সাকিব আল হাসানদের চ্যালেঞ্জিং লাইফ!

আগের সংবাদ

কলকারখানার দূষনে কৃষি জমি ও জলাভূমি নষ্টের প্রতিবাদে মানববন্ধন

পরের সংবাদ

মিয়ানমারের গণতন্ত্রায়ন, ‘মহামানবী’ সু চি (!) ও রোহিঙ্গা সংকট

প্রকাশিত: নভেম্বর ২২, ২০২০ , ৯:০৭ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২২, ২০২০ , ৯:১৩ অপরাহ্ণ
ড.-রাহমান-নাসির-উদ্দিন

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নানান সংকট, যুগ যুগ ধরে জাতিগত সংখ্যালঘু নির্যাতন, প্রেস ফ্রিডমের অভাব, স্বাধীন একাডেমিয়ার অভাব, সর্বত্র মিলিটারি আধিপত্য এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলে জাতিসংঘসহ বিশ্বব্যাপী যেসব বিলাপ এবং আহাজারি শোনা যায়, তার আল্টিমেট সমাধান হিসেবে সবার প্রেসক্রিপশন হচ্ছে ‘মিয়ানমারের গণতন্ত্রায়ন’। বৃহত্তর সংজ্ঞায়নে গণতন্ত্রায়ন বলতে যা বোঝায়, যদি সত্যিকার অর্থে তা হয়ে থাকে তাহলে রোহিঙ্গা সমস্যারও সমাধান মূলত নিহিত আছে মিয়ানমারের গণতন্ত্রায়নের ওপর। কিন্তু এখন মিয়ানমারের গণতন্ত্র কোথা থেকে আমদানি হবে বা কোথা থেকে নাজিল হবে, সে বিষয়ে কারো কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই। তবে অনেক মিয়ানমার বিশেষজ্ঞকে বহুবার বলতে শুনেছি, মিয়ানমারের গণতন্ত্রায়ন হবে মিলিটারিদের মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ‘বোঝ’ দিয়ে রাখা আর পাঁচ বছর পর পর তথাকথিত ‘বহুদলীয় নির্বাচনের’ মাধ্যমে সু চি’কে ‘মহামানবী’ হিসেবে নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে। তাই গত ৮ নভেম্বর মিয়ানমারে যে সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেল, সেটাও মিয়ানমারের গণতন্ত্রায়নের একটি ধাপ হিসেবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু যে নির্বাচনকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নির্বাচনের এক মাস আগেই বলেছে ‘ভেতর থেকেই গলদ’, তাকে দিয়ে কীভাবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হবে? যে নির্বাচনকে জাতিসংঘসহ পৃথিবীর বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বারবার বলেছে, এটা কোনো ‘ফ্রি এন্ড ফেয়ার ইলেকশন নয়’, সে নির্বাচন দিয়ে কীভাবে মিয়ানমারের গণতন্ত্রায়ন হবে? যে নির্বাচনের আগেই এক সময়কার গণতন্ত্রের আইকন হিসেবে পরিচিত অন সাং সু চি ‘লৌহমানবী’ হিসেবে খেতাব পেয়েছে, সে নির্বাচন কীভাবে তাকে ‘মহামানবী’ হিসেবে গড়ে তুলবে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।

