শীতে গরম গীতে বিএনপি

আগের সংবাদ

ট্রাকের ধাক্কায় চুরমার অভিনেত্রী আশার স্বপ্ন

পরের সংবাদ

পুঁজিবাজারে উত্থানেও শঙ্কা!

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৬, ২০২১ , ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ৬, ২০২১ , ৯:২৯ পূর্বাহ্ণ

১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বেড়েছে।
তদারকি অব্যাহত রাখার পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের।

পুঁজিবাজারে উত্থান-পতন একটি স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু কৃত্রিম বুদবুদ (বাবল) তৈরি করে বাজারকে যখন ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে অনেক বড় করা হয়, তখন ধস অবশ্যম্ভাবী। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে এ রকম দুটি কলঙ্কজনক ঘটনার সাক্ষী এ দেশের পুঁজিবাজার। প্রথম দফায় কাগজের শেয়ার নিয়ে অনেক জাল-জালিয়াতি হলেও দ্বিতীয় দফা ধসের সময় বাজারের লেনদেন ব্যবস্থা ছিল ইলেকট্রনিক। কিন্তু কারসাজি চক্র ঠিকই নানা গুজব ছড়িয়ে, রাইট ও প্লেসমেন্ট শেয়ারের ‘মুলা’ দেখিয়ে সর্বস্বান্ত করেছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের। ২০১০ সালের ধসের পর বাজার স্বাভাবিক করতে সুদ ও কর মওকুফ, প্রণোদনা তহবিল গঠনসহ অনেক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু বাজার আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ জন্য আইন প্রয়োগে বিদায়ী খায়রুল কমিশনের ‘গাফিলতি’ ও অসংখ্য দুর্বল কোম্পানির বাজারে আনাকেই দায়ী করা হয়।

অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলামের নেতৃত্বে নতুন কমিশন গঠনের পরই ছন্দে ফিরতে শুরু করে পুঁজিবাজার। নতুন বছরের প্রথম লেনদেনের দিনেই বিরাট উত্থান হয়েছে সূচকের। তারপরের দুই দিন সূচক ওঠানামা করলেও লেনদেন ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু আগের তিক্ত অভিজ্ঞতায় পুঁজিবাজারের এই উত্থান নিয়ে শঙ্কিত অনেকেই। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ভাবছেন, বাজারে আবার কৃত্রিম বুদবুদ তৈরি হচ্ছে না তো? পুঁজি হারিয়ে আবার সর্বস্বান্ত হওয়ার উপক্রম হবে কি? তবে অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা আপাতত সে রকম কোনো লক্ষণ দেখছেন না। দীর্ঘদিন নিম্নমুখী ধারায় থাকা পুঁজিবাজারের গত কয়েক দিনের উত্থানকে স্বাভাবিকই মনে করছেন তারা। এছাড়া বাজারের বর্তমান গতিকে বিএসইসির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরার আভাস হিসেবেই দেখছেন তারা। তারপরও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে তদারকি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কিছু পদক্ষেপের কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। বিশেষ করে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর বন্ধ থাকা প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) খুলে দিয়েছে। পরিচালকদের ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে। আর যেসব কোম্পানি অনিয়ম করেছে তাতে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। অনিয়মের দায়ে অনেক কোম্পানিকে কোটি কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন কমিশনের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। এতে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের আমানতের হার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ। অনেক বেসরকারি ব্যাংক আমানত নিচ্ছেও না। আর যারা আমানত নিচ্ছে তারা সর্বোচ্চ সাড়ে ৫ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা দিচ্ছে। যার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী ব্যাংকে বিনিয়োগ না করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করছেন। এছাড়া চলতি অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে সরকার। যার কিছু প্রভাবও পড়ছে বাজারে। বিশেষ

