কী লিখছ? এখন আর কেউ জিজ্ঞেস করবেন না!

আগের সংবাদ

অমৃত পথের যাত্রী

পরের সংবাদ

রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে দূর দেশে

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৭, ২০২১ , ৭:৩৯ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ৭, ২০২১ , ৭:৪১ অপরাহ্ণ

রাবেয়া খাতুন, আমাদের প্রিয় খালাম্মা, তাকে নিয়ে কিছু লেখা আমার জন্য খুব বিব্রতকর। কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা সলজ্জতা এবং কিছুটা শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয় আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আমি খালাম্মার ভক্ত। তার ব্যক্তিত্বের ভক্ত, তার উপন্যাসের ভক্ত, তার ছোটগল্পের ভক্ত, তার শিশুসাহিত্যের ভক্ত। আর রুচিস্নিগ্ধ, বিদগ্ধ, তরুণ্যদীপ্ত খালাম্মা কত বড়মাপের কথাসাহিত্যিক, সে আলোচনা, সে মূল্যায়ন আমাদের সমাজে খুব একটা হয়নি।
খালাম্মাকে চিনি কবে থেকে?
লেখক রাবেয়া খাতুন দূর শৈশব থেকে আমাদের পরিচিত। মুমন ও মিঠুর গল্পের রাবেয়া খাতুনকে, লাল সবুজ পাথরের মানুষ-এর রাবেয়া খাতুনকে আমরা স্কুলজীবন থেকেই চিনি। এমন কোনো কোনো লেখক থাকেন যারা আজন্ম লেখক। পত্রপত্রিকায় বিশেষ সংখ্যার অবধারিত লেখক। এবং আমার ধারণা, বাংলাদেশের ঘরে ঘরে যারা বইয়ের পাঠক তারা ৪০-৫০ বছর ধরেই রাবেয়া খাতুনের নামের সঙ্গে পরিচিত। বাংলাদেশের এমন কোনো লাইব্রেরি বা পারিবারিক বই-সংগ্রহশালা নেই, যেখানে আমি রাবেয়া খাতুনের উল্লেখযোগ্য দু-চারটা বইয়ের সন্ধান পাইনি।
আমাদের জমজমাট শিশুসাহিত্য জীবন শুরু হয়েছিল আলী ইমামের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে এবং লুৎফর রহমান রিটনের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে। এই দুজনই ছিলেন খালাম্মার অসম্ভব প্রিয়জন। সেই কলেজজীবন থেকেই আমরা খালাম্মা সম্পর্কে জানতাম। আলী ইমাম ও রিটনের কাছে গল্প শুনতাম।
মনে পড়ে একবার ৮০ দশকের শুরুর ঘটনা। কাকরাইলে তখন খেলাঘর সংগঠনের কার্যালয়। প্রতি শুক্রবার সেখানে সাহিত্য-সভা হয়। সাহিত্য-সভা শেষে আলী ইমাম ভাই বললেন, চলো বাংলা ভাষার এক বিখ্যাত লেখকের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দেই। কাকরাইলে এক তিনতলা বাড়ির সিঁড়ি ভেঙে আমরা দোতলায় উঠলাম। নিপুণভাবে সজ্জিত ড্রইরুমে প্রবেশ করে জানলাম, এটা সুমন ও মিঠুর গল্পের লেখক রাবেয়া খাতুনের বাসা। না, তিনি সেই বিকেলে বাসায় ছিলেন না। তার দর্শন লাভের সৌভাগ্য সেদিন হয়নি।
পরে কোনো কোনো অনুষ্ঠানে দূর থেকে দেখেছি খালাম্মাকে। বিনম্র প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী, নিচু কণ্ঠস্বর, ধীর পদক্ষেপ, ভরাট হাসিমুখ খালাম্মাকে দেখে ভাবাই যাবে না যে, এই ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে বাংলা ভাষার অসম্ভব শক্তিমান এক লেখক-সত্তা।
