উত্তরে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস

আগের সংবাদ

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যকর করা কেন প্রয়োজন

পরের সংবাদ

আনওয়ানটেড চাইল্ড সমাজের ভয়াবহ গল্প

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৩, ২০২০ , ৯:৫৫ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৩, ২০২০ , ৯:৫৮ অপরাহ্ণ

কী দোষ এসব নবজাতকের! যে নারী ও পুরুষ তাদের লাগাম ছাড়া সম্পর্কের পরিণাম ‘নবজাতক’কে ছুড়ে দিচ্ছেন সমাজের পরিত্যক্ত জায়গায় তারা যে নবজাতক হয়েই এই পৃথিবীতে এসেছিলেন অনেক সমাদরে, সেই কথা বেমালুম ভুলে যান। নিজেদের অপরাধের শাস্তি নিষ্পাপ সন্তানকে দিচ্ছেন কত সহজে। মূল্যবোধের চাইতে যখন কামনা-বাসনা তীব্র আকার ধারণ করে তখন সম্ভবত এমন বিকারগ্রস্ত আচরণ করেন মানুষ।

এই পৃথিবী বেশি সুন্দর মানবগোষ্ঠীর কারণে। এক একজন মানবসন্তান ভূমিষ্ঠ হয় নির্মল, নিষ্পাপ সৌন্দর্য নিয়ে। পরিবেশ ও প্রকৃতির কাছ থেকে অপার দীক্ষা নিয়ে সেই মানবসন্তান পৃথিবীকে নিজের বাসযোগ্য করে তোলার সংগ্রামে লিপ্ত হয়। নিজে বেঁচে থাকে, অন্যকে বেঁচে থাকার পথ দেখায়। একপুরুষ থেকে অন্যপুরুষ পর্যন্ত এমন অনেক কীর্তি পৌঁছে যায়। মানবগোষ্ঠী তার ঐতিহ্য, সৌন্দর্য, ঐশ্বর্য, সম্পদ এভাবে ধরে রাখে। প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকে নির্যাস নিয়ে নিজেকে সুস্থ, সুন্দর রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা চলে। সম্ভবত সে কারণেই এই পৃথিবী অরেক বেশি সুন্দর। সংঘাত, দুর্যোগ তাই একেবারেই বিপর্যস্ত করে না তাকে। কিন্তু কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা মনকে মুষড়ে দেয়, জীবনকে থমকে দেয়। মনে হয় এমন নৃশংস অনুভূতি আর কখনোই অনুভব করা হয়নি।

একটা সমাজে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। নৃশংস, ভয়াবহতার রূপে আত্মপ্রকাশ করা এসব অপরাধ মানবজীবনে কঠিন আঘাত ফেলে। বিমর্ষ করে। ভীত, সন্ত্রস্ত করে। ধর্ষণ, হত্যা, গুম, অপহরণ, ছিনতাই, রাজনৈতিক সহিংসতা ও দুর্নীতির মতো অপরাধ সমাজে নিত্যদিনের ঘটনা। মিডিয়ায় এসব ঘটনা প্রতিদিন জায়গা করে নেয়, নিচ্ছে। পত্রিকার পাতায় জায়গা রেখে দিতে হয় পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে। পাঠক এসব সংবাদ পড়েন এবং আর জানতে পারেন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সামাজিক মূল্যবোধ, সঙ্গে আরো অনেক কিছু। আবার একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবং তার কারণ যখন শুনতে ও জানতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়েন তখন সবকিছুই তাদের কাছে সহনীয় হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অনেকটা বাধ্যবাধকতার মতো। শোনা ও দেখা ছাড়া করার কিছুই থাকে না সেখানে।

এমন সব অপ্রত্যাশিত ঘটনা সংবাদের পাশাপাশি মিডিয়ায় ইদানীং একটা ঘটনা সংবাদ জায়গা করে নিয়েছে। সংবাদটা হলো, নবজাতককে পথে-ঘাটে, জঙ্গলে ও আবর্জনা স্তূপে পাওয়া যাচ্ছে। জানা গেছে এক মাসে এমন সাতজন নবজাতককে কুড়িয়ে পাওয়া গেছে। শিউলি ফুল কুড়িয়ে নেয়ার মতো ক’জন হৃদয়বান পুলিশ সদস্য, নাগরিক এই মানবফুলদের কুড়িয়ে নিয়েছেন। হয়তো এ ধরনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। ইদানীং পত্রিকার পাতায় আসছে বলে মনে হতে পারে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা বেশি ঘটছে। যেটাই হোক এমন ঘটনা মানবমঞ্চের সব নৃশংসতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। বর্বরতাকে হার মানায়।

