শুধু আইন নয়, বাস্তবায়নও চাই

আগের সংবাদ

সরকারি স্কুলে ভর্তির লটারি স্থগিত

পরের সংবাদ

প্রশ্নবিদ্ধ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩০, ২০২০ , ৯:০৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ৩০, ২০২০ , ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ

সুবর্ণজয়ন্তীতেই পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আ. হাকিম মারা যান ২০১২ সালের ৬ মে। কমান্ডার, নির্বাহী কর্মকর্তাসহ অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় একাত্তরের এই বীর যোদ্ধাকে। বরিশালের উজিরপুরের চকমান গ্রামের প্রয়াত সাহজদ্দিন আরিন্দার সন্তান আ. হাকিমের গেজেট নম্বর ৪৯৫৯। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নম্বর ১১৬১৮৪। রাষ্ট্রীয় সব সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছেন তার পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু ২০১৮ সালের যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়ে তার নাম।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দোরগোড়ায় বাংলাদেশ। ৫০ বছরেও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়ন না করাকে ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন গবেষকরা। তবে নতুন বছরের শুরুতেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের দাবি সরকারপক্ষের। জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ভোরের কাগজকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত। তবে যাচাই-বাছাই কমিটির প্রতিবেদনে নানা ধরনের অসঙ্গতি ও ত্রুটি পাওয়া গেছে। এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি নিরসনে কাজ চলছে। ভোটার আইডি কার্ড ধরে কাজ করছি আমরা। এগুলো যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শেষে মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে। কোনো না কোনো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত এমন সব নাম মিলিয়ে দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৫৬ জন। কিন্তু স্বীকৃতির দাবি করেছেন এমন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৫১ হাজার ২৮৫ জন।

মন্ত্রী বলেন, একই নাম একাধিক বানানে লেখার কারণেও একাধিকবার সেসব নাম তালিকায় এসেছে। যাদের নাম একাধিক তালিকায় রয়েছে, তা বাদ দেয়ার কাজ চলছে। প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি হবে না বলে মনে করেন মন্ত্রী।

প্রশ্নবিদ্ধ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া : গত ২ জুন নতুন করে ১ হাজার ২৫৬ জনকে বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে সরকার। তাদের নিয়ে স্বীকৃতি পাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৬ জন। তবে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকায় এটাকে প্রকৃত সংখ্যা বলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজার। বাকি মুক্তিযোদ্ধার তথ্য আবার যাচাই-বাছাই হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বেসামরিক গেজেট দিয়ে জেলা পর্যায়ে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন কেউ কেউ। আবার একাধিকবার বিভিন্ন তালিকায় নাম রয়েছে অনেকেরই। অভিযোগ রয়েছে, সঠিকভাবে তথ্য যাচাই-বাছাই না করেই মুক্তিযোদ্ধা সনদ দিয়েছে বিএনপি-জামায়াত সরকার। এখনো সনদের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন অনেকেই। মন্ত্রণালয়ও একেক সময় একেক পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন জারি করছে। ফলে সুবিধা পাচ্ছেন অনেক অমুক্তিযোদ্ধাও। অন্যদিকে লাল মুক্তিবার্তা, ভারতীয় তালিকা এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত সনদ থাকার পরও বাদ পড়ছেন অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক কারণ, ব্যক্তিগত বিরোধসহ বিভিন্ন কারণে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ভুয়া বলে প্রমাণ করার অপচেষ্টা চলছে। ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া। এ ব্যাপারে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান আবীর আহাদ ভোরের কাগজকে বলেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দেড় লাখের বেশি হওয়ার কথা নয়। মুক্তিযোদ্ধা বানানোর নামে বাণিজ্য চলছে।

অপেক্ষার অর্ধশতক : স্বাধীনতার ৫০ বছরেও নির্ভুল ও সঠিক তথ্যভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে পারেনি কোনো সরকার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট অনুযায়ী, ভারতীয় তালিকা, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের তালিকা, চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের (ইবিআরসি) তালিকা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৮। ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল আমিন আহমদ চৌধুরী বীরবিক্রম কর্তৃক ইবিআরসিতে রাখা ভারতীয় তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ৬৯ হাজার ৮৩৩।

