করোনায় মারা গেলেন দৈনিক সংবাদের সম্পাদক মুনীরুজ্জামান

আগের সংবাদ

নিউজ ফ্ল্যাশ

পরের সংবাদ

মোংলা বন্দরে সক্রিয় চোরাই সিন্ডিকেট

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৪, ২০২০ , ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৪, ২০২০ , ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ

চোরচক্রের ৫ জন ডিবি হেফাজতে
সিএন্ডএফ ও বন্দর সংশ্লিষ্টদের নিয়েই সিন্ডিকেট

দেশের দ্বিতীয় প্রধান সামুদ্রিক বন্দর মোংলায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে চোরাই সিন্ডিকেট। বন্দরটিতে থাকা কন্টেইনার থেকে আমদানিকৃত পণ্য আমদানিকারকের অজান্তেই চুরি হওয়ার ঘটনা ঘটছে। সিএন্ডএফ প্রতিনিধি ও বন্দর সংশ্লিষ্ট লোক ছাড়াও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এ ধরনের কাজ করছেন। ফলে কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই কোটিপতি হয়ে যাচ্ছেন চোর সিন্ডিকেটের সদস্যরা। এসব অপকর্মে জড়িত পাঁচজন ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। চুরিকৃত পণ্যও উদ্ধার করা হয়েছে তাদের কাছ থেকে। এছাড়া এসব কাজে জড়িত সিএন্ডএফ প্রতিনিধি ও বন্দর সংশ্লিষ্টদের নামও পাওয়া গেছে। তারা ডিবির নজরদারিতে রয়েছেন।

এদিকে, ব্যবসায়ীরা বলছেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোংলা বন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোথাও গলদ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা উচিত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান মুঠোফোনে ভোরের কাগজকে বলেন, যে কোনো ধরনের অনিয়মরোধে শূন্যসহিষ্ণু নীতি অনুস্মরণ করা হচ্ছে। তবে আমাদের কাছে এ ধরনের অভিযোগগুলো লিখিতভাবে আসে না। বন্দরের সুনাম ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো কিছু ঘটলে সে যেই হোক কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বন্দর সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনাসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ডিবি সূত্র বলছে, আজিজ এন্ড সন্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান গত ৬ সেপ্টেম্বর কনটেইনার খুলে ওজন করা শেষে দেখতে পান আমদানি করা ৩১ টনের জায়গায় মাত্র ৬ টন কাপড় রয়েছে। বিষয়টি তাদের খুব অবাক করে। পরে তারা বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানোসহ পুলিশের কাছে এ ঘটনায় অভিযোগ করেন। পরে ৯ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার ইসলামপুরের আইটিসি টাওয়ারের আফরোজা টেক্সটাইলের গুদাম থেকে খোয়া যাওয়া কাপড়ের ৯২ হাজার ৬৭২ গজ উদ্ধার করাসহ শামসুল আরেফীন ও মো. মনির হোসেন নামে দুই ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি লালবাগ বিভাগের কোতোয়ালি জোনাল টিম।

গ্রেপ্তারের পর ওই দুজন জানান, মেসার্স কে জি এন এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক আবুল কাশেম নিলামে কাপড়গুলো কিনেছিলেন। আর ওই ব্যক্তির কাছ থেকেই জব্দ করা কাপড়গুলো কেনে তারা। তবে তদন্তে নেমে ওই নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ডিবি সূত্র জানায়, আবুল কাশেমকে আটকের জন্য তদন্ত কাজ অব্যাহত রাখেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার থেকে রবিবার পর্যন্ত টেরিবাজারের কাপড় ব্যবসায়ী কাশেম, পানগুচি এন্টারপ্রাইজের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অরুণ ও লেবার সরদার সাগরকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আবুল কাশেমকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এ ব্যক্তি জানান, নিলামে নয়, মোংলা বন্দরে কন্টেইনারের তালা ভেঙে কাপড়গুলো চুরি করা হয়। চুরি করা পণ্য প্রথমে চট্টগ্রামের টেরীবাজারে যায়। সেখান থেকে চুরিকৃত মাল চলে যায় পুরান ঢাকার ইসলামপুরে। সেখান থেকে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী হয়ে অন্যান্য জেলায় চলে যায়।

তিনি বলেন, সিএন্ডএফ প্রতিনিধি ছাড়াও বন্দরের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর, লাইনম্যান, নয়েল ড্রাইভার, টালিম্যান ও লেবার সর্দারের সহায়তায় এ কাজ করেন তারা। প্রথমত শুল্কায়ন পরিশোধ শেষে বৈধ কনটেইনারের পণ্য খালাসের সময় ট্রাকের প্রয়োজন হয়। কনটেইনার খালাসে ৪টি ট্রাকের প্রয়োজন হলে তারা বন্দর সংশ্লিষ্টদের সহায়তায় আরো বেশি ট্রাক ঢোকার ব্যবস্থা করেন। বৈধ পণ্য নির্দিষ্ট চারটি ট্রাকে লোড হলে বেশি ঢোকা ট্রাকে করে বের করা হয় কনটেইনার কেটে চুরি করা পণ্য। আর এ কাজগুলো করা হয় বন্দরের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর, লাইনম্যান, নয়েল ড্রাইভার, টালিম্যান ও লেবার সর্দারের সহায়তায়। পরে মালগুলো লোকাল মার্কেট হয়ে ঢাকায় পৌঁছে।

বন্দর কাস্টম সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ পণ্য আমদানির ঘোষণা দেন সে পরিমাণ পণ্য তারা আনেন না। ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে ব্যবসায়ীরা নিজেও অনেক সময় চুপ থাকেন। এ সুযোগ নিয়েই চোরচক্র বিনিয়োগ ছাড়াই কোটিপতি বনে যান।

অভিযানের নেতৃত্ব দেয়া ডিবি লালবাগ বিভাগের কোতোয়ালি জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. সাইফুর রহমান আজাদ ভোরের কাগজকে বলেন, বন্দরের সঙ্গে দেশের অর্থনীতির একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পরই আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করি। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ তদন্তের মধ্য দিয়েই চোরাই সিন্ডিকেটেরে সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। এসব কাজে জড়িত মোংলা, চট্রগ্রাম ও ঢাকার ২০-২২টি সিএন্ডএফ প্রতিনিধি ছাড়াও ১৫ জনের মতো মূলহোতার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম না বললেও তারা ডিবির নজরদারিতে রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, প্রাথমিকভাবে গ্রেপ্তারকৃতরা এমন একাধিক চালান বন্দর থেকে বের করেছে। বিনা পুঁজিতেই এসব পণ্য বিক্রি করে তারা কি পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন তা জানার চেষ্টা করছে সিআাইডি। তারা মানিলন্ডারিং মামলা করবেন ও বিষয়টি তদন্ত করে দেখবেন।

প্রসঙ্গত, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সরকারের একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা যা বাগেরহাটের মোংলায় অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় প্রধান সামুদ্রিক বন্দর। সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অংশ হিসেবে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি বোর্ড বন্দর বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়