শ্রদ্ধা সৃষ্টিশীল মানুষের প্রতি

আগের সংবাদ

অতিথি পাখি শিকার রোধে আইন জোরদার করা জরুরি

পরের সংবাদ

কিউএস র‌্যাঙ্কিং ও কিছু কথা

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২, ২০২০ , ১১:১৬ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ২, ২০২০ , ১১:১৬ অপরাহ্ণ

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কিউএস (কোয়াককোয়ারেল সিমন্ডস) বিশ্বের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি র‌্যাঙ্কিং প্রকাশ করেছে। র‌্যাঙ্কিং ২০২১-এ বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমা পেয়েছে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই বিশ্বের সেরা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে জায়গা করে নিতে পারে না দুয়েকটা ব্যতিক্রম ছাড়া। যেমন ২০২১ র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০০-১০০০ এর মধ্যে। কিন্তু এটা কি আসলেই সন্তোষজনক? কিউএস কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং করে থাকে। এ বছর এশিয়াভিত্তিক র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ থেকে সর্বমোট ১১টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। যার মধ্যে তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বাকি ৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে বাংলাদেশের মধ্যে সেরা অবস্থানে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে এতগুলো পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও ১০০-এর মধ্যে কারো অবস্থান নেই কেন? প্রকৃতপক্ষে কিউএস কর্তৃপক্ষ যে মানদণ্ডগুলো বিবেচনা করে র‌্যাঙ্কিং করে থাকে তার কয়টা মানদণ্ড আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পূরণ করতে পারছে। আমরা যদি সেই মানদণ্ডগুলোর দিকে একটু চোখ বোলাই তাহলে বিষয়টি একদম স্বচ্ছ হয়ে যাবে। এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সংস্থাটি ১১টি মানদণ্ড বিবেচনায় রেখে র‌্যাঙ্কিং করে থাকে। প্রথমটি হলো একাডেমিক সুনাম (৩০ শতাংশ)। এটি মূলত বিশ্বের বড় বড় একাডেমিসিয়ানদের দৃষ্টিতে কোন বিশ্ববিদ্যালয়টির সুনাম সবচেয়ে বেশি সেটি নির্দেশ করে থাকে। পত্রিকা খুললেই দেখা যায় বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক সুনাম অর্জনের জন্য যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি সেই বিষয়গুলোই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।
মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্লেজাজিরম বা গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি করে খবরের শিরোনাম হন। এমনকি অনেক শিক্ষক আছেন যাদের পুরো পিএইচডি ডিগ্রিই নকল এমন খবরও পাওয়া যায় মিডিয়ার কল্যাণে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজে নানান ধরনের দুর্নীতির খবর তো আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই পত্রিকার পাতায়। এভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সুনাম আন্তর্জাতিক একাডেমিসিয়ানদের কাছে ক্ষুণ্ণ হয় ফলে ‘একাডেমিক সুনাম’ নামক মানদণ্ডে বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নম্বর কমে যায়, ছিটকে পড়ে র‌্যাঙ্কিং থেকে। দ্বিতীয় মানদণ্ডটি হলো স্নাতকরা কর্মক্ষেত্রে কতটা সুনাম অর্জন করতে পারছে (২০ শতাংশ)। এই মানদণ্ডটির দিকে তাকালে খুব অসহায় লাগে যে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেসব স্নাতক তৈরি করছে তার বেশিরভাগই বেকার। তাদের একাডেমিক যোগ্যতা অনুযায়ী তারা চাকরি পাচ্ছেন না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন উপযুক্ত যোগাযোগ দক্ষতা ও তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। এছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে দক্ষতা উন্নয়নের কোনো সুযোগই নেই। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনমুখী শিক্ষার চেয়ে তত্ত্বীয় শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। ফলে স্নাতকরা কর্মক্ষেত্রে গিয়ে ততটা সুনাম অর্জন করতে পারে না। তাইতো এই মানদণ্ডে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়ে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তৃতীয় মানদণ্ডটি হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত (১০ শতাংশ)। আমাদের দেশে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী অনুপাতে যে পরিমাণ শিক্ষক থাকা উচিত তার ধারেকাছেও নেই। এমনো বিভাগ আছে যেখানে একজনই মাত্র শিক্ষক দিয়ে পুরো বিভাগ চলছে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর। চতুর্থটি হলো আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক (১০ শতাংশ)। এই সূচকের মাধ্যমে দেখা হয় যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি কতটি বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গে রিসার্চ কোলাবোরেশন আছে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে অনেক পুরনো যেসব বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কিছু কোলাবোরেশন আছে তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষণা বিনিময় কার্যক্রম হয় খুবই কম। আর নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের তো এমন সুযোগই নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমওইউ সাইন করলেও পরে আর এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয় না বা খোঁজ নেয়া হয় না। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় প্রশাসনিক পদে পরিবর্তন আসলেই এগুলো ঢাকা পড়ে যায়। হারিয়ে যায় কালের অতল গহ্বরে। তাই এই মানদণ্ডে নম্বর দিতে গেলে একেবারে খুবই কম নম্বর দেয়া যায়। পঞ্চম সূচকটি হলো প্রতি গবেষণা পেপারে সাইটেশন সংখ্যা (১০ শতাংশ) ও প্রতিজন শিক্ষকের গবেষণা পেপার সংখ্যা (৫ শতাংশ)। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা হয় না বললেই চলে যেটুকু হয় তা শুধু নিয়ম রক্ষার্থেই হয়ে থাকে। আবার যারা যারা গবেষণা করছেন তাদের আর্টিকেলগুলো মানসম্পন্ন জার্নালে প্রকাশও হয় খুব কম। এ বছরের র‌্যাঙ্কিংয়ের দিকে তাকালেই বোঝা যায় এশিয়াভিত্তিক র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ থেকে ১১টি বিশ^বিদ্যালয় স্থান পেলেও সেখানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮টি। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একুশ শতকের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তালমিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সঠিক নেতৃত্ব নিশ্চিত হোক এই প্রত্যাশা। গবেষণায় বিশ্বমানের হোক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ এবং বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক এটাই আমাদের চাওয়া। যথাযথ কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক মানোন্নয়নে কাজ করবে বলে আমার প্রত্যাশা রইল।

ফিচার লেখক
[email protected]

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়