রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে দূর দেশে

আগের সংবাদ

করোনার টিকা সম্মুখ যোদ্ধারা আগে পাবে

পরের সংবাদ

অমৃত পথের যাত্রী

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৭, ২০২১ , ৭:৫৩ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ৭, ২০২১ , ৭:৫৩ অপরাহ্ণ

সাহিত্য রচনা ছিল নন্দিত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের নিকট উপাসনার মতো। অসম্ভব পরিশ্রম করে লিখতেন তিনি। তার প্রধান সম্পদ ছিল অন্তরঙ্গ ভাষাশৈলী। তার ছিল তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি পরিপাশর্^কে বিচার বিশ্লেষণ করতে পারতেন। চলমান ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপট আবিষ্কারে পারঙ্গম ছিলেন। জীবনযন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খেত সর্বদা। তার উপলব্ধিজাত বিশ্বাসকে সাহিত্যে প্রকাশ করে অন্যদের মাঝে সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন। অতি নিষ্ঠার সাথে সুদীর্ঘ সময় ধরে রচনা করেছেন। ষাট বছরের সাধনা তার। লিখে গেছেন একাগ্রচিত্তে। তার সাহিত্য সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই সেই বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত ছিলেন যে, যেতে হবে অনেক দূর ঘুমিয়ে পরার আগে।
যাপিত জীবনের রহস্যকে অবিরাম আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। এ বিষয়ে তার চোখে ছিল গভীর তৃষ্ণা। তৃষ্ণা ছিল বক্ষজুড়ে। তিনি জীবনের প্রতি বিশ্বাসকে অবলম্বন করতে চেয়েছেন নিমগ্নভাবে সাহিত্য সৃষ্টির ভেতর দিয়ে।
১৯৬৩ সালে ২৮ বছর বয়সে প্রকাশ করেন তার প্রথম উপন্যাস মধুমতি। বিক্রমপুর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব সংকটের ওপরে ভিত্তি করে উপন্যাসটি রচিত। রাবেয়া খাতুনের রচনাশৈলীর অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে অস্তিত্ব সংকটকালীন পরিবেশ থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়া। প্রথম উপন্যাসেই রাবেয়া খাতুনের গদ্যশৈলীর স্বাতন্ত্র্য প্রকাশিত হয়েছিল সাবলীল ও প্রাঞ্জলভাবে। নতুন ধাঁচের লেখা। ঝরঝরে গদ্যভাষা। ছোট ছোট বাক্যবিন্যাসে চিন্তা-চেতনাকে প্রকাশ করা। বাংলা কথাসাহিত্যে রাবেয়া খাতুনের আগমন ঘটল স্বতন্ত্রভাবে। তার কণ্ঠস্বর ছিল ভিন্ন আঙ্গিকের। সেই থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে রচনা করে গেছেন তিনি। তার জীবনবোধকে মূর্ত করেছেন। সাহিত্য সৃষ্টিতে অতুলনীয় কুশলতায় নিজেকে বাক্সময় করেছেন। রাবেয়া খাতুন চিরভাস্বর একটি নাম।
গত শতকের পঞ্চাশের দশকে তিনি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহনকারী কথাসাহিত্যকে দৃঢ়ভিত্তিতে সংস্থাপিত করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে বিস্ময়কর কুশলতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন আধুনিক জীবন জিজ্ঞাসার। মানুষের বহমান জীবনের অন্তর্গত জটিল সমস্যাসমূহ ও দ্বন্দ্বের অনুসন্ধান করেছেন। তার জন্ম ১৯৩৫ সালে। এক রক্ষণশীল বাঙালি মুসলমান সমাজের নানাবিধ বিধিনিষেধ অতিক্রম করে তিনি বিস্ময়করভাবে স্বীয় দুর্লভ ক্ষমতার পরিচয় দিলেন। তার জীবন চেতনায় প্রবলভাবে অন্তর্গত ছিল অনিসন্ধিসু মনোবৃত্তি। সেই বোধশক্তি অনবদ্যভাবে প্রকাশ চিত্রময় সাবলীল গদ্যে।
গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে মগ্ন চৈতন্যের শিসের মতো রচনা করলেন। সাহিত্য সৃষ্টিতে ব্রতী হয়েছিলেন কিশোর বয়স থেকেই। সাহিত্যের যে সকল শাখা তার অনবদ্য রচনাশৈলীতে পরিশীলিত হয়ে উঠল তা হলো উপন্যাস, ছোটগল্প, শিশুসাহিত্য, ভ্রমণ সাহিত্য, স্মৃতিকথা। রাবেয়া খাতুন যে সময় এ দেশে সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন তখন নারীদের ক্ষেত্রে তা খুব সহজ ছিল না। অজস্র প্রতিক‚ল পরিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে লিখতে হয়েছে তাকে। নানাবিধ প্রতিক‚লতা ছিল। কিন্তু রাবেয়া খাতুন অনড় মনোভাব নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টিতে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।
তিন ডজন উপন্যাসের স্রষ্টা তিনি। লিখে গেছেন ক্লান্তিহীনভাবে। ছোটগল্প লিখেছেন ছয় শতাধিক। তার রচনায় এসেছে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও পেশাজীবীদের কথা। ঢাকার আদিবাসীদের বিশ^স্ত জীবন ধারা ধরা রয়েছে তার ‘সাহেব বাজার’ উপন্যাসে। রোমান্টিক কাহিনী লিখেছেন ‘চাঁদের ফোটা’ উপন্যাসে। ‘বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি’তে পুরনো ঢাকার সর্দারদের জীবন। ‘অনন্ত অন্বেষা’তে বর্ণাঢ্য জীবন। নীল নিশীথ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে যুদ্ধোত্তর বাংলার বিদ্রোহীদের কথা।
রাবেয়া খাতুন রচিত প্রথম উপন্যাস ‘রাজাবাগ’।
ঢাকা নগরীর গড়ে ওঠার এবং বিকাশের উপাখ্যান রচনা করেছেন নিজস্ব অভিজ্ঞতায়। বৈচিত্র্যময় ঢাকা নগরীর ক্রমবিকাশমান ধারার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন তিনি। ঢাকা নগরীর গড়ে ওঠার বিবরণ দিয়েছেন, ‘শুক্লপক্ষে আমাদের একতলা বাড়ির সিঁড়িতে বসে পুবের আকাশ দেখা যেতো চমৎকার পূর্ণিমার চাঁদ। এখন যেখানে রাজারবাগ পুলিশ লাইন তখন নির্জলা ধানক্ষেত। মতিঝিল হাইস্কুলের জমিতে ফুলকপি ক্ষেত। রূপালি গোল প্রকাণ্ড চাঁদটা উঠত সেখান থেকে। দেখতে দেখতে মনে হতো ওটাই শুধু সত্যি নয়, ওর চোয়ানো আলোর ডোবা যে ঘরগুলো থেকে চলে যাবার হাহাকার উঠেছে তারাও সত্যি।’
১৯৬৯ সালে ‘রাজাবাগ’ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় তৃতীয় উপন্যাস ‘মধুমতী।’ গ্রামবাংলার বঞ্চিত, অবহেলিত তাঁতি গোষ্ঠীদের নিয়ে রচিত। চিত্রময় ভাষায় রাবেয়া খাতুন লিখেছেন, ‘কোনো শাড়িতে সুন্দর সুন্দর বুটি উঠছে। কোনোটায় চার কোনা নকশি। সেগুলো দৃষ্টি কাড়লেও যে হাতের জাদুতে এগুলো ফুটছে তাকে ভালো লাগতো না। কেমন রুখাশুখা চেহারা, হাড় জাগা পাঁজর।
নিজের লেখার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘যে কোনো লেখার শুরু, পাত্রপাত্রীর নাম এবং গল্প-উপন্যাসের নাম আমাকে খুব ভোগায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেমনটি চাই তেমনটি নাম মনে আসে না। আবার এগুলো যতক্ষণ পছন্দসই না হয় ততক্ষণ অদৃশ্য কোনো শক্তি যেন রোধ করে রাখে কলমের অগ্রগতি। এ এক মহাজ্বালা। শেষটায় শুরু করলাম রূপকথার ভঙ্গিতেÑ কুঁচবরণ কন্যে মেঘবরণ চুল, খোঁপাতে গোঁজা তার হীরে মোতির ফুল। কিন্তু হলে কী হবে? কন্যের দুচোখের পাতায় রাজ্যের ঘুম জড়ানো। সে ঘুম দিনে রাতে ভাঙে না, ভাঙে বুড়ি রাক্ষুসীর খেয়াল খুশি মতো।…