ট্রাম্পের বিরামহীন উৎপাত এবং মার্কিন নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে ঢাকা পড়ে ৮ নভেম্বর খানিকটা চুপিসারে অনুষ্ঠিত হলো মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচন যার মাধ্যমে মিয়ানমার পার্লামেন্টের ‘হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ’ বা লোয়ার হাউস বা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ এবং ‘হাউস অব ন্যাশনালিটিজ’ বা আপার হাউস বা পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের জন্য আগামী পাঁচ বছরের প্রতিনিধি নির্বাচিত হলো। ঝামেলা-বিবেচনায় এ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এবং কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলে কিছু কিছু আন্তর্জাতিক মিডিয়া আমাদের জানাচ্ছে। করোনা মহামারিকালে ভোটারের সংখ্যাও প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে বলে পরিসংখ্যান বলে। বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ৪৪০টি আসনের মধ্যে সু চি’র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বা এনএলডি পেয়েছে ৩১৫টি যেখানে ২২১টি পেলেই সরকার গঠন করার জন্য যথেষ্ট। আর পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে যেখানে ২২৪টি আসনের মধ্যে ১১৩টি পেলেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া যায় সেখানে সু চি’র দল পেয়েছে ১৬১টি। সুতরাং খুব সহজেই বলা যায়, এনএলডি ভূমিধস বিজয় নিয়ে আগামী ৫ বছরের জন্য নতুন করে সরকার গঠন করছে। অন্তত পরিসংখ্যান তাই বলে। তবে কথায় আছে, পরিসংখ্যান কখনো মিথ্যা কথা বলে না সত্য, কিন্তু যারা পরিসংখ্যান তৈরি করে তারাও কখনো সত্য বলে না- এটা সত্য। সে কারণেই বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রীয় সংখ্যাতত্ত¡ সবসময় একটি কেন্দ্রীয় সন্দেহের জায়গা। তথাপি প্রশ্ন এ নির্বাচন মিয়ানমারকে কতটা গণতান্ত্রিক করে গড়ে তুলবে! গত ১৮ নভেম্বর, ২০২০ জাতিসংঘের তৃতীয় কমিটি (যারা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি ধারণা দেয়) মিয়ানমারের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে সাধারণ পরিষদে পেশ করেছে। এবং পরিস্থিতি যে বেশ উদ্বেগজনক সেটা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কেননা নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই যেসব সিদ্ধান্ত সু চি’র সরকার নিয়েছে এবং সেটা কঠোর হস্তে কার্যকর করেছে, তাতে নির্বাচনের আগেই গণতন্ত্রের বারোটা বাজার জোগাড়! যেমন- মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনে বসবাসরত প্রায় ২২ লাখ এথনিক মাইনোরিটিকে (সান, কাচিন, রাখাইন, রোহিঙ্গাসহ) ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের নানান অজুহাতে এবং মিথ্যা যুক্তিতে প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে, মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যে বিদ্রোহী দমনের নামে মিলিটারি দিয়ে একটা ত্রাসের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এথনিক মেজরিটি বামার ছাড়া অন্যদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, প্রায় ৫৭টি টাউনশিপের যেখানে সু চি’র দল এনএলডির হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে সেখানে সাধারণ নির্বাচনের ভোট স্থগিত করা হয়েছে, নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে এ অজুহাতে নির্বাচনের আগেই ব্যাপক ধরপাকড় করে অসংখ্য ভোটারকে জেলে প্রেরণ করা হয়েছে, মিডিয়াকে রাষ্ট্র কর্তৃক শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে প্রভৃতিই বলে দেয় মিয়ানমারের নির্বাচন কেমন হয়েছে। যে নির্বাচনের প্রক্রিয়াই গণতান্ত্রিক না, সে নির্বাচনের মাধ্যমে কীভাবে মিয়ানমারের গণতন্ত্রায়ন হবে, সেটাই একটা বড় বিস্ময় বটে। ২০০৮ সালে সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জন্য পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ আসন এবং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ রাখা হয়। অর্থাৎ মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনে ২৫ শতাংশ আসনে নির্বাচনই হয় না। যে পার্লামেন্টে এক-চতুর্থাংশ আসনে নির্বাচনই হয় না অর্থাৎ যে পার্লামেন্টের এক-চতুর্থাংশ জনগণের প্রতিনিধিত্ব থাকে না, সে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দেশের আদৌ কোনো ধরনের গণতন্ত্রায়ন হয় কিনা, সেটা উপলব্ধির জন্য রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

