দরিদ্রদের মাঝে আনোয়ার খান এমপির খাদ্যসামগ্রী বিতরণ

আগের সংবাদ

মনিরের ২শ প্লটের তথ্য খতিয়ে দেখছে রাজউক

পরের সংবাদ

তবুও কেন অশান্ত পাহাড়

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৩, ২০২০ , ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৩, ২০২০ , ১২:০১ অপরাহ্ণ

*পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২৩ বছর
* সবুজ উপত্যকা রক্তে লাল

* কান্না থামেনি আজও

* অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি

* চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি পাহাড়িদের

সবুজ পাহাড়ে রক্তের আল্পনা। একমাসে ছয়টি তাজাপ্রাণের রক্তে লাল হয়েছে পার্বত্য জনপদ। অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে কাঁপছে পাহাড়। শান্তিচুক্তির ২৩ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে আগামী ২ ডিসেম্বর। তবুও কাক্সিক্ষত শান্তি ফিরেনি অশান্ত পাহাড়ে। কান্না থামেনি আজও। আঞ্চলিক পাঁচ সংগঠনের আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বাড়ছে খুন, অপহরণ। প্রতিনিয়ত খালি হচ্ছে মায়ের বুক। শান্তির খোঁজে প্রহর গুনছে ভীতসন্ত্রস্ত পার্বত্য অঞ্চল।

গত এক মাসে আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্য বিস্তারের বলি রাঙ্গামাটি জেলার তিন উপজেলার ৬ জন। গত ১৩ অক্টোবর নানিয়ারচর উপজেলায় বুড়িঘাটে সেনা টহলের ওপর সন্ত্রাসী হামলায় মারা গেছে দুই সন্ত্রাসী। গুরুতর আহত হয়েছেন এক সেনা সদস্য। ১১ নভেম্বর রাঙ্গামাটির কাপ্তাই ওয়া¹া ইউনিয়নে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে মারা যান আরো দুই জন। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঠিক দুদিন পর ১৩ নভেম্বর রাতে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন আরো দুজন। রক্তক্ষয়ী এসব সংঘর্ষের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আঞ্চলিক দলগুলোর। এছাড়া সন্ত্রাসী কার্যক্রম ধামাচাপা দিতে লাশ গুম করে ফেলার অভিযোগও রয়েছে পরস্পরের বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তারে বিবদমান পাঁচটি দল হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-সন্তু গ্রুপ), ইউনাইটেড পিপলস্্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসিত গ্রুপ), পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (লারমা সংস্কার গ্রুপ), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ইউপিডিএফ (সংস্কার গ্রুপ) ও মগ লিবারেল ফ্রন্ট। যদিও হানাহানি এবং সশস্ত্র সংঘর্ষে প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ায় জেএসএস (সন্তু গ্রুপ) ও ইউপিডিএফের (প্রসিত গ্রুপ) মধ্যে অস্ত্র বিরতি চুক্তি হয়েছিল। তবে এই চুক্তি ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক নেতারা। ইতোমধ্যে বিবদমান দল দুটির মধ্যে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

এদিকে পাহাড়ের দলগুলোর মধ্যে অস্থিরতার কারণে দিন দিন বাড়ছে আঞ্চলিক সংগঠনের সংখ্যা। নতুন নতুন দলে রূপান্তরিত এসব উপদলের সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ পাহাড়। এ অবস্থায় পাহাড়ের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তারে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চালানোর দাবিও তুলেছেন কেউ কেউ। প্রতিনিয়ত হামলা-পাল্টাহামলায় অস্থিতিশীল পার্বত্য এলাকার অর্থনীতিতেও

নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন তারা। এ ব্যাপারে রাঙ্গামাটির নারীনেত্রী ও মানবাধিকারকর্মী টুকু তালুকদার ভোরের কাগজকে বলেন, পাহাড়ে রাজনীতির মধ্যে প্রতিহিংসা ঢুকে পড়ায় হামলা বাড়ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, প্রতিহিংসা কেন ঘটবে? তাদের নেতারা তো এ রকম নয়। তাদের অনুসারীরাই এই কাজগুলো করছে। তাদের রক্তক্ষয়ী হামলায় কোনো মেয়ে স্বামীহারা, কেউ পিতৃহারা, কেউ সন্তানহারা হচ্ছে। আঞ্চলিক দলগুলোকে প্রতিহিংসায় না জড়িয়ে ধৈর্য ধরার আহŸান জানান এই মানবাধিকার কর্মী।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান ভোরের কাগজকে বলেন, পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানাচ্ছি। পার্বত্য চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন হলেই হয়তো এই সংঘাত অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যাবে। পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর হানাহানি ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত কারো জন্য ভালো নয়।

শান্তি ফিরেনি ২৩ বছরেও : ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হয়। ২৩ বছর আগে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় দিনে দিনে অশান্ত হয়ে ওঠে পাহাড়। জানতে চাইলে আদিবাসীবিষয়ক গবেষক, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল ভোরের কাগজকে বলেন, পাহাড়ে শান্তির জন্য প্রয়োজন শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। চুক্তি সম্পাদনের সময় সরকারের যে সদিচ্ছদা ও দুই পক্ষের বোঝাপড়া ছিল, ধীরে ধীরে বিরোধীপক্ষের নানামুখী অপতৎপরতায় চুক্তি বাস্তবায়নে ভাটা পড়েছে। সরকারও আশু সমস্যা সমাধানে মনোযোগী বেশি। তিনি বলেন, পাহাড়ের মূল সমস্যা ভ‚মি সমস্যার নিষ্পত্তি না হওয়া। ক্ষুদ্র নৃ-তান্ত্রিক জনগোষ্ঠীরা দিনদিন ভ‚মিহারা হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে তাদের ভ‚মি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। চিম্বুক পাহাড়ও দখল হয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ে ফাইভ স্টার হোটেলসহ সব ধরনের ট্যুরিজম বন্ধ করে ইকো ট্যুরিজম গড়ে তোলা প্রয়োজন।

শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে পাহাড়ে শান্তি ফিরবে এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো তৎপর হওয়ার দাবি তাদের। এ ব্যাপারে পার্বত্য অঞ্চলের প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে ভোরের কাগজকে বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ের অবৈধ অস্ত্র থাকা যেমন বেআইনি; তেমনি পার্বত্য শান্তিচুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নও কাম্য। পাহাড় থেকে অস্ত্র উঠে গেলে যেমন শান্তি ফিরে আসবে, তেমনি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন হলেই তার অনেকাংশে সমাধান হয়ে যাবে।

জানতে চাইলে রাঙ্গামাটির তরুণ রাজনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম মুন্না ভোরের কাগজকে বলেন, করোনার কারণে পাহাড়ের অর্থনৈতিক অবস্থা এমনিতেই নাজুক। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সেখানে আঞ্চলিক দলগুলোর সংঘাত পাহাড়কে আতঙ্কের জনপদে পরিণত করেছে। তিনি বলেন, আমরা এর অবসান চাই। পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করাটা খুবই জরুরি।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়