জীবিত কাউন্সিলর প্রার্থী ভোটার তালিকায় মৃত

আগের সংবাদ

নিখোঁজের ৩ দিন পর শিশুর লাশ উদ্ধার

পরের সংবাদ

নান্দনিক স্থাপত্যশিল্পের কবি

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৭, ২০২০ , ৪:২১ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৭, ২০২০ , ৪:২১ অপরাহ্ণ

কবি রবিউল হুসাইন পেশায় ছিলেন স্থাপত্যশিল্পী। তার নেশা ছিল বহুমাত্রিক। তিনি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও স্থাপত্যশিল্পের বহু বিষয় নিয়ে লিখতেন। সময় পেলেই নান্দনিক ছবি আঁকতেন। একজন সংগঠক হিসেবেও তার সুনাম রয়েছে সফল নেতৃত্বের কারণে। তার প্রত্যেকটি পরিচয় ও শিল্প একটি অন্যটিকে অতিক্রম করে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রামে তিনি ছিলেন অগ্রগামী একজন মানুষ। মনেপ্রাণে বাংলাদেশকে তিনি ভালোবাসতেন, ধারণ করতেন চিত্তে। দেশের বাইরেও তার সৃষ্টিশীল কাজের পরিধি রয়েছে। স্থাপত্য বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন এবং সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন সময়ে।

রবিউল হুসাইনের মৃত্যুতে শোকবার্তায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন :
‘দেশ ও জাতি একজন বহুমুখী গুণের অধিকারী দেশপ্রেমিক বরেণ্য ব্যক্তিকে হারালো। তিনি একাধারে স্থপতি, কবি, শিল্প-সমালোচক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী ছিলেন। পেশা স্থাপত্যশিল্প হলেও তার সম্পৃক্ততা ছিল বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষক রবিউল হুসাইন স্বীয় কর্মের মাধ্যমে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’ (২৬ নভেম্বর, ২০১৯, চ্যানেল আই অনলাইন।)

