লড়ছে দেশ মানুষ বাঁচানোর প্রত্যয়ে

আগের সংবাদ

নাগরিক সেবা বাড়াতে হলে সমন্বয় জরুরি

পরের সংবাদ

রিনা আক্তারের কৃতিত্ব ও সমাজের খুঁতখুঁতানি মানসিকতা!

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১, ২০২০ , ১০:৫৬ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ১, ২০২০ , ১০:৫৬ অপরাহ্ণ
ড.-রাহমান-নাসির-উদ্দিন

আশার কথা হচ্ছে রিনা আক্তারের এ মহৎ কাজে নিয়মিতভাবে আর্থিক সাহায্য করেছে কিছু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এ শিক্ষার্থীরাই আশার আলো। সমাজের বিদ্যমান সব অন্ধকার ভেদ করে এ শিক্ষার্থীরাই পারবে আমাদের সমাজের বিদ্যমান জগদ্দল পাথরকে ভেঙে বা সরিয়ে নতুন সুপ্রভাতের জন্ম দিতে। আর সে সমাজের রিনা আক্তাররাই সম্মানিত হবেন মানুষের মর্যাদায়। এ রকম একটি মানবিক সমাজের প্রত্যাশা নিরন্তর।

বিবিসি প্রতি বছরের মতো এ বছরও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ১০০ নারীর তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে বাংলাদেশের দুজন নারীর নাম স্থান পেয়েছে। দুই ক্যাটাগরিতে এ নির্বাচন করা হয়; একটি হচ্ছে অনুপ্রেরণাদায়ী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং আরেকটি হচ্ছে প্রভাবশালী নারী হিসেবে। বাংলাদেশ থেকে শ্রেষ্ঠ অনুপ্রেরণাদায়ী নারী হিসেবে স্বীকৃতি পান রিনা আক্তার। কিন্তু তাকে নিয়ে দুয়েকটি পত্রিকায় কয়েকটি নিউজ আইটেম ছাড়া আর তেমন কোনো উচ্চবাচ্য নেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলো থেকে কোনো মোবারকবাদ নেই। তথাকথিত সুশীলদের কাছ থেকে তেমন কোনো বাহবা নেই। সংবাদপত্রে দুয়েকটা ব্যতিক্রম ছাড়া তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ-কলাম নেই। এটার কারণ কী? একটা কারণ হতে পারে, রিনা আক্তার একজন ভাসমান যৌনকর্মী এবং তিনি যে কাজের জন্য স্বীকৃতি পেয়েছেন, সেটা করোনাকালে ঢাকা শহরের যৌনকর্মীদের সেবা করার স্বীকৃতি হিসেবে। অথচ মানবসেবার এ রকম বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনের কারণে সমাজের সর্বত্র রিনা আক্তারকে নিয়ে আলোচনা হতে পারত, সমাজের অন্যদের অনুপ্রেরণা দেয়ার একটা উদাহারণ হিসেবে উদ্ধৃত হতে পারত, স্কুল-কলেজে এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন অনুপ্রেরণাদায়ী নারী হিসেবে আলোচিত হতে পারত, যা অন্যদেরও সমাজের প্রয়োজনে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করত। কিন্তু সেটা হয়নি। কারণ আমাদের সমাজে যৌনতা বিষয় আলোচনা এখনো একটা ‘ট্যাবু’ হিসেবে জারি আছে। যৌনতা, যৌনকর্মী এবং ‘সেক্সওয়ার্ক’ সমাজে এখনো নিষিদ্ধ আলোচনার বিষয়, যা ‘ভদ্র’ সমাজে উচ্চার্য নয়। এসবের আলোচনা এখনো পাইকারি হারে ‘অসভ্যতা’ হিসেবে বিবেচিত। আর এসব নিয়ে বাহাস করা তো নির্ভেজাল ‘বেয়াদবি’। যে সমাজে যৌন কর্মীদের ‘পতিতা’ (ধারণাটা এ রকম যে, মানুষ হিসেবে যার পতন হয়েছে অর্থাৎ যে আর মানুষের পর্যায়ে নেই!) তাকে নিয়ে উচ্চবাচ্য করা জাতিগত ‘বেয়াদবি’র শামিল। হয়তো তাই রিনা আক্তার পাদপ্রদীপের আলোয় আসেননি। মাঝখান নিয়ে রিমা সুলতানা রিমু, যিনি প্রভাবশালী নারী হিসেবে ১০০ জনের মধ্যে স্থান অর্জন করেছেন, এসব আদাব-বেয়াদবের করাতে কাটা পড়ে অনালোচিত। ‘একটা কিনলে একটা ফ্রি’র দেশে একজন গেলে আরেকজনও যায়। তাই খানিকটা ‘বেয়াদবি’ করার বাসনায় রিনা এবং রিমা দুজনকেই অনেক অনেক অভিনন্দন এবং মোবারক।

