পাকিস্তানের নৃশংসতার ব্যথা চিরদিন থাকবে: প্রধানমন্ত্রী

আগের সংবাদ

নাচ কেবল শখ নয়, পেশাও

পরের সংবাদ

সত্যেন সেনের সন্ধানে

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩, ২০২০ , ১০:১১ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ৩, ২০২০ , ১০:১৭ অপরাহ্ণ

বিগত শতকের ষাটের দশকে ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী ব্যাখ্যাকে আত্মস্থ করে এবং সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার শিল্পরীতি অবলম্বন করে বাংলা ভাষায় যিনি ঐতিহাসিক উপন্যাস সৃষ্টিতে সাফল্যের দিগন্ত ছুঁয়ে গিয়েছিলেন, তিনি সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১)। এ পথে তিনি হাওয়ার্ড ফার্স্ট, এলেক্সি তলস্তয় ও রাহুল সাংকৃত্যায়নের সুযোগ্য সহযাত্রী। এ যাবৎকালের বাংলা সাহিত্যে সত্যেন সেনই এ পথের সার্থকতম অভিযাত্রী। বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাসকে তিনি শুধু সাম্প্রদায়িক হিন্দু রিভাইভ্যালিজম বা মুসলিম রিভাইভ্যালিজমের কবল মুক্ত করেননি, তিনি এর স্থানিক ও কালিক দিগন্তকেও বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত করে দিয়েছেন। সত্যেন সেন বৈদিক যুগের ভারতের পটভ‚মিতে রচনা করেছেন ‘পুরুষমেধ’। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে ভারতের বাইরে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের ইতিবৃত্ত নিয়ে রচনা করেছেন ‘কুমারজীব’, বৌদ্ধ পাল রাজাদের রাজত্বের পটভ‚মিতে বাংলার শূদ্র জাগরণকে অবলম্বন করেছেন ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’ উপন্যাসে। তৃতীয় শতাব্দীর বৌদ্ধ পণ্ডিত কুমারজীবের মতো একাদশ শতাব্দীর মনীষী ‘আলবেরুনী’র জ্ঞানসাধনার কাহিনীকেও উপন্যাসের আধারবন্দি করতে তিনি আগ্রহ বোধ করেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ ভারতে সিপাহি বিদ্রোহের আবরণে অনুষ্ঠিত প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম যেমন সত্যেন সেনকে ‘অপরাজেয়’ উপন্যাস রচনায় উদ্বুদ্ধ করে, তেমনি খ্রিস্টের জন্মের কয়েকশ বছর আগেকার জেরুজালেম নগরী ও ইহুদি জাতির ইতিহাসও তাকে প্রেরণা জোগায় ‘অভিশপ্ত নগরী’ ও ‘পাপের সন্তান’ রচনায়।
স্বল্প পরিসরে সত্যেন সেনের সবগুলো ঐতিহাসিক উপন্যাস পরিক্রমা কোনো মতেই সম্ভব নয়। তাই এখানে আমি শুধু প্রাচীন ভারতের পটভ‚মিতে রচিত ‘পুরুষমেধ’ উপন্যাসটিকেই আলোচনার জন্য বেছে নিয়েছি। সেইসঙ্গে অতিসামান্য কিছু কথা বলেছি ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’ সম্পর্কে।

