শ্রীনগর ফুটওভার ব্রিজের দাবীত মানববন্ধন

আগের সংবাদ

হাতিয়ায় ছাত্রদলের পদবঞ্চিতদের ঝাডু মিছিল

পরের সংবাদ

ভিন্ন এক শেঠ

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৭, ২০২০ , ৮:২৮ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৭, ২০২০ , ৮:২৮ অপরাহ্ণ

প্রায় সব ধর্মেই শেঠ নামযুক্ত মানুষ পাওয়া যাওয়ার একটি প্রধান কারণ হচ্ছে আদি পিতা-মাতা অ্যাডাম ও ইভের তৃতীয় পুত্রের নাম শেঠ এবং তাকে নবী হিসেবে সম্মান করা হয়েছে। আবেলের হাতে যখন কিয়ান নিহত হন এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে ইভ গর্ভবতী হন এবং শেঠের জন্ম দেন। তিনি সব ধর্মেই বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন। লেবাবনের একটি গ্রামের নাম আল-নবী শেঠ এবং সেখানকার একটি সমাধিকে তার সমাধি বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ইরাকেও নবী শেঠের একটি স্মৃতিসৌধ ছিল, তা ২৬ জুলাই ২০১৪ ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এন্ড সিরিয়ার (আইএসআইএস) যোদ্ধারা গুঁড়িয়ে দেয়। একালের একজন বেস্টসেলিং লেখকের নাম শেঠ গোডিন। বিক্রম শেঠ ইংরেজি ভাষার বিখ্যাত ভারতীয় লেখক।
বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জগৎ শেঠের নাম, জগৎ শেঠ নামের মানে জগতের ব্যাঙ্কার এবং বাস্তবেও তাই। তবুও মীর জাফরের পরের কাতারে যাদের নাম উচ্চারিত হয় শুরুতেই আসে জগৎ শেঠের নাম।
এই রচনার ভিন্ন এক শেঠকে নিয়ে, তিনি করোনাকালে ভাইরাস সংক্রমণে প্রয়াত বিচারপতি ওয়াকার আহমেদ শেঠ। তিনি পাকিস্তানের পেশোয়ার হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস পদে আসীন থাকাকালে ২২ অক্টোবর পজিটিভ শনাক্ত হন এবং ১২ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতির নাম অনেকেই জানেন না, তারা জাস্টিস ওয়াকার শেঠের নাম জানেন। তিনি তার কীর্তি দিয়ে এই বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন।
তিনি ‘অতি রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ (ঐরময ঞৎবধংড়হ)-এর মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফকে ফাঁসির দণ্ড দিয়েছেন। তিন সদস্যের বিচারক প্যানেলের তিনিই ছিলেন প্রধান। অপর দুজন হচ্ছেন লাহোর হাইকোর্টের বিচারক শহীদ করিম এবং সিন্ধু হাইকোর্টের বিচারক নজর আকবর।
পাকিস্তানের রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থায় সামরিক অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ নতুন কিছু নয়। ১৯৫৮ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করার অনেক আগে একজন ব্রিগেডিয়ার যে ক্ষমতায় বসতে চেয়েছেন এবং আইয়ুব খানের হাতেই ধরা পড়েছেন সে বিবরণ তারিক আলীর ক্যান পাকিস্তান সারভাইভ গ্রন্থে কেউ কেউ নিশ্চয়ই পড়েছেন। আইয়ুব তাকে ধরে আটক করে বলেছেন : টেল মি দ্য ট্রুথ, অর আই উইল স্ট্রিঙ্গ ইউ আপসাইড ডাউন। সত্যটা বলো নতুবা ঠ্যাং উপরে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখব। তারপর কিছু নসিহত করে সুযোগটা নিজেই গ্রহণ করার জন্য ঘাপটি মেরে বসেছিলেন।
১৯৫৮-এর অক্টোবরে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ইস্কান্দার মির্জাকে বিলেতগামী উড়োজাহাজে তুলে দিয়ে বললেন, সময় হলে আপনাকে আবার উড়োজাহাজ পাঠিয়ে নিয়ে এসে তখতে কাউসে বসাব। তিনি প্রতীক্ষায় ছিলেন, জাহাজ আর আসেনি, প্রতীক্ষা করতে করতে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর এমনকি তার মৃতদেহও পাকিস্তানে সমাহিত হতে দেয়া হয়নি।
