হাতীবান্ধায় প্রচণ্ড শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন

আগের সংবাদ

সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে আহত যুবকের মৃত্যু

পরের সংবাদ

খনির আড়াইশ কর্মচারীদের বেতন কমেছে ৫০ শতাংশ!

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৩, ২০২০ , ৮:১৯ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ১৩, ২০২০ , ৯:৫৮ অপরাহ্ণ

ডিসেম্বর বিজয়ের মাস, বাঙ্গালীর আনন্দের মাস। কিন্তু পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত আড়াইশ কর্মচারীর মাঝে এবার মুখে আনন্দের হাসি নেই। ২০২০ সালের ডিসেম্বর তাদের কাছে এক অন্য রকম ডিসেম্বর। এ মাস থেকে তাদের বেতনভাতা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। এর ফলে খনির ভুক্তভোগী এসব কর্মচারীর মাঝে হতাশা ও চাপা ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। খনি কর্তৃপক্ষ নানা অযুহাতে দীর্ঘ ২০ বছরেও তাদের চাকুরী স্থায়ীকরণ না করায় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি অফিসে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগে কঠোর শর্ত আরোপ করে নতুন নীতিমালা জারি করায় এ অবস্থার সুষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত রয়েছে ২৪৮ জন কর্মচারী। চলতি বছরের নভেম্বর মাস পর্যন্ত আউটসোর্সিংয়ের একজন কর্মচারীর মাসিক বেতন ছিল সর্বনিম্ন ১৭ হাজার ৪৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৯ হাজার ৬২০ টাকা পর্যন্ত। এর সাথে ওভারটাইম কাজ করে আরও ৭ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা যোগ হতো। সবমিলে গড়ে মাসে একজন কর্মচারী সর্বোচ্চ ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা এবং সর্বনিম্ন ২৫ হাজার ৫০০ টাকা বেতন পেতো। ১ ডিসেম্বর থেকে এসব কর্মচারীকে নতুন ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা-২০১৮’ অনুযায়ী ৫টি ক্যাটাগরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরফলে সর্বসাকুল্যে একজন কর্মচারী ১৬ হাজার ১৩০ টাকা থেকে ১৭ হাজার ৬৩০ টাকা বেতন পাবেন। দ্রব্যমুল্য উর্ধ্বগতির এই বাজারে এত সল্প বেতনে কীভাবে স্ত্রী-সন্তান প্রতিপালন করবেন- সেজন্য চিন্তিত হয়ে পড়েছেন এসব কর্মচারী। তাদের মাঝে দেখা দিয়েছে হতাশা।

সুত্র জানায়, বড়পুকুরিয়া খনি উন্নয়ন কাজ শুরু হয় ১৯৯৬ সালের জুনে। এসব কর্মচারীর অনেকেই খনি উন্নয়নকাল থেকেই কর্মরত রয়েছে। প্রথমে তারা ক্যাজুয়াল হিসেবে কাজ শুরু করে। সে সময় খনি কর্তৃপক্ষ আশ^াস দিয়েছিল খনি বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেলে তাদেরকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হবে। ২০০৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর খনি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় কিন্তু তাদের ভাগ্যে স্থায়ী নিয়োগ জোটেনি। ২০০৪ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব কর্মচারীকে ক্যাজুয়াল থেকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়।

সুত্রমতে, ২০০০ সালে প্রনীত বড়পুকুরিয়া খনি’র প্রথম অর্গানোগ্রামে জনবল নির্ধারন করা হয় ২ হাজার ৬৭৪ জন। প্রথম অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী আউটসোর্সিংয়ের ২৪৮ জন কর্মচারী ও খনির এমপিএমঅ্যান্ডপিএস (উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রভিশনিং সার্ভিসেস) চীনা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামের অধীনে কর্মরত প্রায় ১ হাজার ১শ শ্রমিক সকলেই স্থায়ী নিয়োগ পাওয়ার কথা। কিন্তু খনির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নানা অযুহাতে তা বাস্তবায়ন করেনি। পরবর্তীতে অর্গানোগ্রাম কয়েকদফা সংশোধন করে জনবল ৯১২ জনে নামিয়ে আনা হয়। এতে করে খনি ভূগর্ভে জীবনের ঝুকি নিয়ে কয়লা উত্তোলন কাজে নিয়োজিত প্রায় ১ হাজার ১শ খনি শ্রমিক বাদ পড়ে যায়। বর্তমানে ৮৮৩ জন খনি শ্রমিক এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামের অধীনে কর্মরত রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে সংশোধিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী স্থায়ী কর্মকর্তা ৩১০ জনের বিপরীতে কর্মরত রয়েছে ১১৫ জন, স্থায়ী কর্মচারী ১১৯ জনের বিপরীতে কর্মরত রয়েছে ২৯ জন এবং আউটসোর্সিং ৪৮৪ জন কর্মচারীর বিপরীতে কর্মরত রয়েছে ১৪৮ জন।

