একদিনেই সড়কে ঝরল ২১ প্রাণ

আগের সংবাদ

তিন আলির ঝলকে জিতল ঢাকা

পরের সংবাদ

পর্যটনশিল্প ও কোভিড-১৯ : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৪, ২০২০ , ৮:৪৩ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ৪, ২০২০ , ৮:৫২ অপরাহ্ণ

পর্যটনশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি অন্যতম স্বীকৃত শিল্প হিসেবে দিন দিন ক্রমান্বয়ে আত্মপ্রকাশ করছিল, কিন্তু বাদ সাধল বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান ভয়াবহ এক আতঙ্ক করোনা ভাইরাস নামক মহামারি। এই ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ গত বছর ডিসেম্বরে শুরু হলেও বাংলাদেশে এর প্রকোপ শুরু হয় এ বছর মার্চ মাসে। শুরুর দিকে দেশব্যাপী সংক্রমণ প্রতিরোধে অফিস-আদালত-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদির সঙ্গে পর্যটনস্থলগুলোও লকডাউনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সর্বোপরি পুরো দেশের সর্বত্র জনসমাগমে সরকার কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তবে ধীরে ধীরে জীবন ও জীবিকার তাগিদে মানুষকে আবার বহির্মুখী হতে হয়েছে। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও নিজ সত্তা ও পরিবারের আপনজনদের অন্ন সংস্থানের জন্য মানুষ লকডাউন ভেঙে বের হতে বাধ্য হয়েছে। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশ তথা সমগ্র পৃথিবীর অর্থনীতি বহুলাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের পর্যটন খাতও করোনা ভাইরাসের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির প্রভাবমুক্ত নয় বরং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করলে পর্যটন খাত অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া খাতগুলোর কাতারে শুরুর দিকেই ঠাঁই করে নেবে। আমি এই লেখনীতে মূলত করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে সেসব বিষয় বর্তমান অবস্থা এবং করোনাকালীনও প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে পর্যটনশিল্প কীভাবে অগ্রসর হতে পারে সে বিষয়ে আলোকপাত করব।

