অব্যাহতি পেলেন আ.লীগ সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক

আগের সংবাদ
ড.-রাহমান-নাসির-উদ্দিন

মিয়ানমারের গণতন্ত্রায়ন, ‘মহামানবী’ সু চি (!) ও রোহিঙ্গা সংকট

পরের সংবাদ

সাকিব আল হাসানদের চ্যালেঞ্জিং লাইফ!

প্রকাশিত: নভেম্বর ২২, ২০২০ , ৮:৫৯ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২২, ২০২০ , ৯:০২ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা সাকিব আল হাসান সম্প্রতি নতুন এক বিতর্কের মুখে পড়েছেন। বিতর্ক যেন কিছুতেই তার পিছু ছাড়তে চাইছে না। আইসিসির এক বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে সাকিব আল হাসান যখন সবেমাত্র খেলার মাঠে ফিরছেন, ভক্ত-অনুরক্তরা মাঠে নতুন করে তাদের প্রিয় তারকার ক্রীড়াশৈলী দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, তখন নতুন এ বিতর্ক তার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

বিতর্ক অবশ্য সাকিব আল হাসানের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। কখনো তার পরিবারের সঙ্গে বিরূপ আচরণকারী দর্শকের সঙ্গে মেজাজ দেখিয়ে, কখনো বোর্ডের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে, আর বছরখানেক আগে জুয়াড়ির দেয়া ম্যাচ-ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব গোপন করার দায়ে অভিযুক্ত হয়ে তিনি একের পর এক সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। তবে এবারের বিতর্কের প্রকৃতি একটু ভিন্ন। কলকাতার কোনো এক পূজার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, তার সমালোচকদের ভাষায় এ অনুষ্ঠান ‘উদ্বোধনের’ খবরে ভীষণ চটেছে দেশের একটি মহল। তারা মনে করে, সাকিব একজন মুসলিম হয়ে ওভাবে পূজার অনুষ্ঠান ‘উদ্বোধন’ করে মোটেই ঠিক করেননি। কোনো এক ভক্ত তো রীতিমতো ফেসবুক লাইভে এসে রাম দা উঁচিয়ে তাকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়ে বসেছেন। শেষ অবধি এমনকি সাকিব আল হাসানকে সংবাদ মাধ্যমে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে কারো অনুভ‚তিতে আঘাত লেগে থাকলে তজ্জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়েছে। এতে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে বটে, তবে পুরোপুরি নিরসন হয়েছে কিনা বলা মুশকিল।

এদেশের মানুষ ক্রীড়ামোদী। খেলাধুলা তাদের ভীষণ আকর্ষণ করে। ’৭০-এর দশক পর্যন্ত দেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রধান আকর্ষণ ছিল ফুটবল। ক্রিকেট এ দেশের খেলাধুলার জগতে একরকম অপরিচিতই ছিল বলা চলে। অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ সম্ভবত এই যে, খেলা হিসেবে এটি অনেক ব্যয়বহুল, তাছাড়া জটিল সব নিয়মকানুনে পরিচালিত হয়। ’৮০-এর দশক থেকে এদেশে ক্রিকেট বিকশিত হতে শুরু করে। আজকের এ অবস্থানে আসতে এদেশের বিগত প্রজন্মের ক্রিকেটারদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। যদ্দুর মনে পড়ে, ’৮০ বা ’৯০-এর দশকের কোনো এক সময়ে ফুটবলের সঙ্গে দ্বন্দ্বে চাহিদামতো মাঠ না পাওয়ার দুঃখে দেশের ক্রিকেট খেলোয়াড়রা একবার রাজপথে ক্রিকেট খেলার কর্মসূচি দিয়েছিলেন। ’৯০-এর দশকে আকরাম-বুলবুলদের হাত ধরে আইসিসি ট্রফি জেতা, পর পর ক’টি ওয়ানডে বিশ্বকাপে দুয়েকটি ক্রিকেট জায়ান্টকে হারিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি, প্রথমে ওয়ানডে এবং পরবর্তী সময়ে টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তি- এসব অর্জনের মধ্য দিয়ে গত কয়েক দশকের প্রচেষ্টায় আজ দেশের ক্রিকেট এমন এক অবস্থানে উপনীত হয়েছে, বলতে পারেন আর কোনো ক্রীড়া তার ধারেকাছেও নেই। খেলোয়াড়রা সবসময় দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও তারা তাদের পাশে থেকেছে, উৎসাহ জুগিয়ে গেছে। এদেশের মানুষের কাছে খেলাধুলা আর ক্রিকেট কেমন যেন সমার্থক হয়ে উঠেছে। তেমনি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে আজকের দিনে ক্রিকেটই দেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। শুধুই কী তাই? এদেশের মানুষের জন্য ক্রিকেট একটি ঐক্যের সূত্র বিশেষ, যেখানে সবাই একাকার হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ক্রীড়াবিদরা যখন কোনো প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন, তখন দেশের ১৭ কোটি মানুষের মন পড়ে থাকে খেলার মাঠে, সব ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলে কায়মনোবাক্যে তাদের সাফল্য কামনা করে। বহু দল-উপদলে বিভক্ত এ দেশটিতে আপনি তখন একটি দলই খুঁজে পাবেন, যেটির নাম বাংলাদেশ।