স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাস-ঐতিহ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রচার, প্রকাশনা, স্থাপনা ও স্থাপত্যশিল্পে অবদান রেখেছেন যে কয়জন কীর্তিমান মানুষ তার মধ্যে স্থপতি রবিউল হুসাইন অন্যতম। তার পরিকল্পনা ও নকশায় তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যশিল্প। যেগুলো বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের ইতিহাস বহন করে। যা হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালির ইতিহাসের দীপ্ত চেতনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের পথ দেখায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় মুক্তি ও স্বাধীনতা তোরণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ভাসানী হল, বঙ্গবন্ধু হল, শেখ হাসিনা হল, খালেদা জিয়া হল, ওয়াজেদ মিয়া সায়েন্স কমপ্লেক্স, চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যালয়ের অডিটোরিয়াম ও একাডেমিক ভবন, বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিসার্স ভবন (বিএআরসি) উল্লেখযোগ্য।
স্থপতি রবিউল হুসাইনের প্রয়াণে বরেণ্য চিত্রশিল্পী হাশেম খান মন্তব্য করেছেন,
‘আমার সঙ্গে তার ছিল ৪০ বছরের সম্পর্ক। আমরা একসঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, ঢাকা নগর জাদুঘর, বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা জাদুঘরের কাজ করেছি। রবিউল হুসাইন চিত্রকলা নিয়ে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে মন্তব্য করতেন। তিনি কত বড় স্থপতি, সংগঠক, কবি, সে কথা বলব না, বলব তিনি ভালো মানুষ ছিলেন। তার পাশাপাশি থেকেছি। তার সঙ্গী হয়েছি। তার কাছ থেকে আমি নিয়েছি, তিনি আমার কাছ থেকে নিয়েছেন। আমরা একে অপরের পরিপূরক ছিলাম। আমি শুধু বলব, আমি একজন ভালো মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছিলাম।’ (১০ ডিসেম্বর, ২০১৯, প্রথম আলো)
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় আমাদের আন্দোলন সংগ্রাম ও মুক্তির অন্যতম স্মৃতির পাঠশালা। যেখান থেকে দাঁড়ালে দেখা যায় বাংলাদেশকে। বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশ তিনটি নামের সাথে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাঙালি জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টি সালের ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ছিয়ানব্বর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং সর্বশেষ এক এগারো তত্ত¡াবধায়ক সরকারের পতনসহ বাঙালি জাতির সকল আন্দোলন সংগ্রামের মূল নেতৃত্বে ছিল ঐতিহাসিক এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
এই মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণের সাথে মিশে আছে বিশ^বিদ্যালয়ের ঐতিহ্য। এই স্থাপনা শিল্প আপনাকে থমকে দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্যের। রাজধানীর নগর জীবনে প্রাণের ক্যাম্পাসে এরকম একটি শৈল্পিক স্থাপনা প্রবেশদ্বারে স্বাগত জানাবে আপনাকে।
‘মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ’ এর স্থাপত্যশৈলী মুঘল আমলের। ৯৯ ফুট দৈর্ঘ্য, ১৩ ফুট প্রস্থ ও প্রায় ৩৭ ফুট উচ্চতার এই ‘মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ’ এর স্থপতি কবি রবিউল হুসাইন। যখন আপনি রাজধানীর প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের এই তোরণের পাশ দিয়ে হেঁটে যাবেন তখন স্থপতি রবিউল হুসাইনের নান্দনিক স্থাপত্যশিল্প আপনার চোখে পড়বে। মুক্তি ও স্বাধীনতার কথা বলবে কবি রবিউল হুসাইনের স্থাপত্যশিল্প।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থপতিও কবি রবিউল হুসাইন।
নির্মাণশৈলী ও নান্দনিক স্থাপত্যকর্মের অপূর্ব নিদর্শন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের শহীদ মিনার। যা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শহীদ মিনারটি ত্রিভুজাকার। তিনটি স্তম্ভ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকে যুদ্ধকে তুলে ধরে। ত্রিভুজাকৃতি এই মিনারের তিনটি স্তম্ভ প্রতিদিকে ৫২ ফুট। বায়ান্ন সালের ভাষা শহীদদের রক্তঝরা ইতিহাসকে স্মরণীয় করে রাখতে ত্রিভুজের প্রত্যেকটি বাহু ৫২ ফুট উঁচু করা হয়েছে। মাটি থেকে ৭১ ফুট উঁচু এই মিনার।
গোলাকার বৃত্তের চত্বরে আটটি ধাপ রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের আটটি ধারাবাহিক গণআন্দোলনের প্রতীক। এই ধাপগুলোর মাধ্যমে ১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০ এবং ১৯৭১ সালের সংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাসের প্রতীক হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে স্থাপনায়।
তিনটি স্তম্ভের প্রত্যেকটিই প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস বহন করে। একটি বাংলার ভাষা, শিল্প, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি, অন্যটি এদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, মাটি ও মানুষের এবং অপরটি স্বাধিকার, সার্বভৌমত্ব, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার প্রতীক। বিশ^বিদ্যালয় সবুজ উদ্যানের ভেতর পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনারটি লাল সিরামিক ইটের তৈরি। যার সাথে সাদৃশ্য রয়েছে আমাদের জাতীয় পতাকার। দৃঢ়তার প্রতীক ত্রিভুজাকৃতির কাঠামোর শহীদ মিনারের স্থাপত্যশৈলীতে বিধৃত হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় বীরদের বীরত্বগাথা। যারা মায়ের ভাষা, ভ‚মির জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়েছেন, জীবন দিয়েছেন। নান্দনিক ও ব্যতিক্রম এই স্থাপত্যশিল্পের ডিজাইন করেছেন কবি রবিউল হুসাইন।

স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর তার এক স্মৃতিচারণে মন্তব্য করেছেন
‘তুমি জানো, বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্রিয়েটিভ মানুষের নাম রবিউল হুসাইন।’ (২৬ নভেম্বর, ২০১৯, প্রথম আলো)
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায়ও স্থপতি রবিউল হুসাইনের রয়েছে অসামান্য অবদান। বিশে^র মাঝে যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বেঁচে থাকবেন কবি রবিউল হুসাইন তার শৈল্পিক ও নান্দনিক স্থাপত্যশিল্পের মাধ্যমে। যে শিল্প তাকে অমরত্ব দান করেছে ইতিহাসে।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়