ঢাকার খাল উদ্ধার ও সংরক্ষণ

আগের সংবাদ

রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে দূর দেশে

পরের সংবাদ

কী লিখছ? এখন আর কেউ জিজ্ঞেস করবেন না!

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৭, ২০২১ , ৭:১৭ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ৭, ২০২১ , ৭:২৫ অপরাহ্ণ

রাবেয়া খাতুন। এক নামেই যার অনেক পরিচয়। কথাসাহিত্যিক হিসেবে তার খ্যাতি দুনিয়া জোড়া। বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিকদের একজন তিনি। তার লেখায় দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধনের কথাই ফুটে উঠেছে বেশি। তিনি ছিলেন একান্নবর্তী পরিবারের পক্ষে। সব সময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সময় কাটাতে উন্মুখ থাকতেন। কথায় কথায় একদিন বলেছিলেন, আমি বড় হয়েছি একান্নবর্তী পরিবারে। বর্তমানে একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে? এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হলো, কারণ অনেক আছে। পরিবার ভেঙে টুকরো টুকরো হলে মঙ্গল আসে না। আমাদের জন্য ঠিক না। বিদেশে এ ধরনের পরিবার কালচার গড়ে উঠেছে। কিন্তু আমেরিকা, ইউরোপ সবখানেই এটা নিয়ে বিতর্ক চলছে। এখন আবার যৌথ পরিবারের দিকে ঝুঁকছে মানুষ। এক্ষেত্রে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যৌথ পরিবারে শিশুরা প্রকৃত আদর, আদব-কায়দা শেখে, যা তাদের পরবর্তী জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরাই তো একটা দেশের ভবিষ্যৎ। কাজেই তাদের জন্য আমি যৌথ পরিবারের পক্ষে কথা বলি।
জেনারেশন গ্যাপ এই বিষয়টা আমাকে ভীষণভাবে ভাবায়। জেনারেশন গ্যাপ একটা বড় হতাশার জায়গা। দুই পক্ষ কখনই এক হতে পারে না। কিন্তু যদি উদার দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, সময় ও বিষয়ের গুরুত্ব বুঝে যদি সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে জেনারেশন গ্যাপ থাকার কথা নয়।
একটা সহজ কথা বলি। সংসার নিয়ে অনেকেই দুশ্চিন্তায় ভোগেন। সংসার সাজানোর ক্ষেত্রে সমঝোতাই হলো বড় কথা। সমঝোতা ও মমত্ববোধ যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গাঢ় হয় তখন সংসারও সুশৃঙ্খল ও সুশ্রী হতে থাকে। সংসার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র, সমঝোতা, বিশ্বাস আর মমত্ববোধ ছড়িয়ে দিতে পারলেই জেনারেশনকে সুন্দর করে গড়ে তোলা সম্ভব।
আমি অনেক ভাগ্যবান যে, রাবেয়া খাতুনের মতো বাংলা ভাষার সেরা একজন লেখকের সান্নিধ্যে আসতে পেরেছি। স্কুল-কলেজ জীবনে লেখক হবো- এই স্বপ্নটা যখন দেখতে শুরু করি তখনই আমার আদর্শ ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠেন রাবেয়া খাতুন ও সৈয়দ শামসুল হক। আমার প্রয়াত শিক্ষক পিতা প্রচুর বই পড়তেন। তাকে দেখেই বই পড়ার প্রতি আগ্রহ জন্মায় এবং একদিন সিদ্ধান্ত নেই ভবিষ্যতে লেখক হবো। তারুণ্যে এসে ইমদাদুল হক মিলনসহ আরো অনেক গুণী কবি, লেখকের সাহিত্যকর্মের প্রতি আলাদা একটা ঝোঁক শুরু হয়। কিন্তু রাবেয়া খাতুন ছিলেন সারাক্ষণ আমার মননের ভেতর। প্রায়ই স্বপ্ন দেখতাম একবার যদি রাবেয়া খাতুনের সাথে দেখা হতো। তাকে বলতাম, আমি আপনার লেখার একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত। কীভাবে এত জীবনঘনিষ্ঠ লেখা লেখেন আপনি? একদিন স্বপ্নটা সত্যি হলো। রাবেয়া খাতুনের সাথে শুধু দেখা হওয়া নয়, তার সাথে একটা পারিবারিক সম্পর্ক শুরু হলো। যাকে দেখে লেখালেখির স্বপ্ন দেখেছি তার সাথে সাক্ষাৎ হলো এবং প্রিয় খালাম্মা অর্থাৎ আমাদের মা হয়ে উঠলেন তিনি। তাকে ঘিরে কত স্মৃতি আছে। মা-ছেলের স্মৃতি গুরু আর ভক্তের স্মৃতি, অজুত প্রেরণার স্মৃতি লিখব একদিন। আজ শুধু একটা কথাই মনে পড়ছে। তরুণ কবি-লেখকদের প্রেরণার উৎস ছিলেন রাবেয়া খাতুন। ফোন করলেই প্রথমে জিজ্ঞেস করতেন, কী লিখছ? আহা! কী মায়াময় জিজ্ঞাসা? এখন আর কেউ এমন মায়ায় জড়িয়ে আমার লেখালেখির খবর জানতে চাইবেন না। খুব কান্না পাচ্ছে…
ঢাকার বিক্রমপুরে মামার বাড়িতে জন্ম মহীয়সী নারী বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের। তবে তার পৈতৃক বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগরের ষোলঘর গ্রামে। তার বাবা মৌলভী মোহাম্মদ মুল্লুক চাঁদ ও মা হামিদা খাতুন। রাবেয়া খাতুন প্রবেশিকা (মাধ্যমিক) পাস করেন ১৯৪৮ সালে। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে হওয়ায় বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতেই তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। তাই বলে তিনি থেমে থাকেননি। অচলায়তন ভেঙেছেন। সাহিত্যের সব শাখা যেমন উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, কিশোর উপন্যাস, স্মৃতিকথার মাধ্যমে তিনি পাঠকের মনে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বাস ও সাহসের ভিত্তিভূমি তৈরি করেছেন। ‘এলাম আর জয় করলাম’-এর মতো সাফল্য পাননি রাবেয়া খাতুন। কঠিন জীবন সংগ্রাম ছিল তার। চরম বিপদেও ভেঙে পড়েননি। সংসার সামলেও চালিয়ে গেছেন সাহিত্যকর্ম। বুকে বিশ্বাস আর সাহস ছিল বলেই সাহিত্যকর্মসহ কঠিন জীবন সংগ্রামেও জয়ী হয়েছেন। রাবেয়া খাতুন একটি ইতিহাসের নাম। এই ইতিহাসটাই আমাদের নির্ভরতার ছাদ। আমি এই ছাদটাই বার বার খুঁজছি… না ফেরার দেশে অনেক ভালো থাকবেন খালাম্মা। মাগো, অনেক ভালো থেকো…

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়