বিরল শিশুসাহিত্যিক কাইজার চৌধুরী

আগের সংবাদ

নারীর অন্তপুরের অব্যক্ত কণ্ঠস্বর

পরের সংবাদ

কবিতা এবং আবৃত্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অলঙ্কার

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৯, ২০২০ , ৯:২০ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২০, ২০২০ , ১২:৩৯ অপরাহ্ণ

অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে স্পর্শের দূরত্বে দাঁড়িয়ে সেদিন দেখেছিলাম উনিশো পঁচাত্তর সালে, মহিষাদলে। তখনও দুপুরের সূর্যের আলো মধ্যাহ্নের রং মাখতে শুরু করেনি। বাঁ দিকে মহিষাদল রাজবাড়ির প্রাসাদের চ‚ড়া তখন যেন অপরূপ জ্যোৎস্নায় বানভাসি। ডান দিকে হিজলি টাইটাল ক্যানেলে সুন্দরীর আনত মুখশ্রীর চূর্ণ কুন্তলের মতো ঢেউ তিরতির করে বয়ে চলেছে একদিকে হুগলি আরেক দিকে হলদি নদীর দিকে। সেদিন রাজপ্রাসাদের সামনে মহিষাদল রাজ কলেজের ক্লাস-পালানো হাজার হাজার দেবদাস-পার্বতীর ভেতর দাঁড়িয়ে ছিলাম আমিও।
এখনই যে ‘দত্তা’ সিনেমার সৌমিত্র-সুচিত্রার আউটডোর শুটিং শুরু হবে। দেখতে দেখতে দুটো গাড়ি রাজপ্রাসাদের পামগাছের ছায়াকে ঠেলে সরিয়ে রাজ দেউড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। প্রথম গাড়িটিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, পেছনের গাড়িতে সুচিত্রা সেন। দেখলাম, এই দুই মানব-মানবীর শরীরে এ কী অনিন্দ্যকান্তি রূপ, তারা স্বর্গের সুষমা খানিকটা মেখে নিয়ে মর্ত্যরে মাটিতে নেমে এসেছেন যেন!
সৌমিত্রের তখন চল্লিশ আর আমার বাইশ, কবিতা পাগল তরুণ!। উপচে-পড়া ভিড়ের মধ্যে সৌমিত্র তখন গাড়ির জানালার কাচটা অল্প একটু নামিয়ে হাসিমুখে আমাদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা সব ক্লাস ফাঁকি দিয়ে শুটিং দেখতে চলে এসেছ!’
গাড়ি দুটো জনতার ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল শুটিং স্পটের দিকে। পেছনের গাড়িতে বসে আছেন হাসিমুখে অমর্ত্যলোকের অপ্সরা, সুচিত্রা সেন। তারপর পালকি থেকে নেমে ক্যানেলের উপর বানানো বাঁশের সাঁকো পেরনো… সেসব তো ‘দত্তা’ সিনেমার দৃশ্য!
অভিনেতা সৌমিত্র, নাটক মঞ্চের সৌমিত্র, নাট্যকার সৌমিত্র, নাট্যপরিচালক সৌমিত্র, নাট্যসংগঠক সৌমিত্র, অনুবাদক সৌমিত্র, সম্পাদক সৌমিত্র, আবৃত্তিশিল্পী সৌমিত্র, কবি সৌমিত্র, গদ্যলেখক সৌমিত্র, অন্তিম বয়সে খেয়ালি চিত্রশিল্পী- একজন মানুষ এত রকম অভিধায় নিজেকে মেলে ধরেছিলেন তার পঁচাশি বছরের ক্লান্তিহীন জীবনে। আমি তার আরেকটি অভিধার কথা জানি, যে অভিধা তার অন্তিমযাত্রায়ও কেউ বিশেষ উচ্চারণ করেননি। সেটি হলো- তিনি ছিলেন লিটল ম্যাগাজিনেরও কবি।
খ্যাতির দীপ্তিমান সময়েও তিনি যে লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা লিখতেন, যে লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা দেবেন বলে কথা দিতেন, তার চূড়ান্ত অভিনয় ব্যস্ততার শিডিউলও তাকে সে প্রতিশ্রæতি থেকেও বিচ্যুত করতে পারত না কখনও। সেরকম একটি লিটল ম্যাগাজিনের কথা বলি- সেটি প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে অনেক দূর মফস্বল শহর পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে। পত্রিকাটির নাম- ‘জলদর্চি’। সম্পাদকের নাম ঋত্বিক ত্রিপাঠী। সম্পাদকের অনুরোধে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এই পত্রিকাটিতে নিয়মিত কবিতা লিখতেন। তাদেরই বয়ানে দেখি : হাজারও ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি ‘জলদর্চি’তে কবিতা দিতে ভুলতেন না। অধিকাংশ সময়ই তিনি ডাকযোগে বা কুরিয়ারে যথাসময়ে লেখা পাঠিয়ে দিয়েছেন।’
