ভার্চুয়ালে গণমাধ্যমের অ্যাকচুয়াল সর্বনাশ

আগের সংবাদ

বিদায় আলী যাকের

পরের সংবাদ

আমার স্মৃতিতে আমার বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৮, ২০২০ , ১০:৩৮ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৮, ২০২০ , ১০:৩৮ অপরাহ্ণ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করার রেওয়াজ আছে; আমার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, এখনো রয়েছে, মাতৃসম। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান আমাকে এমন স্নেহে এবং এতটা সময় ধরে শেখায়নি। সময়টাও কিন্তু বেশ দীর্ঘ। বিশ্ববিদ্যালয় একশ বছরে পা রাখছে, আমার সঙ্গে এর সম্পর্ক ৬৮ বছরের। এসেছিলাম সেই ১৯৫২-তে, তারপরে প্রথম চার বছর ছাত্র এবং অনেক বছর শিক্ষক হিসেবে কাটিয়েছি; এখনো রয়ে গেছি। সবটা সময়ই কিন্তু ছিল শেখার, সে শেখার এখনো শেষ হয়নি। শিখেছি ক্লাস রুমে, গ্রন্থাগারে, শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে সম্পর্কে এবং সহপাঠীদের সান্নিধ্যে। প্রথম বছরেই আমি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র সংসদের নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলাম, নির্বাচিতও হয়েছিলাম; পরের তিন বছর প্রত্যেকটি নির্বাচনে আমার অংশগ্রহণ ছিল। আবার শিক্ষক হিসেবে ৯ বছর আমি ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ ছিলাম। সামাজিকতার শিক্ষাটা যে কত জরুরি ও উপকারী সেটা আমি বুঝেছি ছাত্রসংসদের সঙ্গে ওই সংযোগ থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন কিন্তু অপূর্ণ থাকে ছাত্রসংসদ কাজ না করলে। সামাজিকতা শেখার আরেকটি জায়গা ছিল। সেটা হলো সাবসিডিয়ারি ক্লাস। অনার্স ক্লাসে আমরা ছিলাম মাত্র ১২ জন; পলিটিক্যাল সায়েন্সের সাবসিডিয়ারিতে কমপক্ষে ৬০ জন হবে। সেখানে অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব। সে বন্ধুত্ব পরের দিনগুলোতেও অক্ষুণ্ণ ছিল।
আমার জন্য মস্ত বড় আকর্ষণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল গ্রন্থাগারটি। ছাত্রজীবনে গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষ পর্যন্ত ছিল আমার দৌড়, তার ভেতরের জগৎটা ছিল অনধিগম্য ও অতীব আকর্ষণীয়। শিক্ষক হিসেবে গ্রন্থাগারে অবাধ বিচরণের সুযোগ আমাকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছে এবং আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চেয়েছি তার একটা কারণ ছিল ওই গ্রন্থাগার।
শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল দুটি বৈশিষ্ট্য। একটি তার আবাসিক চরিত্র, অন্যটি তিন বছরের অনার্স কোর্স। আবাসিক হলগুলোকে জীবন্ত রাখত ছাত্রসংসদের বার্ষিক নির্বাচন এবং বছরজুড়ে সংসদের সাংস্কৃতিক কাজকর্ম। দ্বিতীয় বর্ষে দুটো সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা দিয়ে আমরা ভারমুক্ত হতাম, পরের বছর পুরোপুরি এবং কেবলই অনার্সের বইপত্র পড়া। ওই তৃতীয় বর্ষে নতুন যা পড়েছি সেসব তো বটেই, আগের দুবছরে যা পড়েছিলাম তাও পুনর্পাঠ ঘটত। অনার্সের পাঠ্যবিষয়টা একসঙ্গে পেতাম। সে ব্যবস্থাটা কিন্তু এখন আর নেই। কোর্স ও সেমিস্টার সিস্টেম এসে তিন বছরের সংবদ্ধ শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। এখনকার ছেলেমেয়েরা তৃতীয় বর্ষে আসে প্রথম দুই বছরের বইপত্র ও কাগজখাতা দূরে সরিয়ে রেখে। অনভ্যাসে বিদ্যালয়ের আশঙ্কা দেখা দেয়। আমাদের সময়ে টিউটরিয়ালের ব্যবস্থা ছিল। চার-পাঁচজনের গ্রæপে একজন শিক্ষকের সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে একবার মিলিত হতাম। সেখানে আমরা লিখতাম, বলতাম এবং শুনতাম। তিনটাই ছিল খুব উপকারী। এখন তাও গেছে চলে। এ ভাঙচুরটা কিন্তু শিক্ষাগত বিবেচনায় ঘটেনি, ঘটেছে রাজনৈতিক কারণে। রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল দুবছর পেরিয়ে সাবসিডিয়ারি এবং তিন বছরের শেষে অনার্সের পরীক্ষার বদলে ৬ মাস পর পর পরীক্ষা নেয়া হবে, ছেলেমেয়েরা পরীক্ষার দুশ্চিন্তায় অস্থির থাকবে, ঘাড় তুলবার সময় পাবে না; তারা রাজনীতি ছাড়বে। ওই একই কারণে ছাত্রসংসদের নির্বাচনও এক সময়ে বন্ধ হয়ে গেল। ফলটা শুভ হয়নি। শিক্ষার জন্য নয়, সমাজের জন্যও নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বারবার ঘটেছে। বড় আকারে ঘটে ১৯৫২-তে, অবিশ্বাস্য রকমের ভয়াবহ মাত্রায় ঘটেছে ১৯৭১-এ। দুটি ঘটনারই আমি প্রত্যক্ষদর্শী। বায়ান্নর একুশে ফেব্রæয়ারিতে পুরনো কলাভবনের আমতলার জমায়েতে আমিও ছিলাম; কাঁদানে গ্যাসের মোকাবিলায় সেটিই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। আবার একাত্তরে ২৫ মার্চের রাতেও আমি উপস্থিত, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দা হিসেবে। রাষ্ট্র অস্ত্র হাতে আক্রমণ করল, রক্তপাত ঘটাল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হলো। পরাজয় দুবারই। এবং বিশ্ববিদ্যালয় যে শক্তির প্রতিভূ তার কাছেই।