পরবর্তীকালে খালাম্মার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এসব আমার জীবনের অন্যতম স্মৃতি সঞ্চয়ের মধুভাণ্ড। খালাম্মার সঙ্গে কলকাতা, দুবাই যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। কোনো কোনো অনুষ্ঠানে খালাম্মার পাশে থেকেছি। ঘুরেছি বইমেলার ভিড়ে। উপভোগ করেছি কোনো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। দেখেছি উল্লেখযোগ্য কোনো চলচ্চিত্র। এ রকম অনেক স্মৃতির পাখিরা এখন ভিড় করছে। তার আগে অন্য প্রসঙ্গ, এখন বই-বিমুখ একটি সমাজে আমরা বাস করছি। প্রযুক্তি ও টেলিভিশনের দ্রুত ধাবমান এই যুগে সবাই তীব্রবেগে ছুটছে। কারো কোনো গভীরতা নেই, মননশীলতা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। লেখালেখি এখন বাণিজ্য সর্বস্ব। প্রবল বিরুদ্ধস্রোতে কয়েকজন রাবেয়া খাতুন আছেন বলেই বাংলা সাহিত্য এখনো সমৃদ্ধ হয়। বাংলা সাহিত্য এখনো সৎ সাহিত্য রচনার স্বপ্ন দ্যাখে।
খালাম্মা এবার ৮৫ বছরে পদার্পণ করলেন। ৬০ বছরেরও অধিককাল তিনি নিবিষ্টচিত্রে, একাগ্র সাধনায় একলব্যের মতো বৈদিক-প্রেরণায় সাহিত্য রচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলা ভাষার খুব কম লেখকই এত দীর্ঘকাল সাহিত্য রচনার সুযোগ পেয়েছেন।
মুসলিম সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে জন্মগ্রহণ করেও রাবেয়া খাতুন কী করে আলোর ঠিকানার সন্ধান করলেন এ বড় বিস্ময় আমার কাছে? কে তাকে সশিক্ষিত করল? কে প্রেরণা জোগাল? বড় লেখক হওয়ার গুণাবলি তিনি কী করে অর্জন করলেন। এসব প্রশ্ন জাগে আমার মনে। প্রকৃত অর্থে মুসলিম নারীদের মধ্যে বলিষ্ঠ ও সর্বার্থে সুসাহিত্যিকের বড় অভাব। কবিতায় সুফিয়া কামাল কিংবা গদ্য-প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া কিংবা সাংবাদিকতায় নূরজাহান বেগম, পরের প্রজন্মের সেই শক্তিমান শিল্পী কোথায়? মুসলিম নারী লেখকদের কথা একবারেই হাতে গোনা যায়। কিন্তু কথাসাহিত্যিক একেবারেই দুর্লভ। গল্প-উপন্যাস পরিশ্রম সাপেক্ষ রচনা-রাবেয়া খাতুন সেই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছেন, একাকী। ঠিক নারী হিসেবে তিনি কখনো বিবেচিত হননি। নারী লেখকদের কাতারেও তার নাম উচ্চারণ হয়নি কখনো। নারী লেখক হিসেবে বিভাজনের সীমানা তৈরি করেননি। তার লেখক জীবনের সূচনাপর্বেই সহযাত্রী ছিলেন শামসুদ্দীন আবুল কামাল, আবদুর গাফ্ফার চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান, আহসান হাবীব, কাইয়ুম চৌধুরী, মির্জা আবদুল হাই, সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান প্রমুখ যশস্বী ও কীর্তিমান লেখকরা। বাঙালি নারীদের হাতে সাহিত্য যেমন