নারীর অন্তপুরের অব্যক্ত কণ্ঠস্বর

আগের সংবাদ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের বিল পাস

পরের সংবাদ

নাট্যশিল্পই ‘অপু’র প্রাণ

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৯, ২০২০ , ৯:২৮ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২০, ২০২০ , ১২:৫৩ অপরাহ্ণ

তিনি অপু? নাকি ফেলুদা? ভারতীয় বাংলা সিনেমায় মহানায়কের মুকুট হয়তো তার মাথায় ওঠেনি, তবে অনেক বোদ্ধার বিচারে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ভারতবর্ষের সেরা অভিনয়শিল্পীদেরই একজন। অভিনয়টা রক্তে থাকলেও তারুণ্যের প্রথমভাগে রুপালি পর্দা খুব একটা টানেনি তাকে, বরং চলচ্চিত্র নিয়ে নিজের ভাষাতেই ‘নাক উঁচু’ সৌমিত্রের মন মজেছিল আবৃত্তি আর মঞ্চনাটকে। ভারতীয় চলচ্চিত্রের দিকপাল সত্যজিত রায় সেই মনের জানালা খুলে দেন, তার হাত ধরেই হয় বড় পর্দায় অভিষেক। এরপরের গল্প- ‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’।
তিনশর বেশি চলচ্চিত্রে দর্শক দেখেছে তার দাপুটে উপস্থিতি। শুরুর সেই ‘অপরাজিত’র তরুণ অপু আর বাঙালির একেবারে নিজস্ব গোয়েন্দা চরিত্র ‘ফেলুদা’ই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে সব সময়।
নদীয়ার কৃষ্ণনগরের আইনজীবী বাবা মোহিত কুমার চট্টোপাধ্যায় ও মা আশলতা চট্টোপাধ্যায় ছিলেন মঞ্চনাটকে সম্পৃক্ত। আশালতা ছিলেন স্থানীয় নাটকের দল ‘প্রতিকৃতি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সেই হিসেবে অভিনয় গুণ সৌমিত্রের জন্মসূত্রেই পাওয়া। কৃষ্ণনগরের সেন্ট জোনস বিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে কলকাতার সিটি কলেজে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন সৌমিত্র। ছাত্রজীবনেই প্রখ্যাত অভিনেতা ও নির্দেশক অহীন্দ্র চৌধুরীর হাত ধরে মঞ্চনাটকে পা রাখেন তিনি।
তরুণ বয়সে আরেক বিখ্যাত অভিনেতা-নির্দেশক শিশির ভাদুড়ির নাটক দেখে মঞ্চের প্রতি ভালোলাগা আরো পোক্ত হয়। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘কিং লিয়র’ অবলম্বনে নির্দেশক সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘রাজা লিয়র’ নাটকে নাম ভ‚মিকায় অভিনয় করে দর্শকদের মনে স্থায়ী আসন তৈরি নেন সৌমিত্র। অনেকের বিচারে এটিই তার সবচেয়ে প্রশংসিত মঞ্চনাটক।
সেই পঞ্চাশের দশকের শেষ পাদে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মন কেড়েছিলেন যে অভিনেতা, সেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এত বছর পরেও অভিনেতা হিসেবে এতটুকু ম্লান হননি। বরং একের পর এক সফল ছবিতে অভিনয় দক্ষতার ছাপ গেছেন।
মৃত্যুর আগেই তিনি নিজেকে থিয়েটারের মানুষ হিসেবে দাবি করেছেন। তার দরাজ কণ্ঠের আবৃত্তি বছরের পর বছর শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছে। কবিতার বই লিখেছেন ১৪টি। সেই পঞ্চাশের দশক থেকে আজ- কীভাবে তিনি পেরোলেন এই দীর্ঘ পথ? কীভাবে ধরে রাখলেন তার সাফল্য আর জনপ্রিয়তা?
সৌমিত্র মানেই দীর্ঘাঙ্গি সুপুরুষ। উত্তমের পর সে সময় মেয়েদের মনে ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন একমাত্র সৌমিত্রই। চট্টোপাধ্যায় পরিবারের আদি বাড়ি ছিল অধুনা বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কাছে কয়া গ্রামে।