প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কলেজ ছাত্রের গলায় ফাঁস

আগের সংবাদ

শ্রীনগর ফুটওভার ব্রিজের দাবীত মানববন্ধন

পরের সংবাদ

খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও ভেল্যু এডিশন কার্যক্রম

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৭, ২০২০ , ৮:২৪ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৮, ২০২০ , ৪:৩৩ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। জীবন-জীবিকার পাশাপাশি জাতির সার্বিক উন্নয়নে কৃষি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। কৃষি বহুমুখীকরণ ও ভোক্তার চাহিদা বিবেচনায় বর্তমানে পশুপালন, মাছচাষ, পোল্ট্রি শিল্প, ফল-মূল, ফুলচাষ কৃষি খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জিন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে গত কয়েক দশকে দেশে কৃষি উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগেও বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৮০ ভাগ ও শ্রমশক্তির ৬০ ভাগ কৃষি খাতে নিয়োজিত। দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩.৬ শতাংশ হলেও ঐতিহ্যগতভাবে কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র। তাই সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শনে প্রথমে কৃষি উন্নয়ন-কৃষিভিত্তিক শিল্প, বাণিজ্য ও সেবা খাতের উন্নয়নের বিষয়টি চলে আসে। কৃষি এখনো বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা এবং অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও কর্মসংস্থান কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল। কাজেই কৃষিভিত্তিক শিল্পে স্বল্পমাত্রার প্রণোদনাই সৃষ্টি করতে পারে সম্ভাবনার বাংলাদেশ। গ্রামীণ ও কৃষি অর্থনীতিতে সৃষ্টি হবে নবজাগরণ। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই দেশের উৎপাদিত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্যের ভেল্যু এডিশন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে শুরু করা গেলে নবদিগন্তের উন্মোচন ঘটাবে এবং গড়ে উঠবে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে ২০৪১ সালে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরের প্রবল আকাক্সক্ষা থেকে দেশবাসী এগিয়ে যাচ্ছেন। দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে বিশ্ব জনমতের। এছাড়া বিশ্ব ব্যবস্থাপনায় টেকসই উন্নয়নের পথ বেয়ে জাতি ৪র্থ শিল্পবিপ্লবে যাত্রা শুরু করেছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ২নং লক্ষ্যে উল্লেখ রয়েছে End hunger, achieve food security and improved nutrition and promote sustainable agriculture. এ লক্ষ্য অর্জনে আমাদের নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চয়ই গুরুত্ব দিতে হবে।

কৃষিতে উন্নত জিন প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে সরকারের নানাবিধ ভর্তুকির সুযোগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে ৪৩২.১১ লাখ টন। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ। ভুট্টা উৎপাদন হচ্ছে ৪৬ লাখ টন। সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয় এবং সবজি উৎপাদন বেড়ে ১ কোটি ৯ লাখ টন। এর পাশাপাশি ফল উৎপাদনেও বাংলাদেশ চমক দেখাচ্ছে। দেশে প্রায় ২৪ লাখ টন আম উৎপাদন হয়ে বিশ্বে সপ্তম স্থান দখল করে নিয়েছে। নানাবিধ পেয়ারা উৎপাদনের ফলে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। অন্যদিকে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ ও মৎস্যের প্রজনন মৌসুমে সরকারের কঠোর নীতির কারণে দেশে বেড়েছে মাছের উৎপাদন। দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ এন্ড অ্যাকুয়াকালচারের ২০২০ সালের প্রতিবেদনে স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থান ধরে রেখে উৎপাদন বাড়ানো হারে দ্বিতীয় স্থানে উঠেছে। মাছ চাষে বাংলাদেশ বরাবরই নিজেদের অবস্থান ধরে রেখে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। আশার কথা হলো আগামী ২০২২ সাল নাগাদ মাছ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ স্থান দখল করার প্রত্যাশা করছে। বিশ্বের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ইলিশ বাংলাদেশে পাওয়া যাচ্ছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। যা দেশজ উৎপাদনে অর্থাৎ জিডিপিতে ১ শতাংশ অবদান রাখছে। আধুনিক কৃষির অন্যতম খাত হিসেবে পোল্ট্রি শিল্প ক্রমেই দেশের পুষ্টি চাহিদা জোগান, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে এ শিল্প। বিকাশমান এ শিল্প ৯০-এর দশকে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল যেখানে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, তা বর্তমানে ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। দেশের মোট চাষাবাদযোগ্য জমির মধ্যে ফলের আওতায় মাত্র ১-২ শতাংশ জমি রয়েছে। অথচ জাতীয় অর্থনীতিতে মোট ফসলভিত্তিক আয়ের ১০ শতাংশ আসে ফল থেকে। প্রচলিত ও বিদেশি ফলের চেয়ে অপ্রচলিত দেশি ফলগুলোর পুষ্টিগুণও বেশি। বর্তমানে মোট চাহিদার ৬৪ ভাগ দেশে উৎপাদিত ফল থেকে। গত কয়েক বছরে ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির হার বেড়েছে। দারিদ্র্য, জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরজীবনের নানান অনিশ্চয়তা সত্তে¡ও বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনের মাঝেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও টিকে থাকার মূল জায়গাটি হচ্ছে উর্বর ভ‚মি ও কৃষককুল। সে কারণেই আমাদের উর্বর কৃষিজমি রক্ষায় ‘কৃষিজমি রক্ষা কর-পরিকল্পিত গ্রাম গড়’ স্লোগানকে ভিত্তি করে পরিকল্পিত গ্রাম গড়ার ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষককুলকে সম্মানিত নাগরিক হিসেবে মর্যাদা দেয়া প্রয়োজন।

জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সহায়ক কৃষিনীতির সহায়তায় দেশে ফসলের উন্নত ও প্রতিক‚লতা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে অভ‚তপূর্ণ সাফল্য এসেছে। ২০১৮-১৯ সালে অবমুক্তকৃত উদ্ভাবিত জাত ১২টি, উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ৯৫টি এবং নিবন্ধিত জাত ২৬টি। গম ও ভুট্টার গবেষণা সম্প্রসারণের জন্য সরকার ২০১৮ সালে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে। গমের ১টি জাত উদ্ভাবন, গম ও ভুট্টার ৪ হাজার ৫০০টি জার্মপ্লাজম সংগ্রহ এবং রোগবালাই ব্যবস্থাপনার ওপর ১টি প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। আধুনিক সেচ পদ্ধতি, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বীজ ও কৃষির জন্য বিদ্যমান অনুকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষিপণ্যের উৎপাদন সন্তোষজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়কে গতানুগতিক খাদ্য সংরক্ষণ ও বিতরণ করলেই হবে না, বরং উৎপাদিত সব কৃষিপণ্য কীভাবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। তাছাড়া সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিশেষ করে জনগণের একমাত্র আশা ভরসার প্রতীক প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ বিবেচনায় নিতে পারে। (১) দেশের কৃষক সমাজের আয় বৃদ্ধিকল্পে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও খাদ্যসামগ্রী যথাযথ ব্যবহারসহ উৎপাদিত পণ্যের ভেল্যু এডিশন করে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা; (২) উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ফসল কাটা ও তৎপরবর্তী পণ্য পরিবহন, গুদামজাতকরণ ইত্যাদি কার্যক্রমে অপচয়/ব্যবহারজনিত অপব্যয় হ্রাস করা যায়, সে বিষয়ে কৃষককে পরামর্শ ও সাহায্য করা; (৩) খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ভেল্যু এডিশন কার্যক্রম ও প্রক্রিয়াজাতকরণে কৃষককে সহায়তা করার লক্ষ্যে দেশের গ্রামপর্যায়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে (যাদের সক্ষমতা রয়েছে) একটি করে ইনকিউভেশন এন্ড ইনোভেশন সেন্টার (ওহপঁনধঃরড়হ ্ রহহড়াধঃরড়হ পবহঃবৎ) স্থাপন করে, তা স্বল্প ভাড়ার ভিত্তিতে কৃষককে ব্যবহার করার সুযোগ দিয়ে ভেল্যু এডিশন কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে হবে। এই কেন্দ্রে সংশ্লিষ্ট স্কুল বা কলেজের ট্রেড ইন্সট্রাক্টর/কারিগরি শিক্ষকরা স্থানীয় কৃষক ও বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ভেল্যু এডিশন এবং নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেবে এবং কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে; (৪) দেশের সব স্কুল/কলেজে ৮ম/৯ম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও ভেল্যু এডিশনসহ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে শিক্ষা কোর্স প্রবর্তন ও শিক্ষা দিতে হবে। এসব ছাত্রছাত্রীকে সরকারের অনুমোদিত এনটিভিকিউএফের (ঘঞঠছঋ) আওতায় ১ম ও ২য় লেভেলের সনদ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে ছেলেমেয়েরা সংশ্লিষ্ট শিল্পকারখানায় কর্মে নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ পায়; (৫) সর্বোপরি কৃষিপণ্যের ভেল্যু এডিশন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত কার্যক্রমসহ সংশ্লিষ্ট শিল্পকারখানার যথাযথ উন্নয়ন ও মনিটরিং করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জন ও বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফুড প্রসেসিং মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা উচিত। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে খাদ্য বা কৃষি মন্ত্রণালয়ে একজন সচিবের নেতৃত্বে একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই ব্যাপক কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে।

এ কথা সবারই জানা যে, মানুষ প্রবর্তিত উচ্চ-নিম্ন শ্রেণি বিভক্ত সমাজব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন খেটে খাওয়া মানুষ তথা কৃষি ও কৃষিজীবীদের বিগত ২টি ঔপনিবেশিক শাসন আমলেই অবজ্ঞা অবহেলার চোখে দেখা হয়েছে। ঔপনিবেশিক এই শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন এ দেশের কৃষি ও কৃষককে মুক্ত করার আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। তাই বঙ্গবন্ধুর কৃষক ও কৃষি ভাবনা বাস্তবায়নে সরকার উদ্যোগী হলে দেশের কৃষকসমাজ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে এবং দারিদ্র্য নিরসনসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি সুদৃঢ় হবে।

এ কে এম এ হামিদ : সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়