হুজুরের নির্যাতনের পর হাসপাতালে ভর্তি কওমীর ছাত্র

আগের সংবাদ

জার্মানির ভয়ঙ্কর রূপ দেখলো ইউক্রেন

পরের সংবাদ

জোট রাজনীতির দিন শেষ!

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৫, ২০২০ , ৯:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ১৫, ২০২০ , ৯:০০ পূর্বাহ্ণ

আ.লীগের ১৪ দল ও বিএনপির ২০ দলীয় জোট নিষ্ক্রিয়
* বিশ্লেষকদের মতে, জোটের রাজনীতি প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে

জাতীয় নির্বাচনের আগে জোট ভাঙা-গড়ার খেলা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই অংশ। ভোটের আগে কে কত বেশি দলকে নিজেদের ছাতার নিচে আনতে পারেÑ তা নিয়ে প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। পরস্পরবিরোধী দুটি রাজনৈতিক ধারায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট এবং বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান। এছাড়া ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী ধারার ‘মহাজোট’ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি ধারার ‘ঐক্যফ্রন্ট’ ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। তবে স্বাভাবিকভাবেই ভোটের কিছু দিন পর গুরুত্ব হারায় জোটের রাজনীতি। বড় দলগুলোর একলা চলো নীতির কারণে দূরত্ব তৈরি হয় জোট শরিকদের মধ্যে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় দুটি দলই জোট শরিকদের তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাদের জোটগত কোনো কর্মকাণ্ডও দৃশ্যমান নয়। এ নিয়ে উভয় ধারার ছোট ছোট শরিকদের মাঝে মধ্যেই প্রকাশ্যে ক্ষোভ-হতাশা জানাতে দেখা যায়। ক্ষমতাকেন্দ্রিক এই ‘জোট রাজনীতি’র ভবিষ্যৎ কী এমন প্রশ্ন এখন প্রায়শই উচ্চারিত হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জোটের রাজনীতি প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভবিষ্যতে জোটের রাজনীতি থাকবে কিনা তা নির্ধারণ করবে সময়। কারণ সময়ই রাজনৈতিক উত্থান-পতনের বড় নিয়ামক।

মূলত, এ অঞ্চলে জোটের রাজনীতির শুরু ১৯৫৪ সালে, যুক্তফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে। ওই নির্বাচনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অংশ নিয়ে বিপুল জয় পায়। অবশ্য সরকার গঠনের পর জোটে দ্ব›দ্ব দেখা দেয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম জোট হয় বাহাত্তরেÑ মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি। এই জোট বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৭৩ সালে ১১টি সংগঠন নিয়ে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট। চুয়াত্তরে ‘সর্বদলীয় যুক্তফ্রন্ট’ করেন মওলানা ভাসানী। পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর নেপথ্যে থেকে জাগদল গঠন করেন জিয়াউর রহমান। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ, সিপিবি, জাতীয় জনতা পার্টি, ন্যাপ (মোজাফফর), গণআজাদি লীগ ও পিপলস পার্টির সমন্বয়ে গঠিত হয় গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট। ’৮০ সালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় ১০ দলীয় জোট। তিন জোটের রূপরেখায় এরশাদের পতন : ভোটের রাজনীতি ছাড়াও রাজনীতির অঙ্গনে অত্যন্ত শক্তিশালী

ছিল এরশাদবিরোধী জোট। তিন জোটের যুগপৎ আন্দোলনেই এরশাদের পতন ঘটেছে। আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলোর ১৫ দলীয় জোট (বাম দলগুলো বেরিয়ে যাওয়ার পর ৮ দল), বিএনপির ৭ দলীয় জোট এবং বাম জোটের দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল স্বৈরাচারের পতন। ১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর এই তিন জোট এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য রূপরেখা ঘোষণা করে। এরই ধারাবাহিকতায় ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগে বাধ্য হন সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ। এরশাদ পতনের পর নির্বাচনের আগেই এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গড়ে ওঠা জোট অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে জোটের অন্য শরিকরা এবং ৫ দলীয় বাম জোটের সমন্বয়ে গঠন করে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট। ওই সময় ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সমন্বয়ে ইসলামী ঐক্যজোট নামে আরেকটি জোট হয়।