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পিতামহের আমল থেকে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে থাকতে শুরু করেন। সৌমিত্রর পিসিমা তারা দেবীর সঙ্গে ‘স্যার’ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র কলকাতা হাইকোর্টের জাস্টিস রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বিবাহ হয়। সৌমিত্রর পিতৃদেব কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি করতেন। প্রতি সপ্তাহে বাড়ি আসতেন। সৌমিত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন কৃষ্ণনগরের সেন্ট জন্স বিদ্যালয়ে। তারপর পিতৃদেবের চাকরি বদলের কারণে সৌমিত্রর বিদ্যালয়ও বদল হতে থাকে এবং উনি বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেন হাওড়া জিলা স্কুল থেকে। তারপর কলকাতার সিটি কলেজ থেকে প্রথমে আইএসসি এবং পরে বিএ অনার্স (বাংলা) পাস করার পর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ অব আর্টসে দুই বছর পড়াশোনা করেন। কলেজে বাংলা অনার্স নিয়ে পড়ার সময় নাট্যব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুড়ির সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে তার। তখন থেকে অভিনয়কে জীবনের প্রধান লক্ষ করে নেয়ার কথা দেখেছিলেন। ভাদুড়ির অভিনয় সৌমিত্রকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
কর্মজীবন শুরু হয় অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঘোষক হিসেবে। পাশাপাশি থিয়েটারে অভিনয় এবং ছবিতে অডিশন দিচ্ছিলেন। ১৯৫৭ সালে পরিচালক কার্তিক বসুর নীলাচলে মহাপ্রভু ছবিতে অডিশন দিলেও জায়গা পান না, তার বদলে সুযোগ পেয়েছিলেন অসীমকুমার। চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দায় ৬০ বছরের ওপর অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সফল মঞ্চাভিনেতা, নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক, কবি এবং এক্ষণ নামে সাহিত্য ও সংস্কৃতি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক সৌমিত্র। ‘থিয়েটারের জন্য আমার নেশাই বলুন বা ভালোবাসাই বলুন, সেটা এত প্রবল ছিল যে সেই কষ্ট আমি খুবই সানন্দে বরণ করে নিয়েছিলাম।’- বলেছিলেন মি. চট্টোপাধ্যায়।
কর্মজীবনের শেষ বেলা পর্যন্ত তিনি মঞ্চ অভিনয় ছাড়েননি। অভিনয়ের প্রতি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। কৃষ্ণনগরে বেশ উন্নতমানের নাট্যচর্চা হতো তার ছেলেবেলায়। তার বাবা সেখানে শৌখিন নাট্য দলে নাটক করতেন, বাড়িতেও কবিতা আবৃত্তি এবং নাটকের একটা আবহ ছিল। শৈশবে তারা বাড়িতে তক্তপোষ দিয়ে মঞ্চ তৈরি করে, বিছানার চাদর দিয়ে পর্দা খাটিয়ে ভাইবোন ও বন্ধুবান্ধবরা মিলে ছোট ছোট নাটিকার অভিনয় করতেন। বাড়ির বড়রাও প্রচুর উৎসাহ দিতেন। ক্লাস ফোর-ফাইভে পড়ার সময় থেকেই তার নাটকের নেশা প্রচুর বেড়ে গেল। স্কুলের মঞ্চে প্রথম অভিনয় করেছিলেন ইংরেজি একটি নাটক- ‘সি্লপিং প্রিন্সেস’। যার জন্য পদক ও মেডেলও পেয়েছিলেন তিনি।
কলেজে বাংলা অনার্স নিয়ে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় নাট্যব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুড়ির সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল তার। তখন থেকেই অভিনয়কে জীবনের মূল লক্ষ করে নেয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার নাট্যাভিনয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। বিএ ফাইনাল ক্লাসে পড়ার সময়ই তিনি মনস্থির করে ফেলেছিলেন- তিনি অভিনয় করবেন, আর কিছু করবেন না।
চলচ্চিত্রে তার প্রথম আত্মপ্রকাশ সত্যজিত রায়ের ‘অপুর সংসার’ ছবিতে ১৯৫৯ সালে। সত্যজিত রায়ের ১৪টি ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এবং পরিচালক সত্যজিত রায়ের সঙ্গে তার একটা গভীর বন্ধন গড়ে উঠেছিল। সত্যজিত রায়কে নিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ‘মানিকদার সঙ্গে’ নামে একটি বইও লিখেছিলেন। তার ইংরেজি অনুবাদটির নাম ‘দা মাস্টার এন্ড আই’। সত্যজিত রায় তার প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’ তে অভিনয় করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আলোচনায