নারীর লালিত্য ও রমণীয়তা গুণে অসাহিত্য হয়ে ওঠে অধিকাংশ ক্ষেত্রে, কিন্তু রাবেয়া খাতুন পঞ্চাশ বছর আগে থেকেই ছিলেন চ্যালেঞ্জিং। নারী নয়, একজন প্রকৃত লেখক হিসেবেই তিনি স্থায়ী আসন লাভ করেছেন বাংলা সাহিত্যে। রাবেয়া খাতুনের রচনাকর্মের মধ্যে কোনো মেয়েলিপনা নেই, এটি এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম। এই ধারায় পরে আমরা পেয়েছি রিজিয়া রহমান কিংবা সেলিনা হোসেনকে। রাজিয়া খানের কথাও আমি স্মরণ করছি।
রাবেয়া খাতুনের বিপুল, অজস্র, বহুমুখী রচনাসম্ভারের সামনে দাঁড়ালে বিস্মিত হতে হয়। ক্লান্তিহীন, নিরন্তর তিনি সৃষ্টি সাধনায় মগ্ন থেকেছেন। শুনেছি, প্রতিদিন তিনি অফিস করার মতো রুটিন বেঁধে লেখার কাজ করে থাকেন। এই নিষ্ঠা বাঙালি লেখকদের মধ্যে খুব বেশি দেখা যায় না। আর আমাদের দেশে লেখকরা যত না ব্যস্ত লেখায় তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আদায়ের চেষ্টায়। মোহহীন সাধক প্রকৃতির লেখকরা এই সমাজে দুর্লভ হয়ে উঠছেন। রাবেয়া খাতুনকে দেখলে তাই শ্রদ্ধায় নত হয়ে যাই। আপন ঘোরে, নিজস্ব বলয়ে বৃত্তাবদ্ধ অসাধারণ এই লেখক এখনো আধুনিকতম সৃজনশীলতায় নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন। এবং প্রতি বছর বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বছরের উল্লেখযোগ্য দু-তিনটি উপন্যাস তিনি উপহার দিচ্ছেন আমাদের। এবং এই নিয়ে তার কোনো অহংকার নেই। অনালোচিত থাকলেও তিনি বিচলিতও নন। নিজের আনন্দময় জগতে নিজেই গুটিয়ে থাকেন এবং নিজের শক্তি সম্পর্কেও তিনি পূর্ণাঙ্গ কোনো ধারণা পোষণ করেন না।
দুর্ভাগ্য যে, রাবেয়া খাতুনের সাহিত্য নিয়ে আমাদের দেশে ভালো কোনো প্রবন্ধ রচিত হয়নি। তার রচনাগুলো বিস্তৃত গবেষণার অপেক্ষা রাখে। বহু বিচিত্র বিষয়ে নিয়ে উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখেছেন। আমাদের বিগত ৬০ বছর সময়কালের রাজনীতি, গণমানুষ, মধ্যবিত্তের বিকাশ, মুক্তিযুদ্ধ, নারী-পুরুষ, ইতিহাস, দেশ ভাবনা, জনপদ- অসংখ্য প্রসঙ্গ তার রচনায় চিত্রায়িত হয়েছে। হয়তো কোনো গবেষক সেসব নিয়ে গবেষণা করবেন। তাতেও হয়তো রাবেয়া খাতুনের সঠিক মূল্যায়ন হবে না। আজকের দিনের সস্তা পাঠকরাও রাবেয়া খাতুনের সাহিত্যরস পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন কিনা আমার জানা নেই। তবে এই ভেবে আশ্বস্ত হই, বড় লেখকদের পাঠকভাগ্য হয় না। তারা জনপ্রিয় হন না। হালের বিচারে অনেক সময় উপেক্ষিত থাকেন। সমকাল তাদেরকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। রাবেয়া খাতুন সেই সৌভাগ্যবান বড় লেখক। সমসাময়িককাল তাকে পূর্ণভাবে শনাক্ত করতে পারেনি। তার সমসাময়িক লেখকরাও অনেকটাই উদাসীন থেকেছেন তার ব্যাপারে। উচ্ছ্বসিত হননি তারা।