দুই.
ওল্ড টেস্টামেন্টের যুগের জেরুজালেমের মতো বৈদিক যুগের ভারতবর্ষও সত্যেন সেনের রসপিপাসাকে উদ্রিক্ত করে। বেদ পুরাণ বা রামায়ণ মহাভারতের কোনো বিশেষ কাহিনীর কঙ্কাল অবলম্বনে আধুনিক সাহিত্য প্রকরণে পুরাণের নবজন্ম ঘটানোর পরিচয়বাহী মাইকেল থেকে বুদ্ধদেব বসু পর্যন্ত অনেকের রচনাই। সত্যেন সেন কিন্তু তেমন কোনো পরিচিত পৌরাণিক আখ্যানের পটভ‚মিতে তার উপন্যাসের ভিত্তি গড়ে তোলেননি; নিজের কল্পনাশক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়েই তিনি বৈদিক আবহমণ্ডিত কাহিনী সৃষ্টি করে ‘পুরুষমেধ’ উপন্যাসটিতে চমৎকার নির্মাণ কৌশলের পরিচয় দিয়েছেন। শুধু নির্মাণ কৌশলে নয়, আধুনিক প্রগতি চেতন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি দিয়ে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের শৈল্পিক ভাষ্য রচনাতেও তার শক্তির পরিচয় ‘পুরুষমেধ’-এ পরিস্ফুট। বৈদিক যুগের সমাজ বলতে তিনি কোনো একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নকে বোঝাননি, প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন স্থানে যে একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের সমাজ কাঠামো বিদ্যমান ছিল, সে সত্যটিকে তিনি সামনে নিয়ে এসেছেন।