জানতে চাইলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ ভোরের কাগজকে বলেন, ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগের পতনের জন্য যুক্তফ্রন্ট বাস্তবতা ছিল। এরশাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনও জরুরি ছিল। তিন জোটের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফসল এরশাদের পতন। ভোটের আগে জোটের সমীকরণ : আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে ১৯৯৯ সালে গড়ে ওঠে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট। পরে বিএনপির থেকে বেরিয়ে এরশাদ ইসলামপন্থি কয়েকটি দল নিয়ে গঠন করেন ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। অন্যদিকে ৪ দলীয় জোটের শাসনের শেষ দিকে সক্রিয় হয়ে ওঠে ১১ দলীয় বাম জোট। ২০০৫ সালে এই জোটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হলে সিপিবি, বাসদের দুই অংশ এবং শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল ওই জোট থেকে বেরিয়ে যায়। অন্য সাতটি দল, জাসদ (ইনু) ও ন্যাপ মোজাফ্ফর নিয়ে গঠিত হয় ১৪ দলীয় জোট। ২০০৮ সালে এরশাদ ও খেলাফত মজলিসকে সঙ্গে নিয়ে মহাজোট গঠন করে ১৪ দলীয় জোট। এরপর ভোটের রাজনীতিতে বিএনপির ২০ দলীয় জোট, মহাজোট থেকে এরশাদের বেরিয়ে যাওয়া, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (আইডিএ), বাম গণতান্ত্রিক জোটÑ বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়। অন্যদিকে তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি কোনো রাজনৈতিক জোট না হলেও বামধারার দলগুলোর সমর্থনে জনগণের স্বার্থে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী জোট হিসেবে কাজ করত। বর্তমানে তারাও নিষ্ক্রিয়। অন্যদিকে রাজনীতিতে সর্বশেষ জোট বিএনপিসহ ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্নার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু তারা কার্যকর ভ‚মিকা পালন করতে পারেননি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে রাজনৈতিক বাস্তবতা। জোটবদ্ধ হওয়ার জন্য সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে এক স্রোতে আসা প্রয়োজন, যা এখন অনুপস্থিত। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জনগণের চাওয়া-পাওয়ার মিল থাকতে হবে। এছাড়া এখন আগের মতো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা না থাকায় জোটের রাজনীতি ক্রমশ গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ডক্টর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ ভোরের কাগজকে বলেন, জোট রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা হারানোর মূল কারণ হচ্ছে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী হিসেবে আবিভর্‚ত হওয়া। অন্যদিকে অন্য দলগুলো সাংগঠনিকভাবে স্তিমিত হয়ে যাওয়া। আওয়ামী লীগ একক দল হিসেবে সংসদে ও রাজপথে অত্যন্ত শক্তিশালী। একটা সময় ছিল জোটের প্রয়োজন ছিল। এখন নেই। ভবিষ্যতে জোটের রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা হয়তো থাকবে না।

রাজনীতি এক থিওরিতে চলে না : রাজনীতিতে উত্থান-পতন থাকবে, কারণ রাজনীতি কখনো একই থিওরি মেনে চলে না এমন দাবি রাজনীতিবিদ ও গবেষকদের। তবে জোটের রাজনীতি সব সময় প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, জোটের রাজনীতি কখনোই গুরুত্ব হারাবে না। জোট হয় আদর্শগতভাবে, শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়। সমমনা দলগুলো নিয়েও জোট হয়। আগেও জোটের রাজনীতি প্রাসঙ্গিক ছিল, বর্তমানেও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে এক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ভোরের কাগজকে বলেন, আমাদের দেশে জোট হয় নির্বাচনকেন্দ্রিক। কিন্তু নির্বাচন শেষে ক্ষমতায় এসে জোটের রাজনীতির চর্চা আর হয় না। গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। এখনো যেমন গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। এক্ষেত্রে রাশেদ খান মেননের সঙ্গে একমত নন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, এখনো অপশক্তির ষড়যন্ত্র চলছে। সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ-আগুনসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আদর্শিক জোটের প্রাসঙ্গিকতা এখনো বিদ্যমান। সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশে এখনো জোটের রাজনীতি প্রাসঙ্গিক। তবে রাজনীতি সবসময় একই থিওরিতে চলে না। উত্থান-পতন থাকবেই। করোনা না থাকলে আমাদের জোটবদ্ধ রাজনৈতিক কার্যক্রম আরো দৃশ্যমান হতো।

এদিকে রাজনীতিতে জোট এখনো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, রাজনীতির সংস্কৃতি পরিবর্তন হচ্ছে, এটা সত্যি। রাজনীতিবিদদের জন্য এখন বড় সুযোগ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা জরুরি। ভোটের আগে জোটের মেরুকরণ ও রাজনৈতিক ভাঙা-গড়ার খেলা স্বাভাবিক সংস্কৃতি মন্তব্য করে বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, তবে অনেকক্ষেত্রেই জোটগুলো আদর্শ ও নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না, হয় ক্ষমতাকেন্দ্রিক। এক্ষেত্রে আমাদের বাম গণতান্ত্রিক জোট নিছকই ক্ষমতাকেন্দ্রিক নয়, রাজনৈতিক বোঝাপড়া থেকেই জোট। রাজনৈতিক বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও আমরা রাজপথে সোচ্চার।

এদিকে জোটের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে মিশ্র বক্তব্য বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, জোট করার পূর্বশত নেই এখন। একই কারণে মহাজোট ও ১৪ দলীয় জোটও নিষ্ক্রিয়। তবে ‘সময়’ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের নিয়ামক মন্তব্য করে অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ বলেন, সময় সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। রাজনীতি মূলত একটি খেলা। সময়ই ঠিক করে দেয় খেলাটি কেমন হবে।

অন্যদিকে রাজনীতিতে জোট অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেছেন সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, রাজনীতি থাকলে তো জোট থাকবে। এখন তো রাজনীতিই নেই। যারাই ক্ষমতায় থাকে তারাই একক আধিপত্য বিস্তার করে। রাজনীতি এখন অপ্রাসঙ্গিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই জোটও গুরুত্ব হারিয়েছে।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়