কালের পরিক্রমায় এ দেশ অনেক গুণী ক্রিকেটারের জন্ম দিয়েছে, যাদের ওপর ভর করে দেশের ক্রিকেট আজকের অবস্থানে আসতে সক্ষম হয়েছে। এক এক করে অনেকের নামই বলা যাবে, যারা সময় সময় তাদের অপূর্ব ক্রীড়াশৈলী দিয়ে দেশের ক্রীড়ামোদী জনতাকে বিমোহিত করেছেন, বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে উজ্জ্বল করেছেন দেশের মুখ। তবে এসব তারকার ভিড়ে যে খেলোয়াড়টি ধারাবাহিকভাবে তার ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়ে গেছেন, সবার মনের মণিকোঠায় এক অনন্য আসন তৈরি করে নিয়েছেন, সে খেলোয়াড়টি আর কেউ নন, সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনেক সাফল্যের কারিগর এ জীবন্ত কিংবদন্তির ঝুলিতে দীর্ঘ সময় একই সঙ্গে ক্রিকেটের সব ফরম্যাটে সেরা অলরাউন্ডারের আসনটি ধরে রাখার মতো কৃতিত্ব রয়েছে। গত ওয়ানডে বিশ্বকাপে তার চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্স তাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়।

আপনি মনে করতে পারেন, একজন খেলোয়াড় হিসেবে যা চাওয়া-পাওয়ার থাকে, তার অনেক কিছুই সাকিব আল হাসান এরই মধ্যে অর্জন করেছেন। ক্রিকেটের প্রতি এ দেশের মানুষের অসাধারণ অনুরাগ আর এই অঙ্গনে অবিরাম আলো ছড়িয়ে যাওয়া সাকিবকে এদেশের তরুণ-যুবাদের কাছে একটি আইকনে পরিণত করেছে। সাকিবের কথাবার্তা, চলাফেরা, আহারবিহার, চিন্তা-চেতনা- এ সবই তার ভক্ত-অনুরক্তদের কাছে নিত্য আলোচনার বিষয়, অনুসরণীয়, অনুকরণীয়। এড ফার্মসমূহ তো আর এমনি এমনি সাকিবদের নিয়ে নিত্যনতুন এড তৈরি করে না! এটা নিঃসন্দেহে একজন সাকিবের জন্য অতুলনীয় আনন্দের, অপরিসীম গৌরবের। সমস্যা হচ্ছে, এর ফলে বরাবর জনপ্রিয় সেলিব্রিটিদের ক্ষেত্রে যেমনটি হয়, সাকিব আল হাসানদের আর ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু থাকে না। ক্যামেরা সব সময় তাদের অনুসরণ করে ফিরে। বলা তো যায় না, ভক্তদের শেয়ার করার মতো কখন কী মিলে যায়। কিন্তু সাকিব আল হাসানরা তো মানুষ বৈ কিছু নন। একজন মানুষের সব কাজই ভালো হবে, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে সেটা তো আপনি আশা করতে পারেন না। কিন্তু কিছু অতি আবেগি লোক ভাবেন, এটি যেহেতু সাকিব আল হাসান, তার প্রতিটি চিন্তা, প্রতি কর্ম পারফেক্ট হতে হবে। ঝামেলাটা বাধে এখানেই। পান থেকে চুন খসলেই গেল গেল রব উঠে, শুরু হয় দুয়ো ধ্বনি। কেন বাবা? মানুষের কি ভুল হতে পারে না? তবে হ্যাঁ, এটা অবশ্যই ঠিক, জনপ্রত্যাশা বিবেচনায় সাকিবদের সদা সাবধানে পা ফেলা দরকার। সাকিব যে এ বিষয়ে সচেতন নন এমনটি মনে করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। তারপরও সাকিব তো একজন মানুষ, ত্রæটি বিচ্যুতি হতেই পারে।

এদেশের আরো অসংখ্য মানুষের মতো সাকিব আল হাসানও একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আমার বিশ্বাস, তিনি নিয়মিত নামাজ পড়েন। সাধারণত এ দেশে মানুষ সব চাওয়া-পাওয়া শেষ হওয়ার পর জীবন সায়াহ্নে এসে হজব্রত পালন করেন। সাকিব এই তরুণ বয়সেই হজব্রত সম্পাদন করেছেন। শুধু সাকিব একাই নন, বাংলাদেশ টিমের অনেক খেলোয়াড় এমনকি রমজানের সময় রোজা রেখে খেলায় অংশ নেন বলে বিভিন্ন সময় সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। যদ্দুর মনে পড়ে, কোনো একদিন ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে সাকিব বলছিলেন, তার টিমের বেশিরভাগ খেলোয়াড় নামাজ-কালামে অনুরক্ত। এরকম একজন সাকিব আল হাসান, যিনি একই সঙ্গে এ দেশের তরুণ-যুবাদের কাছে একজন আইকন, পূজার অনুষ্ঠান ‘উদ্বোধন’ করতে যাবেন তেমনটি হয়তো অনেকেই প্রত্যাশা করেননি। হতেই পারে। এ বিষয়ে সাকিব আল হাসান কি বলেন তা একবার শোনা উচিত নয় কি? তার ব্যাখ্যা যদি আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত না হয়, আপনি যদি মনে করেন একজন মুসলিম হিসেবে, এ দেশের হাজারো তরুণ-যুবকের আইডল হিসেবে তার এটা করা উচিত হয়নি, তাহলে আপনি অবশ্যই এটার সমালোচনা করতে পারেন। আপনি সরাসরি কিংবা মিডিয়ার মাধ্যমে অবশ্যই আপনার ক্ষোভ, দুঃখ, মনোবেদনা তার সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন। তবে আপনি নিশ্চয়ই তাকে হত্যার হুমকি দিতে পারেন না। তাছাড়া আপনার এটাও খেয়াল রাখা দরকার, আপনার সমালোচনা যেন বিষোদগারে পরিণত না হয়।

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন : অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাবি।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়