করে পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেড়ে চলছে। ব্যাংকের ঋণ বিতরণ আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় নির্ধারিত সীমার মধ্যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে উদ্যোগী হচ্ছেন তারাও। এছাড়া করোনাকালীন বিনিয়োগের অন্যান্য পথ বন্ধ থাকায় অনেকে ঝুঁকছেন পুঁজিবাজারের বিনিয়োগে। তবে শঙ্কার বিষয় হলো, ভালো কোম্পানির সঙ্গে স্বল্প মূলধনি কোম্পানির শেয়ারদরে উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। উঠতি বাজারে স্বল্প মূলধনি কিছু কোম্পানির দৌরাত্ম্য ক্রমেই বাড়ছেই। বিশেষ করে ব্যবসা কমে গেলেও কিছু ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েই চলছে। সর্বশেষ গতকালও দর বাড়ার দিক দিয়ে লেনদেনের শীর্ষে ছিল পুঁজিবাজারে নতুন তালিকাভুক্ত ৪০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে। যদিও কমেছে প্রধান সূচক। এ দিন ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ৫৪৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যা ২০১০ সালের ৭ অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ। ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর ২ হাজার ৮০১ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪২.৬২ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬০৯.৭০ পয়েন্টে। এ দিন টাকার অঙ্কে ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে রবির শেয়ার। কোম্পানিটির ২৫৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বেক্সিমকো ফার্মার লেনদেন হয়েছে ১৬৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকার। ১৩৭ কোটি ১২ লাখ টাকার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বেক্সিমকো।

এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, পুঁজিবাজারে এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে বলে মনে হচ্ছে। কারণ, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর কিছু সংস্কার কাজ করেছে, ভালো মানের বড় কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত করেছে। এই কারণে মার্কেটের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। তবে এই ধারা ধরে রাখতে হলে বাজারের তদারকি অব্যাহত রাখতে হবে বিএসইসিকে। কেউ যাতে মার্কেট ম্যানুপুলেট করতে না পারে সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে বলে জানান বিএসইসির সাবেক এই চেয়ারম্যান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থান টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, পরিচালকদের ২ শতাংশ শেয়ার ধারণে বাধ্যবাধকতা, মিথ্যা তথ্য ঘোষণায় আইপিও আসার ক্ষেত্রে কঠোর বিএসইসি। মিথ্যা তথ্যের প্রমাণ পেলে বাতিল হয়ে যাচ্ছে আইপিও আবেদন। ভালো ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। যার কারণে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান পরিচালক রাকিবুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, বর্তমান কমিশনের যুগান্তরকারী কিছু পদক্ষেপের কারণে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে পুঁজিবাজারে। পরিচালকদের শেয়ার ধারণে বাধ্যবাধকতা, কোম্পানির অনিয়মে বিএসইসির জিরো টলারেন্স, মিথ্যা তথ্য ঘোষণার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আইপিও প্রক্রিয়া বাতিল করা হচ্ছে। এসব কারণে পুঁজিবাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। বর্তমান সময়ে ব্যাংকের ইন্টারেস্ট রেট সর্বোচ্চ সাড়ে ৫ শতাংশ। কোনো কোনো ব্যাংক আমানত নিচ্ছে না। যার কারণে দলে দলে মানুষ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন। সব মিলিয়ে এই বাজার স্থিতিশীল হবে বলেই ধারণা ডিএসইর সাবেক এই সভাপতির।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ধস-পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার পুঁজিবাজারে আলোর ঝলকানি দেখা গেলেও তা স্থায়িত্ব পায়নি। মাসখানেক পরে পূর্ববর্তী অবস্থানে ফিরে যায় বাজার। সর্বশেষ ২০১৯ সালে তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুঁজিবাজারে লেনদেন বাড়তে থাকে। তলানিতে থাকা পুঁজিবাজারের লেনদেন হাজার কোটিতে গিয়ে ঠেকে। ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ২৬ কোটি টাকার। পরের দিন অর্থাৎ নতুন সরকার ক্ষমতা নেয়ার দিন ডিএসইতে লেনদেন হয় ৯৬৫ কোটি টাকা। ৮ জানুয়ারি ডিএসইর লেনদেন হয় ১ হাজার ১০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে গিয়েই ডিএসইর লেনদেন ৫০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে আসে। পরবর্তী সময়ে করোনায় আরো তলানিতে যায় ডিএসইর লেনদেন। ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করেও ঠেকানো যায়নি পতন। ফলে বাধ্য হয়ে দুই মাসেরও বেশি সময় বন্ধ রাখা হয় পুঁজিবাজার।

পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থান কতটা টেকসই হবে জানতে চাইলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, পুঁজিবাজার বাড়বে কমবে এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মাঝে মাঝে গুজব আর কারসাজিতে পুঁজিবাজারে উল্লম্ফন হচ্ছে বলে অভিমত দিলেও এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বিএসইসির কিছু ভালো উদ্যোগের জন্য পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়