রিনা আক্তার বিবিসিকে বলেছেন, ‘মাত্র আট বছর বয়সে তার এক আত্মীয় তাকে পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়।’ দোষ কার রিনা আক্তারের নাকি সে আত্মীয়ের? এ আত্মীয় তো আমাদের সমাজের লোক! আমাদেরই পাড়া-প্রতিবেশী; স্বজন কিংবা পরিচিতজন। পতিতালয়েই বেড়ে উঠেন রিনা আক্তার এবং অনিবার্যভাবেই যৌনকর্মীতে পরিণত হন। এরপর থেকেই রিনা আক্তার পতিতালয়েই তার জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় পার করেন। কিন্তু রিনা আক্তার এখন অন্য যৌনকর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করেন। তিনি যৌনকর্মীদের সংগঠন ‘দুর্জন নারী সংঘ’র সাংগঠনিক সম্পাদক। এবং বিশ্বব্যাপী যৌনকর্মীদের সংগঠনগুলোর জোট ‘সেক্সওয়ার্কার নেটওয়ার্কের’ বাংলাদেশের সদস্য। করোনা মহামারিতে আমরা যখন একে অন্যের কাছ থেকে কত দূরে থাকা যায়, তার প্রতিযোগিতায় নেমেছি; যখন চেনাজনকে অচেনা বানানোর নানা প্রকৌশল আবিষ্কার নিয়ে মগজ ব্যয় করে নিত্য-আত্মপর হওয়ার কসরত করছি কিংবা ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ তত্ত¡ নিয়ে মশগুল থাকছি, রিনা আক্তার তখন প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪০০ যৌনকর্মীতে গত চার মাস ধরে নিয়মিতভাবে খাবার সরবরাহ করেছেন। রিনা আক্তারকে আমরা যারা ‘ছোট’ করে দেখি, তারা একবার আয়নায় নিজের চেহারা দেখি আর ভাবি আমরা মানুষ হিসেবে আদতে কতটা ছোট! রিনা আক্তার বিবিসিকে বলেছেন, ‘যৌনকর্মীরা যাতে ক্ষুধার্ত না থাকেন, আমি সেই চেষ্টায় করেছি। তাদের সন্তানরাও যেন এ কাজ করতে বাধ্য না হয়, সেই চেষ্টা করেছি।’ এই হচ্ছে রিনা আক্তার। বিবিসি অনুপ্রেরণাদায়ী এবং প্রভাবশালী যে ১০০ নারীর তালিকা তৈরি করেছে, তার মধ্যে রিনা আক্তারের অবস্থান ৬ নম্বরে। সে তালিকায় আরো আছেন অক্সফোর্ডের করোনা ভ্যাকসিন তৈরি মূল বিজ্ঞানী সারা গিলবার্ট, ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সান্না মারিন, পাকিস্তানের অভিনেত্রী মাহিরা খান, লেবাননের নারী আন্দোলনকর্মী প্রখ্যাত সাংবাদিক হায়াত মিশরাদ, ভারতের বিতর্কিত নাগরিক আইনের অগ্রগণ্য প্রতিবাদকারী বিলকিস বানু, ইথিওপিয়ার ফুটবলার লোজা আবেরা এবং মরোক্কোর র‌্যাপার হুদা আবুজ প্রমুখ। সুতরাং রিনা আক্তার আমাদের সবার জন্য নিঃসন্দেহে অসাধারণ এক অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারেন। কিন্তু আমাদের নাবালক জড়তা এবং বেহুদা হীনম্মন্যতা রিনা আক্তারের মতো দাহারণযোগ্য মানুষকে সামনে আনতে নানা ধরনের খুঁতখুঁতানির অবতারণা করে। এটা মনে রাখা জরুরি যে, পৃথিবীতে কেউ যৌনকর্মী হিসেবে জন্মায় না। বরঞ্চ জন্মের পর নানা সামাজিক-পারিবারিক-অর্থনৈতিক কারণে মানুষ যৌনকর্মীতে পরিণত হয়। সমাজে বিদ্যমান অসম ক্ষমতার সম্পর্ক, অর্থনৈতিক বৈষম্য, লৈঙ্গিক অসমতা এবং আধিপত্যবাদী পুরুষতান্ত্রিকতা জারি রেখে কেবল রিনা আক্তারদের মতো মানুষের অনুপ্রেরণাযোগ্য এবং উদাহরণযোগ্য কার্যক্রমকে মধ্যবিত্ত খুঁতখুঁতানি নিয়ে বিচার করা স্রেফ অনুচিত নয়, এটা আমাদের সমাজের এক ধরনের মানসিক বৈকল্যকেই প্রতিভাত করে। প্রকৃতপক্ষে রিনা আক্তাররাই আমাদের সমাজের এক একটা বাতিঘর, যা সমাজকে পথ দেখায়। নিজের সব ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্তে¡ও নিজের করণীয় থেকে এক পাও পিছু হঠেন না। বরঞ্চ অপ্রতিরোধ্য দায়িত্ববোধ থেকে সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ান সব ধরনের বাধা-বিপত্তিকে উপেক্ষা করে। তাই রিনা আক্তাররাই এ সমাজের জন্য সত্যিকার অনুপ্রেরণা। ধন্যবাদ বিবিসিকে আমাদের রিনা আক্তারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য। পাশাপাশি নিজেদেরও নতুন চেনার মওকা তৈরি করে দেয়ার জন্য।

