বসছে ৩৮তম স্প্যান, দৃশ্যমান হবে পৌনে ৬ কিলোমিটার

আগের সংবাদ

কুড়িগ্রামে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি যুবক নিহত

পরের সংবাদ

সৌমিত্র অবিনশ্বর…

প্রকাশিত: নভেম্বর ২১, ২০২০ , ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২১, ২০২০ , ১১:২০ পূর্বাহ্ণ

আপাদমস্তকে তিনি ছিলেন একজন অভিনেতা। জীবনের শেষ দিনগুলোতে সৌমিত্র হয়ে উঠেছিলেন টলিউডের মহীরুহ। তার স্নিগ্ধ ছায়ার উপস্থিতিতে চলচ্চিত্র পেতো এক ভিন্ন মাত্রা। মনুমেন্টাল চরিত্রের জন্য হয়তো তিনি ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের শেষ আশ্রয়স্থল। এমন একজন ধ্রুপদী অভিনেতার মৃত্যুর খবরে তাই স্বাভাবিকভাবেই মন খারাপের পাল্লাটা বেশ ভারি হতে থাকে সিনেমাপ্রেমীদের। অজান্তেই মনে ভেসে উঠে বেশকিছু সিনেমার দৃশ্য। ‘রেললাইন ধরে একা একা শিশুসুলভ ভঙ্গিতে পাঁচিল ডিঙিয়ে অপুর বাড়ি ফেরা’ অথবা ‘বেলাশেষে’ সিনেমার সেই বিশ্বনাথবাবুর কর্মকাণ্ড কিংবা ‘তিন ভুবনের পারে’ সিনেমার সেই নেচে ওঠা মন্টুর কথা। দর্শকদের প্রিয় এমন শত শত চরিত্রের রূপকার ছিলেন কিংবদন্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

ক্যারিয়ারে প্রায় তিনশোরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ছোটবেলাতেই অভিনয়ের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিলেন তিনি। স্কুল-কলেজ জীবনে আকড়ে ছিলেন থিয়েটারকে। একই সঙ্গে পেয়ে বসেছিল তাকে কবিতা লেখা-আবৃত্তি করা আর সিনেমা দেখার নেশা। অল্প বয়সেই দেখে ফেলেছিলেন শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন ভিট্টোরিও ডি সিকার ‘বাইসাইকেল থিবস’ কিংবা ‘মিরাকল ইন মিলান’র মতো সিনেমা কিছু। যা সিনেমা সম্পর্কে সৌমিত্রর মনে নতুন চেতনার প্রলেপ মেখে দেয়। ফলে বাংলা চলচ্চিত্র নিয়েও তিনি তখন ভাবতে শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পায় নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়, নিজের জীবনে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছি যে আমি অভিনয়ই করব। ‘পথের পাঁচালী’ এই রকম মানসিক অবস্থাতে একটা বড় ধাক্কা দিল। হলিউডের বিখ্যাত ছবিগুলো দেখার পরিপ্রেক্ষিতেও আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে ‘পথের পাঁচালী’ একটা অসামান্য সৃষ্টি। পরিষ্কারভাবে বলি, তার আগে বাংলা সিনেমা সম্পর্কে আমার উঁচু ধারণা ছিল না। সিনেমায় অভিনয় নিয়ে আমার মনে একধরনের অনীহা ছিল, এসব সিনেমা সম্পর্কে তখনকার ভুল ধারণার প্রতিফলন। আমরা সিনেমাকে তখনো তেমন আমল দিতাম না, বরং থিয়েটার করব, থিয়েটার নিয়েই থাকব এমন বাসনাই তখন অদম্য হয়ে উঠেছিল।’ কথাগুলো সৌমিত্র বলেছিলেন তার ‘মানিকদার সঙ্গে’ বইয়ে।

যে নির্মাতার প্রতি সৌমিত্রের এত মুগ্ধতা, তার সিনেমাতে অভিনয় করেই রঙিন পর্দায় অভিষেক করেছিলেন সৌমিত্র। ১৯৫৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল সৌমিত্রের ‘অপুর সংসার’। বাকিটা ইতিহাস। এ সিনেমায় দেখা মেলেছে কবি অপুর; যে কিনা উপন্যাস লিখতে চায়, কবিতা লেখে ও নৌকায় দুলতে দুলতে আবৃত্তি করে রবীন্দ্রনাথ।

