যুদ্ধযাত্রা

আগের সংবাদ

হার না মানার এক বিস্ময়কর উপাখ্যান

পরের সংবাদ

দিব্বোক থেকে বঙ্গবন্ধু

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৫, ২০২০ , ১১:২৯ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ১৫, ২০২০ , ১১:২৯ অপরাহ্ণ

আমরা এখন যে দেশে বাস করছি তার নাম বাংলাদেশ। বর্তমানে এ দেশের সাধারণ মানুষ পেট পুরে খেতে পায়। ভালো পোশাক পরতে পারে। যোগ্যতার ভিত্তিতে তারা দেশ শাসনের অধিকার পায়। খেলাধুলা, শিক্ষা, গবেষণায় তারা বিশ্বে বিশেষ অবদান রাখছে। তারা এভারেস্ট জয় করেছে। বিশ্ব-শান্তি রক্ষা ও বিশ্ব-অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে। উন্নয়নের অগ্রগতির ধারায় তারা বিশ্বসেরাদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
বাংলাদেশের এই সাফল্য, এই শ্রেষ্ঠত্ব কিন্তু একদিনে অর্জিত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে অনেক মায়ের অশ্রæ, অনেক ভাইয়ের রক্ত, অনেক বোনের আত্মত্যাগ, অনেক মানুষের দুঃখ-কষ্ট, বঞ্চনা, লাঞ্ছনা, নির্যাতন আর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস। অনেক দীর্ঘ কণ্টকময় পথ পাড়ি দিতে হয়েছে আজকের বাঙালি জাতিকে।
বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির গোড়াপত্তন হয়েছে বারো’শ বছর পূর্বে পাল রাজাদের আমলে। পাল রাজারা ছিলেন সামন্ত শ্রেণির বাঙালি। “মাৎসান্যায় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সামন্তরাজারা মিলে তাঁদেরই একজন সামন্তরাজ গোপালকে বাংলার রাজা বানালো। গোপাল খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের মাঝামাঝি কোন এক সময় পালবংশ প্রতিষ্ঠা করেন এবং দ্বাদশ শতকের তৃতীয়ার্ধে গোবিন্দ পালের সাথে সাথে এ বংশের শেষ হয়।” (রইসউদ্দিন ভ‚ইয়া রচিত বাঙালির চতুর্মাত্রিক ইতিহাস। পৃ. ৯৫)।
গোপাল বাঙালি হলেও সাধারণ বাঙালি ঘরের সন্তান ছিলেন না। তিনি সামন্ত প্রভুদের একজন ছিলেন। “পালবংশীয় রাজারা দীর্ঘ চার’শ বছর বাংলা শাসন করলেও তাঁদের পুরো সময়টাতে সুশাসন বজায় ছিল না। রাজা মহিপালের আমলে ‘প্রজা পীড়ন’ শুরু হলে দেশে ব্যাপক প্রজা বিদ্রোহ দেখা দেয়। বিদ্রোহীদের নেতা ছিলেন কৈবর্ত সর্দার দিব্বোক। অবহেলিত জনপদের কৈবর্ত সর্দার দিব্বোক প্রথম জীবনে রাজা মহীপালের কর্মচারী ছিলেন। দেশে প্রজা বিদ্রোহ শুরু হলে তিনি প্রজাদের পক্ষ অবলম্বন করেন। বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে মহীপাল পরাজিত ও নিহত হলে দিব্বোক বারেন্দ্রীর রাজা হয়েছিলেন এবং বরেন্দ্রীতে সমৃদ্ধি এনেছিলেন। তিনি বাংলার কর্তৃত্ব হাতে নেয়ার উদ্যোগও গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তাঁরই লোকজনের বিশ্বাসঘাতকতায় রাজা রামপালের হাতে তিনি নিহত হন। কৈবর্ত সর্দার বাঙালি ছিলেন। বরেন্দ্রীর রাজা কৈবর্ত সর্দার দিব্বোক যদি সামন্ত রাজাদের সমর্থন নিয়ে বাংলায় কর্তৃত্ব পেত তাহলে হয়তো অবাঙালি সেনবংশ বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো না।” (প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৬)। একাদশ শতকের বরেন্দ্রভ‚মির বিদ্রোহীদের নায়ক কৈবর্ত সর্দার দিব্বোক বাংলার ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। (জেলে সম্প্রদায় কৈবর্ত নামে পরিচিত)।
১২০২ সালে অবাঙালি রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলায় ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে প্রথম মুসলিম রাজত্বের সূত্রপাত। সেই থেকে ইংরেজ আগমনের অর্থাৎ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ’শ বছর অবাঙালি মুসলমান শাসকগণ বাংলা শাসন করেন। মাঝখানে পঞ্চদশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজা গণেশ ধর্মান্ধ সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের পুত্র সায়েফ উদ্দিনকে হত্যা করে বাংলার সিংহাসন দখল করেন। “তিনি মুসলমানদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য অনেক আলেম, ধর্ম প্রচারক ও দরবেশকে হত্যা করেছিলেন। বাংলা থেকে ইসলামকে নির্মূল করাই ছিল তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য।” (প্রাগুক্ত পৃ. ১১০)