আর সু চি’র ‘মহামানবী’ ইমেজ একটা পশ্চিমা নির্মাণ ছাড়া কিছুই নয়। পশ্চিমা দুনিয়া এবং মিডিয়া গণতন্ত্রহীন একটি সামরিক বাহিনী শাসিত দেশ হিসেবে মিয়ানমার থেকে ‘চুজ এন্ড পিক’ থিওরি দিয়ে সু চি’কে নির্মাণ করে গণতন্ত্রের মানসকন্যা হিসেবে। অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট, ব্রিটিশ স্বামী, ইংরেজিতে রাজনৈতিক বক্তৃতাদানে পটু, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কন্যা এবং বুদ্ধিস্ট মেজরিটির দেশে নারী নেতৃত্ব প্রভৃতির মিশেলে সু চি হয়ে উঠে গণতন্ত্রের আইকন। দশ আনা যোগ্যতাকে ছয় আনা রং নিয়ে ষোলোআনা গণতন্ত্রের আইকন হিসেবে সু চি নির্মাণের পেছনে আরো বড় ভূমিকা রাখে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। এসবই পশ্চিমার তেলেসমাতি! তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, বার্মা/মিয়ানমারের জন্য সু চি’র ত্যাগও কম নয়। প্রধানমন্ত্রী বাবাকে হারিয়েছেন, বছরের পর বছর গৃহবন্দি হিসেবে জীবন পার করেছেন, স্বামীর মৃত্যুতে দেখতে পর্যন্ত যেতে পারেননি, সন্তান-সন্তুতিদের মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছেন, ২০১৫ সালে বিপুল ভোটে (২০১৫ সালের নির্বাচনে সংসদের প্রায় ৮৬ শতাংশ আসনে অর্থাৎ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ২৩৫টি আসনে এবং পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে ১৩৫টি আসন এনএলডি জয়লাভ করে) নির্বাচিত হওয়ার পরও সরকার প্রধান বা হ্যাড অব দ্য গভর্নমেন্ট হতে পারেননি বিদেশি স্বামী ও সন্তান থাকার কারণে। কিন্তু জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিপীড়ন, নির্যাতন এবং তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে সু চি’র পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতা তাকে গণতন্ত্রের আইনকন থেকে জেনোসাইড সংঘটনের সমর্থকে পরিণত করেছে। তাই আন্তর্জাতিকভাবে সু চি’র সে ইমেজ আজ ভ‚লুণ্ঠিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সু চি’কে বয়কট করার কর্মসূচি চলছে। অনেক দেশে গণতন্ত্রের মানসকন্যা হিসেবে দেয়া অনেক পুরস্কার ফেরত নেয়া হয়েছে এবং অনেক পুরস্কার বাতিল করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের আগস্টের ২৫ তারিখের পর রাখাইনে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের ওপর যে অমানবিক নির্যাতন, নিষ্ঠুর অত্যাচার, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং জেনোসাইড চালানো হয়েছে, তার পেছনের সু চি’র ছিল পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ সমর্থন। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জেনোসাইডের যে বিচার চলছে, সেখানে সু চি সশরীরে হাজির হয়ে সরাসরি সেনাবাহিনীর পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করায় সু চি’র গণতন্ত্রের যে আইকনিক ইমেজ সেটা বিশ্ববাসীর সামনে রীতিমতো ধসে পড়েছে। তাই নির্বাচনের মাধ্যমে মিয়ানমারের গণতন্ত্রায়ন হবে আর সু চি’র মধ্য দিয়ে ‘মহামানবী’তে পরিণত হবে, এটা খানিকটা আষাঢ়ের গল্পের মতো শোনায়। সুতরাং সে আশার গুড়েবালি! তাছাড়া সু চি’র পুরো রাজনৈতিক ভিত্তিমূল হচ্ছে পপুলার বুদ্ধিস্ট ‘বামারইজম’ যার বাইরে গিয়ে রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য এথনিক মাইনোরিটির জন্য কথা বলা সু চি’র জন্য আত্মহত্যার শামিল। আর ‘মহামানবী’ হওয়ার খায়েস নিয়ে সু চি আত্মহত্যা করবেন, সেটা যারা বোকার স্বর্গে বাস করেন, তারাই প্রেডিক্ট করতে পারেন।

পরিশেষে, রোহিঙ্গা সংকটের কথা বলতে গেলে সোজা বাংলায় বলা যায়, মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কোনো ভূমিকাই রাখবে না। কেননা, সু চি যে এবার ২০১৫ সালের চেয়ে অধিক জনপ্রিয়তায় নির্বাচিত হয়েছেন, এর অন্যতম একটি প্রধান কারণ হচ্ছে, রোহিঙ্গা জেনোসাইডের অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডসের হ্যাগে যে বিচার চলছে সু চি সেখানে সেনাবাহিনীর পক্ষে এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন। সুতরাং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করার জন্য যিনি বাড়তি জনপ্রিয়তায় নির্বাচিত হন, তার হাতে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান আশা করা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছুই নয়। অতএব পিরিয়ডিক এ নির্বাচন যেমন মিয়ানমারে গণতন্ত্র আনবে না, তেমনি সু চি’কেও ‘মহামানবী’ বানাতে পারবে না। ফলে নির্বাচনের হাত ধরে নতুন সরকারের কাছে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানও আশা করা নিরর্থক। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান জরুরি এবং এর সব দায়দায়িত্ব বিশ্বসম্প্রদায়কেই নিতে হবে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়