কিন্তু এটাও বিবেচ্য লেখক স্বীকৃতির কোনো অপূর্ণতা নেই রাবেয়া খাতুনের। আজ থেকে ৪০ বছর আগে তিনি উপন্যাসে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন। ৬০ বছর ধরে পত্রপত্রিকায় তার উপস্থিতি রাজসিক। ৩৮ বছর বয়সে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ধন্য হন। আমাদের দেশের সব বড় পুরস্কারই তিনি পেয়েছেন। এ বড় কম ব্যাপার নয়। রাবেয়া খাতুন জন্মগতভাবেই লেখক, হয়তো সে কারণেই আমাদের বেড়ে ওঠার সময় থেকে আমরা তার লেখার সঙ্গে পরিচিত।


খালাম্মার শখ দেশ ভ্রমণ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তিনি ঘুরেছেন। দেশ ভ্রমণ খালাম্মার নেশা। তীব্র অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তিনি ঘুরে বেড়ান। পৃথিবীর যে প্রান্তেই গিয়েছেন ফিরে এসে ট্রাভেল লিখেছেন। ভ্রমণ কাহিনিগুলো একত্রিত পাঠ করলে বোঝা যাবে, সেখানেও তিনি কত বড় শক্তিমান লেখক। বাংলা ভাষার ভ্রমণ কাহিনি রচনার প্রথাবদ্ধ ছকও তিনি ভেঙে দিয়েছেন। চেরি ফোটার দিনে জাপানে, কুমারী মাটির দেশ অস্ট্রেলিয়ায়, মমি উপত্যকা এবং অন্যান্য আলোকিত নগর, টেমস থেকে নায়াগ্রা, কিছুদিনের কানাডা অসাধারণ সব ভ্রমণ কাহিনির বই।
একবার কলকাতা যাচ্ছি খালাম্মার সঙ্গে। ঢাকা এয়ারপোর্টে খালাম্মার পা ছুঁয়ে সালাম করলাম।
এই আমীরুল, কি হলো?
খালাম্মার হাসিমুখে প্রশ্ন।
আমি বললাম,
খালাম্মার, একজন বিখ্যাত ভ্রমণবিদের সঙ্গে দেশের বাইরে যাচ্ছি। এ আমার পরম সৌভাগ্য। তাই আর কী!
খালাম্মা কথা শুনে হাসলেন।
হ্যাঁ, কথাটা তুমি মন্দ বলোনি?
পরে আরও দুবার কলকাতা গিয়েছি। কলকাতা আর লন্ডন খালাম্মার বড় প্রিয় দুই শহর।
খালাম্মা একদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, প্রতিটা বাঙালির কলকাতা আর লন্ডনে জীবনে একবার হলেও যাওয়া দরকার।
কথাটা আমার খুব মনে ধরে।
এই তো কিছুদিন আগে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে আমরা দল বেঁধে চ্যানেল আইয়ের পক্ষ থেকে গিয়েছি। খালাম্মা আছেন ছায়ার মতো আমাদের সঙ্গে। প্রতিটা পার্টিতে খালাম্মা উপস্থিত হতেন। চুপচাপ বসে বসে পর্যবেক্ষণ করতেন। উপভোগ করতেন।
খালাম্মার ৮৫ বছর বয়সÑ আমার বিশ্বাস হতে চায় না।
খালাম্মা ২২ বছরের তরুণীদের চেয়েও তারুণ্য নিয়ে চলাফেরা করেন।
দুবাইতে গত বছর চ্যানেল আইয়ের পারফরমেন্স অনুষ্ঠানেও তাকে দেখেছি। কী বিপুল উৎসাহ। শত শত মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। আন্তরিকতা নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন। ক্লান্তি নেই। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা অনুষ্ঠান উপভোগ করলেন। ঢাকায় ফিরেই ভ্রমণকাহিনি লিখলেন একটা। লেখা পড়েই বুঝলাম, কত সূ² সংবেদনশীল হৃদয়ের অধিকারী তিনি। কত আশ্চর্য অনুপুঙ্খভাবে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন দুবাই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের।
৮৫ বছর বয়সেও রাবেয়া খাতুন প্রচÐ স্মৃতিশক্তির অধিকারী। যা দেখেন, যা পড়েন সব মনে রাখতে পারেন। আমরা অনেক সময় খালাম্মার সঙ্গে দু-একটা নির্দোষ মিথ্যা বলার চেষ্টা করে সরাসরি ধরা পড়ে যাই। কারণ খালাম্মার অবিশ্বাস্য স্মৃতিশক্তির প্রাখর্যে আমরা পরাজিত হই। ছোটখাটো সব ধরনের ঘটনা প্রবাহ খালাম্মার মনে থাকে। কোথায় যেন পড়েছিলাম, প্রতিভাবান মাত্রেই স্মৃতিধর। স্মৃতিশক্তি যার নেই তিনি বড় কাজ করতে পারেন না।
৮৫ বছরের তরুণী রাবেয়া খাতুনের স্মৃতিশক্তির প্রশংসা না করে উপায় নেই। অসম্ভব গোছানো তিনি। ছিমছাম থাকতে পছন্দ করেন। খুব স্বল্পাহারী। তবে উৎকৃষ্টমানের রান্না এবং পছন্দসই আইটেম না হলে খাদ্যগ্রহণ করবেন না। তার আলোকচিত্র সংগ্রহের বৈভব বিস্ময়কর। যে কোনো জরুরি জিনিস তিনি সংরক্ষণ করেন। প্রয়োজনীয় মুহূর্তে সংরক্ষিত দ্রব্যাদি তিনি উপস্থাপন করতে পারেন।
এসব গুণাবলি অন্যত্র আলোচনা করা যাবে। খালাম্মার সঙ্গে ভ্রমণ বিষয়ে আরেকটু কথা আছে। প্রথমবার কলকাতা ভ্রমণের সময় নিউমার্কেটে ঘুরছি। আমার স্বভাবানুযায়ী টুকটাক নানা প্রসঙ্গে আলাপ করছি। হঠাৎ করে বললাম,
খালাম্মা, আপনি কি লাতিন আমেরিকা গিয়েছেন?
না। সাগরের কোনো আগ্রহ নেই। তাই যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
কথাটা সত্যি। খালাম্মার সঙ্গে প্রায় সব জায়গাতেই সফরসঙ্গী ছিলেন তার কৃতিমান পুত্র, খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক চ্যানেল আইয়ের কর্ণধার ফরিদুর রেজা সাগর। খালাম্মার কথা শুনে সাগর ভাই মৃদু হাসলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
কী, আম্মার সঙ্গে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করছ কি?
হ্যাঁ, সাগর ভাই।