“১৪১৫ সালে জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শাহ্ শারকি বাংলা আক্রমণ করতে এলে রাজা গণেশ পুত্র যদুকে ধর্মান্তরিত করে জালালুদ্দীন নাম দিয়ে সিংহাসনে বসিয়ে দেন। ইব্রাহিম শাহ্ শারকি বাংলা ত্যাগের কিছু পরেই গণেশ পুত্রকে সরিয়ে দিয়ে নিজে রাজা হয়ে বসেন। …১৪১৮ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।” (প্রাগুক্ত, পৃ. ১১০)। রাজা গণেশ ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং বর্ণবাদী দিলেন। তিনি সাধারণ বাঙালি ঘরের সন্তান ছিলেন না। তিনি সাম্প্রদায়িক শাসক ছিলেন। এই দীর্ঘ সময় রাজায় রাজায়, নবাবে নবাবে, সুলতানে সুলতানে অসংখ্য যুদ্ধবিগ্রহ হয়েছে। এসব যুদ্ধে বাংলার সাধারণ মানুষের কোন সম্পৃক্ততা ছিল না। শাসকগোষ্ঠীর যুদ্ধের রসদ জোগাতে জোগাতে সাধারণ মানুষের দুর্দশার অন্ত ছিল না। এর ওপর ছিল নানান ধরনের দস্যু তস্করদের উৎপাত।
বলা হয়ে থাকে, এক কালে বাংলার মানুষ সুখে শান্তিতে বাস করতো। তাদের গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু ছিল। এসবের মালিক ছিল সামন্ত প্রভুরা। সাধারণ মানুষ এসবের ছিটেফোঁটাও পেত না। অভাবী সাধারণ মানুষ দেবীর কাছে প্রার্থনা করতো, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ (ভারত চন্দ্রের অন্নদা মঙ্গল কাব্য)। ধন সম্পদের প্রাচুর্য থাকা সত্তে¡ও সাধারণ মানুষের ভাগ্যে তা জুটতো না। তারা যে তিমিরে সেই তিমিরেই থাকতো। দু’বেলা পেট পুরে ভাত খেতে পেত না। তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। মানবেতর জীবনযাপন করতো।
পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৫ সালে বাংলায় এসেছিলেন। তাঁর বিবরণী থেকে জানা যায়, “বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ ভালো ছিল। বাজারে তখন প্রকাশ্যে দাস-দাসী বিক্রি হতো। তিনি নিজে ১০ টাকা দিয়ে ‘আশুরা’ নামে একজন সুন্দরী দাসী কিনেছিলেন। তাঁর সহযোগী ২০ টাকা দিয়ে একজন দাস কিনেছিলেন। জীবনযাত্রার মান ছিল খুবই উন্নত। তবে এত সচ্ছলতার মাঝেও দারিদ্র্য ছিল। দারিদ্র্যের মূল কারণ হিসেবে তিনি সরকারি কর্মচারীদের অত্যাচার ও জুলুমকে উল্লেখ করেছেন।” (প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৩)। ইবনে বতুতার বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। তিনি একদিকে বলেছেন, “তখন বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ ভালো ছিল।” আবার বলেছেন, “তখন বাজারে প্রকাশ্যে দাস-দাসী ক্রয়-বিক্রয় হতো।” এই দাস-দাসী কারা? তারা বাংলার সাধারণ মানুষ। তিনি কোন শ্রেণির মানুষের আর্থিক সচ্ছলতার কথা বলেছেন? যে সমাজে সাধারণ মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করা হতো না, যে সমাজে সাধারণ মানুষ পণ্য সামগ্রী বলে বিবেচিত হতো! দারিদ্র্যের মূল কারণ হিসেবে ইবনে বতুতা সরকারি রাজকর্মচারীদের অত্যাচার ও জুলুমের কথা উল্লেখ করেছেন।
সামন্ত প্রভুদের অত্যাচার ছাড়াও মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে বাংলায় হামলা চালাতে থাকে ভিনদেশী হানাদার বাহিনীর দল। এরা পর্তুগিজ জলদস্যু (হার্মাদ), মারাঠি দস্যু (বর্গী), বার্মার জলদস্যু (মগ) এবং ইংরেজ বনিকের দল। সব শেষে বাংলায় আসে পাকিস্তানি শাসকের দল। তারা ধর্মের নামে বাংলার মানুষকে শোষণ করতে থাকে দীর্ঘকাল। যুগযুগ ধরে বিদেশি হানাদারদের অত্যাচার মানুষের চোখের ঘুম কেড়ে নিতো। মায়েরা শিশুদের ঘুম পাড়ানি গান শুনাতো, “ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে? ধান ফুরালো, পান ফুরালো, খাজনার উপায় কী? আর কটা দিন সবুর করো রসুন বুনেছি।”
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও সুদূর অতীতেও বাংলার মানুষ এসব অত্যাচার কখনো নীরবে সহ্য করেনি। তারা এসব অত্যাচারের প্রতিবাদ করেছে, কখনো সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, বুকের রক্ত দিয়েছে। মাথা নত করেনি, আপস করেনি অকুতোভয় বাঙালি। মুকুন্দ দাসসহ অসংখ্য চারণ কবি মাঠে প্রান্তরে গান গেয়ে বাংলার মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করেছেন।