একবার লিখেছিলাম সন্তান জন্ম দিলেই একজন নারী ও পুরুষ মা-বাবা হতে পারেন না। সন্তান নেহাতই প্রজনন প্রক্রিয়ায় বিনা চাষের ফসল হয় তখন, যখন তাকে ফেলে রেখে যান কেউ অনায়াসে, অবলীলায় প্রবল ইচ্ছায়। তারা আদতে বাবা-মা হন না। হতে চান না। মা-বাবা হতে হলে মাতৃত্ব ও পিতৃত্ববোধ লাগে। পথে-ঘাটে, ডাস্টবিন কিংবা জঙ্গলে যেসব মানবসন্তান কুড়িয়ে পাওয়া যাচ্ছে এই জগতে নিশ্চয়ই তাদের কোনো বাবা-মা নেই, বাবা-মা থাকে না। নির্দ্বিধায় বলা যায় অনৈতিকভাবে প্রজনন প্রক্রিয়ায় লিপ্ত নারী ও পুরুষের অপকর্মের পরিণাম এসব নিষ্পাপ নবজাতকের দল।

একটি বেসরকারি চ্যানেলে এই প্রসঙ্গে মানবাধিকার নিয়ে কর্মরত একজন আইনজীবী পরামর্শ দিয়েছেন, এসব নবজাতককে চাইলে তার অভিভাবকরা শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে আসতে পারেন যেখানে-সেখানে ফেলে না দিয়ে। চমকে উঠলাম কথাটা শুনে। কানে বাজল কথাটা। প্রকৃত অভিভাবক কি কখনো তার নবজাতক সন্তানকে ডাস্টবিনে ফেলে রেখে যান? তিনি কাদের অভিভাবক বলছেন কিংবা অভিভাবকত্ব বলতে কী বুঝাতে চাইছেন, বুঝলাম না। হয়তো তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্কের ফলে ভূমিষ্ঠ নবজাতককে আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা যেতে পারে পথে-ঘাটে, ডাস্টবিনের আবর্জনা স্তূপে না ফেলে। আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয়হীন একজন মানবসন্তানের ঠাঁই পাওয়া তো কঠিন কোনো কাজ নয়। কঠিন বোধহয় সেটাই যে, অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি থেকে নারী ও পুরুষকে বিরত রাখা। এমন সম্পর্কে একজন নবজাতকের আবির্ভাবের সম্ভাবনা থাকে যার পরিচয় কিংবা সমাজে ঠাঁই দেয়ার যোগ্যতা বা ক্ষমতা সেসব নারী-পুরুষের থাকে না।

একজন সমাজবিদ অভিমত ব্যক্ত করলেন এভাবে যে, এসব নবজাতক প্রসবকারী কোনো নারী হয়তো সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না এই চক্ষুলজ্জায় নবজাতককে ফেলে দিতে কুণ্ঠিত হন না। ফেলে দেয়া ছাড়া কোনো পথ বা উপায় খুঁজে পান না। তার কথায় মনে হলো নবজাতককে আশ্রয়হীন করে দেয়ার ব্যাপারটিতে কেবল নারীই সম্পৃক্ত কিংবা দায়ী। মানবসন্তান ভূমিষ্ঠের নেপথ্যে যে একজন পুরুষ বড়বেশি সক্রিয় থাকেন তথাকথিত বিজ্ঞজনের মতামতে সেই আভাস থাকে না যদি না মতামত প্রদানকারী একজন পুরুষ হয়ে থাকেন।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলছিলেন, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে নবজাতক চুরি করার একটা সংঘবদ্ধ দল থাকে। যারা নবজাতক চুরি করে নিঃসন্তানদের কাছে বিক্রি করেন কিংবা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সেই নবজাতক নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাছে সম্পৃক্ত হন। অপ্রত্যাশিত নবজাতককে অনেকেই এই সংঘবদ্ধ দলের কাছে হস্তান্তর করেন স্বেচ্ছায়। কেউবা সংসারের আর্থিক অনটনের কারণে নিরুপায় হয়ে সন্তান ফেলে যান। যদিও এমন ঘটনার সংখ্যা নেহাতই কম। কী দোষ এসব নবজাতকের! যে নারী ও পুরুষ তাদের লাগাম ছাড়া সম্পর্কের পরিণাম ‘নবজাতক’কে ছুড়ে দিচ্ছেন সমাজের পরিত্যক্ত জায়গায় তারা যে নবজাতক হয়েই এই পৃথিবীতে এসেছিলেন অনেক সমাদরে, সেই কথা বেমালুম ভুলে যান। নিজেদের অপরাধের শাস্তি নিষ্পাপ সন্তানকে দিচ্ছেন কত সহজে। মূল্যবোধের চাইতে যখন কামনা-বাসনা তীব্র আকার ধারণ করে তখন সম্ভবত এমন বিকারগ্রস্ত আচরণ করেন মানুষ। অথচ পথে-ঘাটে যেসব প্রাণী তথা কুকুর ও বিড়ালের বসবাস তারা উন্মুক্ত ও অরক্ষিত জায়গায় বাচ্চা প্রাণীদের কীভাবে নিরাপত্তা দিয়ে রাখছে, আগলে রাখছে। মানুষের ভেতর সেই চেতনা নেই, নেই দায়বোধ।

