তবুও কেন অশান্ত পাহাড়

আগের সংবাদ

কোন্দল সৃষ্টিকারীদের জন্য অশনি সংকেত!

পরের সংবাদ

নেপথ্যের কারিগরদের শনাক্ত করা শুরু

মনিরের ২শ প্লটের তথ্য খতিয়ে দেখছে রাজউক

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৩, ২০২০ , ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৩, ২০২০ , ৯:০৭ পূর্বাহ্ণ

দোকানের বিক্রয় প্রতিনিধি থেকে হঠাৎ ফুলে-ফেঁপে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরের উত্থানের নেপথ্যের কারিগরদের শনাক্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মিশন শুরু হয়েছে। এতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক) কর্মরত দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট নস্যাৎ সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বাতিল হতে পারে গোল্ডেন মনিরের ২০০ প্লটের মালিকানা। এদিকে গোল্ডেন মনিরের প্লট জালিয়াতি, ফাইল জালিয়াতি ও অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত করা হবে বলে গতকাল রবিবার জানিয়েছেন রাজউক চেয়ারম্যান। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বাড্ডা থানায় অস্ত্র, মাদক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে গতকালই গোল্ডেন মনিরের বিরুদ্ধে হওয়া পৃথক ৩টি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

অন্যদিকে বাড্ডা থানা-পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মনির জানিয়েছেন, তার বাড়ি থেকে স্বর্ণসহ যা উদ্ধার করা হয়েছে আয়কর রিটার্নে তার সব দাখিল রয়েছে। এছাড়া দুবাই যাওয়ার কথা থাকায় তার নামে থাকা ৪টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র তিনি গুলশানের একটি অস্ত্রের দোকানে জমা দিয়েছেন। তবে তার কাছ থেকে র‌্যাবের উদ্ধার করা অস্ত্রের বিষয়ে কোনো কিছু জানাতে পারেননি তিনি। এছাড়া তার ঘর থেকে যে টাকা পাওয়া গেছে তা তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানির কাছে গাড়ি বিক্রির ৫০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছেন গোল্ডেন মনির। তবে বাকি টাকার কোনো সঠিক উৎস তিনি জানাতে পারেননি। ডিএমপি গুলশান বিভাগের বাড্ডা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার এলিন চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

গতকাল সচিবালয়ে এক বৈঠক শেষে মনিরের ২০০ প্লটের মালিক হওয়ার পেছনে রাজউকের কারো সহযোগিতা ছিল কিনাÑ এমন প্র?শ্নের জবাবে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সাঈদ নূর আলম বলেন, এটা একদিনের প্রক্রিয়া না, এটা দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়া। আমরা এতদিনে তথ্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। মনিরের দুর্নীতির বিষয়টি প্রথম উদ্ঘাটন হয় গত বছর, তখনই সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়। এ ব্যবস্থা চলমান থাকবে যতক্ষণ না সর্বশেষ বিষয়টি উদ্ঘাটিত হচ্ছে। এগুলো আমরা তদন্ত করব। তদন্তে যারা যারা শনাক্ত হবে, তাদের সবার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। আদালতে যে মামলা আছে তা চলবেই।
ম?নি?রের প্লটগুলো বাতিল করা হবে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, এই প্রক্রিয়ায় যদি কোনো প্রকার অনিয়ম-দুর্নীতি থাকে, তাহলে আমরা অবশ্যই বাতিল করব। অনিয়ম রোধে রাজউকে শুদ্ধি অভিযান চালানো হবে জানিয়ে সাঈদ নূর আলম বলেন, নতুন করে আরো শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করব। ভবিষ্যতে রাজউকে কোনো প্রকার অনিয়ম থাকবে না।

গতকাল দুপুরে র‌্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, ২০ বছর আগে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করলেও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে লাগেজে কসমেটিকস আনার ব্যবসায় জড়িয়ে অপকর্মের শুরু হয় মনিরের। এর মধ্যেই বিমানবন্দরের স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া গোল্ডেন মনির রাজউকের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সেখানে জাল স্ট্যাম্প, জাল সিল তৈরি করে ভুয়া দলিল করে রাজধানীতে বিভিন্ন স্থানে প্লট ও জমি দখল করেন। এছাড়া তার বাসা থেকে ২টি ও অটোকার সিলেকশন থেকে ৩টি অনুমোদনহীন বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করা হয়। এসব বিষয়ে সরকারের ৪টি সংস্থাকে তথ্য সংগ্রহের অনুরোধ জানাব।

