নিয়তি আর মিনতির মধ্যবর্তী অনুসর্গ

আগের সংবাদ

নবম-দশম শ্রেণিতে থাকছে না কোনো বিভাগ

পরের সংবাদ

পড়ে আছে চন্দনের চিতা

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৯, ২০২০ , ৯:৪২ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২০, ২০২০ , ১২:৩৬ অপরাহ্ণ

বাবা মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের মঞ্চাভিনয় দেখেই কৈশোর থেকে মঞ্চের প্রতি ভালোবাসা জন্মায় এই নায়কের। নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ীর সান্নিধ্যে এসে প্রথম সুযোগ পান ‘প্রফুল্ল’ নাটকে সুরেশের চরিত্রে অভিনয় করার। তখন তার বয়স মাত্র ২২ বছর। পরের বছর অর্থাৎ ২৩ বছর বয়সে বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায় তার ‘অপুর সংসার’ এ অপুর চরিত্রে অভিনয় করার জন্য নির্বাচন করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। বাকিটা ইতিহাস। ফিচার, ডকুমেন্টারি ও শর্টফিল্ম মিলিয়ে সত্যজিৎ রায় মোট ৩৬টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। এর মধ্যে ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন এই নায়ক।সত্যজিৎ রায় ছাড়াও তিনি মৃণাল সেন, তপন সিনহা, অজয় করের মতো প্রবীণদের পাশাপাশি কাজ করেছেন নতুন প্রজন্মের অনেক পরিচালকের সঙ্গেও। নাট্যনির্দেশনা কিংবা মঞ্চে এবং পর্দায় অভিনয় করেই সন্তুষ্ট থাকেননি এই শিল্পী, সাহিত্য সৃষ্টিতেও নিয়োজিত রেখেছেন নিজেকে।‘ পদ্মবিভ‚ষণ’ এই অভিনেতা ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ সমেত দেশ-বিদেশের নানান পুরস্কার পেয়েছেন তার অভিনয়ের জন্য। তার এইসব কীর্তির খবর সংস্কৃতি প্রেমিকদের অজানা নয়। তবু সংক্ষেপে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি বরং তার বিশাল সাহিত্যকর্ম নিয়ে সামান্য কিছু কথা বলার মধ্যেই সীমিত রাখি আমার মুগ্ধতা। সম্ভবত, সারা বিশ্বে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একমাত্র অভিনেতা যার কবিতাসমগ্রর পাশাপাশি তিন খণ্ডের নাটকসমগ্র এবং দুই খণ্ড গদ্যসমগ্র আছে।
‘মানিকদার সঙ্গে’ গ্রন্থটি তার উল্লেখযোগ্য গদ্যগ্রন্থের একটি। ১৯৫৯ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে অভিনয় করার সময়ে বিভিন্ন ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের কথা শুধু নয়, তার দেখা এই মহান পরিচালক সম্পর্কেও কিছু অজানা তথ্য আছে এই গ্রন্থে। প্রায় ৩৫ বছর ঘনিষ্ঠতার সূত্রে গুরু সমান এই মানুষটির কাছে ছাত্রের মতো অনেক কিছুই শিখেছিলেন তিনি। শুটিংয়ের আগে পরে কী করতেন মানিকদা, কীভাবে ব্যস্ত থাকতেন চিত্রনাট্য লেখায়, প্রকৃতির অনুপম রূপের রহস্যে কেমন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতেন, কোনো শট নেয়ার আগে কীভাবে বুঝিয়ে দিতেন অভিনেতাদের, সমস্তই খুব প্রাঞ্জল, ঝরঝরে ভাষায় বর্ণনা করেছেন লেখক। ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার সুবাদে কখনো কখনো কোনো দৃশ্য কিংবা ছবির শেষ নিয়ে তার মানিকদাকে নিজের মতামত হয়তো জানিয়েছেন লেখক। তা নিয়ে দু’জনের কথাবার্তা, বন্ধুর মতো আচরণ এবং আরও অনেক কিছু নিয়ে অসামান্য স্মৃতিকথায় উজ্জ্বল এই গ্রন্থ। বিশ্বনন্দিত এই পরিচালকের প্রতি লেখকের পরম শ্রদ্ধা ফুটে উঠেছে প্রতিটি ছত্রে। সে কারণেই শুধু সত্যজিৎ রায় নন, লেখককেও দেখা যায় স্পষ্ট দুরবিনে। বোঝা যায় তাদের জীবনদর্শন। পরিচালকের মৃত্যুতে খুবই শোকার্ত হয়ে পড়েছিলেন লেখক। যেন এক পরম শূন্যতা গ্রাস করছিল তাকে। সে সময়ের স্মৃতিচারণায় সৌমিত্রবাবু লিখেছেন এক বিদেশিনী বন্ধুর কথা। যিনি তাকে সান্ত¡না দিতে গিয়ে বলেছিলেন- Don’t cry soumitra, Manikda has given you a heritage.. কথাগুলো লেখককে উদ্বুদ্ধ করেছিল অন্য ভাবনায়। মানিকদার চলে যাওয়া প্রসঙ্গে লেখকের এইসব অনুভ‚তির বর্ণনায় মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। এই বইটির অনুবাদ- ‘The master and I : soumitra on satyajit’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৪ সালে। অনুবাদ করেছেন অরুনাভ সিনহা।
সৌমিত্রবাবুর মননের অনেকটাই জুড়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তার, ‘প্রতিদিন তব গাঁথা’ [প্রকাশকাল ২০০৯] গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখা। কবিগুরুকে ঘিরে তার মুগ্ধ অনুভব, কবির জীবনের বিভিন্ন দিক নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করেছেন তিনি।
উল্লেখযোগ্য আরও তিনটি গ্রন্থÑ ‘অগ্রপথিকেরা’, ’পরিচয়’ এবং ‘চরিত্রের সন্ধানে’। প্রথমটি অগ্রজ পথিকৃৎদের প্রতি তার শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, দ্বিতীয়টি চলচ্চিত্র জীবন ও ব্যক্তিজীবনের কথা, তৃতীয়টি বোধহয় এক অর্থে আত্মানুসন্ধান।
এছাড়াও তার ‘অভিনয়ের ইতিহাস হারিয়ে যাবে কেন?’, ‘শিশির কুমার’, ‘আমার অভিনয় জীবন’, ‘অভিনেতা হবার আগে’ গ্রন্থগুলো বেশ জনপ্রিয়।
তার সমস্ত নাটক নিয়ে তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে ‘নাটক সমগ্র’। এই প্রসঙ্গে কোনো একটি লেখায় তিনি লিখেছেন তার বেশিরভাগ নাটকই অন্য নাটক বা কথাসাহিত্যের ছায়া অবলম্বনে রচিত।
অনেক বিদেশি নাটকের অনুবাদও করেছিলেন তিনি। সেই অর্থে মৌলিক নাটকের সংখ্যা কম। ‘নীলকণ্ঠ’ মঞ্চস্থ হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। আত্মজীবনীমূলক নাটক ‘তৃতীয় অঙ্ক অতএব’ মননশীল দর্শকের মনে সতত উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
কবিবন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উৎসাহে কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াবো বলে’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। এই কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন সত্যজিৎ রায়। পরে আরও তিনটি কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদও করে দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭৬-এ প্রকাশ পায় ‘ব্যক্তিগত নক্ষত্রমালা’। প্রথম কবিতার বই প্রকাশ নিয়ে একটু গড়িমসি থাকলেও, পরের দিকে তার কাব্যগ্রন্থের প্রকাশ ছিল নিয়মিত। একে একে পাঠক পেয়ে যান ‘মধ্যরাতের সংকেত’, ‘ক্যালিডোস্কোপ’, ‘স্বেচ্ছাবন্দী আশার কুহকে’, ‘ভাঙাপথের রাঙা ধুলোয়’, ‘শব্দেরা আমার বাগানে’, ‘পড়ে আছে চন্দনের চিতা’, ‘হায় চিরজল’, ‘হে সায়ংকাল’, ‘জন্ম যায় জন্ম যাবে’, ‘ধারাবাহিক তোমার জলে’, ‘যা বাকি রইল’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ। এর মধ্যে ‘স্বেচ্ছাবন্দী আশার কুহকে’ উৎসর্গ করেছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষকে।
১৯৯৩ সালে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল তার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’।
২০১৪-তে আমরা হাতে পাই তার ‘কবিতা সমগ্র’। কিছুদিন আগে প্রকাশ পায় তার আরেকটি কাব্যগ্রন্থ ‘হলুদ রোদ্দুর’।
কবিতা লেখা শুরু কিশোর বয়সে। এ প্রসঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন- ‘কৈশোরে নতুন জন্মানো প্রেমাকাক্সক্ষার আন্দোলনে’ তার কবিতা লেখা শুরু, কবিতাকে ভালোবাসা।
‘প্রত্যেক ভ্রমণ শুরু হয় এক পদক্ষেপ দিয়ে /তুমি কি এক পা এগিয়ে আসবে না?’ জানি না এই ‘তুমি’ কোন প্রেয়সী না পাঠক, তবে তিনি জানিয়েছেন মাঝেমধ্যেই তার প্রেমিকাকে তিনি উপহার দিতেন কবিতা, পরবর্তীকালে সেই প্রেমিকা তার স্ত্রী হলেও তাকে কবিতা শোনানোর উদ্যম কমেনি কখনোই। প্রায় প্রতিটি নতুন কবিতার প্রথম শ্রোতা ছিলেন তার স্ত্রী দীপা চট্টোপাধ্যায়।
তাই কোনো জটিল মতবাদ বা ইশতেহার নয়, একজন কবির দিনযাপনের অভিজ্ঞতা, অনুভব। সমাজ, প্রকৃতি, প্রেম, আশা-নিরাশায় দোদুল্যমান জীবনের টানাপড়েন, ক্রমশ গড়িয়ে যাওয়া নিষ্ঠুর সময় নিয়েই তার কবিতা। জীবন ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং অঙ্গীকার ছড়িয়ে আছে তার কবিতায়।
অনায়াসেই তাই তিনি লিখতে পারেন- ‘ভালোবাসা মানেই কেবলই যাওয়া/যেখানেই থাকি না কেন/
উঠে পড়া /পেয়ে গেলে নিকটতম যান’…[ব্যক্তিগত নক্ষত্রমালা ]। আবার ‘ভালোবাসা বহুদিন আগে’ কবিতায় তার উচ্চারণ- ‘ভালোবাসা বহুদিন আগেই /বাসে উঠতে না পেরে /দাঁড়িয়ে গেছে’ …।
এই কবিতার শেষ স্তবকে তিনি আমাদের সকলের অনুভব নিয়েই বোধহয় লেখেনÑ ‘ভালোবাসার
কাছে কিছুই নেই এখন./ …..বরষায় তাকে খুব একা দেখব বোধহয় /যদি ফিরতি বাসে যাই /…
ভাবতে অবাক লাগে তার মতো একজন সফল এবং ব্যস্ত অভিনেতা যিনি প্রায় ৩০০টি ছবিতে
অভিনয় করেছেন, থিয়েটার নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন নিয়তই, তিনি কীভাবে সাহিত্য জগতে এমন বিশাল অবদান রাখতে পারেন? জীবনের প্রতি নিঃশর্ত কোনো অঙ্গীকার থাকলেই বোধহয় এটা সম্ভব। অনেক সাক্ষাৎকারে তাকে বলতে শুনেছি- কাজ করতে না পারলে বেঁচে থেকে লাভ কী?
এই অঙ্গীকার বোধ তাই স্পষ্ট হয় তার কলমে- ‘প্রতিজ্ঞার ফাইলটা একবার /খোলো দেখি সহকারী/ জানা খুব দরকারি/ কি কি ছিল অঙ্গীকার/ কার কার কাছে /…।
ভাঙাপথের রাঙা ধুলোয় মিলিয়ে যাওয়া প্রবাদপ্রতিম এই মানুষটির সমস্ত সৃষ্টি আমাদের পরম সম্পদ হয়ে থাকবে, এটাই সান্তনা।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়