বিয়ের প্রলোভনে কুয়াকাটা এনে প্রেমিকাকে ধর্ষণ!

আগের সংবাদ

কুবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি শামীম, সম্পাদক কামাল

পরের সংবাদ

টেলিভিশন নাটকে দায়সারাভাবে মুক্তিযুদ্ধকে উপস্থাপন

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৩, ২০২০ , ১০:১০ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ১৩, ২০২০ , ১০:১৩ অপরাহ্ণ

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির পরিচয়ের জ্বল-জ্বলে দলিল। অথচ সিনেমা বা টেলিভিশন নাটকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঠিকমতো কোনো কাজ হয়নি এবং হচ্ছেও না! যা হচ্ছে তাতেও সঠিক বিষয় ফুটে উঠছে না। বিশেষ দিনকে ঘিরে দায়সারাভাবে কিছু কাজ হচ্ছে। কেন এমনটি হচ্ছে? এর পেছনে মূলত কী কারণ লুকিয়ে তা খুঁজতে মেলা কথা বলে কয়েকজন নাট্য নির্মাতার সঙ্গে। তাদের কথাগুলো সাজিয়ে আজকের প্রতিবেদন।

লিখেছেন শাকিল মাহমুদ

মুক্তিযুদ্ধকে এক ঘণ্টার বিশেষ নাটকে তুলে ধরা সম্ভব নয়
মারুফ মিঠু, নির্মাতা
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যে নাটক নির্মাণ হয়েছে তা আমার কাছে যথেষ্ট বলে মনে হয় না। আসলে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ তো বিশেষ কয়টি দিনে সংঘটিত হয়নি। কিন্তু এই বিশেষ দিনগুলোর একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে আমাদের কাছে। এ কারণেই শুধু বিশেষ দিনগুলোতেই শুধু মুক্তিযুদ্ধের নাটক প্রচারিত হয়। কিন্তু আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা আমাদের প্রতিনিয়ত চর্চার বিষয়। চ্যানেলগুলো বছরের যে কোনো সময়ই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক প্রচার করতে পারে। তারা একটা সেগমেন্টই নির্ধারণ করতে পারেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নাটকের জন্য। একটা সময় ছিল যখন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছিল বা লুকানো হচ্ছিল। বঙ্গবন্ধুকে আড়ালে রাখা হচ্ছিল। আমরা যারা স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রজন্ম, মুক্তিযুদ্ধ বলতে বুঝতাম ধানক্ষেতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রল করে পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করা। খুব খেলোভাবে উপস্থাপিত করা হতো মহান মুক্তিযুদ্ধকে। কিন্তু এর পেছনে যে ত্যাগের ইতিহাস, যে সাহসিকতার ইতিহাস আছে তা কিন্তু আমরা জানতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্বের ইতিহাস। বর্তমানে ইতিহাসকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে আমাদের প্রজন্মের নির্মাতারা। কিন্তু সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং বাজেট স্বল্পতার কারণে প্রকৃত ইতিহাস সঠিকভাবে দেখানো যাচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নাটকে অবশ্যই পর্যাপ্ত বাজেট থাকতে হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধ একদিনের ইতিহাস নয়। এটা বাঙালির অস্তিত্বের ইতিহাস। স্বাধিকার আন্দোনের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির চেতনায় গ্রোথিত হয়েছে স্বাধীনতার বীজ। যা একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতার ফসল। যদি প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে হয়, তাহলে সেটা বছরে দুটি এক ঘণ্টার বিশেষ নাটকে তুলে ধরা সম্ভব নয়। বরং এটা হতে হবে ধারাবাহিক কোনো মেগা সিরিয়াল। এক ঘণ্টার স্বল্প বাজেটের নাটকে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা যাবে না। সেক্ষেত্রে শুধু কল্পকাহিনীই তৈরি হবে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারব না।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটকের বাজেট বাড়াতে হবে
রওনক হাসান, অভিনেতা ও নির্মাতা
নাটক যথেষ্টই নির্মাণ হয়েছে। তবে তার অধিকাংশই ভাষা ভাষা জ্ঞান নিয়ে নির্মাণ করা। যথেষ্ট গবেষণা, বাজেট ও ইতিহাসের সত্যতা কতটুকু সেটা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের নাটকের নির্মাণ বাড়িয়ে লাভ কি? যদি সেগুলো মানসম্পন্ন না হয়! এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের নাটকের বাজেট দেড় থেকে দুই লাখ। এই টাকায় কী হবে? মুক্তিযুদ্ধ তো মনগড়া কিছু নয়। নিজের মতো ভেবে একটা স্ক্রিপ্ট দাঁড় করিয়ে দিলেই হলো! এর জন্য তথ্যের প্রয়োজন। তার জন্য গবেষণা প্রয়োজন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের নাটকের জন্য যে বাজেট তা মোটেই যথেষ্ট নয়। মুক্তিযুদ্ধের অনেক কাজেই সঠিক ইতিহাস থাকে আবার অনেকগুলোতে থাকে না। যেমন আমি অসংখ্য মুক্তিযুদ্ধের নাটকে অভিনয় করেছি। অধিকাংশ নাটকের সমস্যা বাজেট এবং চিত্রনাট্য। বাজেট না বাড়লে চিত্রনাট্য নিয়ে গবেষণাও কম হবে স্বাভাবিক। মাসের পর মাস গবেষণা করে একজন একটা লেখা লিখল। সেটার পারিশ্রমিক সে পাবে ৫ থেকে ১০ হাজার। তাহলে সে চলবে কী করে? ভালো পাণ্ডুলিপি আসবে কোথা থেকে? ফলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটকের বাজেট যেমন বাড়াতে হবে তেমন সঠিক তথ্য নিয়ে মানসম্পন্ন নাটক নির্মাণ করতে হবে।