অথচ এমন নারীও এই সমাজে আছেন যিনি সিঙ্গেল মাদার পরিচয়ে তার সন্তানকে গড়ে তুলেছেন। কোনো সংশয়, দ্বিধা নেই তার এই পরিচয়ে। শত প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে সন্তানকে তিনি ‘অপ্রত্যাশিত’ উপাধি থেকে রক্ষা করে চলেছেন। মানুষ ও মানবতার সর্বাগ্রে তিনি অবস্থান করে আছেন দৃঢ়চিত্তে এবং সম্পূর্ণ নিজস্বতায়। এই সমাজে ঠিক তার বিপরীত অবস্থান করছেন মানবতাহীন কিছু নারী ও পুরুষ। যারা শারীরিকভাবে সম্পর্ক গড়েন সামাজিক রীতিনীতির ঊর্ধ্বে আবেগে এবং আর পরিণতির দোষে শাস্তি দেন নিষ্পাপ নবজাতককে। এই নবজাতক অবশেষে ‘অপ্রত্যাশিত’ উপাধিতে ঠাঁই পায় ডাস্টবিন কিংবা পরিত্যক্ত জায়গায়।

নিঃসন্দেহে এ ধরনের ঘটনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া দরকার। একজন মানবসন্তানকে অনিরাপদ, অরক্ষিত করবার অধিকার কারোরই নেই। যিনি এমন কাজ করবেন তাকেই সমাজ থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা দরকার। সমাজচ্যুত করার দরকার। মানুষ হত্যার চেয়ে এ ধরনের অপরাধ কোনো অংশেই কম নয়, বরং বেশি। মানবসভ্যতার সৌন্দর্য বিনষ্ট করছে এরা। এ ধরনের ঘটনা থেকে সমাজ ও নবজাতককে রক্ষা করার জন্য এমন কথা ভাবা যায় কিনা যে, জাতীয় পরিচয়পত্রে ব্যক্তির ডিএনএ শনাক্ত করার কোনো সুযোগ রাখা যেন সহজেই অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। জাতীয় পরিচয়পত্রে নাগরিকের ব্যক্তিগত নম্বরের পাশাপাশি ডিএনএর একটা পরিচয় রাখা সম্ভব কিনা। প্রযুক্তিবিদরা ভালো বলতে পারবেন। তাহলে সম্ভবত নবজাতক ফেলে দেয়ার মানসিকতার অবসান হবে এবং সেই সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রবণতা কমবে। পাশাপাশি গোটা শহর সিসিটিভি ক্যামেরায় দৃশ্যমানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে অপরাধীকে শনাক্ত করার প্রয়োজনে।

পরিশেষে বলি, প্রতিটি ভূমিষ্ঠ সন্তানই তার বাবা-মায়ের কোলে আশ্রয় পাক। আনওয়ানটেড চাইল্ড উপাধিতে এই বসুন্ধরায় না আসুক। শৃঙ্খলা আসুক ব্যক্তির মনমানসিকতায় এবং রাষ্ট্র হোক সেই মনমানসিকতার অন্যতম কারিগর। মনে রাখা দরকার যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা তখনই নিশ্চিত হবে যখন একজন নাগরিক নিরাপদ হবেন। হোক সে নবজাতক কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক কেউ।

স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।
[email protected]

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়