করোনা ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র সমাজতান্ত্রিক

আগের সংবাদ

কর সংস্কৃতির বিকাশ ও কর ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা

পরের সংবাদ

বিশ্বজয়ী বাঙালি নারীকে অভিবাদন

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৯, ২০২০ , ১০:৪৭ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৯, ২০২০ , ১০:৪৭ অপরাহ্ণ

কিছুদিন আগে ইসলামাবাদে পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী লেখকদের এক সভায় বাংলাদশের ভ‚য়সী প্রশংসার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে বয়স্ক এক ভদ্রলোক আমাদের নারী নেতৃত্বের উন্নতি শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা আর নারীদের কারণে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছিলেন বারবার। তিনি আমাদের মুদ্রায় মা-ছেলের বই পাঠ করার ছবিটিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, এখানেই বোঝা সম্ভব কেন বাংলাদেশ আজ পাকিস্তানকে পিছে ফেলে এগিয়ে চলেছে। তার কথার মূল বিষয় ছিল নারী উন্নয়ন ও তাদের অগ্রযাত্রার কারণেই বাংলাদেশ উপমহাদেশে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে। তার মুখে ফুল চন্দন পড়–ক। এ কথা সত্যি হলেও দেশে এক শ্রেণির ধর্মান্ধ উন্মাদ তা মানে না। তাদের সবকিছু একমুখী আর একপেশে। এরা ধর্মের নামে আচরণ ও সংস্কারকে বড় করে নিত্যনতুন ফতোয়া দেয়ার পাশাপাশি এখন লেগেছে ভাস্কর্য ধ্বংস করার চক্রান্তে।
দেশের বর্তমান অবস্থা বা বাইরে থেকে যেসব খবর আমরা পাই বা দেখি তাতে কিন্তু হতাশ হওয়ার বিকল্প নেই। হঠাৎ করে এক শ্রেণির উগ্র মানুষ চলে এসেছে লাইম লাইটে। এরা বঙ্গবন্ধুর কন্যার আমলে জাতির জনকের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলেছে। ভবিষ্যতে তা গুঁড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। এগুলো এড়িয়ে চলা বা পাত্তা না দেয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এদের আর কিছু থাক বা না থাক সমর্থক নামের বাহিনী আছে। যে বাহিনী বুঝে না বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়তে তৈরি। এদের দমন করা জরুরি হলেও সরকারি দলের গা ঝাড়া ভাব আর সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে ঘটনার জট বাড়ছেই। এ নিয়ে বেশি বলাটাও অনিরাপদ। আমার আজকের লেখার মূল বিষয়ও সেটা নয়, বলতে চাইছি নারী নেতৃত্ব আর নারী বিদ্বেষী এই শক্তি যেন যে কোনো অজুহাতে বলশালী হয়ে না ওঠে। একবার তা হতে পারলে এ দেশ ও সমাজের সব আশা-ভরসা যাবে রসাতলে। আজ মূর্তি বা ভাস্কর্য ভাঙার পেছনে আছে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের মূর্তি ভাঙা, তাদের ওপর হামলার ধারাবাহিকতা। তখন এদের আঁতুড়ঘরে বিনাশ করলে আজ তারা জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙার চিন্তা করত না। এবং এটা বলাই বাহুল্য, সুযোগ মিললেই তারা আসল এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নামবে আর তাদের প্রধান দুশমন আমাদের মা-বোনরা।
অথচ আমরা যদি ভালো করে তাকাই দেখব দেশের নারী শক্তি কিন্তু প্রকাশ্যে-গোপনে সবকিছুকে শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের নারীরা ফুটবল ক্রিকেটে আজ চমৎকার ভ‚মিকা রাখছে। এই যে পুরুষ ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান, তার কত খ্যাতি। তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক ক্রিকেটার। আমাদের এই অস্ট্রেলিয়ার নাক উঁচু সাদা মহলও তাকে জানে। চেনে এবং মানতে বাধ্য এ সময়কার সেরা অলারাউন্ডার সাকিব। কিন্তু এই যুবক একের পর এক অঘটনেরও জন্ম দেয়। ক’দিন আগে কলকাতা কেন্দ্রিক এক পূজায় বাতি জ্বালানো নিয়ে কী সব হৈচৈ। গেছে তো গেছে আবার তা অস্বীকার করার প্রচেষ্টা। সব মিলিয়ে কেমন জানি বীতশ্রদ্ধ হওয়ার মতো। অথচ আপনি হয়তো জানেনই না আমাদের এক কন্যা বা বোন মধ্যপ্রাচ্যের ক্রিকেট টুর্নামেন্টে ক্রমশ দীপ্তি ছড়িয়ে হয়ে উঠেছে সংবাদ শিরোনাম। কেন জানি না এই খবর ভাইরাল হয়নি। যেমন হয় না পরিশ্রমী নারীদের সংগ্রাম মেধাবী প্রচারবিমুখ পুরুষদের বেলায়ও এ কথা সত্য।

