সরকারি স্কুলে ভর্তির লটারি স্থগিত

আগের সংবাদ

ম্যান্ডোলিন বাজানো সেই রোহিঙ্গা যুবক এখন ভাসানচরে

পরের সংবাদ

ভাঙা হবে কি বাংলা একাডেমির পুরনো ভবন বা সংসদ ভবন

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩০, ২০২০ , ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ৩০, ২০২০ , ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ

আমার সহপাঠিনী মাহমুদা হামিদ ঘর-সংসার ছেড়ে টিএসসির সামনে একটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে। প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘টিএসসি ভবন ভাঙা চলবে না’। একদম একা দাঁড়িয়ে আছেন, আশেপাশে কেউ নেই। কিন্তু তার সবচেয়ে সুন্দর সময়, যৌবনের মিঠেকড়া দিনগুলোর সঙ্গে টিএসসির স্মৃতি জড়িয়ে। ফেসবুকেও তিনি তা উল্লেখ করেছেন। মাহমুদা নয় বাংলাদেশের পাঁচটি জেনারেশনের সাংস্কৃতিক গণতান্ত্রিক বিকাশ ও যৌবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র বা টিচার্স স্টুডেন্টস সেন্টার বা টিএসসি।

টিএসসি যে জায়গায় সে জায়গাটি ছিল রমনার মাঠের অংশ। এর মধ্যে গ্রিক স্মৃতিসৌধ, যা একসময়ের ঢাকার মেট্রোপলিটন চরিত্রের ইঙ্গিত বহন করে। ১৯৬০-এর দিকে গ্রিক স্থপতি কনস্ট্যান্টিন ডক্সিয়াডেসের নকশায় টিএসসির নির্মাণ শুরু হয়। গ্রামীণ কুঁড়ের আদলে এর নকশা। মুঘল আমল থেকে বাংলা চালাঘরের ফর্ম আমাদের স্থাপত্যের নকশায় এসেছে। ঢাকার যে মেট্রোপলিটন চরিত্র ছিল বা বিভিন্ন সংস্কৃতির দিকে আগ্রহ ছিল তার প্রমাণ ভিন্ন দেশের প্রথিতযশা স্থপতিদের নিয়ে কাজ করানো। লুই কানের নকশায় গড়ে উঠেছে সংসদ ভবন। ডক্সিয়াডেসও তার আমলে নামকরা, বিদেশি অনেক পর্যটক আসেন শুধু এগুলো দেখতে। ১৯৬৪ সালে এর নির্মাণ শেষ হয়। ১৯৬৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আমরা প্রায় নবনির্মিত ভবনটি পাই। টিএসটিতে প্রথমে পা দিয়ে তো আমরা অভিভ‚ত। সবুজ ঘাসে ঢাকা ল’ন। যা আগে দেখিনি। এক টাকা না পাঁচ সিকায় তিন কোর্সের, ডালসহ ধরলে চার কোর্সের লাঞ্চ। কাঁটাচামচ, ছুঁড়িসহ খেতে হয়। কি পরিচ্ছন্ন, আমাদের রুচি গড়ে তুলল টিএসসি। এর পরিচালক ছিলেন জামান সাহেব। একদিন ল’নের ওপর হেঁটে আসছি, তিনি যাচ্ছিলেন। আমাকে ডাকলেন, বললেন, ল’ন দিয়ে হাঁটা যাবে না ঘাস নষ্ট হয়ে যাবে। ঐ সময় প্রায় প্রতিদিন টিএসসিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। এ মিলনকেন্দ্রটি ছিল শহরের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

১৯৭২ সালে টিএসসিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নাট্য আন্দোলন ডাকসুর উদ্যোগে। ম. হামিদ গড়ে তোলেন নাট্যচক্র। শেখ কামালও একটি নাট্যদল গড়ে তুলেছিলেন, অভিনয়ও করেছিলেন। আমার সহপাঠিনী শারমিন হাসান যে অনুষ্ঠানে নাচতেন সেদিন হলে জায়গা পাওয়া যেত না। টিএসসি আমাদের যৌবন। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, টিএসসির সেই জৌলুস আর নেই। কিন্তু জৌলুস অক্ষুণœ রাখার ব্যাপারে তো বিশ্ববিদ্যালয় কখন চেষ্টাও করেনি।

