানা পুলিশ সুরতহাল রিপোর্টে বয়স জানতে চেয়েছে। সে কারণে মৃতদেহ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এক্স-রে শাখায় পাঠানো হয়েছিল। তবে তা করা সম্ভব হয়নি। এক্স-রে ছাড়াই মৃতদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া শরীরের গঠন ও দাত দেখে বয়স নির্ধারণ করা হবে।

ভিকটিম আনুশকার মামা হারুন অর রশিদ মর্গে অভিযোগ করে বলেন, দিহান নামে ওই ছেলেই তার বোনের মেয়েকে ফোন করে ফুসলিয়ে কলাবাগানের ডলফিন গলির বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অসুস্থ হয়ে পড়লে দিহানই তাকে ধানমন্ডি আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত বলে জানান। পরে দিহান আনুশকার মাকে ফোন করে জানায়, আনুশকা তার বাসায় গিয়েছিল, সেখানে সে অচেতন হয়ে পড়েছে। তাকে সে আনোয়ার খান মডার্নে নিয়ে এসেছে। পরে তার মা হাসপাতালে গিয়ে মেয়ের লাশ দেখতে পান।

এদিকে শুক্রবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশিদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ইফতেখার ফারদিন দিহান। কলাবাগান থানায় করা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা আসামিকে ১টা ১০ মিনিটে আদালতে হাজির করেন। এ সময় স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক জবানবন্দি নেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। ২৬ জানুয়ারির মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন আদালত। আদালতে কলাবাগান থানার সাধারণ নিবন্ধন (জিআর) শাখা থেকে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে রমনা নিউমার্কেট জোনের এসি আবুল হাসান এ প্রতিবেদককে বলেন, এ ঘটনায় দিহান ছাড়া আটক বাকি তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার এখনো কোনো প্রমাণ মেলেনি। বাকি তিনজনকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হয় অভিযুক্ত। তাই এখানে তাকে রিমান্ডের আনার কোনো প্রশ্ন ওঠে না। পাসপোর্ট, মৃত্যুসনদ ও অন্যান্য নথিতে ১৭ হলেও পুলিশ সুরতহালে বয়স ১৯ উল্লেখ করে- এ দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রশ্ন ওঠায় ময়নাতদন্তে বয়স জানতে চাওয়া হয়েছে। আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দির বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা জবানবন্দির কোনো কপি এখনো পাইনি। এছাড়া তদন্তের স্বার্থে তা বলাও সমুচিন নয়।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের কাছে জিজ্ঞাসাবাদে যা জানিয়েছে দিহান, আদালতেও তাই বলেছে। এক ভাই ২ বোনের মধ্যে সবার বড় আনুশকা। মাস্টারমাইন্ড স্কুলে ইংরেজি বিভাগ থেকে এবার ‘ও লেভেল’ পরীক্ষার্থী ছিল সে। তাদের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার গোপালপুর। তার মা শাহানুরী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কম্পিউটার অপারেটর। আর বাবা আল আমিন আহমেদ নবাবপুরের ব্যবসায়ী। আনুশকাকে তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায় দাফন করা হবে বলেও জানায় তার পরিবার।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়