এছাড়াও সৌমিত্রকে সৌমিত্রের মতো করে পাওয়া গিয়েছে বেশ কিছু সিনেমায়। যেখানে সিনেমার চরিত্র তার বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি। সত্যজিতের ‘চারুলতা’ সিনেমার ‘অমল’, গৌতম ঘোষের ‘দেখা’ সিনেমার ‘শশী’ কিংবা তরুণ নির্মাতা শঙ্খ ঘোষের ‘এবং বিসর্জন’ সিনেমার ‘মাস্টারবাবু’। সব যেন অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়েরই জীবনধ্বনি। ১৯৭৫ সালে বের হয় সৌমিত্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াব বলে’।

কবিতা লেখা প্রসঙ্গে কবি জয় গোস্বামী একবার সৌমিত্রকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- আপনি তো অভিনয়ের মধ্য দিয়ে, সিনেমায় এবং নাটকে, দুভাবেই নিজের সত্তাকে প্রকাশ করতে পারেন। তা করেও চলেছেন অব্যাহত ভাবে। তা হলে আবার আপনার কবিতা লেখার দরকার হয় কেন? কবিতা তো মানুষ নিজেকে প্রকাশ করার জন্যই লেখে। আপনি তো অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সেই প্রকাশ সম্ভব করতে পারছেন। তা হলে কবিতা কেন? উত্তরে কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘অভিনয়ের সময় কী হয় জানো, আমি কোনো একটা চরিত্রের অন্তরালে আত্মগোপন করি। বলা যায়, চরিত্রটিকে সামনে রেখে তার পিছনে লুকিয়ে পড়ি। বা উবু হয়ে বসে থাকি। চরিত্রটিই তখন আমার আড়াল। এই বার সেই চরিত্রের সত্তার সঙ্গে নিজেকে অল্প অল্প করে মিশিয়ে চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তোলার কাজটা শুরু হয় আমার মধ্যে। কিন্তু কবিতা লেখার চেষ্টা যখন করি তখন ব্যাপারটা হয়ে যায় একেবারে অন্য রকম। তখন কোনো চরিত্রের মধ্যে ঢুকে আমাকে কথা বলতে হচ্ছে না আর। এই আমি, মানে আমার যা সারাংশ, তাকেই আমি সরাসরি কবিতায় বলতে পারছি। এই নিজের সারাংশকে বলার চেষ্টা আমার কলেজজীবন থেকেই সঙ্গে থেকে গেছে।’ এই হল সৌমিত্র, বহুমাত্রিক সৌমিত্র। মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে তার সিনেমা ‘অবলম্বন’। সেখানেও তাকে দেখা যাবে একজন লেখকরূপে। আর চিরতরে ঘুমের দেশে যাওয়ার সৌমিত্র সম্পন্ন করেছিলেন তার বায়োপিক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় নির্মিত ‘অভিযান’র শুটিং। এই সিনেমাটিও থেকে গেছে মুক্তির প্রতীক্ষায়।

ব্যক্তিজীবনে কবিতা-অভিনয়-আবৃত্তি ছাড়াও একজন সংগঠক ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। করেছেন ‘এক্ষণ’ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদনা, যে পত্রিকার জন্য লিখতেন ও প্রচ্ছদ এঁকে দিতেন নির্মাতা সত্যজিৎ রায়। এছাড়া টলিউডের ‘আর্টিস্ট ফোরাম’র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সৌমিত্র। ১৯৩৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন চলচ্চিত্রের এই মহাপুরুষ। জীবনের প্রথম ১০ বছর সৌমিত্র কাটিয়েছিলেন কৃষ্ণনগরে। আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কাছে কয়াগ্রামে। ৮৬ বছর বয়সে গত ১৫ নভেম্বর পৃথিবী ছেড়ে চিরতরে চলে যান সৌমিত্র। স্মৃতির ক্যানভাসে আজো জীবন্ত হয়ে আছে তার সিনেমার চরিত্ররা। কানে বেজে উঠছে তার সিনেমার গানগুলো। সৌমিত্রও একদিন আবৃত্তি করেছিলেন, ‘এখানে ব্যাংক-ব্যালেন্স আছে/ফিক্সড ডিপোজিট আছে/প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে/গ্র্যাচুয়িটি আছে/পেনশন আছে/ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড আছে/তা থাক- তাতে আমার কী/সব পড়ে থাক/ মৃত্যু আয়, তিন পাত্তি খেলি আয়’। অবশেষে সাঙ্গ হলো মৃত্যুর সঙ্গে সেই তিন পাত্তি খেলা। তবুও বাঙালির মানসপটে সৌমিত্র অবিনশ্বর।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়
close