বিবিসি না জানালে আমি জানতাম না, চিনতামও না। একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন, একটি মেয়েকে আট বছর বয়সে নিষিদ্ধ এলাকায় বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। তারপর যা হয়… সে তার শরীর দিয়ে জীবন চালিয়ে বড় হতে বাধ্য হয়েছে। এটাই কি স্বাভাবিক ছিল না এই নারী থাকবে অন্ধকারে? তাকে মানুষ অকারণে ঘৃণা করবে, যারা তাকে চায় বা পেয়েছে তারাও তাকে দেখলে দূরে সরে যাবে। এটাই কি তার নিয়তি না সে হবে অস্পৃশ্য পরিত্যাজ্য? কিন্তু সবার মনোবল ও জীবন কি এক? এই মেয়ে যত নারীতে পরিণত হয়েছে তত তার তেজ ও শক্তি পরিণতি লাভ করেছে। এই কঠিন করোনাকালে গড়ে ৪শ-এর মতো নিষিদ্ধ এলাকার নারীদের খাবার জোগান তিনি। ডিম, ভাত, সবজি, মাছ ও মাংস দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন খদ্দেরবিহীন অসহায় নারীদের। তাদের সন্তানদের পড়ালেখা শেখানোর কাজও করেন।
করোনার সময়কালে সবাই যখন নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত প্রাণ বাঁচাতে একা থাকছেন তখন এই নারী সামনে এসে না দাঁড়ালে পতিতা বলে পরিচিত আমাদের সমাজের একটি অংশের কী হতো ভাবাও কঠিন। কে তাদের খাদ্য জোগাত? এমন করে কেউ কি ভেবেছে? এই যে এত সামাজিক সংগঠন, এত নেতা-উপনেতা, এত পাতি নেতা, কোটি কোটি হাজার কোটির গল্প কারো মনে কি রহম হয়েছিল একটুকু? এমন সাহসী উদার মনের নারীকে আমরা চিনতাম না, জানতামও না। ধন্য আমাদের চলমান ভিজুয়াল মিডিয়া চোর, বাটপার, ডাকাত, দস্যুদের জন্য তারা সময় দেয় রোজ, তাদের খবর প্রচার করে, এন্টি হিরোদের হিরো করে তোলে কিন্তু এই রীনা আক্তারকে চেনে না।
তার মতে, সন্তান যদি শুধু মায়ের পরিচয়ে বড় হয় এই হতভাগ্য মায়েদের অভাগা সন্তানরাও মানুষের মতো বাঁচতে পারবে। প্রচলিত আইন ও সমাজ এখনো তা মানতে নারাজ। হয়তো একদিন তা মানতে বাধ্য হব আমরা। কিন্তু ভেবে দেখুন কি অসাধারণ আর সুদূরপ্রসারী যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন তিনি। আজ আইনজীবী বিচারকরা পুরুষতন্ত্র ও সমাজের দোহাই দিয়ে এই যুক্তি এড়িয়ে গেলেও একদিন রীনা আক্তারের কথাই সত্য হবে। সন্তানের পরিচয় হবে মায়ের নামে। যা আধুনিক উন্নত বিশ্বে এখন চালু ও আইনসিদ্ধ।
এর মনোবল ও দৃঢ়তা আমি-আপনি না জানলেও দুনিয়া জেনে গেছে। যে কোনো মহৎ কাজ ফুলের মতো নিজের সুরভি ছড়ায়। তাই বিবিসি তাকে পৃথিবীর শক্তিময়ী পাওয়ারফুল ১০০ নারীতে জায়গা দিয়েছে, দিয়ে তার পাশাপাশি নিজেরাও সম্মানিত হয়েছে। আমি যখন এই খবরটি পেলাম আমার বারবার মনে পড়ছিল রবীন্দ্রনাথের গানের কলি। আমাদের জাতীয় সংগীতে আছে : আমি নয়ন জলে ভাসি।
বাংলাদেশের কথিত পতিতা পল্লীর পবিত্র আত্মা রীনা আক্তার আপনাকে স্যালুট। বিনম্র শ্রদ্ধা। আপনার এই বিশ্ব সেরা ১০০ নারী হওয়ার সম্মান ও গৌরব বাঙালি বাংলাদেশকে আরো একবার পবিত্র করে দিল। আপনি যদি জননী না হবেন তো কে তবে ধাত্রী?
রীনা আক্তার আপনাকে আমি দেখিনি, চিনিও না। আজ পুরো বিশ্বের বাঙালির হয়ে আপনাকে জানাই অভিবাদন।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়