হেমন্তের ঝরাপাতা

আগের সংবাদ

নিয়তি আর মিনতির মধ্যবর্তী অনুসর্গ

পরের সংবাদ

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জলপ্রপাতের কবিতারা

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৯, ২০২০ , ৯:৩০ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২০, ২০২০ , ১২:৩৮ অপরাহ্ণ

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যে আদপে কবি সে কথা কবিতা লেখা শুরু করার সময় আমরা বা আমাদের বয়েসি অনেকেই জানতাম না। শুধু জানতাম তার মতো অসাধারণ অভিনেতা খুব কমই জন্মেছেন এদেশে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে আলাপ হওয়ার পরে জেনেছিলাম তার কবিসত্তার কথা। ১৯৫৯-এ প্রথম ছবি ‘অপুর সংসার’-এ সৌমিত্রকে কবি অপু হিসেবে দেখা গিয়েছে। তারপর থেকে তার চলচ্চিত্র জগতে অভিযান অব্যাহত থেকেছে। অথচ ‘এক্ষণ’ নামে লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ১৯৬১ সালে। আমরা জানতাম এই লিটল ম্যাগাজিনের পেছনে ছিলেন সত্যজিৎ রায় কারণ তিনি ‘এক্ষণ’-এর প্রচ্ছদ আঁকতেন। সুনীলদার কাছে প্রথম দেখলাম কবি সৌমিত্রর ১৯৭৫-এ প্রথম প্রকাশিত বই, ‘জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াব বলে’। গল্পটা পরে শুনেছিলাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মুখে “শক্তির জন্যই তো আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াব বলে’ প্রকাশিত হয়। অনেকদিন ধরেই ও বলছিল ‘পুলুবাবু একটা কবিতার বই বের করো।’ কিন্তু আমার মনে হতো তখনও সময় আসেনি। এই করতে করতে চল্লিশ বছর বয়সে শক্তি উঠে পড়ে লাগল। এক প্রকাশক ওর কাছে এসে হাজির আমার কবিতাগুলো বই আকারে বের করবে বলে। শক্তি আমায় বলল, ‘দ্যাখ পুলু, প্রকাশক নিজে এসেছে। আমরা চেষ্টাচরিত্র করে যোগাড় করিনি যখন এবার বই বের হওয়া উচিত।’ ৫৪টি কবিতার সেই সংকলন প্রথম প্রকাশ করেছিল অন্নপূর্ণা পাবলিশিং হাউস। প্রচ্ছদশিল্পী সত্যজিৎ রায়। কেমন লিখেছিলেন তিনি প্রথম প্রকাশিত কবিতাগুলি? সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থে ছিল ‘দীর্ঘশ্বাসের করতলে’, ‘জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াবো বলে’, বা ‘মধ্যাহ্ন’র মতো টানা গদ্যের কবিতা। হয়তো তাকে পথ দেখিয়েছিলেন তার প্রিয় কবি অরুণ মিত্র। কবিতাগুলো ছিল টুকরো টুকরো স্বরের মন্তাজ যা এক পূর্ণতা খুঁজছে। মগ্নচৈতন্যের এমন উদ্ভাস, বাক্যের অন্তরালবর্তী ছন্দ যা কল্পনায় আগুন ধরায়। ভাঙবার জন্য যে শিক্ষা লাগে, বাংলা সাহিত্যে আজ যা প্রায়শই অনুপস্থিত, তা কিন্তু সৌমিত্র’র ছিল। ফরাসি কবিতায় গদ্যের এই আবিষ্কার উনিশ শতক থেকেই শুরু হয়েছিল। আলোইজিউস বেরত্রাঁ, বোদল্যের, লোত্রেয়ামঁ, র্যাঁবো থেকে আঁরি মিশো, রনে শার, স্যাঁ-জন পের্স যার সাক্ষী। এই লিখন চকিতে স্যাঁ-জন পের্সের বিস্তার মনে পড়ায়। পরের বছর ব্যক্তিগত নক্ষত্রমালা (১৯৭৬)। তার সহজ ও গভীর অনুরণনময় উচ্চারণ তাকে বাংলা কবিতায় এক আলাদা আসন দিয়েছিল। তার কবিতায় কখনই মেকি শব্দের কোনও স্থান নেই, কৃত্রিমতা নেই। কি রিকম? একটি কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘ঘোষণা করে দাও/ অনুশোচনার মৃত্যু হয়েছে গতকাল… অশ্রুর নবজন্ম হয়েছে গতকাল…।’ সেটা ছিল অশান্ত সত্তরের দশক। বামপন্থী কবি সৌমিত্র লিখলেন সত্তরের দশক নিয়ে একটি কবিতা- ‘রাল কল’। এই কবিতায় লিখলেন ‘কতগুলো ভীরু বারুদকে আমি/ প্রচণ্ড রেগে গিয়ে ঘেন্নায়/ বোমা আর পাইপগান দিয়ে/ ভীষণ চমকে দিয়েছিলাম।’ এ সময়ের আরেকটি কবিতায় লিখলেনÑ ‘সত্বর ফিরে এসো বাতাসের কাছে/ বাতাসে কি বেয়নেট আছে?/ বিঁধেছে কি সাঁওতাল পাড়া?/ তোমার কি মনে আছে? মনে পড়ে শূন্য গ্রাম/ তছনছ তল্লাশ করেছে কার নাম?’ একদিকে চলচ্চিত্রে দুরন্ত অভিনয়, অন্যদিকে কবিতা লেখা ও লিটল ম্যাগ সম্পাদনা করা, বেশ অদ্ভুত না? এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সৌমিত্র বলেছিলেন- “কবিতা আমি লেখার কে? না। কবিতা আমার দ্বারা লিখিত হয়। যারা নিয়মিত কবিতা লেখেন, তারা কবিতা সম্পর্কে অনেক বেশি মনোযোগী। আমি পাঁচ কাজের লোক। তবে অভিনয় ছাড়া যে কাজটা প্রায় কৈশোর থেকে করে আসছি সেটা কবিতা লেখাই। শুরুও করেছি এক একেবারেই রোমান্টিক ইনভলমেন্ট থেকে। আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ! স্পর্ধা নিত মাথা তোলবার ঝুঁকি। আর সেই আমিকে প্রকাশ করতে গিয়েই কবিতা। অভিনয়ে যে ব্যাপারটা হয়, তাহলো কীভাবে নিজের মনোভাব আড়াল করা যায়। অন্য লোকের চরিত্রের আড়ালে। কারণ নিজেকে আড়াল করাটাই অভিনেতার কাজ। যারা নিজেকে দেখায় তারা অভিনেতা নয়। শো-ম্যান হতে পারে। কবিতার ক্ষেত্রে বেরিয়ে আসে আমার সেই আমি, যে নিজেকে আড়াল থেকে টেনে এনে প্রকাশ করতে চায়। সেই আমি মুক্ত। কবিতা আমাকে মুক্ত করে দেয়।” সে জন্যে তার কবিতাসমগ্রর ভ‚মিকাতে লিখেছেন- “আমি কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম কৈশোরের নতুন জন্মানো প্রেমাকাক্সক্ষার আন্দোলনে।…..পরবর্তীকালে অবশ্য একটু একটু করে প্রকৃতি, সমাজ, বেঁচে থাকার অপরিহার্য অভিজ্ঞতাগুলোও কবিতার মধ্যে ফুটে উঠতে আরম্ভ হল।
আমি যত দূর জানি, কোনও বড় ভাব বা আদর্শের প্রভাবে আমার লেখা শুরু হয়নি”। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মজা করে বলতেন তার বন্ধু সৌমিত্রকে যে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত না হয়ে যে কবি হয়ে উঠতে পারেন তার উদাহরণ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। কারণ কবি সৌমিত্র কৈশোরের প্রেমিকা দীপাকে চিঠির ফর্মে না দিয়ে তার প্রতি নিজের অনুভ‚তিগুলো কবিতার আকারে পাঠাতেন কারণ দীপা কবিতা ভালোবাসতেন। প্রথম দুটি কবিতা সংকলন প্রকাশের পরে একে একে প্রকাশিত হয় তার আরও ১২টি কাব্যগ্রন্থ। সেসবের মধ্যে ‘ব্যক্তিগত নক্ষত্রমালা’, ‘শব্দেরা আমার বাগানে’, ‘পড়ে আছে চন্দনের চিতা’, ‘হায় চিরজল’, ‘পদ্মবীজের মালা’, ‘হে সায়ংকাল’, ‘জন্ম যায় জন্ম যাবে’, ‘হলুদ রোদ্দুর’, ‘মধ্যরাতের সংকেত’, ‘অন্তমিল’, ‘স্বেচ্ছাবন্দি আষাঢ় কুহকে’। প্রথম দুটি ছাড়া পরের