তথাকথিত আর্য সভ্যতার সৌধ যে বিপুলসংখ্যক শূদ্র জনতার লাঞ্ছনার ওপরই গঠিত- সেই সুপরিচিত ঐতিহাসিক তথ্যটির জীবন্ত চিত্র উপস্থাপিত সত্যেন সেনের ‘পুরুষমেধ’-এ। মানবিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিতে শূদ্ররা যে মোটেই পশ্চাৎপদ ছিল না, বরং ‘সভ্য’ আর্য জাতিই যে সব রকমের অমানবিক কাণ্ডের হোতা এবং তাদের সেই অমানবিকতাই শূদ্রের মানবিকতাকে বিপর্যস্ত করে- সব ‘পুরুষমেধ’ উপন্যাসটি জুড়ে তার নিপুণ বিশ্লেষণ বিধৃত। বৈদিক যুগের ভারতবর্ষে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে রাজশক্তি ও পুরোহিতশক্তির দ্ব›দ্ব যেমন বিভিন্ন স্থানে প্রকট হয়ে উঠেছে, তেমনি অনেক স্থানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাও সগৌরবে বিরাজ করেছে, এমনকি চতুর্বর্ণের ভেদ পর্যন্ত আর্য সমাজেরই কোনো কোনো অংশে বহুকাল পর্যন্ত অপরিজ্ঞাত থেকেছে। ‘পুরুষমেধ’-এর বিভিন্ন অংশে এ ধরনের অসম বিকাশজাত অনেক বিচিত্র সমাজের খণ্ড খণ্ড আলেখ্য অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে চিত্রিত। উপন্যাসের দশম পরিচ্ছেদে চম্পাবতী রাজ্য ও সে রাজ্যের বহু শক্তিমতী বিদূষী রমণী অম্বত্থলার কাহিনীর মধ্য দিয়ে প্রাচীন ভারতের কৃষিকেন্দ্রিক সমাজের লোকায়ত দর্শনের মর্মকথাটি বর্ণিত। অনেক ঐতিহাসিক তথ্য ও দার্শনিক তত্ত¡ উপন্যাসটিতে পরিবেশিত যদিও, তবু উপন্যাসকারের কাহিনী বর্ণনা ও চরিত্রসৃষ্টির নিপুণতার দরুন পাঠকের ওপর তথ্য বা তত্তে¡র ভার চেপে বসেনি। ব্যক্তিত্বময়ী রানী সুদক্ষিণা, ক্ষত্রিয় রাজশক্তির ওপর ব্রাহ্মণ্য পুরোহিত শক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্রতী রাজপুরোহিত উষস্তি চাক্রায়ণ, সত্য সন্ধানী আর্যসন্তান সুদর্শন, শ্রেণিত্যাগী মানবতাবাদী সাত্যকি, লোকায়ত দর্শনের সাদিকা অম্বত্থলা, ‘নারীত্বের প্রকৃত মহিমায় মহিমান্বিতা’ প্রেমময়ী বারবণিতা উলুপী, সহজ সারল্যের অধিকারী শূদ্রপুরুষ সুদাম ও তার যোগ্য সহধর্মিণী ইদা,- ‘পুরুষমেধ’-এর এ রকম সব চরিত্রই ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গে চিরকালীন মানবিক স্বাভাবিকতাকেও ধারণ করেছে। এ উপন্যাসের শাখা কাহিনীগুলো যদিও অনেক পরিমাণে শিথিলবদ্ধ ও মূলের চেয়ে শাখার বিস্তারই অনেক বেশি, তবু এর মূল কাহিনীটির উজ্জ্বলতা মোটেই কম নয়। উপন্যাসকার নিজেই উপন্যাসের ভ‚মিকায় ‘পুরুষমেধ’-এর ‘গুরুত্বপূর্ণ সংকট মুহূর্ত’টিকে চিহ্নিত করেছেন রাজা বৃষকের রোগমুক্তির কামনায় বরুণদেবের প্রসন্নতালাভের উদ্দেশ্যে এক বছরের ক্ষুদ্র শিশু ‘খেতু’র বলিদান অনুষ্ঠানের মধ্যে। যজ্ঞে পুরুষ বা মানুষ বলিদানের নামই ‘পুরুষমেধ’। কালের গতিপ্রবাহে মানবসভ্যতা যে পর্যায়ে উপনীত, তাতে আজকের দিনে নরবলির অনুষ্ঠান অবশ্যই বর্বর প্রথা বলে সর্বজনবিদিত।
তবু সত্যেন সেন তার ‘পুরুষমেধ’-এর ভূমিকায় প্রশ্ন রেখেছেন,-
‘বিংশ শতাব্দীর সু-সভ্য যুগে ধর্মের নামে, সম্প্রদায়ের নামে, জাতীয়তাবাদের নামে, শ্রেণিস্বার্থের নামে যে জগৎজোড়া ব্যাপক পুরুষমেধ অনুক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে- হিংস্রতা বীভৎসতা ও অমানুষিকতার দিক দিয়ে তা কি প্রাক-সভ্যতা যুগের পুরুষমেধকে বহুগুণে ছাড়িয়ে যায় না? প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে সত্যেন সেন এখানে তার উপন্যাসের স্বকীয় ভাষ্য প্রদান করেছেন। তার এই ভাষ্যকে উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করার কোনোই উপায় নেই। সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটে গিয়ে শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত সত্যেন সেনের এই বক্তব্য অমোঘ সত্য হয়েই থাকবে।
বলাবাহুল্য, সত্যেন সেন কলাকৈবল্যবাদের তীব্র বিরোধী। দ্বান্দ্বিক বাস্তুবাদী ইতিহাস-বিজ্ঞানের নিয়ম প্রণালি তার সব চৈতন্য দিয়ে অধিগত, তাই প্রাগাধুনিক যুগের সকল দেশের ইতিহাসেই রাজতন্ত্র পুরোহিততন্ত্রের অন্তর্দ্ব›দ্ব সমেত রাজশক্তির সঙ্গে প্রজাশক্তির পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্বকে তিনি অতি সহজেই অনুধাবন করতে পারেন এবং সে অনুধাবনেরই ঐতিহাসিক রসমণ্ডিত প্রতিফলন ঘটান ‘অভিশপ্ত নগরী’, ‘পাপের সন্তান’ ও ‘পুরুষমেধ’-এ যেমন, তেমন ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’তেও। দাস মালিকদের সঙ্গে দাসদের দ্বন্দ্বের পরিণতিতে ক্রীতদাস-বিদ্রোহের যে চিত্র ‘অভিশপ্তনগরী’তে অঙ্কিত; পুরুষমেধের শূদ্র বিদ্রোহের চিত্র তার থেকে স্বরূপত অবশ্যই পৃথক নয়। তবু পার্থক্য একটা আছে বটে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে অন্য দেশের মতো সরল ও প্রত্যক্ষ কোনো দাসযুগকে চিহ্নিত করা যায় না; অথচ বর্ণাশ্রমের উদ্ভাবনার মধ্য দিয়ে প্রাচীন ভারতের সমাজ বিধায়করা শূদ্রদের যে স্থান নির্দেশ করে দিয়েছেন এবং এর ফলে শোষণ-বঞ্চনার যে অভিনব কৌশল ও অদ্ভুত এক প্রথার সৃষ্টি হয়েছে, তা পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশে প্রচলিত ক্রীতদাস প্রথার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। তবু সেই জটিলতার জাল ছিন্ন করেই ভারতবর্ষের ইতিহাসে বারবার শূদ্র বিদ্রোহ ঘটেছে। তেমন শূদ্র বিদ্রোহের কাল্পনিক চিত্রই সত্যেন সেনের ‘পুরুষমেধ’-এ অঙ্কিত। ‘পুরুষমেধ’-এ যে বিদ্রোহ ব্যর্থতার চোরাবালিতে আটকে যায়, ‘বিদ্রোহী কৈবর্তে’ সে বিদ্রোহই সফলতার দিগন্তকে স্পর্শ করে। ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’ উপন্যাসের মূল কাহিনীটি কাল্পনিক নয়, এর বাস্তব ঐতিহাসিক ভিত্তি বিদ্যমান। বাংলার পাল রাজত্বের সময় বরেন্দ্রের শূদ্র কৈবর্তদের বিদ্রোহের উল্লেখ ইতিহাসে আছে। কিন্তু শূদ্র বিরোধী অভিজাতদের রচিত ইতিহাস কৈবর্ত বিদ্রোহকে অবশ্যই গৌরবমণ্ডিত রূপে অঙ্কিত করেনি, কিংবা এ বিদ্রোহের কোনো অনুপুঙ্খ বর্ণনাও কোথাও রক্ষিত হয়নি। একালের বিপ্লবকামী বুদ্ধিজীবী সত্যেন সেন তার ঐতিহাসিক কল্পনার প্রয়োগে কৈবর্ত নায়ক দিব্বোককে নতুনভাবে সৃষ্টি করে তুলেছেন, সে সময়কার সমাজ পরিবেশকে তার অভ্যন্তরীণ শ্রেণিদ্ব›দ্ব সমেত ইতিহাস থেকে তুলে এনে এ যুগের মানুষের সামনে এক জীবন্ত প্রতিমার মতো সংস্থাপন করেছেন। সত্যেন সেনের ঐতিহাসিক কল্পনায় দিব্বোক হয়ে উঠেছেন নিগৃহীত শূদ্রদের আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীক।