ইস্কান্দার মির্জাকে খবর না দিয়ে তিনি নিজেই ক্ষমতা দখল করলেন। বিচারপতি কায়ানি বললেন, পাকিস্তানের বীর সৈনিকরা নিজেদের মাতৃভ‚মি দখল করে নিয়েছে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব ডকট্রিন অব নেসেসিটির আওতায় এই ক্ষমতা দখলকে জায়েজ ঘোষণা করলেন। প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ মুনীর এমনকি ১৯৫৪ সালের জরুরি আইন জারিকেও ব্র্যাকটনের ম্যাক্সিম (হেনরি ডি ব্যাকটন, ১২১০-১২৬৮) দিয়ে জায়েজ করেছেন, পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতিরা এ কাজে অভ্যন্ত হয়ে উঠেছেন, অন্য দেশের বিচারপতিদেরও প্রভাবিত করতে পেরেছেন, বাংলাদেশের কথা বাদই থাক।
যে প্রক্রিয়ায় আইয়ুব খান জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে অপসারণ করেছেন, তার আন্ডার কমান্ড অফিসাররা তা ভালোই শিখে নেন। কাছাকাছি একটি পথ অনুসরণ করে জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাকে সরিয়ে ক্ষমতা নিয়ে নিলেন। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত আমাদের দেখতে ও সইতে হয়েছে। পাকিস্তানের বীর সৈনিকরা একদা যা নিজ দেশ ছিল সেখানেই আত্মসমর্পণ করে, এমন অগৌরবের পরাজয়ের নজির বেশি নেই। তারপর জেনারেল জিয়াউল হক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করলেন এবং তারই একগুঁয়েমির কারণে ১৯৭১-এর প্রধান ষড়যন্ত্রকারী জুলফিকার আলী ভুট্টো ফাঁসিতে ঝুলে প্রাণ হারান। জিয়াউল হক প্রাণ হারান আমের ঝুড়িতে লুকোনো বোমা বিস্ফোরণে পাকিস্তানেরই আকাশে। এ নিয়ে মোহাম্মদ হানিফের ‘এ কেইস অব এক্সপ্লোডেড ম্যাঙ্গোজ’ বইটিও নিশ্চয়ই অনেকেরই পড়ার সুযোগ হয়েছে। একাত্তরে গণহত্যা ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরাজয়ের অভ্যন্তরীণ সাক্ষী ব্রিগেডিয়ার (পরবর্তী সময়) সিদ্দিক সালিকও সেই উড়োজাহাজ বিস্ফোরণে নিহত হন। তারই বই উইটনেস টু সারেন্ডার।
কিছুকাল পর আবার সামরিক অভ্যুত্থান। এবার জেনারেল পারভেজ মুশাররফ। তার আগের অভ্যুত্থানকারীরা ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’র অজুহাতে বৈধতা পেয়ে গেছেন। বৈধতা গ্রহণের কাজটা ক্ষমতায় থাকতেই সেরে নিতে হয়। পারভেজ মুশাররফের ভাগ্য মন্দ। জরুরি অবস্থা জারি করা এবং সংবিধান রহিত করাকে ‘হাই ট্রিজন’ হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং ওয়াকার আহমেদ শেঠের নেতৃত্বাধীন বিচারক প্যানেল তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে।
যেন মৃত্যুদণ্ডই যথেষ্ট নয়, রায়ে লেখা হলো : আমরা আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশ দিচ্ছি তারা যেন পলাতক এই দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে আইন অনুযায়ী সাজা প্রদানের ব্যবস্থা করে, আর যদি তাকে মৃত পাওয়া যায় তাকে ইসলামাবাদের ডি-চকে টেনেহিঁচড়ে এনে তিনদিন ঝুলিয়ে রাখা হয়। ডি-চক মানে ডেমোক্রেসি চক, গণতন্ত্র চত্বর। কায়রোর তাহিরি স্কোয়ারের মতো আন্দোলনের অনেক চত্বর সৃষ্টি হয়েছে। ডি-চক আন্দোলন ও জনসমাগমের উপযুক্ত জায়গাÑ একপাশে জিন্নাহ এভিনিউ এবং কনস্টিটিউশন এভিনিউ। রায়ের এই অংশটুকু অবশ্যই ওয়াকার আহমেদ শেঠ লিখিত বলেই মনে করা হয়। রায়টি ছিল বিভাজিত। সিন্ধু হাইকোর্টের বিচারক নজর আকবর এই রায়ের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন।
এই রায়ে বিচারকের জুডিসিয়াল মাইন্ড কতটা প্রয়োগ করা হয়েছে আর কতটা ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানো হয়েছে এ নিয়ে প্রশ্ন তখনই উঠেছে। এই রায়ের পরপরই পারভেজ মুশাররফ বর্তমান বাহিনীর অপছন্দের হলেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে তাও লক্ষণীয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইন্টার-সার্ভিস পাবলিক রিলেশনসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আসিফ গফুর স্বাক্ষরিত প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে : এই রায়ে সেনাবাহিনীর সব কর্মকর্তা ও সৈনিকদের মধ্যে দুঃখ ও যাতনার সৃষ্টি হয়েছে। যিনি ৪০ বছর ধরে দেশের সেবা করেছেন এবং দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, অথচ এখানে তাকে দেশদ্রোহী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শরিক দল পাকিস্তান তেহরিখ-ই-ইনসাফ থেকে যোগদান করা মন্ত্রী ফেরদৌস আসিফ আওয়ান ও পাকিস্তানের অ্যাটর্নি জেনারেলও রায়ের সমালোচনা করেছেন। এদিকে যারা পারভেজ মুশাররফকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন তাদেরও বিচারের আওতায় আনার জন্য ওয়াকার শেঠের রায়ে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