টেলিভিশন নাটকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক তথ্য তুলে ধরা যায় না
আশফাক নিপুণ, নির্মাতা
প্রথমত, এক ঘণ্টাব্যাপী যে নাটকগুলো হচ্ছে সেগুলো বন্ধ করে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণের দিকে যেতে হবে। আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক যে নাটক টেলিভিশনের জন্য নির্মাণ করা হয় তাতে যেমন যথেষ্ট বাজেট থাকে না তেমন তথ্য-উপাত্তসহ ভালো কিছু উপস্থাপিত হয় না। ফলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নাটকের প্রতি দর্শকের একটি অনীহা জন্ম নিয়েছে। প্রতিটা নাটকে একই বিষয়, একই ঘটনা দেখা হয়। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এমনও অনেক ঘটনা আছে, যা এখনো তুলে ধরা হয়নি। যেমন, মুক্তিযুদ্ধের সময় রোজাও হয়েছে, ঈদও হয়েছে। সে সময়ের মানুষ কীভাবে তা পালন করেছে! এ নিয়ে নাটক হতে পারে। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে তো শুধু অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ হয়নি। সেখানে একেকজন মানুষের আলাদা আলাদা মতাদর্শ ছিল। সে বিষয় নিয়েও নাটক হতে পারে। কিন্তু তা হয়নি এবং হচ্ছে না। এদিকে ভালোবাসা দিবস বা অন্য দিবসগুলোতে যে পরিমাণের অর্থ বরাদ্দ করা হয় মুক্তিযুদ্ধের নাটকে তা করা হয় না। ফলে নির্মাতারা ঠিকঠাক, তথ্য-উপাত্ত নিয়ে, গবেষণা করে নাটক নির্মাণ করতে পারেন না। ফলে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সম্মান জানিয়ে যে কাজগুলো করা হচ্ছে তাতে সম্মান জানানো তো হয়ই না উল্টো একই জিনিস ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখিয়ে দর্শককে বিমুখ করা হয় এবং সঠিক তথ্যের বিপরীতে কাল্পনিক ঘটনার উত্থান হয়। তাই আমি মনে করি টেলিভিশন নাটকে মুক্তিযুদ্ধ তুলে ধরা বন্ধ করে সিনেমার দিকে যাওয়া উচিত।

