পেট্রোল পাম্পে ওজনে কম, দুই মালিকের জরিমানা

আগের সংবাদ

মূল্য না বাড়ালে চালের চুক্তি করবে না মিল মালিকরা

পরের সংবাদ

মুম্বাই হামলার ক্ষত ভোলেনি বিশ্ব

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৫, ২০২০ , ১০:২৯ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৫, ২০২০ , ১০:২৯ অপরাহ্ণ

মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার শোক অনেকেই ভুলতে পারেননি আজো। ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের মুম্বাইয়ে হওয়া সেই হামলায় প্রাণ হারান ২৬ নারীসহ ১৬৬ জন মানুষ। বিকলাঙ্গ হয়েছেন ৪৬ নারী ও ১৩ শিশুসহ ১৭৯ জন। সেই ক্ষত বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে ভারতসহ আমেরিকা, কানাডা, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মরিশাস ও ইসরাইলের মানুষ। কিন্তু তাদের সেই ক্ষত নিয়ে একচুলও বিচলিত নয় পাকিস্তান। সম্প্রতি দেশটির আদালত এই মুম্বাই হামলার মূল কারিগর মুহাম্মদ হাফিজ সৈয়দকে মাত্র ১০ বছরের কারাদÐ দিয়ে বাহবা নেয়ার চেষ্টা করছে। ১৬৬ জন মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ১০ বছরের সাজা দিয়ে পাকিস্তান বিশ্বকে বোকা বানানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে শুধু নিজেদের অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। গোটা দুনিয়ার কাছেই হাফিজের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সবরকম তথ্যপ্রমাণ থাকলেও গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী আদালত এই সাজা শুনিয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে হাফিজকে রক্ষায় নিজেদের অবস্থান আরো খোলসা করেছে পাকিস্তান।
অবশ্য মুম্বাইয়ে দেশ-বিদেশের বহু মানুষ হত্যার পরও যে হাফিজের কড়া শাস্তি হবে না সেটা বোঝা গিয়েছিল চলতি বছরের ৯ জুন। মুহাম্মদ হাফিজ সৈয়দের সঙ্গী হাফিজ আবদুল রহমান মাক্কি, মালিক জাফর ইকবাল, ওয়াইয়া আজিজ আর আবদুল সালামদের শাস্তি ঘোষণার সময়ই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। মুম্বাই হামলায় জড়িত ইকবাল আর আজিজের মাত্র ৫ বছর কারাদÐ দেয়া হয়। আর মাক্কি ও সালামকে এক বছরের জন্য জেলে পাঠায় পাক-আদালত। হাফিজ ও তার দলবলকে ঘরোয়া রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় মানিলন্ডারিং বা অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসীদের অর্থায়নের অভিযোগে শাস্তি দেয় পাকিস্তান।
দীর্ঘ ১২ বছর পর এ ধরনের হাস্যকর শাস্তি ঘোষণার মূল কারণ জঙ্গিদের অর্থায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স বা এফএটিএফের সন্দেহের তালিকায় রয়েছে পাকিস্তান। সামনের বছর মার্চে এফএটিএফের অধিবেশনে কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে দেশটিকে। তাই আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি কিছুটা স্বচ্ছ করার তাগিদে ভালো মানুষ সাজার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পাক-সরকারের সখ্য আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে বহুদিন ধরেই উদ্বেগের কারণ। তাদের কালো তালিকাভুক্ত করার দাবিও উঠছে বহুদিন ধরে। তাই অর্থনৈতিক অবরোধের আশঙ্কায় এফএটিএফকে বোকা বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছে পাক-সরকার।
এমন ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলা মানবসভ্যতার পক্ষেই বিপজ্জনক। আর পাকিস্তান সরাসরি মদদ দিয়েছে এ হামলায়। হামলায় নিহত মার্কিন নাগরিক অ্যালান শেরার ও তার ১৩ বছরের কন্যা সন্তান নাওমির শোকে আজো চোখের জল ফেলছেন তাদের পরিবার। মুম্বাইয়ের ওবেরয় ট্রিডেন্ট হোটেলে নৈশভোজে এসে জঙ্গি হামলার কবলে পড়েন তারা। এরকমভাবেই দেশ-বিদেশের বহু মানুষ জঙ্গিদের দানবিক আক্রমণের শিকার হন সেদিন। মার্কিন প্রকাশনা প্রোপাবলিকা মুম্বাই বিস্ফোরণের শোকগ্রস্তদের জবানবন্দি প্রকাশ করেছে। ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর প্রকাশিত তদন্তমূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিভিন্ন দেশের নাগরিকের অভিমত। পাকিস্তান মুম্বাই হামলার ষড়যন্ত্রকারীদের রক্ষা করে চলেছে। এর পেছনে রয়েছে নিজেদের স্বার্থ। ভারত ও আফগানিস্তানে জঙ্গি কার্যকলাপ জারি রাখার পাশাপাশি মুম্বাই ষড়যন্ত্রে তাদের প্রত্যক্ষ ভ‚মিকা যাতে ফাঁস না হয় সেদিকেও লক্ষ রয়েছে ইসলামাবাদের।
