সংক্রমণ বাড়ছে, শঙ্কাও

আগের সংবাদ

ছাত্রলীগের সহযোগিতায় স্পেন প্রবাসীদের ভোগান্তির অবসান

পরের সংবাদ

মাস্ক, হাতধোয়া ও সামাজিক দূরত্ব

তিন করণীয়ই ‘রক্ষাকবচ’

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৭, ২০২০ , ৯:৪১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ১৭, ২০২০ , ৯:৪১ পূর্বাহ্ণ

কয়েক দিন ধীর গতিতে সংক্রমণের বিস্তার ঘটালেও আবারো বিশ্বব্যাপী তাণ্ডব শুরু করেছে করোনা ভাইরাস। আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে মৃতের তালিকাও। পরিস্থিতি যে আরো জটিল হচ্ছে এবং হবে সেই হুঁশিয়ারি অনেক আগেই দিয়েছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা। অক্টোবরের শেষের দিকে সংস্থার প্রধান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, বিশ্ব এখন করোনা মহামারির জটিল সন্ধিক্ষণে রয়েছে। আগামী কয়েক মাস কয়েকটি দেশে করোনা পরিস্থিতি খুবই কঠিন হবে। অথচ আমরা এখন কেবল অক্টোবরে আছি। বিপজ্জনক পথে রয়েছে কয়েকটি দেশ। বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই বিশ্ব নেতাদের আগে থেকেই সতর্ক থাকতে বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এদিকে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে চলছে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা। আর ভ্যাকসিন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। কিন্তু ভ্যাকসিন প্রাপ্তি নিয়ে এখনো দোলাচলে বিশ্ব। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতের কাছে বড় ‘ভ্যাকসিন’ রেখে পুরো বিশ্ব ছুটছে এক অনিশ্চয়তার দিকে। মাস্ক ব্যবহার, ঘনঘন হাত ধোয়া এবং সামাজিক দূরত্বকেই করোনা প্রতিরোধে ‘শতভাগ কার্যকর ভ্যাকসিন’ বলে উল্লেখ করছেন তারা। আসন্ন শীতে করোনার সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা থেকে হাতের কাছে সহজলভ্য ভ্যাকসিনের প্রতি গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও।

সরকারের পক্ষ থেকে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এক পরিপত্রও জারি হয়েছে। কিন্তু এসব কথা কানেই তুলছেন না অধিকাংশ মানুষ। সংক্রমণের শুরুর দিকে সামাজিক দূরত্ববিধি কিছুটা মানা হলেও সেই পাট চুকেছে অনেক আগেই। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ আইনের আওতায় মাস্ক না পরে বের হলে অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডই কার্যকর করার বিধান থাকলেও এর কার্যকারিতা খুব একটা দেখা যায়নি। করোনার সংক্রমণ নিয়ে মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে এক ধরনের উদাসীনতা। আর তাই সঠিক নিয়মে মাস্ক না পরে তা ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে কানে, থুঁতনিতে। কেউ বা মাস্ক পকেটে নিয়ে ঘুরছেন।

কোভিড-১৯ মোকাবিলায় জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, কীভাবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচা সম্ভব তা নিয়ে প্রচার হলেও অনেকেই তা জানেন না। আবার অনেকে জানলেও তা মানছেন না। মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘ডেমকেয়ার’ ভাব দেখা যাচ্ছে। এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা এবং জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক গবেষণায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২৭ আগস্ট। ওই গবেষণায়ও এমন তথ্য উঠে আসে। এতে দেখা গেছে, করোনা ভাইরাস সম্পর্কে অনেকের মধ্যেই রয়েছে ভ্রান্ত ধারণা। এই ভাইরাস কীভাবে ছড়ায় এবং কীভাবে তা প্রতিরোধ করা যায়- সে সম্পর্কে জ্ঞান থাকলেও অনেকেই তা মানেন না। শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ অনান্য বিধি নিষেধ মানার প্রবণতা অনেক কম।

দেশে করোনার সংক্রমণ বিস্তার ঘটতে পারে এই উদ্বেগ থেকেই ২৫ অক্টোবর মাস্ক না পড়লে কাউকে কোনো ধরনের সেবা না দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করে সরকার। দেশের সব দোকানপাট, মার্কেট ও বিপণিবিতানে মাস্ক না পরলে কোনো ক্রেতা ও বিক্রেতার প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। ‘মাস্ক নাই সেবা নাই’ শিরোনামের এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে গতকাল পহেলা নভেম্বর থেকে। চলবে আগামী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক বাংলাদেশ ফার্মাকোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা ভ্যাকসিন নিয়ে আলোচনা করছি। অথচ এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু বড় একটি ভ্যাকসিন আমাদের কাছেই আছে। আর তা হলো মাস্ক পরা, ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখা, সাবান দিয়ে ঘনঘন হাত ধোয়া। এর চেয়ে কার্যকর ভ্যাকসিন আর কিছু নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটি যে শতভাগ কার্যকর তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত। আমরা এমন একটি ভ্যাকসিন তৈরিতে আগ্রহী হচ্ছি যা এই মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায়া রাখা এবং বারবার হাত ধোয়া থেকে মুক্তি দেবে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য আমরা এই ভ্যাকসিন খুঁজছি।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুসতাক হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে জনসাধারণের মধ্যে এক ধরনের শৈথিল্য দেখা যাচ্ছে। এসব কারণে বাংলাদেশেও আবারো সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। যেহেতু জীবিকার স্বার্থে লকডাউন সম্ভব নয়, তাই একটি কার্যকর ভ্যাকসিন না পাওয়া পর্যন্ত নিরাপদ থাকার জন্য মাস্ক ব্যবহার করা, সাবান দিয়ে বারবার হাত ধোয়া এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাই কোভিড-১৯ প্রতিরোধের একমাত্র উপায়।

মেডিকেল অ্যানথ্রোপলজি ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. চিন্ময় দাস ভোরের কাগজকে বলেন, করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষার ক্ষেত্রে যে নির্দেশনাগুলো ছিল আমাদের দেশের মানুষ তা আগেও মানেনি। এখন তো তা আরো মানছে না। মানুষ ধরেই নিয়েছে অদৃশ্য এই ভাইরাসের সঙ্গে মানিয়ে চলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

এছাড়া প্রথমে কোনো বিষয়ে মানুষের মধ্যে যে ভীতি তৈরি হয় তা ধীরে ধীরে সয়ে যায় এটাই স্বাভাবিক। জীবন ও জীবিকার জন্য মানুষকে রাস্তায় নামতেই হবে। আমরা যদি ভালো থাকতে চাই তাহলে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার পাশাপাশি, সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশন নিশ্চিত করা এবং হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়