অনন্তলোকে মুনীরুজ্জামান

আগের সংবাদ

গোল্ডেন মনিরের ৬শ কোটি টাকার সন্ধান পেয়েছে দুদক

পরের সংবাদ

গ্যাঁড়াকলে করদাতারা!

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৫, ২০২০ , ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৫, ২০২০ , ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ

রিটার্ন দাখিলে জটিলতায় আয়কর আদায়ে ধস
* এক পাতার রিটার্ন ফরম মিলছে না অনলাইনে
*এখনো রিটার্ন জমা দেননি সাড়ে ৪১ লাখ টিআইএনধারী

রিটার্ন দাখিলের জঠিলতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর আদায়ে ধস নেমেছে। করোনার কারণে সরকারিভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। সারা বিশে^ করোনাকালীন অনলাইনে নির্ভরতা বাড়লেও এনবিআর ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই রিটার্ন জমা নিচ্ছে। সার্ভার জটিলতায় বন্ধ রয়েছে অনলাইনে জমা। ইতোমধ্যে এনবিআর চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সময় বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আর রিটার্ন সংক্রান্ত এসব জটিলতায় আইনি ফাঁদে পড়েছেন সাধারণ করদাতারা। এর প্রভাব পড়েছে রিটার্ন জমায়ও। এনবিআরের সর্বশেষ হিসেবে ৪৯ লাখ করদাতার মধ্যে রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র সাড়ে ৭ লাখ করদাতা। অর্থাৎ এখনো রিটার্ন জমা দেননি সাড়ে ৪১ লাখ আয়করদাতা। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী একজন করদাতাকে প্রতি বছর নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে হয়। এই লক্ষ্যে গত কয়েক বছর ধরে নভেম্বর মাসে আয়কর মেলা করে আসছে এনবিআর। এবার করোনার কারণে এই আয়োজন থেকে বিরত রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি বছর ৩০ নভেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। এবারও এর ব্যতিক্রম করা হয়নি। করোনাকালীন অনলাইন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে চাইলেও রিটার্ন জমা দিতে পারছেন না। এক পাতার রিটার্ন ফরম চালু করলেও এ নিয়েও করদাতাদের মধ্যে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এনবিআরের ওয়েবসাইটে মিলছে না এই এক পাতার রিটার্ন ফরম। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে না পেরে আইনি জটিলতায় পড়েছেন করদাতারা। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে আয়করদাতাকে। এসব জটিলতার প্রত্যেক্ষ প্রভাব পড়েছে রিটার্ন জমায়। চলতি মাসের ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে মোট ট্যাক্সপেয়ারস আইডিন্টিফিকেশন নাম্বার (টিআইএনধারী) হচ্ছেন ৪৯ লাখের বেশি। এর মধ্যে রিটার্ন জমা দিয়েছেন সাড়ে ৭ লাখ করদাতা। অর্থাৎ এখনো রিটার্ন জমা দেননি ৪১ লাখ। আগামী সপ্তাহ অর্থাৎ ৩০ নভেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে গুণতে হবে জরিমানা। এ সময়ে রিটার্ন জমা দিতে না পারায় এনবিআরের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করেছেন ২৭৮ জন আয়করদাতা। সবমিলে অল্প সময়, অনলাইন বন্ধ থাকায় আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়ছেন করদাতারা। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দেয়া নিয়ে সন্দিহান তারা।

সম্প্রতি এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রাহমাতুল মুনিম বলেছেন, রিটার্ন জমা দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা নেই। আর রিটার্ন জমা দেয়ার ক্ষেত্রে ভয় পাওয়ারও কোনো কারণ নেই। তাই এবারও রিটার্ন জমা দিতে হবে সবাইকে। এছাড়া রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে সময় বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন রাহমাতুল মুনিম।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোভিডের কারণে সারা বিশ্বে অনলাইনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সেই জায়গায় এনবিআরের অনলাইন কার্যক্রম চালু থাকা উচিত ছিল। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে যে প্রণোদনা ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, তার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন করদাতারা। সময় বাড়ানোর ক্ষেত্রে এনবিআর যে ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাজস্ব আহরণের স্বার্থে এনবিআরকে সরে আসা উচিত বলে মনে করেন তারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ^ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, এনবিআরের কর সংক্রান্ত এই জটিলতা বেশ পুরোনো। এনবিআর এতদিন করদাতাবান্ধব একটি পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়নি। যার কারণে করদাতারা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে। সরকার একদিকে অনলাইনে রিটার্ন জমা দেয়াকে উৎসাহিত করছে, অন্যদিকে বন্ধ রয়েছে অনলাইনে জমা দেয়া। এছাড়া করোনাকালীন ভিড় এড়াতে বেশি; প্রয়োজন ছিল অনলাইন কার্যক্রম যা এখনো সচল করতে পারেনি এনবিআর। এক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণের স্বার্থে সময় বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে এনবিআর।

জানা গেছে, গত বছরে আয়কর মেলার প্রথম তিনদিনে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল এনবিআরের রাজস্ব আদায়। একদিনেই প্রায় ২ লাখ ৭১ হাজার ৯৪০ জন করসেবা নিয়েছিলেন। আর রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন প্রায় ৮৪ হাজার ৫৩৫ জন করদাতা। এর বিপরীতে আয়কর আদায় হয়েছে ২৬২ কোটি টাকা। নতুন করে একদিনে ৪ হাজার ১১ জন ই-টিআইএন নিয়েছিলেন। তবে এবারের আয়কর রিটার্নের পরিস্থিতি পুরোটাই ভিন্ন। প্রতিটি কর অঞ্চলে অল্প পরিসরে মিনি করমেলার মতো আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু এতে সাধারণ করদাতাদের আগ্রহ খুবই কম। বিভিন্ন কর অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, স্বল্প পরিসরে করসেবা দিয়ে আসছে কর অঞ্চলগুলো। অনলাইন এবং মেলা না থাকায় চরম বিরক্ত করদাতারা। করদাতারা বলছেন, এনবিআর সবকিছু নিজেদের মতো করে চিন্তা করে। এনবিআরের মনে হলো, তাই বলে দিল সময় বাড়ানো হবে না। গত বছর আয়কর মেলা থাকার পরও সময় বাড়ানো হয়েছিল। এবার এই সুযোগ না থাকায় অনেক করদাতা বিপাকে পড়বেন বলে জানান একাধিক করদাতা। হয়রানির ভয়ে নাম প্রকাশে রাজি হননি একাধিক করদাতা।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সঙ্গে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, কোভিডের কারণে সংকটে রয়েছে সারা বিশ^। এই পরিস্থিতিতে সময় বাড়ানোর বিষয়টি এনবিআরের বিবেচনায় নিতে পারে। আর টিআইএনধারী এবং রিটার্ন জমাদানকারীর মধ্যে বিশাল পার্থক্য আজও বিদ্যমান রয়েছে। টিআইনধারীরা যদি রিটার্ন দাখিল না করেন তাহলে এনবিআরের কাছে তাদের তথ্য থাকবে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলোÑ রিটার্ন দাখিল সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেকে কর দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এক্ষেত্রে এনবিআরকে রাষ্ট্রের স্বার্থে করদাতাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে বলে জানান এই গবেষক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়