তিন.
ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করার অধিকার কোনো ঔপন্যাসিকের নেই, বরং সে সত্যকে স্পষ্ট ও জীবন্ত করে তোলাটা তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবু ঐতিহাসিক তথ্যাবলির বিশ্বস্ত উপস্থাপনাই একজন ঐতহাসিক ঔপন্যাসিকের কৃতিত্বকে চিহ্নিত করে না। প্রাচীন আলঙ্কারিকরা সাহিত্যের সকল শাখাকেই ‘কাব্য’ নামে আখ্যায়িত করে রসকেই কাব্যের মানবস্তু বলে নির্দেশ করেছিলেন; ঐতিহাসিক উপন্যাসও কাব্যের অন্তর্গত বলেই তাকেও ‘রসাত্মক বাক্যমালা’ হয়েই সার্থক কাব্য হয়ে উঠতে হয়। আলঙ্কারিকদের যুগে ঐতিহাসিক উপন্যাস নামক কাব্য কাব্যপ্রকরণটির উদ্ভব ঘটেনি, তাই অলঙ্কারশাস্ত্রে এর রসস্বরূপের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। আধুনিককালে কবিগুরু (এবং রসগুরুও) রবীন্দ্রনাথ ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ শীর্ষক

আলোচনায় যুগের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ রেখে লিখেছেন-
‘আমাদের অলংকারে নয়টি মূল রসের নামোল্লেখ আছে। কিন্তু অনেকগুলো অনির্বচনীয় মিশ্ররস আছে, অলংকারশাস্ত্রে তাহার নামকরণের চেষ্টা হয় নাই।