বায়ান্নর শেষদিকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন নতুন স্বাধীনতার এবং পাকিস্তানবাদিতার আবহাওয়াটা যে একেবারে কেটে গেছে তা নয়। রাষ্ট্রকে ভাঙার কথাও ওঠেনি। দাবিটা ছিল বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার। ঘটনার কয়েক বছর পরে আমাদের শিক্ষক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন একটি প্রবন্ধে ভাষা আন্দোলনকে ‘ল্যাঙ্গুয়েজ রায়ট’ বলেছিলেন। এই মনোভাবটি তার একার নয়, অন্য কারো কারো মধ্যেও ছিল। আবার যে জায়গাটাতে পুলিশের গুলিতে বরকত শহীদ হলেন তার কাছেই, দশ বছর আগে নাজির আহমদ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র প্রাণ হারিয়েছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাত্রদের ছুরিকাঘাতে। সেই স্মৃতি যে একেবারে মুছে গিয়েছিল তাও নয়; কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদ দ্রæত এগুচ্ছিল। মুনীর চৌধুরী আমাদের বিভাগের শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু ক্লাসরুমে তাকে আমরা পেলাম না, কারণ তখন তিনি জেলে। তার অপরাধ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তার সম্পর্ক। জেলে থাকা অবস্থায় তিনি বাংলা সাহিত্যে এমএ পরীক্ষা দিয়ে খুব ভালো ফল করলেন এবং যখন বের হয়ে এলেন তখন আর ইংরেজি বিভাগে রইলেনই না, বাংলা বিভাগে চলে গেলেন। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না যে বাঙালি জাতীয়তাবাদই মূলধারায় পরিণত হবে। আমাদের শিক্ষক খান সারওয়ার মুর্শিদ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ইংল্যান্ডে যাবার; তার সঙ্গে ড. সাজ্জাদ হোসায়েনের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল; ইংল্যান্ডে তারা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং একই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ডক্টরেট করেছেন। দুজনই পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী ছিলেন, এক সময়ে যেটা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা গেল তারা পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন; কারণ ড. হোসায়েন পাকিস্তানপন্থিই রয়ে গেলেন, ড. মুর্শিদ এগিয়ে গেলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের দিকে। শেষ পর্যন্ত দুজনের ভেতর কথাবার্তাই বন্ধ হয়ে গেল। একই ঘটনা ঘটেছিল ড. হোসায়েনের সঙ্গে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সম্পর্কের বেলাতেও। অধ্যাপক রাজ্জাক যখন শিক্ষক, ড. হোসায়েন তখন ছাত্র। এক সময়ে দুজনেই ছিলেন পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী, তাদের সম্পর্কটাও ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ; কিন্তু ১৯৬৫-এর যুদ্ধের পর সে সম্পর্কটা আর রইল না, ওই জাতীয়তাবাদের প্রশ্নেই।
আইয়ুব খানের শাসনামলে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকে পোক্ত করার চেষ্টা নিরন্তর চলছিল। এ কাজে রাষ্ট্রক্ষমতা যত তৎপর হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্তি ততই বেড়েছে। আইয়ুব খান আরেক কাণ্ড করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি সরকারি দপ্তরে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তার সামরিক শাসনের শুরুতেই ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি হামুদুর রহমানকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করে বসিয়ে দিয়েছিলেন। এই উপাচার্য হুকুম জারি করেছিলেন ক্লাস থাকুক না থাকুক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দশটা-পাঁচটা অফিস করতে হবে। সে সময়ে কলা অনুষদের ডিন ছিলেন অধ্যাপক আবদুল হালিম, তিনি উপাচার্যকে গিয়ে বললেন, দশটা-পাঁচটার জোয়ালে আটক থাকলে শিক্ষকরা নিজেদের পড়াশোনা ও গবেষণা করবেন কখন? উপাচার্য তাকে বলেছিলেন, ‘পড়াশোনা করছেন বলেই তো আপনাদের চাকরি দেয়া হয়েছে, আবার কি?’ উপাচার্যের ওই হুকুম প্রচুর হাস্যরসের সৃষ্টি করেছিল এবং অবশ্যই তার হুকুম বহাল থাকেনি; কিন্তু এর রাষ্ট্রের সামরিক শাসকরা যা করেছিল সেটা ছিল আরো মারাত্মক। তারা এমন একটি আইন জারি করল যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বলতে কোনো কিছু আর অবশিষ্ট রইল না। এটা শুধু যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জারি করা হয়েছিল তা নয়, পাকিস্তানের সব বিশ্ববিদ্যালয়েই একই রকম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। স্বভাবতই প্রতিবাদ হয়েছে এবং সেটা পাকিস্তান জুড়েই। তাই দেখা গেছে ছাত্ররা যখন আইয়ুব শাহীর পতন চেয়ে আন্দোলন করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও তখন আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার ব্যাপারে স্বাধীনতার জন্য। সেই স্বাধীনতা পাওয়া গেল বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হওয়ার পর, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন একটা অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে। আমরা ভাবলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা যাবে। উপাচার্য, ডিন, সিন্ডিকেট, সিনেট সর্বত্রই নির্বাচনের বিধি তৈরি হলো।
কিন্তু দেশে যেমন, বিশ্ববিদ্যালয়েও তেমনি, গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়নি। আমরা আশা করছিলাম গণতন্ত্রের চর্চার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় হবে অগ্রপথিক, সেটা ঘটল না। অভিযোগ আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বড় বেশি দলাদলি করেন। কথাটা অর্ধসত্য মাত্র। নির্বাচনী ব্যবস্থা আছে, একা একা নির্বাচন করা যায় না, তাই নির্বাচনী জোট তৈরি হয়েছে; ভিত্তিটা ছিল মতাদর্শগত ভিন্নতা। সেটা কোনো খারাপ ব্যাপার নয়। শিক্ষকতা কখনোই তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে ছাত্রদের মধ্যে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হননি। নির্বাচন ব্যবস্থার ফলে দুটি ভালো জিনিস পাওয়া গিয়েছিল, একটি হলো শিক্ষকদের ভেতর পরিচিতি গড়ে তোলা। দ্বিতীয়টি এই বোধ তৈরি হচ্ছিল যে, শিক্ষকদের ভেতর জ্ঞান ও বয়সের পার্থক্য অবশ্যই সত্য কিন্তু এটাও সত্য যে শিক্ষক হিসেবে তারা একই সমতলে রয়েছেন। এক কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন অধ্যাদেশ আমাদের সামন্তবাদী সংস্কৃতির বলয় থেকে বের হয়ে গণতন্ত্রের প্রশস্ত ক্ষেত্রে আসার সুযোগ করে দিয়েছিল। গণতন্ত্রের সুফল যে পুরোপুরি পাওয়া যায়নি তার দায় গণতন্ত্রের নয়, দায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের। ঘটনাটা আমরা ঘটতে দেখলাম, কিন্তু থামাতে পারলাম না। এক সময়ে দেখা গেল সাদা ও নীল উভয় গোষ্ঠীর কিছু শিক্ষক বড় দুই রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। রাজনৈতিক নেতাদেরও আগ্রহ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভেতরে সমর্থক জোগাড় করার। এভাবেই বাইরের দলীয় রাজনীতিটা চলে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভেতরে। ক্ষুণ্ণ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের দেয়া ‘কনসেশন’ হিসেবে; শাসক বদল হয়েছে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন হয়নি।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়