টিএসসি ভেঙে এখন বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে বলে শুনেছি। ছাত্রলীগের নেতারাও এ ঘোষণা দিয়েছেন টিভিতে। এখন যারা ক্ষমতায় তারা যে মতাদর্শের সৃষ্টি করেছেন তা উন্নয়ন অর্থাৎ জিডিপি বৃদ্ধি। সে প্রচেষ্টা ভালো নয় এমন কথা বিএনপি ছাড়া কেউ বলেনি। তবে এই প্রচেষ্টায় বেশি লাভবান হয়েছেন ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনীতিবিদরা। অন্যেরা ছিঁটেফোঁটা পায়নি তা বলা যাবে না। আমি যখন চাকরি করেছি তখন শেখ হাসিনার কল্যাণেই হঠাৎ বেতন বেড়েছে, পেনশন বেড়েছে। কিন্তু, বৃহৎ জনগোষ্ঠী জিডিপি বৃদ্ধিতে তো এফ বি সি আইয়ের নেতা বা সচিব বা জেনারেলদের মতো লাভবান হয়নি। হলে দেশের অধিকাংশ মানুষ কেন দেশ ছেড়ে যেতে চায়? আজ যদি ইউরোপ, আমেরিকা ভিসা উঠিয়ে দেয় তাহলে বাংলাদেশে তিনজন ছাড়া কেউ থাকবে কিনা সন্দেহ। সে তিনজন হলেন শেখ হাসিনা, যিনি বাবার স্মৃতি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইবেন না। থাকবেন খালেদা জিয়া এ আশায় যে, হাসিনা না থাকলে তিনিই হবেন একচ্ছত্র নেতা, দেশে লোক না থাকলে কি হলো? ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা কী বলেনি আদমি নেহি চাতা, মিট্টি চাহতা, আর থাকবেন বাবুনগরী। তার অনুসারীরা মুসলিম কোনো দেশে থাকে না, কেননা সেখানে তাদের প্রচারিত ইসলাম অচল, মুরগির মাংস আর অকথিত টাকা সেখানে পাওয়া যাবে না, নাছারাদের দেশ তার চাইতে ভালো। কিন্তু বাবুনগরী তো ‘লিডার’ হিসেবে থাকতে চাইবেন। আর কোথাও টাকা দিয়ে তো নেতৃত্ব পাওয়া যাবে না। শুধু বাংলাদেশ নয়, এক জরিপে দেখা গেছে দক্ষিণ এশিয়ার ৮০ ভাগ মানুষ দেশে থাকতে চান না।

উন্নয়ন সংস্কৃতির অর্থ নির্মাণ আর নির্মাণের অর্থ, অর্থ বা টাকা। এ কারণে, আমলা ও রাজনীতিবিদরা নির্মাণ ভালোবাসেন। এতে মানুষ যে লাভবান হয় না তা নয়। এরশাদ আমলে এই উন্নয়ন সংস্কৃতির যখন শুরু তখন রাস্তাঘাট নির্মাণে কি মানুষের লাভ হয়নি? কিন্তু বেশি লাভবান হয়েছে আমলা, ব্যবসায়ী ও জাতীয় পার্টির রাজনীতিবিদরা। এখন যারা সরকারি সুযোগ ও লুটপাটের সুযোগ পাচ্ছেন এরশাদ আমলেও তারা ছিলেন। যদি বিশ্বাস না করেন সে আমলের কাগজপত্র দেখেন।

