বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য জাতীয় ঐক্যের প্রতীক

আগের সংবাদ

অনিশ্চয়তা দ্রুত কেটে উঠুক

পরের সংবাদ

ধর্ষণ বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা দরকার

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩, ২০২০ , ৭:৫৪ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ৩, ২০২০ , ৮:০৩ অপরাহ্ণ

নারী ধর্ষণের বাড়াবাড়ি যে দেশেই হোক- একদিকে সামাজিক অবক্ষয় ও দুর্বৃত্ত শক্তির দাপটের প্রতিফলন, অন্যদিকে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির ওপর কালো ছায়াপাত। বাংলাদেশে বিষয়টি সামাজিক থেকে জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে সরকার ধর্ষণের অপরাধে চরম শাস্তির বিধান নিশ্চিত করার পরও ধর্ষণের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকার কারণে। বিষয়টি সরকারসহ সচেতন নাগরিক মাত্রের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ২৭ নভেম্বর একটি দৈনিকে গুরুত্বপূর্ণ শিরোনামে গোটা বছরের উল্লিখিত দুর্বৃত্তপনার একটি সংখ্যা চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনামটি হলো ‘১০ মাসে ধর্ষণের শিকার ১০৮৬’। তাদের প্রতিবেদন মতে ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে এক হাজার ৮৬ জন নারী ও শিশু।’ এ সম্পর্কে বিশদ বিবরণ রয়েছে এই প্রতিবেদনটিতে। কিন্তু এ সংখ্যা অপ্রকাশিত ঘটনা বাদ দিয়েই। এ সম্বন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিশু ধর্ষণ এবং প্রায়শ ধর্ষণোত্তর হত্যা। এটি বাংলাদেশি সমাজে বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশুকে নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে আনা খুব সহজ, সহজ কার্যসিদ্ধি- যেমন প্রায়ই দেখা চকোলেট বা অনুরূপ কিছুর লোভ দেখিয়ে শিশুকে তুলে নিয়ে যাওয়া, পরিচয় ফাঁস হবার সম্ভাবনা বা অন্য কোন কারণে ধর্ষণ শেষে হত্যা বিনা বাধায়। এ জাতীয় ঘটনা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে পত্র-পত্রিকায়, অভিভাবক বা শিক্ষকদের প্রতি সতর্কতামূলক ব্যবস্থাদির উল্লেখসহ। প্রধানমন্ত্রীর এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও বক্তব্য, শেষ পর্যন্ত হুঁশিয়ারি এবং শাস্তি বিধান নেয়ার পরও ভয়ঙ্কর ঘটনা বন্ধ হয়নি। স্বভাবতই এ প্রবণতা বন্ধ করতে ব্যবস্থাগ্রহণের কথা ভাবতে হয়। সমাজের কলঙ্কমোচনের জন্যই কার্যকর ব্যবস্থাগ্রহণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ প্রতিবেদনে একটি তথ্য- ‘পারিবারিক সহিংসতা সাড়ে ৩৭ হাজার।’ এ সমাজকে কী নামে অভিহত করা যায়।
\ দুই \
একটি দুর্বলতার কথা প্রসঙ্গত স্বীকার করতে হয়। শিশুরা ধরে নেই অবুঝ, সহজে প্রতারিত হয়; কিন্তু কিশোরী-তরুণী, শিক্ষার্থী যারা সংবাদপত্রের সঙ্গে পরিচিত, ধর্ষণ ঘটনাদির সঙ্গেও এসব মাধ্যমে পরিচিত, এত সতর্কবাণীর পরও তারা সহজাত আত্মনিরাপত্তার বিষয়ে এত বেখেয়াল কেন? সংবাদপত্রগুলো পড়লে মনে হয় তারা বিষয়টিকে গুরুত্বারোপ এবং নিজস্ব নিরাপত্তার কথা একেবারেই ভাবে না। তাই সহজে ধর্ষকদের প্রতারণার শিকার হয়। অভিভাবকগণও কি তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি সম্পর্কে সতর্কতা গ্রহণের শিক্ষা দেন না, বা দিলেও তরুণীরা বয়সের টানে তা উপেক্ষা করে?