তিনি আরো বলেন, গোল্ডেন মনির দেশের বাইরে কী পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন বা কী পরিমাণ সম্পদ তার রয়েছে সে বিষয়ে তদন্তের জন্য দুদককে, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধপথে কসমেটিকস পণ্য ও চোরাচালানির মাধ্যমে কী পরিমাণ স্বর্ণ দেশে এসেছিলেন সে বিষয়ে এনবিআরবিকে, অনুমোদনহীন বিলাসবহুল গাড়ি (প্রত্যকটি ৩ কোটি টাকা মূল্যের) আমদানির বিষয়ে বিআরটিএকে আর জাল-জালিয়াতি করে ভ‚মি দখলের বিষয়ে রাজউক অনুসন্ধানের জন্য আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাব।

তিনি বলেন, গোল্ডেন মনিরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ পেয়েছি, তা র‌্যাবের কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত নয় বিধায় আমরা সরকারের ৪ সংস্থাকে তদন্ত করতে অনুরোধ জানিয়েছি। ২টি মামলা গোল্ডেন মনিরের বিরুদ্ধে আগেই ছিল। গত ২০১২ সালে দুদকের একটি ও সিল জালিয়াতি করে ভুয়া দলিল তৈরিতে রাজউক একটি মামলা করেছিল। আর তার বাসা থেকে বিদেশি পিস্তল উদ্ধারের বিষয়ে রাজধানীর বাড্ডা থানায় রবিবার অস্ত্র আইনে, বিদেশি মদ উদ্ধারের কারণে মাদক আইনে, ৬০০ ভরি স্বর্ণ ও বৈদেশিক মুদ্রা এবং কোটি টাকা উদ্ধারের ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটিসহ মোট ৩টি মামলা হয়। পরে ওই দিন দুপুরেই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাকে হাজির করা হলে অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের পৃথক দুই মামলায় ৭ দিন করে মোট ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক আবু বক্কর সিদ্দিক ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক মাসুদ-উর রহমান। অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের দুই মামলায় ৭ দিন করে যে রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে, তা একই সঙ্গে কার্যকর হবে। সেই হিসাবে ৩ মামলায় আসামিকে মোট ১১ দিন রিমান্ডে থাকতে হবে।

আশিক বিল্লাহ বলেন, গোল্ডেন মনিরের বাসায় অভিযানে জানতে পেরেছি, রাজউকের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ২ শতাধিক প্লট ও জমি দখল করেছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ৩০টি প্লট রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেছেন। আশা করছি, তদন্তে তার সম্পদের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

গোল্ডেন মনির আয়কর রিটার্নে যে সম্পত্তির কথা উল্লেখ করেছেন, তা আসলে বাসা। তবে তার সঙ্গে অনেক ফারাক রয়েছে। উত্তরায় জমজম টাওয়ারে গোল্ডেন মনিরের মালিকানার বিষয়ে র‌্যাবের তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা সত্যতা পেয়েছি। র‌্যাবের একটি দল জমজম টাওয়ারে অভিযান চালিয়েছে। জানা গেছে, জমজম টাওয়ারে গোল্ডেন মনিরের যে মালিকানা ছিল সেটি গত ১ মাস আগে তার অন্য অংশীদারদের কাছে বিক্রি করেছেন। জমজম টাওয়ারের বাজার মূল্য প্রায় শতাধিক কোটি টাকার কাছাকছি বলে প্রাথমিকভাবে আমরা জেনেছি। নেপথ্যের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট কারো নাম না জানালেও র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, একদিনে গোল্ডেন মনির হয়ে উঠেননি তিনি। তিনি একজন সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ। বিভিন্ন সময়ে তিনি বিভিন্ন জনকে ব্যবহার করে অবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়