১৯৯৪ সালে বিএনপির তালিকা অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৮৬ হাজার। আওয়ামী লীগের সময় (১৯৯৬-২০০১) মুক্তিবার্তা (লাল) অনুযায়ী, ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫২ জন। পরে বিএনপি-জামায়াত ২ লাখ ১০ হাজার ৫৮১ জনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ৭০ হাজারের বেশি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত অভিযোগ করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নে যাচাই-বাছাই করতে ৪৭০টি কমিটি গঠন করে। আওয়ামী লীগের একদশকেও তালিকা চূড়ান্ত হয়নি। বর্তমানে গেজেটভুক্ত ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৬ মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও অন্তর্ভুক্তির আবেদন রয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার। এর মধ্যে খুলনা বিভাগ বাদে অন্যান্য এলাকার আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই শেষ করেছে সরকার। এছাড়া বেসামরিক গেজেট পেলেও উল্লেখযোগ্য রেকর্ড নেই- এমন সাড়ে ৪৩ হাজারের তালিকা নতুন করে যাচাই-বাছাই হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষকদের অভিযোগ, ৫০ বছরেও সঠিক তালিকা করতে পারেনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। বরং তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন বিতর্কিত ব্যক্তিরাও।

জানতে চাইলে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির ভোরের কাগজকে বলেন, নির্ভুল তালিকার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছি। ৫০ বছরে এসে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য কেন আবার যুদ্ধ করতে হবে? এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারেনি।

এ ব্যাপারে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির সভাপতি ডা. এম এ হাসান ভোরের কাগজকে বলেন, তালিকা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পুরোটাই লেজেগোবরে অবস্থা। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে কেন স্বীকৃতির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে? মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রতিটি এলাকা থেকে তাদের খুঁজে বের করা।

যাচাই-বাছাইয়ের অবসান চান মুক্তিযোদ্ধারা : গোপালগঞ্জের গোবরা ইউনিয়নে ২০০৩, ২০০৫ ও ২০১৭ সালে তিন দফা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের পর ১৫ বছর ধরে ভাতা পাচ্ছেন ১৯ মুক্তিযোদ্ধা। এর মধ্যে মারা গেছেন ১১ জন। জীবিত ৮ জনের দুই জন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে মৃত্যু পথযাত্রী। নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের চিঠি পাওয়ায় হতবাক মুক্তিযোদ্ধারা ও তাদের পরিবার। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে যাচাই-বাছাইয়ের নামে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছেন তারাÑ এমন বক্তব্য তাদের। যাচাই-বাছাই থেকে অব্যাহতি চেয়ে ইতোমধ্যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন গোবরার বীর মুক্তিযোদ্ধারা। গোবরা ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম চৌধুরী টুটুল বলেন, অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছেন। অনেকে রোগাক্রান্ত হয়ে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। এখন জীবিত তিন সহযোদ্ধা নিয়ে যাচাই-বাছাই কমিটিতে হাজির হওয়া অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টসাধ্য।

অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদ দেয়ায় মর্মাহত পরিবারের সদস্যরা। বরিশালের উজিরপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আ. হাকিমের নাতনি সাংবাদিক মরিয়ম সেঁজুতি বলেন, আমার নানা মুক্তিযোদ্ধা, এটি এলাকার সবাই জানে। এখন তালিকা থেকে তার নাম বাদ দেয়ায় আমরা হতবাক। নানা মারা যাওয়ার পর কমান্ডারসহ উজিরপুরের সব বীর মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন। তার মৃত্যুতে দেয়া রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ফেরত নেয়া হোক নতুবা তার নাম তালিকাভুক্ত করা হোক।

সুবর্ণজয়ন্তীতেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা : জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইনের ৭(ঝ) ধারার ব্যত্যয় ঘটিয়ে অনুমোদন ছাড়া যেসব বেসামরিক বীর মুক্তিযোদ্ধার গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, কাউন্সিলের ৭১তম সভায় তা যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। জামুকা অনুমোদনহীন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট যাচাই ৯ জানুয়ারি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম ভারতীয় তালিকা বা লাল মুক্তিবার্তা বা মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃত ৩৩ ধরনের প্রমাণ অন্তর্ভুক্ত থাকলে তিনি যাচাই-বাছাইয়ের আওতাবহির্ভূত থাকবেন। দেশের ভেতরে প্রশিক্ষণ নেয়া মুক্তিযোদ্ধাকে অবশ্যই পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ করার সপক্ষে তিনজন সহযোদ্ধার (ভারতে প্রশিক্ষণ নেয়া) সাক্ষ্য জোগাড় করতে হবে। একাত্তরের ৩ ডিসেম্বরের পর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। যাচাই-বাছাই শেষে তিন ধরনের প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে কমিটি। খসড়া তালিকা প্রস্তুত ও পরবর্তী তিন কর্মদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এবং উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স বা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে ফলাফল টানিয়ে প্রকাশ করবে। আর এই প্রক্রিয়া শেষ হলে বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা সম্ভব বলেও জানান তিনি।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়