২০২০ সালে আর্জেন্টিনারই সেরা নন মেসি

আগের সংবাদ

আজীবন সম্মাননায় ফেরদৌস ওয়াহিদ, সেরা ব্যান্ড শিরোনামহীন

পরের সংবাদ

বলেশ্বর পারের বিস্মৃত বীর

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১২, ২০২০ , ১২:২৩ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ১২, ২০২০ , ৩:৩৮ অপরাহ্ণ

ডেডলাইন ১১ জুলাই, একাত্তর, বাগেরহাটের শরণখোলা। ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল নিয়ে রায়েন্দা ক্যাম্প আক্রমণ করেন ক্যাডেট অফিসার আনোয়ার হোসেন। অতর্কিত আক্রমণের পাল্টা জবাবে গুলি ছুড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। কয়েক ঘণ্টার ওই যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন আঞ্চলিক কমান্ডার আনোয়ার হোসেন। পরে তার মরদেহ গোপনে নৌকায় করে বাড়িতে পৌঁছে দেন সহযোদ্ধা শেখ শামসুর রহমান ও মনিরুজ্জামান বাবুল। রাত ১২টায় বলেশ^র নদীর তীরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। বিজয়ের অর্ধ শতকেও রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি নেই শরণখোলার প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের।

অন্যদিকে সময়ের পরিক্রমায় বলেশ্বরের ভাঙনে বিলীন হওয়ার উপক্রম হলে স্থানীয় সংবাদকর্মী নজরুল ইসলাম আকনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলার প্রশাসন ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের দেহবাশেষ তুলে উপজেলা সদরের রায়েন্দা বাজারে শহীদদের কবর স্থানের অদূরে সমাধিস্থ করেন (২০১৫ সালে)। শহীদ ওই মুক্তিযোদ্ধার প্রতি এতেই যেন দায় শেষ। স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় সমাধিটি ঢেকে আছে লতা-পাতা, গাছ-গুল্ম উদ্ভিদে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধি সংরক্ষণসহ মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে রাষ্ট্রীয় খেতাব দেয়ার দাবি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাসহ এলাকাবাসীর। ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের বড় ভাই হেমায়েত উদ্দিন খান একজন ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। বয়সের ভারে ন্যূজ¦ হেমায়েত উদ্দিন বলেন, সেনাবাহিনীর অফিসার পদের চাকরি ছেড়ে দিয়ে দেশের জন্য যুদ্ধ করে প্রাণ দিয়েছে। অথচ তার কোনো নাম নেই। মৃত্যুর আগে ভাইয়ের স্বীকৃতি চাই। ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের সহযোদ্ধা শেখ শামসুর রহমান বলেন, ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছি। তিনি অত্যন্ত সাহসী যোদ্ধা ছিলেন। তার নেতৃত্বেই শরণখোলা থানা ঘেরাও করা হয়। সম্মুখযুদ্ধে তিনি শহীদ হন। আমরা তার মরদেহ খুব গোপনে তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলাম। আনোয়ার হোসেনকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করার দাবি জানিয়েছেন শরণখোলার মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জেল হোসেন পঞ্চায়েত ও হারুনুর রশীদ।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষকদের মতে, অর্ধশতকেও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তৈরি হয়নি। গ্রামেগঞ্জের বীরত্বগাথা হারিয়ে যাচ্ছে বিস্মৃতির অন্তরালে। এ ব্যাপারে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ডা. এম এ হাসান ভোরের কাগজকে বলেন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসিকতা মুক্তিযুদ্ধে চিত্রিত হয়নি। আমরা তাদের সঠিক সম্মান দিতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় এই দায় এড়াতে পারে না।

বীরত্বের স্বীকৃতি কবে : শরণখোলা উপজেলার বলেশ্বর নদী সংলগ্ন দক্ষিণ সাউথখালী গ্রামে ১৯৪৪ সালে আনোয়ার হোসেনের জন্ম। বাবা আলেপ খান ও মা জুমিনা খাতুন। পড়াশোনা শেষে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে করাচি আর্মিতে যোগ দেন ১৯৬৬ সালে। একাত্তরে পাকিস্তানের খানেওয়ালা ক্যান্টেনমেন্টে ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন ফেব্রুয়ারি মাসে ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে আসেন। মার্চে শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার প্রত্যয়ে চাকরির মোহ পেছনে ফেলে হাতে তুলে নেন অস্ত্র। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতে বেছে নেন সুন্দরবনকেই।

শরণখোলা উপজেলার মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস থেকে জানা যায়, ধানসাগর, খোন্তাকাটা, রায়েন্দা, সাউথখালী- এই চার ইউনিয়নে নিজস্ব বন্দুক ও লাঠিসোঁটা নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু হয়। শহীদ সেনাসদস্য ক্যাডেট অফিসার আনোয়ার হোসেন ও আব্দুল আজিজ ফুল মিয়া সুবেদারের নেতৃত্বে একটি দল গঠন হয়। সুন্দরবন এলাকায় নিজস্ব উদ্যোগে বন বিভাগের কার্যালয়ে বনরক্ষীদের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে ও দেশীয় বন্দুক ব্যবহার করে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলেন তারা। তার ভাই হেমায়েত উদ্দিন খানও তার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। অন্য দুই ভাই শাফায়েত খান ও সায়েদ খান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা বন্দি ছিলেন পাকিস্তানে। শরণখোলাসহ বাগেরহাটের একাধিক স্থানে পাকহানাদারবাহিনী ও রাজাকারদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ করে জয়ী হন আনোয়ার হোসেন ও তার সঙ্গীরা। তার নেতৃত্বে একাধিক হামলায় অনেক পাকিস্তানি সেনা সদস্য নিহত হয়। রাজাকাররা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু ১১ জুলাই শত্রুপক্ষের গুলিতে থেমে যায় তার হৃদস্পন্দন। থেকে যায় সব সাহসিকতা। ৩০ লাখ রক্তের বিনিময়ে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় কাক্সিক্ষত বিজয়। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে অবদান রাখা মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সম্মানিত করা হয়। কিন্তু ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায় শরণখোলার প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন। আজও স্বীকৃতি মেলেনি এই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার। যার বীরত্বগাথা নিয়ে বয়ে চলছে বলেশ^র। কখনো শান্ত, কখনো অশান্ত বলেশ^র যেন ঢেউয়ের কান্নায় গেয়ে যায় বিস্মৃতির একাত্তরনামা।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়