ফিরলেন রাসেল ডমিঙ্গো

আগের সংবাদ

মধ্যযুগীয় কায়দায় দুই ভাই বোন কে নির্যাতন

পরের সংবাদ

অ্যান্টিবায়োটিক অপব্যবহার রোধে সতর্কতা

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৫, ২০২০ , ৯:৫৪ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৫, ২০২০ , ৯:৫৪ অপরাহ্ণ

অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার মানুষের রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। কোটি কোটি অসুস্থ মানুষের রোগ নিরাময়ে তা যে ধন্বন্তরি অবদান রেখেছে এ একটি ধ্রুব সত্য। পাশাপাশি আরেকটি সত্য হলো, অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার মানব জাতির জন্য ইতোমধ্যে হুমকি হয়ে উঠেছে। যেসব দেশ এ হুমকির সামনের কাতারে বাংলাদেশ তার একটি। কারণ উন্নত দেশে ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রির সুযোগ না থাকলেও বাংলাদেশে এটি অবারিত। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার চেয়ে নিজেই দোকান থেকে ওষুধ কিনে চিকিৎসা চালান এমন লোকের সংখ্যা এ দেশে অসংখ্য। ফলে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে। স্বল্পোন্নত অনেক দেশেই রয়েছে অভিন্ন সমস্যা।
অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার কী ধরনের বৈশ্বিক সংকট সৃষ্টি করছে তা ফুটে উঠেছে বৈশ্বিক প্ল্যাটফরম ‘ওয়ান হেলথ গ্লোবাল লিডার্স গ্রুপ অন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্স’-এর যাত্রার অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া কো-চেয়ারের ভাষণে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষ ও প্রাণীর জন্য অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্স একটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরিণামদর্শী খাদ্য উৎপাদন আমাদের বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে; যা বিদ্যমান কোভিড-১৯ মহামারির চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দিতে পারে। যুগের পর যুগ বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অর্জিত সাফল্য ম্লান করে দিতে পারে অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, ভুল ডোজ এবং সার্বিকভাবে দুর্বল সংক্রমণ প্রতিরোধব্যবস্থা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ওয়ার্ল্ড অরগানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথের উদ্যোগে গঠিত বৈশ্বিক প্ল্যাটফরমে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার মানবজীবনের জন্য এক পরম আশীর্বাদ। রোগ-জীবাণুর বিরুদ্ধে মানুষের লড়াইয়ে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। রোগ চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার রোগীকে সুস্থ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। কিন্তু পাশাপাশি এর অপব্যবহার স্বাস্থ্যঝুঁকিরও বড় কারণ। বিভিন্ন গবেষণা ও অনুসন্ধানী রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা প্রবল। ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ফার্মেসি থেকে প্রায় সব ধরনের ওষুধ কেনা যায় সহজে। আবার চিকিৎসকদেরও অনেকেই রোগ নিরাময়ে যথেচ্ছভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের পরামর্শপত্র দিয়ে থাকেন। ফলে দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য তা অন্যতম প্রধান হুমকি।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠার পেছনে নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি এবং ওষুধ বিক্রেতা ও ক্রেতার অসাবধানতা বড় ভূমিকা রাখছে। যেসব অ্যান্টিবায়োটিক বিভিন্ন জটিল রোগ প্রতিরোধে ঐতিহাসিক ভ‚মিকা রেখেছে, সেগুলোর অনেক অ্যান্টিবায়োটিক আজ জীবনের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সাবধানী না হলে খুব শিগগিরই মানবজাতি জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রাণরক্ষার যুদ্ধে পরাস্ত হবে।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা আইসিইউতে থাকা রোগীদের একটি বড় অংশের মৃত্যুর পেছনে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া দায়ী, যাদের এই ক্ষমতার জন্য ‘সুপারবাগ’ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, এক দশক আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি ব্যাকটেরিয়া ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠছে।
দ্য টেলিগ্রাফের ‘সুপারবাগস লিঙ্কড টু এইট আউট অব টেন ডেথস ইন বাংলাদেশ আইসিইউস’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ৮০ শতাংশ মৃত্যুর জন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সুপারবাগ দায়ী। বিষয়টি অত্যন্ত আতঙ্কজনক এক বাস্তবতাকেই নির্দেশ করে। অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি শরীর প্রতিরোধ গড়ে তুললে সে অবস্থাকে বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। এই প্রবণতার কারণে প্রতি বছর বিশ্বে ৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াতে পারে ১ কোটিতে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, পশুখাদ্য, মাছ এবং কৃষিতে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষিতে, যা দেশে ব্যবহৃত মোট অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় অর্ধেক। ফলে খুব সহজেই কৃষিখাদ্যের মধ্য দিয়ে এই অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের শরীরে ঢুকছে। এতে একদিকে যেমন অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারাচ্ছে, তেমনি শরীরও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে। অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে সামান্য জীবাণুু সংক্রমণও এখন ব্যবহারকারীর জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য যে ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে তা উদ্বেগজনক। এই চিত্রের অবসানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হলে জাতিকে এর চরম খেসারত দিতে হবে।
আমাদের প্রত্যাশা- বাংলাদেশে যথেচ্ছভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের যে প্রবণতা রয়েছে তার রাশ টেনে ধরতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে দিকনির্দেশনা হিসেবে অনুসরণ করা হবে।

মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ।
[email protected]

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়