যাও, কোথায় যাবে?
আমি বললাম, লাতিন আমেরিকা।
সাগর ভাইয়ের কাছে কোন আবদার করলে ‘না’ করেন না। হাসতে হাসতে বললেন,
যাও। ঘুরে আসো। অসুবিধা কী?
কোনো অসুবিধা নেই। যাব। খালাম্মা একটা প্ল্যান করতে হবে।
খালাম্মা তখন হাসতে হাসতে বললেন,
তোমরা এমন পেশায় কাজ করো যে, কোনোদিন প্ল্যান করে তোমাদের কিছুই হবে না।
দু’বছর পর আবার কলকাতা। গ্র্যান্ড হোটেলের লাউঞ্জে বসে আছি আমি আর খালাম্মা। পুরনো শতবর্ষী বড় বড় কাঠের অলিন্দ, খিড়কি-দুয়ার এসব নিয়ে গ্র্যান্ড হোটেলের ঐতিহ্য বর্ণনা করছিলেন খালাম্মা। আমি হঠাৎ আবার বোকার মতো বললাম,
খালাম্মা আমাদের লাতিন আমেরিকা যাওয়া হলো না। গার্সিয়া মার্কেজের দেশ, দিয়াগো ম্যারাডোনার দেশ, ফিদেল ক্যাস্ট্রোর দেশ দক্ষিণ আমেরিকা কি যাওয়া হবে না?
খালাম্মা কিছুক্ষণ নিরুত্তর রইলেন। তারপর গম্ভীরভাবে বললেন,
স্বপ্ন। এটা তোমার স্বপ্ন। কোনোদিন তোমার আর আমার অ্যাজটেক বা ইনকা সভ্যতা দেখতে যাওয়া হবে না।
অপ্রাসঙ্গিকভাবেই এসব কথা মনে পড়ল। লাতিন আমেরিকা যাওয়ার স্বপ্ন এখনো আছে আমার। খালাম্মার সঙ্গেই যাব। একজন সফল ভ্রমণকাহিনি রচয়িতার সঙ্গে দূরদেশে যাব, এই স্বপ্নও আমাকে অসম্ভব প্রেরণা দেয়। খালাম্মার স্নেহ আমাকে স্বপ্ন দ্যাখায়।
খালাম্মা অপেক্ষা করুন, আমরাও আসছি।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়