পরিশেষে বলব, এটা একটি বেয়ারামদায়ক সত্য যে, আমাদের সমাজের মধ্যবিত্ত সেনসিটিভিটি একটা আজব জগদ্দল পাথর। এত ধাক্কা খায়, কিন্তু নড়ে না। এত তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়, কিন্তু ভাঙে না। এত উলট-পালট হয়, কিন্তু মচকায় না। ‘জাত গেল জাত গেল’ বলে বিলাপ করে। মধ্যবিত্তের কাজ হচ্ছে সমাজের বিদ্যমান নানা সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠিত নানা ধারণা এবং প্রচলিত বহুবিধ বিশ্বাসকে রক্ষা করা। যক্ষের ধনের মতো আঁকড়ে ধরা। এবং ‘সমাজ কী বলবে’ বলে সমাজের দোহাই দিয়ে সমাজের সংস্কারকে অটুট রাখা। যাকে কোনোভাবে টুটে না যায়। কিন্তু সমাজের নিরন্তর পরিবর্তনশীলতা ধারণ করার মধ্য দিয়েই সমাজের বিকাশ ঘটে। নিত্য নতুন ধারণা, বিশ্বাস এবং সংস্কৃতিকে বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থায় আত্মীকরণের মধ্য দিয়ে সমাজের ইতিবাচক রূপান্তর ঘটে। অন্যের সঙ্গে আদান-প্রদান এবং যৌক্তিক-বিজ্ঞানসম্মত বাহাসের ভেতর দিয়ে সমাজ বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হয়। পুরনো সবকিছু ফেলে দিতে হবে, তা নয়। কিন্তু পুরনোকে যদি নতুনের সঙ্গে ডাইলেক্টিকসের মধ্য দিয়ে মহব্বত ও মোকাবিলার একটা স্বাস্থ্যকর ডায়ালগ না তৈরি করা যায়, তাহলে সমাজের স্বাভাবিক বিকাশের পথ রুদ্ধ থেকে যাবে। তবে আশার কথা হচ্ছে রিনা আক্তারের এ মহৎ কাজে নিয়মিতভাবে আর্থিক সাহায্য করেছে কিছু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এ শিক্ষার্থীরাই আশার আলো। সমাজের বিদ্যমান সব অন্ধকার ভেদ করে এ শিক্ষার্থীরাই পারবে আমাদের সমাজের বিদ্যমান জগদ্দল পাথরকে ভেঙে বা সরিয়ে নতুন সুপ্রভাতের জন্ম দিতে। আর সে সমাজের রিনা আক্তাররাই সম্মানিত হবেন মানুষের মর্যাদায়। এ রকম একটি মানবিক সমাজের প্রত্যাশা নিরন্তর।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়