এ তো ভাবাই যায় না। অত বড়ো কিংবদন্তি মানুষের লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি এ কী উদার ভালোবাসা!
তাদের স্মৃতিচারণায় আরও পড়ি : ‘সেবার ১৯১৮ সালে তিনি তার বাড়ি থেকে লেখাটি সংগ্রহ করতে বললেন। নির্দিষ্ট দিনে জলদর্চির শুভানুধ্যায়ী অনীক নন্দী তার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলে মুচকি হেসে সৌজন্যবিনিময় করে লেখাটি দিলেন। তিনি নিজের হাতে লেখা কবিতাটি আগে থেকে খামে ভরেই রেখেছিলেন। লেখার প্রতি, লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি তার এরকম গভীর ভলোবাসা ছিল। আক্ষেপ করতেন, যেবার শুটিংয়ের ব্যস্ততার জন্য লেখা দিতে পারতেন না। তবে জলদর্চি হাতে পেয়ে পাঠপ্রতিক্রিয়া জানাতেও তার ভুল হতো না কখনও।’
কৈশোর থেকে তার কবিতা লেখার শুরু। কিন্তু কলকাতায় সিটি কলেজে পড়ার সময় জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটতে শুরু হয়। তারপর কবিতা লিখতে শুরু করেন পুরোদমে। সে সময় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তার কবিতা পড়ে কখনও সৌমিত্রকে বলতেন, ‘হ্যাঁ রে, বুলু, এটা খানিকটা রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতো হয়ে গেল না?’ আবার ভালো লাগলে চিৎকার করে বলতেন, ‘এই কবিতাটা তুই দারুণ লিখেছিস।’
তারই উৎসাহে ৫৪টি কবিতা নিয়ে সৌমিত্রের প্রথম কবিতার বই। সৌমিত্র বই বের করার ব্যাপারে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না।
শক্তি বললেন, ‘আরে প্রকাশককে তো আর আমি সেধে ডেকে আনিনি? তিনিই তো তোর কবিতার বই বের করতে চাইছেন? তিনিই তো আমার কাছে সে ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন।’
এরপরে আর সৌমিত্রর গাঁইগুঁই টেকেনি। কবিতার বইয়ের নাম রাখলেন ‘জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াব বলে’। কলকাতার অন্নপূর্ণা পাবলিশিং থেকে প্রথম কবিতার বইটি বেরোল ১৯৭৫ সালে। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, সে বইটির প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। এমন করেই তো মাইলস্টোন তৈরি হয় সময়ের স্রোতে। এও এক মাইলস্টোন কবি সৌমিত্রর জীবনে।
কবিতা প্রসঙ্গে অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলতেন, ‘কবিতার ক্ষেত্রে, বেরিয়ে আসে আমার সেই আমি, যে নিজেকে আড়াল থেকে টেনে এনে প্রকাশ করতে চায়। সেই আমি মুক্ত। কবিতা আমাকে মুক্ত করে দেয়।’ তিনি যে কবিতা অন্তঃপ্রাণ, তা তাকে অবিস্মরণীয় করে রেখেছে। সেটি হলো কবিতার আবৃত্তি। তিনি রবীন্দ্রনাথে ডুবে থাকতে চাইতেন সব সময়। সব সময় রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ টেনে এনে কথা বলতেন। সঙ্গে জীবনানন্দ দাশ থেকে এ কালের তরুণ কবির কবিতাও তার আবৃত্তি থেকে বাদ পড়ত না। উদাত্ত কণ্ঠে সেই সব আবৃত্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে স্মরণীয় করে রাখবে অকৃপণভাবে।
যেমন তার কণ্ঠের শ্রুতিনাটক আপামর শ্রোতাকে আচ্ছন্ন করে রাখে আজও। সেরকম, রবীন্দ্রনাথে ‘শেষের কবিতা’ অবিস্মরণীয়। আর সৌমিত্র কণ্ঠে রবীন্দ্রাথ ঠাকুরের ‘দেবতার গ্রাস’ আবৃত্তি অনবদ্য, অসাধারণ, অতুলনীয়! রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’র শতবর্ষ উপলক্ষে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আবৃত্তির অ্যালবাম অবিস্মরণীয়। কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তার কবিতা এবং কবিতা ও শ্রুতিনাটকের আবৃত্তির জন্যও কবিতাপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে চিরজীবী হয়ে থাকবেন অনন্তকাল।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়