পাকিস্তানি সরকারি কর্মীরাই বলছেন, লস্কর এখনো ভয়ঙ্কর হামলা চালাতে পারে। তারা পাকিস্তানি সরকারের প্রতি দায়বদ্ধ। হাসপাতাল বা দাতব্য ক্রিয়াকর্মের মাধ্যমে পাক-জনগণের মধ্যেও তাদের প্রভাব রয়েছে। মুম্বাই বিস্ফোরণের পর বড় ধরনের কোনো হামলা না চালালেও লস্করকে নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আফগানিস্তান ও কাশ্মিরে বড় ধরনের হামলার চালানোর মতো বিশাল অস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে তাদের। আইএসআইয়ের প্রশ্রয়ে বেড়েই চলছে অত্যাধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আমেরিকার নাগরিক হ্যাডলিকে মার্কিন বিচার বিভাগ ইতোমধ্যেই দোষী সাব্যস্ত করেছে। ৩৫ বছর কারাদণ্ডও হয়েছে তার। সে সঙ্গে ভারতীয় আদালতকেও হ্যাডলির বিরুদ্ধে বহু প্রমাণ তুলে দেয় আমেরিকা। কিন্তু হাফিজ মহম্মদ সঈদ বা জাকিউর রহমান লাখভিকে কঠোর শাস্তি দিতে চায় না পাকিস্তান। আর এটাই প্রমাণ করে, ওসামা বিন লাদেনকে পাকিস্তানই আশ্রয় দিয়েছিল। কারণ সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয়াটা তাদের কাছে নতুন কিছু নয়।
মার্কিন গবেষণা সংস্থা স্টিমসন সেন্টারের সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ‘২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার পর প্রমাণ হলো পাকিস্তানের সামরিক, রাজনৈতিক বা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা চাননি বা পারেননি, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে’। এখন ‘মুম্বাই ধাঁচের হামলা’ দুনিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। প্রায় একই ধরনের হামলার শিকার বাংলাদেশও। ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই হলি আর্টিজানের হামলার সঙ্গে অনেকেই ২৬/১১-এর মিল পান। আবার ২১ এপ্রিল, ২০১৯-এ শ্রীলঙ্কার গির্জায় হামলারও মিল রয়েছে মুম্বাই হামলার সঙ্গে। এই হামলাগুলো থেকেই বোঝা যায় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা বা সার্কের আসল উদ্দেশ্যই বিঘি্নত হচ্ছে সন্ত্রাসের কারণে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের জঙ্গি শিবিরই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। দক্ষিণ এশিয় দেশগুলোর ক‚টনীতিকরা সন্ত্রাস নিয়ে মুখ খুলতে অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু সন্ত্রাস দমনে কার্যকরী ভ‚মিকার প্রয়োজন অনুভব করেন সবাই।
আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্ট অনুসারে, ‘পুরো দুনিয়ার কাছেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে দক্ষিণ-এশিয়া’। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘সন্ত্রাসবাদীদের কারণে ইসলামাবাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও আজ নানা দিক থেকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষাই কঠিন হতে পারে পাকিস্তানে পক্ষে। শুধু পাকিস্তানই নয়, আঞ্চলিক অস্থিরতাও সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ তাদের মতে, জঙ্গিদের মদদ দিতে গিয়ে পাকিস্তান আজ নিজেই ভয়ানক বিপদের সম্মুখীন। সেইসঙ্গে দক্ষিণ এশিয়াতেও রয়েছে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা। আর এসবের পিছনে রয়েছে জঙ্গিদের সঙ্গে পাক-সরকারের সখ্য। তবু ২৬/১১-র অপরাধীদের আগলে রেখে সন্ত্রাসীদের আজো মদদ দিয়ে চলেছে পাকিস্তান।

ফারাজি আজমল হোসেন : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়