দুটি অর্থাৎ ৪ টে কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন সত্যজিৎ রায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি কবিতার বইয়ের নাম ‘হায় চিরজল’- নামটি বইয়ের প্রচ্ছদে দেখে আমি অল্পবয়েসে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। জলের আগে ‘চির’ শব্দটিকে কীভাবে সংযুক্ত করেছেন রচনাকার? তার কাব্যক্ষমতার একটি অব্যর্থ পরিচয় পাওয়া যায় এখানে। ‘মধ্যরাতের সঙ্কেত’ নামক তার কাব্যগ্রন্থে এই কবিতাটি গন্তব্যের শেষে এমন কয়েকটি লাইনে এসে পৌঁছেছে, যা কখনও ভোলা যায় না। লাইনগুলো এই রকম- ‘তুমি শীতার্তদের জন্য/ এবার একটা ম্যানিফেস্টো রচনা করো/ পাতাঝরার গর্জন থাক তার মধ্যে/ তোমার গিটারে যে আগুন/ তারই প্রতিশ্রæতি থাক/ তোমার ম্যানিফেস্টোয়।’ পাতাঝরার গর্জন? এ তো একটি অভাবিত লাইন! কবিতা লেখার ব্যাপারে সারা জীবন কতটা সজাগ ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তার একটি প্রমাণ আমাদের সামনে আছে। বছরখানেক আগে শারদীয় দেশ-এ, সৌমিত্র লিখেছিলেন একটি নতুন ধরনের কবিতা, যা তার এত দিন ধরে লিখে আসা কবিতার তুলনায় একটি নবতর আঙ্গিকের পরীক্ষায় জাগিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘ সেই কবিতা পুরোপুরি গদ্যে রচিত, আর স্তবকবন্ধের বদলে সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে প্যারাগ্রাফ। প্যারাগ্রাফের পর প্যারাগ্রাফ দিয়ে গ্রথিত এই কবিতা ২০২০-র বইমেলায় সিগনেট প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। নাম ‘ভাঙা পথের রাঙা ধুলায়’। যে কেউ একবার পড়ে দেখলেই বুঝবেন যে, ৮৫ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও নিজের কবিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কেমন সাহস দেখিয়েছেন সৌমিত্র। তিনি একদিন লিখেছিলেন, ‘পথে আজ বড় বেশি লোক/ মিছিলে কী খুঁজে পাবে হারানো বালক? কবিতা সমগ্র প্রকাশিত হওয়ার পর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আরও তিনটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে, ক্যালাইডোস্কোপ, মধ্যরাতের সংকেত, আর স্বেচ্ছাবন্দি আশার কুহকে। সিগনেট প্রেস থেকে প্রকাশিত সৌমিত্রর কবিতার সংকলন ‘মধ্যরাতের সংকেত’ এর শুরুর আগের শুরুতে লিখেছেন : ‘আমি কবিতার চলতে শুরু করার সাক্ষী/ আমি দেখতে পেয়েছিলাম/ চলতে চলতে সে এই শহর ছাড়িয়ে যাচ্ছে/ প্রথম মেঘ যেমন ক’রে আকাশ ঢেকে ফেলতে থাকে/ প্রথম প্রেম যেমন…’। শঙ্খ ঘোষ, যাকে উৎসর্গ করে এই বই, তিনিও অবাক হয়েছেন কীভাবে ‘কাব্যভাষার এত গভীরে স্বচ্ছন্দে চলে যায়’ তার কলম। বাংলাদেশ নিয়ে সৌমিত্রর এক মুগ্ধতাবোধ কাজ করত সবসময়। গঙ্গা-যমুনা নাট্যোৎসবে যোগ দিয়ে ঢাকা থেকে ফিরে তার কথায় যে উচ্ছ্বাস দেখেছি বাংলাদেশ সম্পর্কে তা তার এই দেশ সম্পর্কে গভীর শ্রদ্ধাবোধের পরিচয়। একই সাথে অনুযোগ করে বলেছিলেন, ‘বেশ হত যদি তোমাদের মত বাংলাদেশে কবিতা পড়তে মাঝে মাঝেই যেতে পারতাম’।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়