সেই সমস্ত অনির্দিষ্ট রসের মধ্যে একটিকে ঐতিহাসিক রস নাম দেওয়া যাইতে পারে। এই রস মহাকাব্যের প্রাণস্বরূপ।’
ঐতিহাসিক উপন্যাসরূপী একালীন মহাকাব্যের সার্থকতা রবীন্দ্রনাথ কথিত এই ঐতিহাসিক রসের প্রয়োগ সাফল্যেই বিচার্য। ‘ঐতিহাসিক রস’ জিনিসটি ইতিহাসের তথ্যপুঞ্জের মধ্যে থাকে না, প্রতিভাবান সাহিত্যস্রষ্টার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই এ রস উপজাত হয়। একজন ঔপন্যাসিকের অবশ্যই কল্পনা-কুশল হতে হয়, কিন্তু সে কল্পনাকুশলতা যদি বৈজ্ঞানিক চেতনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়, তবে তা রূপকথার সৃষ্টি করতে পারে, সার্থক উপন্যাসের জন্ম দিতে পারে না। ইতিহাসকে অবলম্বন করে ঔপন্যাসিক যখন তার কল্পনাকে মুক্ত করে দেন, তখন সে কল্পনার উন্মার্গগামী হওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা থাকে যদি না তিনি ইতিহাস ব্যাখ্যার প্রকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাথে পরিচিত থকেন। বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাস ব্যাখ্যাত ইতিহাসের গতিধারাকে অবলোকন করেন পরস্পরবিরোধী স্বার্থযুক্ত শ্রেণিসমূহের সংঘাতের মধ্যে। ঐতিহাসিক উপন্যাসের স্রষ্টাকেও তার অবলম্বিত ঐতিহাসিক যুগের মৌল শ্রেণিগুলোকে শনাক্ত করতে হয়, তাদের সংঘাতের ক্ষেত্রসমূহকে চিহ্নিত করতে হয়, ইতিহাসের অগ্রগতির বিধানগুলোকে স্পষ্ট করে তুলতে হয়, সংগ্রামরত মানুষগুলোর শ্রেণিস্বরূপের পথেই তাদের ব্যক্তিস্বরূপকে কল্পনা দিয়ে বাস্তব করে তুলতে হয়। এই দায়িত্বগুলো যিনি যথাযথ পালন করতে পারেন, তিনিই পারেন ঐতিহাসিক তথ্যের স্থবির কঙ্কালের মধ্যে প্রাণের সজীবতা বইয়ে দিতে। ইতিহাসের এই প্রাণবীজই কল্পনাকুশল স্রষ্টার হাতে ‘ঐতিহাসিক রসে’ পরিণতি পায় এবং সে রসকে মর্মে ধারণ করেই একটি উপন্যাস যথার্থ ঐতিহাসিক উপন্যাস হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক রসাশ্রয়ী এরকম সার্থক উপন্যাস স্রষ্টাদের মধ্যকার অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিনিধিই হলেন সত্যেন সেন। ইতিহাসের চিরকালীন ছন্দটি উপন্যাসের আধারে পরিবেশন করে সমকালীন বাঙালি পাঠককে ইতিহাস চেতন ও গণচেতন করে তোলাই ছিল সত্যেন সেনের উদ্দেশ্য। সে উদ্দেশ্য সাধনে তার সার্থকতা তুঙ্গস্পর্শী।

সত্যেন সেন সমকালীন সমাজ জীবন নিয়েও অনেক উপন্যাস রচনা করেছেন, কিন্তু সাহিত্যিক সিদ্ধি তার ঐতিহাসিক উপন্যাসেই। তার সঙ্গে তুলনা করা চলে এমন কোনো বাংলা ঔপন্যাসিকেরই নাম করা চলে না। ঐতিহাসিক রসমণ্ডিত উপন্যাস রচনায় তিনি অনন্য। বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাসে তার অনন্যতাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো আর কাউকে আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি না।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়