পরিকল্পিত, না দুর্ঘটনা?

আগের সংবাদ

পুরো অঞ্চলে জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে পাকিস্তান

পরের সংবাদ

অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে২২৬ কোটি টাকা পাচার

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৬, ২০২০ , ৯:৩৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৬, ২০২০ , ৯:৩৫ পূর্বাহ্ণ

ব্যাংক হিসাব থেকে শুরু করে বিনিয়োগ বোর্ডের নিবন্ধন সবই জাল জালিয়াতির মাধ্যমে বানানো হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খুলতে যেসব কাগজপত্র ব্যবহার করা হয়েছে তার সবই জাল। আমদানিকারকের জাতীয় পরিচয়পত্র, মূসক নিবন্ধন, বিনিয়োগ বোর্ডের নিবন্ধন সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রথমে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। এরপর শতভাগ মার্জিনে পণ্য আমদানিতে এলসি খোলেন। যা সচরাচর পণ্য আমদানিতে আমদানিকারকরা করেন না। এমন অভিনব কৌশল করে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে পোল্ট্রি ফিডের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির আড়ালে ২২৬ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত আমদানিকারক ও পণ্য খালাসে নিয়োজিত সিএন্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে মামলা দায়ের করতে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে অনুমতি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে পোল্ট্রি ফিডের মূলধনী যন্ত্রপাতি ঘোষণায় দুটি প্রতিষ্ঠান ১২ কন্টেইনার যন্ত্রপাতি আমদানি করে। এর মধ্যে ৬ কন্টেইনার আমদানি করে খিলক্ষেতের হেনান আনহুই এগ্রো এবং বাকি ৬টির আমদানিকারক কেরানীগঞ্জের এগ্রো বিডি এন্ড জেপি। এসব পণ্য রপ্তানিকারক চীনের জমরাজ ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে শুল্ক গোয়েন্দা কন্টেইনার আটক করে এবং ওই বছরের ৫ ও ৬ মার্চ বিভিন্ন সংস্থার উপস্থিতিতে ১২টি কন্টেইনার কায়িক পরীক্ষার জন্য খোলা হয়।

দেখা যায়, পোল্ট্রি ফিডের মূলধনী যন্ত্রপাতি ঘোষণা দেয়া হলেও আনা হয় সিগারেট, এলইডি টিভি, ফটোকপি মেশিন ও বিদেশি মদ। এই দুই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের আগে একই ঘোষণায় মোট ৭৮ কন্টেইনার খালাস নেয়। এ ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দা মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, একই ঘোষণায় এর আগে ২০১৫ সালের বিভিন্ন সময়ে ২৫ কন্টেইনার পশুখাদ্য তৈরির যন্ত্রপাতি আমদানি করে নারায়ণগঞ্জের পাগলার নন্দলালপুর এলাকার চায়না বিডিএল নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর রপ্তানিকারক হচ্ছে সিঙ্গাপুরের ইস্তাম্বুল ট্রেডিং এবং চীনের রাপাতি এন্টারপ্রাইজ। পণ্যের আমদানি মূল্য ছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬২৪ ডলার (১ কোটি ৪১ লাখ টাকা)।

সরেজমিনে শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করে এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পায়নি। ওই ঠিকানায় শুধু চারদিকে বাউন্ডারি, মধ্যে একটি কাঠামো ও সাইনবোর্ড পাওয়া যায়। শুল্ক গোয়েন্দারা বলছেন, হেনান আনহুই এগ্রো এবং এগ্রো বিডি এন্ড জেপির আমদানিকৃত ৬ কন্টেইনারের মতো চায়না বিডিএলের কন্টেইনারে মদ, সিগারেট, টেলিভিশনসহ অন্য বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি করে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দেয়া হতে পারে। আগের ৬টি চালানের ইনভেন্ট্রিতে প্রাপ্ত ৫৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা হিসেবে ২৫ কন্টেইনারে ২২৬ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান।