১৭ ডিসেম্বর ২০১৯ প্রদান করা রায় নিয়ে তার পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক বাদানুবাদ হয়েছে। তারপরও সামরিক আদালতের যেসব মামলার আপিল শুনানি পেশোয়ার হাইকোর্টে তার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে হয়েছে সেগুলোর মধ্যে ৭৪টি শাস্তির মামলা, যার মধ্যে ৫০টি ছিল মৃত্যুদণ্ডের সাজা- তিনি নাকচ করে দিয়ে সামরিক আদালতের অসাড়তা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
মৃত্যুর পর গত ক’দিনে তিনি বহুল প্রশংসিত হয়েছেন, কেউ কেউ তাকে পাকিস্তানের উচ্চ আদালতের প্রকৃত স্বাধীন ও সাহসী বিচারক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাকে অন্যতম সেরা মানবাধিকার বাস্তবায়নকারীও বলা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় সরকার কার্যত তাদের দলবিরোধী যেসব ব্যক্তিকে আটক রেখেছে তিনি প্রমাণহীনতার কারণে তাদের সবাইকেই অব্যাহতি দেন। সেনাবাহিনীর গোপন আটককেন্দ্রের ওপর আইনি আঘাত করেন বলে বিবিসি মন্তব্য করে। তার রায়ে যুগপৎ সরকার ও সেনাবাহিনী নাখোশ হতে থাকে।
এটাও বলা হয় যে, তার অনমনীয়তার খেসারত তাকে দিতে হয়েছে। তাকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি করা হয়নি। পারভেজ মুশাররফের রায় নিয়ে বলা হয়, ১৯৪৭-এ পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর এই প্রথম এত বড় পদের একজন সামরিক কর্তাকে দেশদ্রোহী চিহ্নিত করে বিচার করা হলো। এই রায়ের বিশেষ অংশের জন্য ওয়াকার আহমেদ শেঠের বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠনেরও আলোচনা হয়। তার রায় পাকিস্তান সরকারের জন্য আরো বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে কারণ ইমরান খান মন্ত্রিপরিষদের সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইজাজ শাহ ছিলেন পারভেজ মুশাররফের সময়কার গোয়েন্দা প্রধান এবং আইনমন্ত্রী ফারুখ নাসিম ছিলেন পারভেজ মুশাররফের আইনজীবী।
পারভেজ মুশাররফ মৃত হলে তার লাশ তিনদিন ঝুলিয়ে রাখার আদেশটি উপলক্ষ করে বিচারকের মানসিক সুস্থতার প্রশ্ন তুলে বিরোধীরা জাজদের মানসিক পরীক্ষা গ্রহণের দাবি জানান এবং তাকে বরখাস্ত করার জন্য পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি আসিফ সায়িদ খোসার প্রতি আহ্বান জানান। অন্যদিকে আদালত নিয়ে অনভিপ্রেত মন্তব্যের জন্য আদালত অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পরামর্শও দেয়া হয়।
এতে কোনো সন্দেহ নেই সরকারের সঙ্গে আঁতাত না করে সাবেক সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফের পক্ষে দেশ ছাড়া সম্ভব ছিল না। কাজেই এই রায় সরকারকেও সম্পৃক্ত করে।
করোনা ভাইরাস সংক্রমণের এই দুঃসময়ে বিচারপতি আকবর আহমেদ শেঠের মৃত্যু স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষতির কারণ হয়েছে। তার জন্ম ১৬ মার্চ ১৯৬১ ডেরা ইসমাইল খান জেলাতে। তিনি পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট ছিলেন। ২০১১-তে বিচার বিভাগে যোগ দেন এবং ২০১৮-এর জুনে পেশোয়ার হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হন। সুপ্রিম কোর্টে আপিল আদালতে তার রায়ের পরিণতি যা-ই হোক, তার রায় রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য একটি বার্তা।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়