এ নির্মাণের আর একটি তত্ত¡ হলো যেটি জিয়ার আমল থেকে সূত্রপাত, সেটি হলো, স্বাধীন দেশে তো উপনিবেশের স্মৃতি থাকা যাবে না। এখনো সরকারের অনেকে সে তত্তে¡ বিশ্বাস করেন না তা কেমনে বলি? বিদেশ হচ্ছে স্বাধীনতা ও উন্নয়নের মডেল। সে কারণে, তিনি প্রথমে এসে ঢাকার ঐতিহ্য দুষ্প্রাপ্য ও বর্ণিল বৃক্ষরাজি সাবাড় করলেন। এরশাদ এসেও তাই করলেন। হাসিনার আমলেও এই তত্ত¡ প্রয়োগ করা হয় যেমন, মনিপুরি ফার্মের বাড়ি ভেঙে ফেলা, তখন আমাদের প্রিয় রাজনীতিবিদ মতিয়া চৌধুরী কৃষিমন্ত্রী। স্থপতি, পরিকল্পনাকারী থেকে অনেকে কত কাকুতি-মিনতি করেছে। এটি না ভাঙার, তিনি শোনেননি। দেখেন ভাগ্যের কি পরিহাস! এ দেশের রাজনীতিতে মতিয়া চৌধুরীর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু, আজকে তার আলোচনায় সে অবদানের কথা না এসে কী এলো!

যদি এ তত্ত্ব কার্যকর করতে হয় তাহলে জাতীয় সংসদের কী হবে? ধানমন্ডির সব বাড়ির উন্নয়ন হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ছাড়া। উন্নয়নের নামে কি তাও ভাঙবেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের যে তত্ত¡ দাঁড় করানো হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে ছাত্র শিক্ষক সংখ্যা বেড়েছে। সে কারণে, অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। অবশ্যই যুক্তিযুক্ত তত্ত¡। তারা মাস্টারপ্ল্যানের কথা বলছেন। আমরা যখন শিক্ষক তখন দু’কি তিন দশক আগেও মাস্টারপ্ল্যান হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় যখন বাড়ছে তখন কেরানীগঞ্জে জমি চাওয়া হচ্ছে না কেন? বা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকে যে জমিজমা দান করেছেন তার হিসাব কি নেয়া হয়েছে? অবকাঠামো উন্নয়ন তো সেসব জায়গায়ও করা যায়? সব কি নীলক্ষেতে করতে হবে? পৃথিবীর কোনো দেশে বিশ্ববিদ্যালয় তত্তে¡ এমন চিন্তা নেই। এখন কর্তৃপক্ষের তত্ত¡ অনুযায়ী যদি বলা হয়, ভিসির বাড়ি দিয়েই উন্নয়ন শুরু হোক। তাহলে? যদি বলা হয় প্রায় ৫ একর জায়গায় ভিসির বাড়ি থাকবে কেন? সেটা ভেঙে ১০০ ফ্ল্যাট করেন বা কোনো ফ্যাকাল্টি করেন। ভিসিও তো ফ্ল্যাটে থাকতে পারেন। সচিবরা থাকেন না? বিচারপতি ইব্রাহিম যে জায়গা দান করে গেছেন যা কেউ বলে না, সে গ্রিন রোড ও সেই মার্কেট জায়গা ভেঙে ৫০ তলা বিল্ডিং কেন করেন না? ধানমন্ডিতে জিসি দেবের যে বাড়ি, আজিমপুরে পুরনো শিক্ষকদের দান করা, বাড়ি সেগুলো দখলে এনে ২০ তলা বিল্ডিং করেন না কেন? পরমাণু কমিশন তো চলে গেছে। ঐখানেও তো অনেক জায়গা। আর ভাঙতে হলে তো সবার আগে ভাঙতে হয় কুৎসিত কলাভবন। সেটি ভেঙে নতুনভাবে করুন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঐতিহ্যমণ্ডিত ইমারত আছে- পুরনো হাইকোর্ট, কার্জন হল, ঢাকা মেডিকেল, ফজলুল হক হল, শহীদুল্লাহ হল, মহসীন হল, এস এম হল ও ভিসির বাসভবন, বাংলা একাডেমির পুরনো ভবন। এগুলোর সঙ্গে ইতিহাস ঐতিহ্য জড়িত। এগুলো ভাঙা মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শত বছরের স্মৃতিতে হাত দেয়া।

