তামিম-মুশফিকদের উইন্ডিজ সিরিজের প্রস্তুতি শুরু

আগের সংবাদ

নিঃশব্দ বোবাকণ্ঠই বাকশালীদের প্রিয়

পরের সংবাদ

সরকারের মহাপরিকল্পনার অংশীদার বিসিক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৫, ২০২১ , ৫:১৭ অপরাহ্ণ আপডেট: জানুয়ারি ৭, ২০২১ , ৫:৩৮ অপরাহ্ণ

ভোরের কাগজকে মোশতাক হাসান

সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নিমিত্ত সামঞ্জস্য রেখে বিসিকও তার মহাপরিকল্পনার অংশ হিসবে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। করোনা মহামারির প্রভাবে সারাদেশে যখন স্থবির হয়ে যায়, সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে তখনো বিসিক শিল্পনগরীতে পুরোদমে কাজ চলে। এতে করে দেশের এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও খাদ্য, ঔষধ ও অক্সিজেনের অভাব পূরণ করতে সক্ষম হয় সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান, এনডিসি করোনাকালীন ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তায় সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি বিসিকের নিজস্ব তহবিল থেকেও ঋণ বিতরণ করছেন। উদ্যোক্তাদের সহায়তায় সারাদেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মেলার আয়োজন করছেন। দেশকে এগিয়ে নিতে সরকারের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে আরো কিছু পরিকল্পনার কথা জানালেন এই অভিজ্ঞ চেয়ারম্যান।

ভোরের কাগজের সঙ্গে একান্ত আলাচারিতায় তিনি তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মরিয়ম সেঁজুতি- বিসিকের একটি খসরা হিসেবে দখো গেছে, করোনাকালীন ৮ মাস সবকিছু বন্ধ ছিল, তাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ১২ হাজার কোটি টাকার মতো লোকসান করেছে। মোশতাক হাসান বলেন, লকডাউনে সারাদেশে অচল থাকলেও বিসিক ছিল সর্বদা সচল। বিসিকের ৭৬টি শিল্পনগরী আছে। তেল, নুডুলস, সেমাইসহ ৯৫ শতাংশ ঔষধ কোম্পানি বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত। টাঙ্গাইল বিসিকে অক্সিজেন তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ জীবনরক্ষাকারী প্রায় সব পণ্যই বিসিক শিল্পনগরীতে তৈরি হচ্ছে। এ জন্য শিল্পনগরীগুলো বন্ধ থাকলে সারাদেশে সমস্যায় পড়ে যেত বলে মনে করেন বিসিক চেয়ারম্যান মোশতাক হাসান। তিনি বলেন, বিসিকের শিল্পনগরীগুলো চালু থাকায় দেশে ঔষধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব দেখা যায়নি। এ ছাড়া বিসিক শিল্পনগরী বন্ধ না থাকাতে এখানে কর্মরত সাড়ে ৮ লাখ শ্রমিকদের অর্থসংকট হয়নি। এর সঙ্গে ভ্যালু চেইনে যারা জড়িত এদেরও রুটি-রুজির ব্যবস্থা ছিল করোনাকালীন সময়। কোনো ধরনের সমস্যা যেন না হয় এ জন্য আমরা নিয়মিত তদারকির জন্য একটা মনিটরিং টিম গঠন করেছিলাম।

করোনা মহামারিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্প মালিক যারা আছেন গত আটমাস সম্পূর্ণভাবে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ ছিল। ফলে তাদের অবস্থান খুবই খারাপ ছিল। এদের সিংহ ভাগই নারী উদ্যোক্তা। এদের কথা মাথায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরা করোনাকালীন সময়ের মধ্যেই একটা মেলার আয়োজন করি। মেলায় ২৫টি স্টল থাকার কথা থাকলেও আবেদনের ভিত্তিতে ৫৬টি স্টল করা হয়। মেলায় ব্যবসা ভালো হওয়ায় এ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে, তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। আমি ৬৪ জেলা প্রধানকে বিসিকের মেলা আয়োজনের জন্য ইতিমধ্যে চিঠি পাঠিয়েছি। রাজশাহী, ঝিনাইদহ, পাবনা ইতোমধ্যে মেলা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছেন।

বর্তমানে মোশতক হাসান বলেন, বৃহৎ ও মাঝারি উদ্যোক্তারা মোটামুটি প্রণোদনা প্যাকেজ সুবিধা পাচ্ছে। ক্ষুদ্র, কটেজ, অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই আমরা প্ল্যান করলাম, কৃষি দিনের মতো শিল্পঋণ এ কোনো ধরনের মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেই। সেখানে ১৬ দফা সুপারিশ দিয়েছি আমরা। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত এ সুপারিশের আলোকে কোনো কাজ শুরু করেনি। তবে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে একটি মনিটরিং টিম গঠন করে। বিসিক চেয়ারনম্যান জানান, বঙ্গবন্ধুর শতবার্ষিকী উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন হাজার কোটি টাকার যুবঋণ ঘোষণা করেছেন। কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে এটা বিতরণ হবে।