World Travel and Tourism Council (WTTC) এর ২০১৩ সালের খতিয়ান অনুযায়ী ২০১২ সালে বাংলাদেশে সৃষ্ট প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান মিলিয়ে মোট কর্মসংস্থানের শতকরা ৩.৭ শতাংশ সৃষ্টি হয়েছিল পর্যটনশিল্প থেকে, যা ২০২৩ সাল নাগাদ ৪.২ শতাংশে উন্নীত হওয়ার আশা করা হয়েছিল। ১৯৯৯ থেকে শুরু করে ২০১৮ সাল পর্যন্ত Gross Domestic Product (GDP) হিসাব করলে পর্যটনশিল্পের অবদান দাঁড়ায় দেশের মোট Gross Domestic Product-এর শতকরা ৪ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মোট Gross Domestic Produc-তে পর্যটনশিল্পের অবদান ছিল ৯৫০.৭ বিলিয়ন টাকা। হু হু করে বেড়ে চলছিল পর্যটনশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ব্যবসার পরিধি। সচ্ছলতার স্বাদ পেতে শুরু করেছিলেন পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মানুষরা। দিনকে দিন সময় বনাম পর্যটনশিল্পের উন্নতির লেখচিত্র ক্রমান্বয়ে ওপর দিকেই সবেগে ধাবিত হচ্ছিল কিন্তু বিধিবাম। হঠাৎ করেই করোনা ভাইরাস নামক এই বৈশ্বিক দুর্যোগের আবির্ভাব এবং দেশব্যাপী জনসমাগমে দেশি-বিদেশি নিষেধাজ্ঞার কারণে যেন আকাশ থেকে জমিনে মুখ থুবড়ে পড়ে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প। সাধারণত শীত মৌসুমে বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে ঘুরতে আসতেন ভ্রমণপিপাসু পর্যটকরা। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে প্রায় সারাজুড়েই এ দেশে পর্যটকদের আনাগোনা দেখতে পাই। পরিতাপের বিষয়, বছরের শুরু থেকেই তারা তাদের বিমান ফ্লাইট ও হোটেল বুকিং বাতিল করে দেন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রেহাই পেতে। দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটকরাও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে সরকারি নির্দেশ মেনে পর্যটনস্থলগুলো ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকেন। সারা বছর জমজমাট থাকা পর্যটনস্থলগুলো হয়ে পড়ে পর্যটকশূন্য। ফলস্বরূপ পর্যটন খাত থেকে জীবিকা নির্বাহ করা অধিকাংশ মানুষ হয়ে পড়েন অসহায় এবং সেই সঙ্গে দেশের মোট এউচ-তে পর্যটনশিল্পের অবদান নেমে যায় প্রায় শূন্যের কোটায়। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায় করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে পর্যটন খাতে বিগত জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার লোকসান হয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে তা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত ৪০ লক্ষাধিক মানুষ বেকারত্ববরণ করেছেন এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল প্রায় দেড় কোটি মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সরকারি নির্দেশ মোতাবেক দেশের পর্যটনস্থলগুলো গত মার্চ মাস থেকে বন্ধ থাকলেও আগস্ট মাস থেকে মোটামুটি সব পর্যটনস্থলই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তসাপেক্ষে খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই সুবাদে পর্যটনস্থলগুলো আগস্ট মাস থেকে পুনরায় খুলতে শুরু করলেও পর্যটকদের মধ্যে আগের মতো ভ্রমণে উৎসাহ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ট্যুরিজম বোর্ডের নির্দেশাবলি অনুযায়ী যেসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সাপেক্ষে পর্যটনস্থলগুলো খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো সার্বক্ষণিক মাস্ক পরিধান করা, অনলাইনে বুকিং ও অর্থ পরিশোধ করা, বড় দলে ভ্রমণের পরিবর্তে কম সদস্য ও পারিবারিক ভ্রমণে উৎসাহিত করা, হোটেলে অবস্থানকালে অপরিচিত ও বহিরাগত মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা, পারতপক্ষে হোটেল কক্ষের বাইরে খাবার গ্রহণ না করা, রেস্তোরাঁতে খাবার গ্রহণের সময় নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করে গাড়ি ব্যবহার না করা ইত্যাদি। হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিকদের বিশেষভাবে নির্দেশনা দেয়া হয় যথাসম্ভব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে, পর্যটকদের ব্যবহৃত বিছানাপত্র উত্তমরূপে ধৌত করা, সর্বত্র সাবান বা জীবাণুনাশক দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা, পর্যটকদের ব্যবহার করা স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা। ট্যুরিজম বোর্ড থেকে আরো নির্দেশনা দেয়া হয়, যদি কোনো পর্যটক পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলেন তবে তাকে জরিমানার সম্মুখীন হতে হবে; মোবাইল কোর্ট, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও জেলা প্রশাসন এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করবে।

এসব বিধি-নিষেধকে পুঁজি করে পর্যটনস্থলগুলো খুলে দেয়া হলেও বাস্তবচিত্র এখন অনেকটাই ভিন্ন। সরকারের বেঁধে দেয়া নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই অবাধে চলছে স্বাস্থ্যবিধির লঙ্ঘন। দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ মোবাইল কোর্ট, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও জেলা প্রশাসন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। কারণ খুব অল্পসংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন আর বাকি সবাই চলছেন তাদের নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো। ফলে অল্প সংখ্যক জনবলের নিযুক্ত প্রশাসনের পক্ষে এত বিপুলসংখ্যক অসচেতন মানুষকে স্বাস্থ্যবিধির আয়তায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। শুরুর দিকে বেশ অনেক দিন জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে নিয়মিত ফলাও করে বিশেষ করোনা বুলেটিন প্রচার করা হতো এবং তাতে প্রতিদিনের করোনা টেস্টের সংখ্যা, সংক্রমণের সংখ্যা ও মৃতের সংখ্যা উল্লেখ করা হতো। মানুষ তা দেখে শিক্ষা নিত ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার তাগিদ অনুভব করত। কিন্তু বর্তমানে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও হ্রাস পেয়েছে। জনগণ এখন সরকারি বিধিনিষেধের প্রতি শৈথিল্যভাব প্রদর্শন করছে। ‘নতুন স্বাভাবিক’-এর কথা বলে তারা এখন সতর্কতা অবলম্বনের পথ থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে। সতর্কতা অবলম্বন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে এখনো সম্ভব হ্যাপি ট্যুরিজমের (ঐধঢ়ঢ়ু ঞড়ঁৎরংস) ব্যবস্থাপনা করা। যদিও গুটিকতক কিছু সচেতন মানুষ ছাড়া কাউকে এখন আর ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি হিসেবে সচেতনতামূলক মাস্ক পরিধান করতেও দেখা যায় না। গত ২০ অক্টোবর, ২০২০-এ দেশের প্রায় সব দৈনিক পত্রিকায় খবর এ দেখতে পাই, আমাদের প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ঘরের বাইরে বের হওয়ার সময় মাস্ক পরিধান করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। অধিকাংশ মানুষ দীর্ঘদিন লকডাউনের একঘেয়েমি কাটাতে পর্যটনস্থলগুলোতে ঘুরতে যাচ্ছেন কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা উপেক্ষা করছেন।

আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হয়ে করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করা সম্ভব। পর্যটনের ক্ষেত্রেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেমে নেই বরং বারবার ভাইরাসটি তার জিনগত গঠন পরিবর্তন করায় এর প্রতিকার নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় শতভাগ সফলতা পাচ্ছেন না এবং এ কারণে এখন পর্যন্ত এর কোনো কার্যকরী ঠধপপরহব আবিষ্কার করা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। পৃথিবীর উন্নত অনেক দেশে পর্যটনস্থলগুলো খুলে দেয়ার পর করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় তারা সেগুলো আবার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী করোনা ভাইরাস অচিরেই আরো শক্তিশালী রূপে আঘাত হানতে পারে মানবসভ্যতার ওপর। যা কিনা দ্বিতীয় ঢেউ (ঝবপড়হফ ডধাব) হিসেবে আবিভর্‚ত হতে পারে। বাংলাদেশের মতো এত বহুল জনসংখ্যার ঘনত্বের দেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি বিশেষজ্ঞদের ধারণাকে সত্য প্রমাণ করে করোনা ভাইরাস নতুন করে বিস্তৃতি শুরু করে, তাহলে তা বর্তমান অবস্থা থেকে ভিন্নতর রূপ লাভ করতে পারে। হাসপাতালগুলোকে আরো সতর্ক হতে হবে। একজন মানুষ করোনা আক্রান্ত হলে তার পরিস্থিতি কী হতে পারে তার নিশ্চয়তা নেই, তবুও জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়েও মানুষ জনতার স্রোতে মিশে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণামতে আরো প্রায় ১ থেকে ২ বছর করোনা ভাইরাসের প্রভাব থাকবে। ফলে এই দীর্ঘ সময় পর্যটনশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার সরকারি পর্যায়ে সুচিন্তিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।

পর্যটন খাতকে ঘিরেই যাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ হয় তাদের কথা চিন্তা করে পর্যটনস্থলগুলো খুলে দেয়ার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলা মানুষগুলোকে আরো সচেতন হতে হবে। সরকার জনগণের মঙ্গলের স্বার্থেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে এবং তা তদারকির দায়িত্ব দিয়েছে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে। পর্যটনশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের নাম। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দেশের সর্বস্তরের জনগণের দায়িত্ব। পৃথিবীর ইতিহাসে সময়ে সময়ে করোনা ভাইরাসের মতো আরো অনেক প্রলয়ঙ্করী মহামারি এসেছে কিন্তু মানুষ সেগুলো জয় করে এখনো টিকে আছে। এই উন্নত প্রযুক্তির যুগে এসে করোনা ভাইরাসকেও মানুষ জয় করে টিকে থাকবে এমন আশা করা বিলাসিতা নয়; দরকার শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাগুলো যথাসম্ভব মেনে চলা। অচিরেই করোনা ভাইরাস এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে, এই প্রত্যাশায়ই রয়েছে মানব সভ্যতা।

লেখক : লে. কর্নেল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ, মিরপুর সেনানিবাস।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়