উন্নয়ন হবে, পুরনো ইমারত ভাঙা হবে, নতুন ইমারত হবে। কিন্তু, নির্বিচারে নয়। শুনেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো চারুকলা ইনস্টিটিউটেরও নাকি সংস্কার হবে। কী হবে আল্লাহ জানেন! ইউরোপ আমেরিকার কী উন্নয়ন সংস্কৃতি নেই। বেশি আছে। নিয়ত নব নব নির্মাণ চলছে। সংস্কার করা হচ্ছে। সেখানে কি পুরনো স্থাপত্য/ভাস্কর্য/নিদর্শনী ভাঙা হয়? হয় না। কারণ, এর সঙ্গে নন্দনতত্ত্ব, রুচিবোধ জড়িত। ঐসব দেশ তো চরম পুঁজিবাদী দেশ। তাহলে রুচির এমন তফাৎ হয় কেন? কারণ, তাদের মধ্যে বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশ হয়েছে, আমাদের মধ্যে লুটেরা ও তাদের ফার্স্ট জেনারেশন চামচাদের বিকাশ হয়েছে। ঐতিহ্য নষ্ট করে বর্বররা। শিক্ষিতরা নয়। আমাদের এখানে শিক্ষিত ও বর্বর এক হয়ে গেছে। আমরা যখন বিদেশ যাই শুধু ইমারত বা রাস্তাঘাট দেখি না। জাদুঘরে যাই, বিনোদনস্থলে যাই। এখানে তথাকথিত উন্নয়নের নামে শুধু নির্মাণের বিকাশ ঘটছে সংস্কৃত ছাড়া- এটাই দুঃখ।

ইতিহাস-ঐতিহ্য মুছে দেয় শত্রæরা। সেখানে তারা নতুন ইতিহাস নির্মাণে সচেষ্ট হয় মনোজগতে আধিপত্য বিস্তারে। ধরা যাক রমনা রেসকোর্স বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কথা। সেখানে আত্মসমর্পণ করেছিল পাকিস্তানিরা, এখানে জিন্নাহর বক্তৃতার প্রতিবাদ হয়েছিল, এখানে বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ঢাকা ফিরে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেখানে জিয়াউর রহমান শিশুপার্ক করলেন। কেন? বঙ্গবন্ধু ও পাকিস্তানের পরাজয়ের স্মৃতি যাতে মুছে যায় সে কারণে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ বলেছিলেন এখানে বিজয় স্মারক হবে। বঙ্গবন্ধুকন্যা সে প্রচেষ্টা নিয়েছেন। আমার ও জেনারেল শফিউল্লার রিটের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি খায়রুল হক রায় দিয়েছিলেন, এখান থেকে পুলিশ থানা, শিশুপার্ক সব উঠিয়ে পুরো জায়গাটা সংরক্ষিত হবে। দুঃখের বিষয় সেটি মানা হয়নি। সব অটুট আছে। কালীমন্দিরের আয়তন বাড়ানো হচ্ছে যা কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে। এখানে এখন মেলা ও জনসভা হয়। অথচ, পাশে এই কলকতা শহরে ময়দানে কিছু করতে দেয়া হয় না। এমনকি বইমেলাও। কারণ ঐ পাবলিক প্লেসে ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ তা রক্ষা করতে হবে। জানি না, কবে প্রস্তাব হবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সুউচ্চ আবাসিক এলাকা, অফিস ভবন বা ডিএইচও করার।

আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগের কথা, শিল্পকলার এক অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসেছেন। আনুষ্ঠানিকতা সেরে তিনি প্রয়াত কবি স্থপতি রবিউল হুসাইন, শিল্পী হাশেম খান ও আমার সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। তখনো তিনি এসব অনুষ্ঠানে আসতে পারতেন ও সময় পেলে আমাদের মতো সাধারণের সঙ্গে দু’একটি কথা বলতে পারতেন। তিনি বলেছিলেনÑ আমার একটা স্বপ্ন আছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পকলা আর সোহরাওয়ার্দী ঘিরে সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয় হবে। এখানে কোনো স্থাপনা গাছের চুড়োর চেয়ে উঁচু হবে না। আমরা মহা উৎসাহে সমর্থন করেছিলাম। হয়তো এখন তা আর তার মনে নেই। কিন্তু টিএসসি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের কথা শুনে এই আলোচনা মনে পড়ল। একদিকে শিল্পকলা আরেকদিকে টিএসসি। আমাদের সাংস্কৃতিক মিলনকেন্দ্র। টিএসসিতে একসময় রাজনৈতিক সভা হয়েছে। কারণে অকারণে টিএসসিতে মিলিত হয়েছি, আন্দোলনের রূপরেখা আলোচনায়। এই তো হেফাজতিদের ঢাকা আক্রমণের সময় আমি, শাহরিয়ার কবির ও নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু এখানে ছাত্রলীগ নেতা ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করেছিলাম এদের প্রতিরোধ করতে হবে। এবং হরতালের আহŸান জানিয়েছিলাম এবং তা সফলও হয়েছিল। ১৯৬৪ থেকে এ ধরনের কত আন্দোলন কত আনন্দমেলার শুরু এখান থেকে। সে স্মৃতি মুছে ফেলার এত আগ্রহ কেন আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের?

আমি তো কবি নই [বিখ্যাত কবিতা পরিষদ যাদের সৃষ্টি এরশাদের স্বৈরাচার প্রতিরোধে তারও শুরু এই টিএসসিতে] না হলে জনমত সৃষ্টিতে শামসুর রাহমান বা নির্মলেন্দু গুণের মতো কবিতা লিখে ফেলতাম। এ মুহ‚র্তে মনে পড়ছে ওয়ার্সো শহরে ইহুদি ইতিহাসের ওপর নির্মিত পলিন জাদুঘরের কথা। সেটি উদ্বোধন উপলক্ষে বিখ্যাত ইহুদি কবি ইয়েহুদা আমি চাই ‘অন্তহীন কবিতা’ শিরোনামে লিখেছিলেন একটি কবিতা-
ঝকঝকে নতুন জাদুঘরের ভেতর
রয়ে গেছে পুরনো এক সিনগগ
সিনগগের ভেতর
আছি আমি
আমার ভেতর
আমার আত্মা
আমার আত্মার ভেতর
একটি জাদুঘর
[অক্ষম অনুবাদ]
আমাদের হৃদয়ের ভেতরেও তেমনি রয়ে গেছে টিএসসি।

অমিয় চক্রবর্তী লিখেছিলেন, ভাঙা দরজা আর ঝড়ো হাওয়াটা তিনি মেলাবেন। নতুন পুরনোর খানিকটা সমন্বয় করুন না কেন উপাচার্য। তিনিও তো ইতিহাসের ছাত্র হোক না তা ইসলামের ইতিহাস। প্রেমেন্দ্রে মিত্র লিখেছিলেন, জানালায় থাকুক না একটু ধুলো, চাদরটা এলোমেলো, তাহলেই তো মনে হয় তা ঘর। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তারা সব ভেঙেচুরে চারদিকে সব ঝকঝকে ইমারত করুন, তার মধ্যে থাকুক না কেন একরত্তি টিএসসি। তাহলেও তো মনে হবে এটি পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়। ঝকঝকে করপোরেট অফিস নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যারা আছেন তারা সবাই আমাদের ছাত্রতুল্য। তাদের যৌবন, প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছা আমাদের সামনে। নিজ নিজ ক্ষেত্রে কে কী করেছেন তাও আমাদের জানা। ছাত্র ও তরুণ শিক্ষক অবস্থায় জনরোষ বলতে কী বোঝায় তা তারা জেনেছেন দেখেছেন। বাংলাদেশের এলিটবর্গের বড় অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়েছেন। তারা আমাদের মতো সাধারণের আবেদন না শুনে ধামাধরা কর্তৃপক্ষের ডাকে সাড়া দেবেন এটি দূর কল্পনামাত্র।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়