মুক্তিযুদ্ধের সব নাটকে ঘুরেফিরে একই জিনিস
মাহমুদ দিদার, নির্মাতা
টেলিভিশন নাটকে মুক্তিযুদ্ধ আসে বিষয় কিংবা ভাবনা আকারে নয়। উপলক্ষ আকারে। তাই যত কাজই হোক সেগুলোর গল্প কোনোভাবেই কখনো দেশপ্রেমিক মানুষের জন্য চিন্তা উদ্দীপক হয় না। বিশেষ দিনে মুক্তিযুদ্ধের নাটক দেখানো হয় খুব অযতেœ, খুব কম টাকা বাজেটে নির্মাণ করা হয়। তথাকথিত ভালোবাসা দিবসের নাটকে বাজেট যদি থাকে ৫-৬ লাখ, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের নাটকের বাজেট আড়াই লাখ টাকা দিতেই আপত্তি করে কর্তৃপক্ষ। এভাবে প্রচুর মুক্তিযুদ্ধের নাটক বানিয়েই বা কি উদ্দেশ্য হাসিল হবে? যেখানে গল্প ভাবনা এবং তার পোর্ট্রেশনে ভয়াবহ দীনতা। মুক্তিযুদ্ধের সব নাটক ঘুরেফিরে একই জিনিস। গত ২০ বছরের নাটক ঘাঁটলেই দেখবেন একই গল্প। যেমন হয় রবীন্দ্রনাথের জন্ম-মৃত্য দিন ঘিরে একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, ঐতিহাসিক সংগ্রামী জনমানস, স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের ভবিতব্য, নতুন প্রজন্মের চিন্তার রেখাপাত করে দেয়ার মতো গল্প টেলিভিশন প্রডিউস করে, পরিচালক হায়ার করে বানাবে সে চিন্তাবোধ জ্ঞান আছে বলে মনে হয় না। আমি মনে করি এগুলো বন্ধ করা উচিত। প্রত্যেক চ্যানেলের উচিত নিজস্ব অর্থায়নে বিশেষ চলচ্চিত্র নির্মাণ করা। আর মানসম্পন্ন নাটক বানানোর মতো বাংলাদেশে কেউ নেই। সুতরাং যেভাবে হচ্ছে সেভাবে হতেই থাকবে, এগুলো বন্ধ করে দিয়ে আমি বলব তাদের পড়াশোনা করতে, ভাবতে শিখতে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যথেষ্ট কাজ একদমই হয়নি
ইমেল হক, নির্মাতা
আমাদের টেলিভিশন নাটকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যথেষ্ট কাজ একদমই হয়নি। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো হয়তো এইচ ডি হয়েছে কিন্তু অনুষ্ঠানের ফর্মুলা এখনো বিটিভির মতোই, বিটিভি বিকাল ৩টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত টেলিকাস্ট হতো আর এখন আমাদের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ২৪ ঘণ্টাই দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু সব চ্যানেল ওই একই ফর্মুলায় আছে। মানে সব চ্যানেলে এক জিনিসই দেখা যায়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া চ্যানেল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নতুন কিছু করার সাহস করেন না বা চ্যালেঞ্জটা নেন না। সেজন্য বিশেষ দিন ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের নাটক নির্মাণ হয় না। সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হলে মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট ছোট বায়োগ্রাফি বানাতে হবে। কিন্তু আমাদের সেই বাজেট না থাকার কারণে আসলে মুক্তিযুদ্ধের মতো এত বড় ক্যানভাস টিভিতে আনা সম্ভব হয় না।

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়