তারা গেয়েছেন, “ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙে।” কবি নজরুল গেয়েছেন, “তোমরা ভয় দেখিয়ে করছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়, সেই ভয়ের টুঁটিই ধরব টিপে, করবো তারে লয়।” কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার সংগ্রামী মানুষকে অভয় দিয়ে বলেছেন, “উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই, ওরে ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই, তার ক্ষয় নাই।” এছাড়া শিল্পীরা যাত্রা ও পালাগানের মাধ্যমে পৌরাণিক বীররসের কাহিনী দিয়ে মানুষের বুকে সাহস জুগিয়েছে। বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন, তিতুমীর, ভবানী পাঠক, ফকির মজনু শাহ্, সুশীল চন্দ্র সেন, ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, কানাইলাল, সত্যেন বসু, চারু বসু, বারীন দত্ত, চিত্তপ্রিয় রায় চৌধুরী, গোপীনাথ সাহা, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার প্রমুখ। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু জাপানের সহায়তায় ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। এছাড়াও বাংলাদেশে ভ‚স্বামীদের বিরুদ্ধে কৃষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে লড়েছিলেন নূরুলদীন, ইলা মিত্র প্রমুখ।
সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানদের ভোটে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘ ২৩ বছর অবৈধভাবে বাংলাদেশ অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে উপনিবেশ বানিয়ে শাসন ও শোষণ করতে থাকে। বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা চালু করার মধ্য দিয়ে এই শোষণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাঙালিরা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষার দাবিতে শুরু করে সংগ্রাম। পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করে রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতসহ অনেক বাংলার বীর সন্তান। ভাষা আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ বেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ ও ৩ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী ও কায়েদে আজমের দাবি ছিল শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা। সেই দাবি অনুযায়ী ভারতবর্ষ দু’ভাগে ভাগ হয় ভারত ও পাকিস্তান। ভারত হিন্দুদের দেশ, আর পাকিস্তান মুসলমানদের দেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর দাবি ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। তাই স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবার পর তিনি প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। একজন রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধান হওয়া সত্ত্বেও তিনি বাস ভবনে এসি ব্যবহার করতেন না। খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। শিশুকাল থেকে তিনি দেশের সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট অভাব-অনটন খুব গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি দেশের জমিদার, জোতদার আর মহাজনদের অত্যাচারে দরিদ্র গ্রামবাসীদের জর্জরিত হতে দেখেছেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছিলেন বলেই তাদের কষ্ট হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন। নির্যাতন ও শোষণের হাত থেকে জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু নিজ দল আওয়ামী লীগের বিলুপ্তি ঘটিয়ে, সকল রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠন করেন একটি নতুন রাজনৈতিক দল, যার নাম ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ সংক্ষেপে ‘বাকশাল’। বাকশালের মূল লক্ষ্য ছিল চারটি : (১) গণমুখী প্রশাসন, (২) গণমুখী বিচারব্যবস্থা, (৩) বাধ্যতামূলক বহুমুখী গ্রাম সমবায়, (৪) শোষিতের গণতন্ত্র। একে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লব বলে অভিহিত করেন।
