তিন আলির ঝলকে জিতল ঢাকা

আগের সংবাদ

মধ্যবয়সী অক্ষয়কে পেয়ে উচ্ছ্বসিত সারা

পরের সংবাদ

যে নির্বাচনে ব্যক্ত হয় স্বাধীনতার ম্যান্ডেট

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৪, ২০২০ , ৯:১৭ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ৪, ২০২০ , ৯:১৭ অপরাহ্ণ

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ৫০ বছর পূর্তি ৭ ডিসেম্বর ২০২০। এই নির্বাচন কেবল তখনকার পাকিস্তান কিংবা দক্ষিণ এশিয়া নয়, সারা পৃথিবীর জন্য কিছু শিক্ষা রেখে যায়।
নির্বাচনে ভোটার মেরুকরণ আকস্মিকভাবে এবং দ্রুত গতিতে ঘটে যায়।
বৃহত্তর ইস্যুভিত্তিক নির্বাচনে ক্ষুদ্র ইস্যুভিত্তিক দল দ্রুত সমর্থক হারায়।
নেতৃত্বের ক্যারিশমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছোট দলের নেতারা সমর্থকদের আস্থা হারান। সমর্থকরা রাজনৈতিক গতিময়তাকে অনুসরণ করেন।
কোনো দলের ফলাফলে অবিশ্বাস্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাষ্ট্রের সংহতির জন্য হুমকিস্বরূপ।
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ গণরায় অমান্য করা রাষ্ট্রের খণ্ডীকরণ ত্বরান্বিত করে।
একই রাষ্ট্রে ভিন্ন সংস্কৃতি বিরাজমান থাকলে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয়ভিত্তিক প্রভাব ও সব সংস্কৃতিতে সমর্থন থাকতে হবে। সত্তরের নির্বাচনে দুটো প্রধান দলই প্রাদেশিক সমর্থনে বলীয়ান ছিল।
অর্থনৈতিক বঞ্চনা রাজনৈতিক বিদ্রোহের অন্যতম কারণ।
দেশের বুদ্ধিজীবী ও গোয়েন্দা সংস্থা গণরায় আঁচ করতে প্রাই ব্যর্থ হয়।
সব তাত্তি¡ক বিষয় ছাপিয়ে সত্তরের নির্বাচনে বাঙালিদের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিস্ময়কর নেতৃত্বগুণ। ৫০ বছর পর সত্তরের নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উদযাপন করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। এই নির্বাচনের ফলাফলের ভেতরই নিহিত ছিল স্বাধীনতার পক্ষে বাঙালির গণরায়।
সাধারণ নির্বাচনে গণপরিষদের জন্য সাব্যস্ত তারিখ ছিল ৫ অক্টোবর ১৯৭০। ১২ নভেম্বরের জলোচ্ছ্বাস যখন উপকূলীয় জেলাগুলোর লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নেয় এবং জেলাগুলোর ভৌত অবকাঠামোর ভয়ঙ্কর ক্ষতিসাধন করে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের ছোট দলগুলো নির্বাচন পিছিয়ে দেবার দাবি তুলে। প্রধান দল আওয়ামী লীগ জানায় নির্বাচন ঘোষিত তারিখেই হতে হবে, পেছানোর প্রয়োজন নেই। পাকিস্তান সরকারের হাতে এ ধরনের একটি অজুহাত তুলে দিলে নির্বাচন নিয়ে তালবাহানা শুরু করতে পারে- এমন একটি যৌক্তিক আশঙ্কা ছিল। ৫ অক্টোবরের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রায় এক বছর আগে ১৯৬৯-এর ২৮ নভেম্বর।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জলোচ্ছ্বাস পীড়িতদের জন্য মায়া কান্না কেঁদে নির্বাচনকর্মীরা ত্রাণকাজে ব্যস্ত- এ যুক্তি দেখিয়ে নির্বাচনের নতুন তারিখ ঘোষণা করেন- গণপরিষদের জন্য ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ এবং প্রাদেশিক পরিষদের জন্য ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭০। ছোট রাজনৈতিক দলগুলো প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানায় কিন্তু পাকিস্তান পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো অভিযোগ করেন একটি বিশেষ দলকে সুবিধা প্রদান করতে নির্বাচন পেছানো হয়েছে। জবাবে আওয়ামী লীগ প্রধান জানান তার দল যে কোনো সময় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত এবং নির্বাচন অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে নিয়ে যাওয়াতে তার দলের অবস্থার কোনো হেরফের ঘটবে না। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, যারা জলোচ্ছ¡াসে বিধ্বস্ত মানুষের দোহাই দিয়ে নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়েছেন তাদের কেউ দুর্গতদের ত্রাণ কাজে এগিয়ে আসেননি। বরং তার দলই দুর্গতদের পাশে রয়েছে। ভুট্টোর শঠতা ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ যেসব পশ্চিম পাকিস্তানি নেতার কাছে স্পষ্ট ছিল তারা মুখ খুলে বলতে শুরু করেছেন, ভুট্টো সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের সঙ্গে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছেন। কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা এবং সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল নূর খান বলেন জনগণের ভোটে যারা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছেন তাদের উদ্যোগ নস্যাৎ করতে পিপিপি প্রধান অগণতান্ত্রিক শক্তিকে মদদ দিয়ে যাচ্ছেন। স্পষ্টত সে সময় সামরিক শাসনাধীনে থেকে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ভুট্টোর ষড়যন্ত্রের কথা বলা যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয়। নিজে সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশের প্রধান থাকার পরও বললেন, সামরিক আইন কখনো আইনের শাসন দিতে পারে না।
ঊনসত্তর পরবর্তী গণজাগরণের জোয়ার তখনো মিলিয়ে যায়নি, বরং নির্বাচন উপলক্ষ করে ছয় দফা ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য গুটিকয় মানুষ ছাড়া দলমত নির্বিশেষে পূর্বাঞ্চলের নাগরিকগণ একটি প্লাটফর্মে জমায়েত হন।
১৯৭০-এর ডিসেম্বর যাদের স্মৃতিতে এখনো সজীব তারা ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ পোস্টারটির কথা স্মরণ করতে পারেন। পরিসংখ্যানে ঈষৎ হেরফের হতে পারে কিন্তু এর মধ্যে বৈষম্যের যে চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে তা পূর্ববাংলার স্বল্প শিক্ষিত মানুষকেও স্পর্শ করেছে :
একটি বিষয়ের প্রতি আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এক ধরনের ইসলামিকরণের নামে এই পূর্ব পাকিস্তানেরই কর্তাব্যক্তি ও সরকার আশ্রিত বুদ্ধিজীবীরা এমনকি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার ‘সজীব করিব মহাশ্মশান’ বদলে ‘সজীব করিব গোরস্থান’ করেছেন। কিন্তু ‘যখন সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ পোস্টারে শহর ছেয়ে গেল আমি কাউকে বলতে শুনিনি এমনকি পরবর্তীকালে কোনো লেখাতেও দেখিনি কেউ এর শিরোনাম বদলে ‘সোনার বাংলা গোরস্থান কেন?’ করেছেন বা করার প্রস্তাব করেছেন। অর্থাৎ সত্তরের নির্বাচনে শ্মশান শব্দটিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী অন্তত পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চনার প্রশ্নে শ্মশান হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। এমনকি পাকিস্তানিকরণের উপযুক্ত সময়েও কেউ কবি কায়কোবাদের মহাকাব্য মহাশ্মশান-এর নাম বদলের উদ্যোগ গ্রহণ করেননি।
৭ ডিসেম্বর প্রবল উৎসাহের ভোটাধিকার প্রয়োগ করা হলো। স্বায়ত্তশাসন ও ছয় দফাভিত্তিক শাসন কায়েমের জন্য নৌকা প্রতীকই তখন কাক্সিক্ষত। নির্বাচনের ফলাফল তখনো সব আসেনি। রাল্ফ ব্লামেন্থালের পাঠানো প্রতিবেদন ৮ ডিসেম্বরের নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত হলো। সংবাদের শিরোনাম বাঙালি ও বামপন্থি দলগুলো পাকিস্তানের নির্বাচনে এগিয়ে :
একটি ঐতিহাসিক দলিল বিবেচনায় সংবাদটির অংশ বিশেষের অনুবাদ তুলে ধরছি।