আসেন। সত্যজিত রায় ছাড়াও মৃণাল সেন, তপন সিংহসহ বহু নামি পরিচালকের প্রায় দুশর মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এর মধ্যে তার খুবই জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে আছে মৃণাল সেনের ‘আকাশ-কুসুম’, তপন সিংহের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, অজয় করের ‘অতল জলের আহ্বান’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘পরিণীতা’, আশুতোষ বন্দোপাধ্যায়ের ‘তিন ভুবনের পারে’ ইত্যাদি।
অনেক ছবিতে এক সঙ্গে অভিনয় করেছেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের দুই প্রতিদ্ব›দ্বী নায়ক উত্তম কুমার এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। একসঙ্গে তাদের পর্দায় দেখা যাক বা না যাক বাঙালি সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে চরম বিভক্তি ছিল তাদের প্রিয় নায়ক কে তা নিয়ে। সিনেমাভক্তদের একদল মনে করতেন ‘জনতার মহানায়ক’ একজনই- তিনি উত্তম কুমার। আর প্রতিপক্ষ দলের পরিষ্কার রায় ছিল বুদ্ধিজীবী মননের চলচ্চিত্রে ‘শেষ কথা’ একজনই- তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বড় ও ছোট পর্দার নানা ছবিতে তিনি কাজ করে গেছেন। সাম্প্রতিককালের বহু পরিচালকের ছবিতে তার অভিনীত অনেক ছবি খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সত্যজিত রায়ের বিভিন্ন ছবির তিনি সফল নায়ক তো বটেই, কিন্তু সত্যজিত রায়ের ‘ফেলুদা’ চরিত্রের সুবাদে মানুষের কাছে তার আরেক নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ফেলুদা’। সত্যজিত রায়ের পরিচালনায় ফেলুদা বা অন্যান্য চরিত্রে অভিনয়ের চেয়েও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অনেক বেশি কাজ করেছিলেন অন্য পরিচালকদের ছবিতে।
মঞ্চ অভিনয় এবং নাট্য নির্দেশনাতেও দারুণ সফল ছিলেন মি. চট্টোপাধ্যায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, নাটক ছিল তার প্রথম প্রেম। তাই সিনেমার কাজে ব্যস্ত থাকার পরেও তিনি ছুটে যেতেন মঞ্চ নাটকে অভিনয় করতে। তিনি বলেছিলেন, পেশাদার রঙ্গমঞ্চে তার নাট্যজীবন তিনি শুরু করেছিলেন কলকাতার স্টার থিয়েটারে ১৯৬৩ সালে ‘তাপসী’ নাটকে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে।
নাটক ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম প্রেম আর দ্বিতীয় প্রেম ছিল সাহিত্য। তিনি এবং নির্মল আচার্য ১৯৬১ সালে তৈরি করেছিলেন এক্ষণ নামে একটি সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক পত্রিকা। মননশীল পাঠকরা ওই পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করে থাকতেন। পত্রিকার নামকরণ করেছিলেন সত্যাজিত রায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক। তিনি সম্পাদনার কাজ করতেন, লিখতেন আবার বিজ্ঞাপনও জোগাড় করার জন্য ছুটে বেড়াতেন সেই সময়ের মহাব্যস্ত নায়ক। পত্রিকার জন্য যেমন সিরিয়াস প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি, তেমনই লিখেছেন অসংখ্য কবিতা। প্রকাশিত হয়েছে তার কবিতার আর নাটকের বই।
অভিনয়ে তার অবদানের জন্য দেশি-বিদেশি অজস্র পুরস্কার পেয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ২০০৪ সালে পেয়েছেন ভারত সরকারের পদ্মভ‚ষণ সম্মান, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভ‚ষিত হয়েছেন দুবার এবং সিনেমায় তার সারাজীবনের অবদানের জন্য ২০১২ সালে পেয়েছেন ভারত সরকারের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র খেতাব ‘দাদাসাহেব ফালকে সম্মাননা’। ২০১৭ সালে তিনি ফরাসি সরকারের বেসামরিক সম্মাননা লিজিয়ন অব অনারে ভূষিত হন।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়