১৯৫২ সালে বঙ্গবন্ধু নয়াচীন সফরের সময় সে দেশের সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বাস্তবায়ন লক্ষ করেছিলেন। তখন থেকে তিনি সাধারণ মানুষের সার্বিক মুক্তির চিন্তা তাঁর চেতনায় ধারণ করেছিলেন। বাস্তবে তাঁর এই চিন্তা রূপদানের পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ‘বাকশাল’ গঠন এই চিন্তারই ফসল। বাংলার মানুষের দুর্ভাগ্য, বঙ্গবন্ধুর এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের পূর্বেই মানবতার শত্রুরা তাঁকে সপরিবারে এবং ঘনিষ্ঠ চার সহযোগীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বাংলার মানুষের সার্বিক মুক্তি অধরাই রয়ে গেল।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারত রাষ্ট্রের জনক মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধীকে ‘মহাত্মা’ উপাধিতে ভ‚ষিত করেছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ‘কায়েদে আজম’ বলে সম্বোধন করতেন মহাত্মা গান্ধী। সেই থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নামের সাথে ‘কায়েদে আজম’ কথাটি যুক্ত হয়ে যায়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ উদীয়মান রাজনৈতিক নেতা সুভাষচন্দ্র বসুকে সস্নেহে ‘নেতাজী’ বলে সম্বোধন করতেন। সেই থেকে ‘নেতাজী’ শব্দটি সুভাষচন্দ্র বসুর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাশ (সি আর দাশ) মাসিক হাজার টাকা আয়ের আইনি পেশা পরিত্যাগ করে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করায় তিনি ‘দেশবন্ধু’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭১ সালের ২৩ ফেব্রæয়ারি রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ৫ লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশে তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমদ জনগণের পক্ষে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি লাভ করেছে। বিবিসির জরিপে বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু বিশ্বের কোটি কোটি বাঙালির মর্যাদা এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি।’ কবি জীবনানন্দ দাশের মাতা কবি কুসুম কুমারী দাশ দেশের দুর্দশা দেখে লিখেছিলেন, “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে।” কবির আকাক্সক্ষা পূর্ণ হয়েছে। তাঁর কাক্সিক্ষত সেই ছেলের জন্ম হয়েছিল এই বাংলাদেশে তাঁর নাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরাধীনতার গ্লানি থেকে তিনি বাংলার মানুষকে মুক্তি দিয়েছিলেন। হারানো বাংলাকে আবার বাংলার মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
হাজার বছর আগে আরেক বাঙালি বীর এ দেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বরেন্দ্র ভূমির ধীবর সম্প্রদায়ের বিদ্রোহী বীর বাঙালি কৈবর্ত সর্দার ‘দিব্বোক’। দিব্বোক সামন্ত প্রভু রাজা মহীপালকে পরাজিত করে বরেন্দ্রীর রাজাও হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলার কর্তৃত্ব হাতে নেয়ার উদ্যোগও গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু নিজ দলের লোকদের বিশ্বাসঘাতকতায় রাজা রামপালের হাতে নিহত হন।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলার কর্তৃত্ব গ্রহণ করার পর নিজ দলের খোন্দকার মোশতাকসহ অন্য ঘাতকদের হাতে নিহত হয়েছিলেন। আর কৈবর্ত সর্দার দিব্বোক বাংলার কর্তৃত্ব গ্রহণ করার পূর্বেই নিজ দলের লোকদের বিশ্বাসঘাতকতায় নিহত হন। দু’জনের জীবনের করুণ পরিণতি নিজ দলীয় বিশ্বাসঘাতকদের দ্বারাই হয়েছে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদৌলার করুণ পরিণতিও হয়েছিল তার বিশ্বস্ত মীরজাফর, রায় দুর্লভ, জগৎ শেঠ প্রমুখের দ্বারা।
সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম তার ‘বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি’ গ্রন্থে লিখেছেন, “অতীতের কথা স্মরণ করতে গেলে এ কথা অবশ্যই বলতে হবে যে, এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ নিজেদের জন্য একটা আলাদা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখত। এটা প্রতিফলিত হয়েছে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবেও।” (পৃ. ২২)।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সশস্ত্র যুদ্ধে পরাজিত করে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে সাধারণ মনুষের সেই স্বপ্ন পূরণ করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গেয়েছেন :
“ওই মহামানব আসে,
দিকে দিকে রোমাঞ্চ রাগে
মর্তধূলির ঘাসে ঘাসে।”
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই মহাকবির সেই প্রত্যাশিত মহামানব।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়