রাওয়ালপিন্ডি, পাকিস্তান, মঙ্গলবার ৮ ডিসেম্বর
পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সার্বভৌমত্বের দাবি জানানো একটি রাজনৈতিক দল এবং পশ্চিম পাকিস্তানে মার্ক্সীয় পন্থায় সম্পদ পুনর্বণ্টনের প্রতিশ্রুতি দেয়া একটি রাজনৈতিক দল ২৩ বছরের ইতিহাসে দেশের প্রথম প্রত্যক্ষ সাধারণ নির্বাচনে এগিয়ে আছে। নির্বাচনের সাময়িক ফলাফল দেশকে সামরিক শাসন থেকে মুক্ত করে ১৯৫৮ সালের পর প্রথম বেসামরিক শাসনে প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে খসড়া সংবিধান প্রণয়নের কাজে দুটো দলকে সামনে নিয়ে এসেছে। গতকালের নির্বাচনে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও একটি মৃত্যু ছাড়া ৫ কোটি পাকিস্তানির অংশগ্রহণে নির্বাচন প্রাথমিক পর্যালোচনায় শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে।

এই সংবাদে ভুট্টোর সাফল্যকে অনেকটা অপ্রত্যাশিত বলা হয়েছে এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আরো ভালো করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যেহেতু সম্পূর্ণ ফলাফল জানার আগেই প্রতিবেদনটি প্রেরিত হয়েছে, তখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ১১২টি আসনে এগিয়ে ছিল।

১৯৭০-এর নির্বাচন সামরিক শাসকের করা একটি গণতান্ত্রিক দলিল লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের (এলএফও) আওতায় অনুষ্ঠিত হয়। এই আদেশের ১নং তফসিলে জনসংখ্যানুপাতিক যে আসন বিন্যাস করা হয় তা গাঠনিকভাবে এমনিতেই পূর্ব পাকিস্তানের ‘আপার হ্যান্ড’ প্রতিষ্ঠা করে। জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের ১৬২টি আসন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত হয়।

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে পূর্ব পাকিস্তানে নারী আসনসহ ১৬৯টির মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ১৬৭ আসন আর পশ্চিম পাকিস্তানের চার প্রদেশে ৬টি নারী আসনসহ ১৪৪টির মধ্যে পাকিস্তান পিপলস পার্টি পায় ৮৮ আসন।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আওয়ামী লীগ প্রধানকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী সম্বোধন করেন।

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ পেশোয়ারে এক সাংবাদিক সম্মেলনে পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো যে বক্তব্য পেশ করেন তাতে তার, তার দলের এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভিলাষ ও পরিকল্পনা বের হয়ে আসে। এই সংবাদ সম্মেলনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৬ ফেব্রæয়ারি করাচি থেকে প্রকাশিত দ্য ডন-এর প্রতিবেদনটির সংশ্লিষ্ট অংশ:
পেশোয়ারে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে তার দল যোগ দেবে না, যদি-না সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছ থেকে প্রকাশ্যে বা গোপনীয়ভাবে পারস্পরিকতার সুস্পষ্ট কোনো নিশ্চয়তা লাভ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা সেখানে গিয়ে একটি দলের তৈরি করা সংবিধান সত্যায়ন করতে পারি না এবং অপমানিত হয়ে ফিরতে পারি না। যদি আমাদের কথা শোনা না হয়, আমাদের দেয়া যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব বিবেচনা না করা হয়, সেখানে যাওয়ায় কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে আমি মনে করি না।’
নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পশ্চিমাংশের প্রধান- তিনি বললেন, ‘ভুট্টোর সংসদ অধিবেশনে যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত দুর্ভাগ্যজনক। তিনি যদি তা-ই করেন তাহলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবেন। তার কিছু বলার থাকলে অধিবেশনে যোগ দিয়ে সংসদের ভেতরেই বলতে পারতেন।’ পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অন্যতম সদস্য সালাউদ্দিন খান বলেছেন, ‘তার এ সিদ্ধান্ত রহস্যজনক এবং এতে ষড়যন্ত্রের আভাস রয়েছে।’

পাঞ্জাব পাকিস্তান ফ্রন্টের আহ্বায়ক মালিক গোলাম জিলানি বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের চার প্রদেশের কেবল একটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো গোটা পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃত্ব দাবি করতে পারেন না। ভুট্টোর সিদ্ধান্ত অপ্রত্যাশিত, অযাচিত এবং অন্যায়। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি পাঞ্জাবসহ যেসব স্থানে জনগণ পিপলস পার্টির প্রার্থীকে জিতিয়ে এনেছে তাদের সবার অমর্যাদা করেছেন, বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন এবং লজ্জার কারণ হয়েছেন। ক্ষমতার জন্য ভুট্টোর রাজনীতি দেশকে ধ্বংসের প্রান্তে এনে দাঁড় করিয়ছে। এর পরের অংশে গভীর ষড়যন্ত্রের ইতিহাস, জনগণের দেয়া ম্যান্ডেট না মানার পরিণতি রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম, পাকিস্তানের দ্বিখণ্ডীকরণ ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়