সিলেটে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের ছাত্রদের দ্বারা তরুণী গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনা এবং এমন একাধিক ঘটনা শুধু স্থানীয় শহর বা এলাকাই নয়, সারাদেশে তুমূল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তারপরই তো ধর্ষকের বিচার, চরম শাস্তির দাবি নিয়ে ঢাকার শাহবাগ থেকে সারাদেশ উত্তাল, বিশেষ করে তরুণ সমাজ। আর সেই সূত্রে জাতীয় সংসদে ধর্ষণের চরম শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান পাস, বিষয়টি নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে যাবজ্জীবন ও আমৃত্যু কারাদণ্ডের সংজ্ঞা নিয়ে।

তারপরও কি আমাদের কিশোরী-তরুণী সমাজ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাববে না, সতর্ক হবে না। আন্দোলন, সমাবেশ, আইন প্রণয়ন ইত্যাদি ঘটনার পরও দেখা যাচ্ছে একই ধরনের অসতর্কতা বা নিরাপত্তা বিষয়ক সাবধানতার অভাব। যেমন গত ২৯ নভেম্বরের একটি ঘটনা। সংবাদ-শিরোনাম ‘বাসা ভাড়া করে দেয়ার কথা বলে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ।’ ঘটনাস্থল ময়মনসিংহের ভালুকা। বাসা ভাড়া করে দেয়ার কথা বলে এক পোশাক কর্মীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। একই ধরনের ঘটনা প্রায়ই দেখা যায় বিভিন্ন উপলক্ষ ঘিরে। যেমন ‘জ¦র মাপার কথা বলে যৌন নিপীড়ন। বিশেষ করে লক্ষ করা যায় প্রেমের অভিনয় করে এক পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধা মতো ধর্ষণ, এটা খুবই সচরাচর ঘটনা। অনুরূপ বহুল দুটি ঘটনা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একান্তে নির্জনে ধর্ষণ। একই রকম সংখ্যাধিক্য ঘটনা চাকরির কথা বলে সুবিধামতো তরুণী বা গৃহবধূ ধর্ষণ। এগুলো থেকে পরিত্রাণের একমাত্র এবং সহজ উপায় নিরাপত্তা বিষয়ক সতর্কতা। বছর কয়েক আগের কথা। বিশ^বিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী, বন্ধুর সঙ্গে বিলাসবহুল গাড়িতে দূরযাত্রার শখ মিটাতে গিয়ে হোটেলে রাতভর ধর্ষণের শিকার। অতি বিত্তবান পরিবারের বখাটে সন্তানের প্রশ্রয়-লালিত অপকীর্তির ঘটনা শহর ঢাকায় বেশ সরস আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এরপর যথারীতি মামলা, শাস্তি ইত্যাদি। দূষিত সমাজের অংশ হিসেবে হঠাৎ বিত্তবান পরিবারে সুশিক্ষা ও আদর্শ ও মননশীলতার অভাব দুর্বৃত্ত মস্তানদের অপকর্মে প্রভাবিত করে। এছাড়া পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক বহু কারণ তরুণ সমাজকে ভ্রষ্টাচারে প্ররোচিত করে থাকে। অভিভাবকদের শিক্ষা ও শাসনের অভাবও এ ক্ষেত্রে কম দায়ী নয়। শ্রেণিগত বৈষম্য এবং আইনি ব্যবস্থার শিথিলতার মতো একাধিক কারণ ধর্ষণ প্রবণতা ও বৃদ্ধির কারণ।
\ তিন \
অবশ্য সতর্কতা সত্তে্বও, সচেতনতা সত্তে¡ও আমাদের সমাজে নারী ধর্ষণের ঘটনা লক্ষ করা যায়। যেসব ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার মতো বহুবিধ কারণ সামাজিক অপরাধ ঘটতে সাহায্য করে। এছাড়া আইনি কঠোরতা, দ্রæত বিচারে শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারার মতো কারণগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক বিত্তের ও ক্ষমতার প্রভাবও এসব ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়। আমাদের সমাজ যে নারী ধর্ষণের ক্ষেত্রে কতটা দূষিত হয়েছে তার প্রমাণ ‘রিকশা চালক, অটো রিকশা চালক থেকে জনপ্রতিনিধি তথা ইউপি চেয়ারম্যান পর্যন্ত ধর্ষকের ভ‚মিকায়।’ এগুলো দৈনিক পত্রিকার কল্যাণে প্রকাশিত। অপ্রকাশিত ধর্ষণের সংখ্যাও বহুজনের মতে, নেহাৎ কম নয়। কাজেই পূর্বোক্ত ১০ মাসের সংখ্যাটি সম্ভবত প্রকৃত সংখ্যা নয়- এটা অঘটনের চরিত্র প্রকাশ করে মাত্র। যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর প্রকাশিত শিরোনাম অন্তত কয়েকটি উল্লেখ প্রয়োজন। যেমন- ‘গৃহবধূকে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ/ইউপি চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার’।