সংকলন
রাবেয়া খাতুন জীবনের খণ্ড-বিচ্ছিন্ন টুকরো ছবি ও উদ্ভাবনীমূলক কাহিনীর চয়নে দক্ষতার পরিচয় দিতে থাকলেন। তার ভাষা ছিল পরিচ্ছন্ন এবং আকর্ষণীয়। রচনা রীতির বৈশিষ্ট্যের জন্য পাঠকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।
রাবেয়া খাতুনের ভাষা ছিল চিত্রময়। স্নিগ্ধ এবং প্রসন্ন। ‘মধুমতী’ উপন্যাসে লিখেছেন, ‘বর্ষার পানি ঘোলাটে হতে শুরু করেছে। টান ধরা মধুমতীর পলি ছড়ানো পারে পারে অগুন্তি কুঁচো কাঁকড়ার ভিড়। ভেজা মাটির ননীগন্ধে বুকে হাঁটা শামুকের ঝাঁক। মাছরাঙা, বক আর গাঙচিলের ঘন আনাগোনা।’ কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত ‘দেশ’ পত্রিকা ‘মধুমতী’ সম্পর্কে মন্তব্য করেছিল, ‘পূর্ববঙ্গের তাঁতিদের চিত্রটি ঘনিষ্ঠ নৈপুণ্যে অঙ্কিত করেছেন লেখিকা। স্বল্প পরিসর এই উপন্যাসের চরিত্রগুলো অকৃত্রিম এক অন্তরঙ্গ আলোয় উদ্ভাসিত। এদের দেখা যায়, চেনা যায়।’
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গটি রাবেয়া খাতুনকে প্রবলভাবে উদ্বেলিত করেছিল। তিনি অত্যন্ত সৎ ও বিশ^স্তভাবে এই প্রসঙ্গটির অবতারণা করেছেন। একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখকের সামাজিক দায়িত্বের কথা তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন।
তার সংবেদনশীল রচনাসমূহ মুক্তিযুদ্ধকে বিভিন্ন আঙ্গিকে মূল্যায়িত করেছে। সমৃদ্ধ করেছে। আমাদের চিন্তা ও চেতনার জগৎটিকে স্পন্দিত করেছে। তার রচিত মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যসালা হচ্ছে- ১. ফেরারী সূর্য ২. নীল নিশীথ ৩. বাগানের নাম মালনিছড়া ৪. হিরণদাহ ৫. মেঘের পরে মেঘ ৬. ৭১-এর নয় মাস ৭. ৭১-এর নিশান।
মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন রুদ্ধশ্বাস পরিবেশের আবহ বিভিন্ন রচনায় কুশলতার সাথে ফুটিয়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন রাবেয়া খাতুন। মানুষের আবেগ, উৎকণ্ঠা, আশা-আকাক্সক্ষা, মর্মযাতনা, স্বপ্ন সব ধরনের অনুভ‚তিই প্রকাশ করেছেন। সময়কে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছেন ‘ফেরারী সূর্য’ উপন্যাসে। এ হচ্ছে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতার নির্যাস। উপন্যাসটি শুরু হয়েছে- ‘ওরা দুজন পথের দুপারে থমকে দাঁড়ালো। মাঝে মার্চেরই কোনো ক্ষোভের শিকার এক জোড়া পোড়া গাড়ির বেরিকেড।
আশেক হাত নাড়ালো। বিক্ষুব্ধ শিল্পীগোষ্ঠীর বিরাট দলটা ততক্ষণে শহীদ মিনারের দিকে মোড় নিয়েছে। আর দেরি করলে সেও পিছিয়ে পড়বে নিজের দল থেকে। ফ্লাগের বাঁশটা চেপে ধরলো, স্লোগান দিলো, মতিঝিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে উপলব্ধি করলো আজ একবার দু মিনিটের জন্য হলেও দেখা হওয়া দরকার। … প্রতিদিনের চেয়ে আজ একটু অন্যরকম শহরের মেজাজ। রাজপথে পথিক নেই। উত্তেজিত জনতা। উত্তপ্ত মার্চের প্রথম তারিখে ক্রীড়ামোদী যে দলটি সহক্রোধে বেরিয়ে এসেছিল স্টেডিয়াম থেকে, স্কুল-কলেজ থেকে, হাইকোর্ট থেকে তাদেরই খণ্ডিত সত্তার একক ঘোষণা পোস্টারে, ফেস্টুনে। লাল পতাকা বহন করে নিতে নিতে আশেক অনুভব করল ক’দিনে নানাভাবে আক্রান্ত, শোকাহত নগরচরিত্রের এক দুরন্ত দিক।’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গ্রামে, গঞ্জে, শহরে অবরুদ্ধ মানুষজনের মানসিক অবস্থার বর্ণনাতে লেখিকা অনেক ক্ষেত্রে স্নায়ু টানটান অনুভব শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। ঘটমান মুহূর্তগুলোর অন্তরালের প্রেক্ষাপটকে আবিষ্কার করেছেন। পরিবেশের বর্ণনায় ছিলেন আন্তরিক। বিশ্বাসে ছিলেন বলীয়ান। দ্বিধাকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় দিয়ে বিভ্রান্তির বেড়াজাল তৈরি করেননি। প্রত্যয় দীপ্ত ছিল লেখনীর ধারা।