সূত্র জানায়, চায়না বিডিএল ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাধীন আলীগঞ্জ সার্কেল নিবন্ধিত হলেও রিটার্ন জমা দিত না। ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর নেয়া হয় সরবরাহকারী ও আমদানিকারক হিসেবে। পরে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ভ্যাট নিবন্ধন নম্বরে ‘উৎপাদনকারী’ শব্দ যুক্ত করা হয় এবং সে অনুযায়ী অগ্রিম ট্রেড ভ্যাট (বর্তমানে আগাম কর) মওকুফের সুবিধা নেয় প্রতিষ্ঠানটি। উৎপাদনমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানকে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে এটিভি দিতে হয় না। এতেও সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে।

অন্যদিকে, বিনিয়োগ নিবন্ধিত তথ্যের জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে যোগাযোগ করলে সংস্থাটি জানায়, চায়না বিডিএল নামের কোনো প্রতিষ্ঠান বিডা থেকে যৌথ বিনিয়োগ বা শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ শিল্প নিবন্ধন নেয়নি। অর্থাৎ জাল নিবন্ধন ব্যবহার করা হয়েছে।

এ ছাড়া সরেজমিন পরিদর্শনেও নন্দলালপুর এলাকায় চায়না বিডিএল নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ওই ঠিকানায় শুধু চারদিকে বাউন্ডারি মধ্যে একটি কাঠামো ও সাইনবোর্ড পাওয়া যায়। পরে ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে ট্রেড লাইসেন্সের তথ্য চাওয়া হয়। জবাবে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জানান, ঠিকানা মতে প্রতিষ্ঠানটি ছিল। তবে বর্তমানে যাচাইকালে প্রতিষ্ঠানটির খোঁজ পাওয়া যায়নি। আর জমির মালিক জসিম উদ্দিন আহমেদ জানান, তারা সুরুজ মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে চায়না বিডিএল নামে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য জমি কখনো ভাড়া দেননি। এমনকি তার জানা মতে, নন্দলালপুর গ্রামে চায়না বিডিএল নামের কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো সময়ই ছিল না, এখনো নেই। জাতীয় তথ্য ভাণ্ডারের তথ্য মতে, সুরুজ মিয়ার বাবার নাম ফজলু মিয়া। মায়ের নাম- কুলসুম আক্তার। বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা : বাসা নং-১৩, রোড নং- কে এম দাস লেন, ওয়ারী সূত্রাপুর।

এদিকে, শুল্ক গোয়েন্দার প্রতিবেদনে শুধু আমদানিকারক ও সিএন্ডএফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা ও ব্যাংক হিসাব শনাক্তকারী হিসেবে শহিদুল আলম বা চট্টগ্রাম কাস্টমসে পণ্য ছাড়ে জড়িত কাস্টমস কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে সুস্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। ব্যাংক কর্মকর্তারা শুধু শহিদুল আলমের সঙ্গে পূর্ব পরিচয়ের ভিত্তিতে সুরুজ মিয়ার ব্যাংক হিসাব খোলার অনুমতি দেন এবং শতভাগ মার্জিনের বিপরীতে এলসি খোলেন। এক্ষেত্রে কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি।

অন্যদিকে, প্রতিবেদনে পণ্য খালাসে জড়িত শুল্ক কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়নি। অথচ পণ্য আমদানির পর আমদানিকারকের সিএন্ডএফ এজেন্ট পণ্য খালাসের যাবতীয় ডকুমেন্ট বন্দর ও কাস্টমসে জমা দেন। বন্দরের গেট দিয়ে মালামাল বের হওয়ার আগে স্ক্যানিং করা হয়। এরপর কন্টেইনারের সিল খুলে মালামাল ছাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত শুল্ক কর্মকর্তাকে সিএন্ডএফ এজেন্টের উপস্থিতিতে পণ্য পরীক্ষা করতে হয়। সর্বশেষ শুল্ক গোয়েন্দার সুপারিশের ভিত্তিতে আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়