‘সাভারে ৭ বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার, রিকশা চালক আটক।’ জনস্বার্থের রক্ষক তথা দেখভাল করার দায়িত্বে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যখন ভক্ষক এবং অপরাধে যুক্ত তখন সমাজ জনস্বার্থ রক্ষা করবে কীভাবে? ইতোপূর্বে আমরা সামাজিক দূষণ, অবক্ষয়ের কথা বলেছি- এর ভয়াবহ উদাহরণ ‘বাহুবলে গৃহবধূকে ধর্ষণের পর হত্যা, শ্বশুর গ্রেপ্তার।’ (২৭.১১.২০২০)। এ ধরনের একাধিক ঘটনা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে সমাজের একাংশে মূল্যবোধ ও মানবিক চেতনা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। এর চেয়েও বর্বরোচিত ঘটনার প্রকাশও সংবাদপত্রের কল্যাণে আমরা জানতে পারি। আরেকটি খবর। তথাকথিত প্রেমিক ও তার বন্ধুরা মিলে কিশোরীকে আটকে রেখে ধর্ষণ- শিরোনাম ‘সিলেটে ৮ দিন আটকে রেখে কিশোরীকে ধর্ষণ’ (১.১২.২০২০)। শুধু সিলেটে নয়, দেশের সর্বত্র, বিশেষ বিশেষ এলাকায় এ জাতীয় ঘটনা একের পর এক ঘটে চলেছে। যেমন রাজধানীর তুরাগে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ‘তরুণীকে আটকে দল বেঁধে ধর্ষণ।’ (২.১২.২০২০)।

এসব সাম্প্রতিক ঘটনা। ধর্ষণের মৃত্যুদণ্ড বিধান সংসদে পাস হবার পর ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে শুধু আইন করলে চলবে না। দরকার অপরাধের দ্রুত, সঠিক তদন্ত ও বিচার এবং শাস্তি কার্যকর করা। এক কথায় আইনের দ্রুত, ন্যায় ভিত্তিক প্রয়োগ, জনসাধারণের সচেতনতার জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, অর্থাৎ আইনের দ্রুত প্রয়োগ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া ধর্ষক মানসিকতা, ধর্ষণ প্রবণতা হ্রাস পাওয়া এবং বন্ধ হবার নয়। দূষিত সমাজকে সংশোধন করার জন্য এটা জরুরি। তদুপরি সমাজের সংস্কার তার শুভ শক্তিকে সংহত করতে উদ্যোগ। সে উদ্যোগ নিতে হবে দেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে। শুধু লেখালেখিতে লক্ষ্য অর্জিত হবে না। প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাই কার্যকর ব্যবস্থা।

আহমদ রফিক : লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়