কয়লা খনির সাবসিডেন্স এলাকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন খনি কর্মচারী জানান- আগে সারফেজে কর্মরত কর্মচারীরা ৩০ শতাংশ খনি ভাতা পেতো। এখন আর তা পাবেন না। উৎসবভাতাও নেই। অন্যান্য চাকুরিজীবিদের প্রতিবছর বেতন বৃদ্ধি পায়। এমনকি দিনমজুরের মজুরীও সময় সময় বাড়ে। সেখানে তাদের বেতন কমেছে। অথচ খনির স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মোটা বেতন ও প্রফিট বোনাস পেয়ে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছে পরিণত হচ্ছে। প্রফিট বোনাসের ভাগ কমে যাওয়ার আশংকায় খনি কর্তৃপক্ষ এতদিন তাদের চাকুরী স্থায়ী করেনি। যার ফলে তাদের আজ এ অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছে। আক্ষেপ করে তারা আরও বলেন, বাড়িঘর জায়গা জমি সবই গেল খনির পেটে। কিছুদিন পর খনি হয়তো তাদেরকেও গিলে খাবে (!)।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের দায়িত্বশীল দু’জন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান- বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দেশে বাস্তবায়িত একমাত্র কয়লা খনি এবং পেট্রোবাংলার অন্যতম লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান। এখানকার কয়লা দিয়ে পার্শ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র সচল রাখা হয়েছে। প্রতিবছর সরকার এখান থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। অথচ খনি শ্রমিক-কর্মচারীদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। খনি ভূগর্ভে ৩৮-৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা কাজ করেন। স্থায়ী নিয়োগের দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি বরাবরই খনি কর্তৃপক্ষ অবহেলা অবজ্ঞা করে এসেছে। কয়েকদফা অর্গানোগ্রাম পরিবর্তন করে শ্রমিকদের স্থায়ী নিয়োগ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে খনি কর্তৃপক্ষ এখনও ইচ্ছে করলেই আউটসোর্সিংয়ের ২৪৮ জন কর্মচারীকে স্থায়ী নিয়োগ দিতে পারে বলে তারা মনে করেন।

বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানী লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কামরুজ্জামান আউটসোর্সিং কর্মচারীদের বেতনভাতা কমে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান- খনিতে দু’বছর পরপর আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে কর্মকর্ত-কর্মচারী নিয়োগ করা হয়। পূর্বে যারা কর্মরত থাকেন তাদেরকেই নতুন শর্তে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। এর বাইরেও প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। চলতি ডিসেম্বর মাসে পূর্বে কর্মরত ২৪৮ জন কর্মচারীকে ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা-২০১৮’ অনুযায়ী ৫টি ক্যাটাগরিতে পুনঃনিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নতুন নীতিমালায় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে তিনি খনি পরিচালনা পর্ষদ বোর্ড সভায় আউটসোর্সিং কর্মচারীদের বেতনভাতা বাড়ানোর বিষয়টি কয়েকদফা উপস্থান করেছেন।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, দফতর, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন কর্পোরেশন এবং বিভিন্ন প্রকল্পে লোক নিয়োগের লক্ষ্যে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সেবা গ্রহণ নীতিমালা-২০০৮ প্রণয়ন করে। এই নীতিমালার মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও অফিস লোকবল নিয়োগ দিয়ে আসছে। নীতিমালায় তাদের পারিশ্রমিক দৈনিক, মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে দেয়ার বিধান রাখা হয়। আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলো পুরনো নীতিমালার কিছু বিধানের কারণে লোক সরবরাহে অনাগ্রহ দেখায়। এ অবস্থায় ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা-২০১৮’ প্রনয়ন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ২০১৯ সালের জুনে পরিপত্র জারি করে। সেই সাথে ২০০৮ সালের নীতিমালা স্থগিত করা হয়। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদ ছাড়া অন্য কোনো পদে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেওয়া যাবে যাবে। ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা-২০১৮’ অনুযায়ী ৫টি ক্যাটাগরিতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর বেতন কাঠামো সর্বসাকুল্যে জনপ্রতি (সিটি করপোরেশন বাদে) সর্বনিম্ন ১৬ হাজার ১৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ৬৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়