‘ফেরারী সূর্য’ উপন্যাসের এক স্থানে নিজের বিশ্বাসকে লেখিকা এভাবে প্রকাশ করেছেন : ‘এবারের রোজা শুধু গতানুগতিক রোজা নয়, মহরমও ছিল না শুধু দূর অতীতের সকরুণ কাহিনীর ধারক। পাইকারি গণহত্যা, পাইকারি পাপ দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল বিশ শতকের বুড়িগঙ্গার পাড়ের নগরীতে। একটা নয় একসঙ্গে অসংখ্য কারবালার ঘটনা। আরো করুণ, মর্মন্তদ। রোজাদার মানুষ শুধু আত্মিক পরিশুদ্ধির মানসে ছিল না। জাতির মুক্তির প্রার্থনা, প্রিয়জনের শোক সংবরণের কাজেও সে এসেছে। কিন্তু সেই সত্য একমাত্র নয়, চরমও নয়। অশ্রুর প্লাবনে ভাসন্ত দেশে ভিড়তে চলেছে স্বাধীনতার তরণী।’
এভাবে সমকালীন ঘটনাপ্রবাহকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করে রাবেয়া খাতুন তার কথাসাহিত্যে নতুন এক মাত্রা সংযোজন করেছেন।
রাবেয়া খাতুন মুক্তিযোদ্ধা যুবকদের সাথে অনেক সময় সরাসরি কথা বলেছেন, মতবিনিময় করেছেন, আগ্রহের সাথে জানতে চেয়েছেন তাদের চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলে যাওয়ার প্রেক্ষাপট। জীবনকে বাজি রেখে তারা মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। যখন বাতাসে ভাসছে বারুদের গন্ধ, ইথারে রাইফেল, এসএলআরের শব্দ। তবু আকাশে স্বপ্নের মতো অগুন্তি সোনালি তারা জ¦লে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এ দেশের জনজীবন বিপুলভাবে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। রাবেয়া খাতুন একজন মহৎ লেখকের মতো সেই পরিবর্তনকে অনুভব করতে পেরেছিলেন। বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করেছিলেন রণাঙ্গনের কাহিনী। রোমাঞ্চকর উপাখ্যান। এ বিষয়টিতে তার ছিল অদম্য স্পৃহা। যখন গ্রামবাংলায় ছিল পোড়া বারুদের ঝাঁঝ। বাতাসে ভাসত ভয়াল সমস্ত সংবাদ। পাশবিক তাণ্ডবে মেতে ওঠা পিশাচসুলভ হানাদার বাহিনীর নানাবিধ আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ঘটনা।
রাবেয়া খাতুন লিখেছেন- বুদ্ধিজীবীদের নাকি ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, উঠতি বয়সের ছেলেদের ওপর চলছে ব্রেন ওয়াশের নৃশংসতা, মোহাম্মদপুর মিরপুরের দিকে নাকি চৌবাচ্চায় সংরক্ষিত হচ্ছে মানুষের বুকের রক্ত, বস্তাবন্দি হচ্ছে তাজা চোখ, ড্রাম উপচে উঠছে সজীব হৃদপিণ্ডে।’
হানাদার বাহিনীর ভয়ঙ্কর অত্যাচারের বিবরণ পাঠ করে শিহরিত হতে হয়। এভাবে রাবেয়া খাতুন যেন বধ্যভ‚মির এক সংগ্রহশালা গড়ে তুললেন শব্দ সম্ভার দিয়ে। গণহত্যার পাশাপাশি সামরিক জান্তারা নিয়েছিল বাঙালি মানসজগৎকে পাল্টে ফেলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তারা সচেষ্ট হয় শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উদারনৈতিক চিন্তাচেতনা বাদ দিয়ে মৌলবাদী চেতনার বিকাশ ঘটানোর।
এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন ছিলেন রাবেয়া খাতুন। নতুন প্রজন্মের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছেন।
তার ভ্রমণ সাহিত্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। দেখার পাশাপাশি শেখাটাকেও সচল রেখেছেন। বিদেশের বিভিন্ন দুর্গভবনের ইতিহাস উপস্থাপিত করেছেন প্রাঞ্জলভাবে। বিদেশের বস্তুবাদী জীবনধারার চাকচিক্য এবং গতিময়তার অন্তরালে যে হাহাকার মিশে আছে তার নিঃশব্দ আর্তনাদও তিনি শুনেছেন।
রাবেয়া খাতুন যেন উপনিষদে বর্ণিত ঋষি যাজ্ঞ্যবল্কের সেই জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজেন। ঋষি তার স্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘হে মৈত্রয়ী, তা নিয়ে আমি কি করবো যা আমাকে অমৃত দেবে না।’
রাবেয়া খাতুন শেষ জীবন পর্যন্ত একান্তভাবে নিবেদিত ছিলেন সাহিত্যচর্চায়। তিনি সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে হতে চেয়েছিলেন অমৃত পথের যাত্রী।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়