তিনি বলেন, আমরা কর্মসংস্থান ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করলাম। এ যুবঋণ ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া যাবে। তবে এক্ষেত্রে একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তা হচ্ছে, বয়স হতে হবে ১৮ থেকে ৩৫ এর মধ্যে। বয়স নির্ধারিত করে দেয়াতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কিছুটা সমস্যা হয়। সেক্ষেত্রে আমরা বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছি। তা হচ্ছে বিসিকের একটি নিজস্ব ফান্ড আছে। অর্থাৎ ‘বিনিত’ বা বিসিক এর নিজস্ব তহবিল। আমরা এখান থেকে এসব নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করেছি। জেলা উপজেলা পর্যায়ের সবাইকেই আমার নির্দেশনা দেয়া আছে, বিসিকের উদ্যোক্তারা ঋণের জন্য এসে কেউ যেন ফিরে না যায়। মোশতাক হাসান বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়কে আমি প্রস্তাব করেছিলাম যে আমাকে ২ হাজার কোটি টাকা দেয়া হোক। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৬০০ কোটি টাকা বাজেট পাস করানো হয়েছে। এ বাজেট হাতে পেলে আমি বেশ কিছু উদ্যোক্তাকে ঋণ দিতে পারব। তিনি বলেন, করোনাকালীন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি স্বর্ণযুগ। প্রধানমন্ত্রী সবার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। সুতরাং টাকার জন্য বর্তমানে উদ্যোক্তা হতে পারবে না, একথা এখন আর বলা ঠিক না।

বিসিকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মোশতাক হাসান বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে শিল্পোন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, লবণ শিল্প ও স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আরো তিনটি শিল্পপার্ক স্থাপন করবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। গত ৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালি উপজেলায় কর্ণফুলী নদীর তীরে চরণদ্বীপে ১০০ একর জায়গায় লবণ শিল্পের জন্য আলাদা একটি বিসিক লবণ শিল্পপার্ক, স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিসিক নারী উদ্যোক্তা শিল্পপার্ক ও পটিয়ায় ৫০০ একর জমিতে বিসিক মাল্টিসেক্টরাল শিল্পপার্ক স্থাপনের লক্ষ্যে সম্ভাব্য জায়গা পরিদর্শন করেছি। বিসিক চেয়ারম্যান জানান, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নিমিত্ত সামঞ্জস্য রেখে বিসিকও তার মহাপরিকল্পনার অংশ হিসবে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। বিসিক স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনায় ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ৩ হাজার একর জমিতে ১০টি শিল্পপার্ক স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ১৫ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। অনুরূপভাবে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৫ সাল থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। মধ্য মেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ হাজার একর জমিতে ৪০টি শিল্পপার্ক স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মেয়াদ ২০৪১ পর্যন্ত যা সরকারের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ সময়ের মধ্যে ৪০ হাজার একর জমিতে ১০০টি শিল্পপার্ক স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামে বর্তমানে বিসিকের ৫টি শিল্পনগরী রয়েছে। এগুলো- বিসিক শিল্পনগরী ফৌজদারহাট, বিসিক শিল্পনগরী ষোলশহর, বিসিক শিল্পনগরী কালুরঘাট, বিসিক শিল্পনগরী পটিয়া এবং বিসিক শিল্পনগরী মিরসরাই। এ ছাড়াও চট্টগ্রামের রাউজানে ৩৫ একর জায়গায় আরো একটি শিল্পপার্ক নির্মাণাধীন রয়েছে। চট্টগ্রামের বিদ্যমান ৫টি শিল্পনগরীর মোট আয়তন প্রায় ১৫০ দশমিক ৪১ একর। উৎপাদনরত শিল্প ইউনিটের সংখ্যা ১৯৫টি যার মধ্যে ৮৫টি শিল্প ইউনিট রপ্তানিমুখী। বর্তমানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৬০ জন নারী-পুরুষের। ওই ৫টি বিসিক শিল্পনগরীতে হালকা প্রকৌশল যন্ত্রাংশ রেডিমেট গার্মেন্টস, সিরামিক ও নন- মেটালিক পণ্য, কেমিক্যাল এন্ড এলাইড পণ্য, প্যাকেজিং, কাঠ ও বনজ, খাদ্য ও খাদ্যজাত, চামড়া, রাবার ও রাবারজাত পণ্য উৎপাদিত হয়ে থাকে। লবণ শিল্পের জন্য বিসিক লবণ শিল্পপার্ক, নারী উদ্যোক্তাদের বিসিক নারী উদ্যোক্তা শিল্পপার্ক ও বিসিক মাল্টিসেক্টরাল শিল্পপার্কের স্থাপন সম্ভব হলে প্রায় ৫ লাখ নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়