‘আহারে ট্রাম্প, মাথা ঠাণ্ডা করো‘!

আগের সংবাদ

রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে নীতিমালা মানার বালাই নেই

পরের সংবাদ

ঘুরে এলাম সীতাকুণ্ড

সাগর-পাহাড়-অরণ্যের সঙ্গে মিতালী

প্রকাশিত: নভেম্বর ৬, ২০২০ , ৭:১১ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ৬, ২০২০ , ৮:৪৪ অপরাহ্ণ

আমরা হয়তো ভুলেই গিয়েছি। কবে যে এক সঙ্গে বসে আড্ডা দিয়েছিলাম। আমার যতটুকু মনে পড়ে, ৬ জানুয়ারি সিরাজুল হাসপাতালে বসেছিলাম। এরপর আর বসা হয়নি। দেখতে দেখতে চলে গেল ৯টা মাস।

চারটা বেজে গেছে। আমরা এখনো ঘুমাতে পারিনি। ফেনীতে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকা মেইল ট্রেন। অনেকক্ষণ হয়ে গেল লাইন সিগন্যাল দিচ্ছে না। কখন ছাড়বে তারও কোনো খবর পাচ্ছি না। এরইমধ্যে বাইরে ঘুরাঘুরি করছে শিমুল-সজীব। ক্লান্ত শরীর নিয়ে ট্রেনে ঘুমিয়ে পড়েছে মাহবুব। হাজারো ব্যস্ত মানুষ সে। ট্যুরটা তার মিস হয়েই গিয়েছিল। অল্পের জন্য রক্ষা হলো। ঘর থেকে ছাড়ছে না বউ। যেতে মানা করছে। কেন মানা করছে তারও কোনো সদুত্তর পাইনি।

অবশেষে সে আসছে, তা শুনে আমাদের মন ভালো হয়ে গেল। তবে শর্ত, বউকে ট্যুরে নিয়ে যেতে হবে। অথবা রাতেই বাপের বাড়ি দিয়ে আসতে হবে। কথা না বাড়িয়ে সে বউকে শ্বশুর বাড়ি দিয়ে স্টেশনে চলে এসেছে। এতে সেও অনেকটা স্বস্তি বোধ করছে। আমরাও স্বস্তির হাসি হাসলাম।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ে উঠার পূর্ব মুহূর্ত।

নরসিংদী রেল স্টেশনে ট্রেন যথাসময়েই এলো। শিমুল সিট নিয়ে একটু দুশ্চিন্তায় ছিল। ট্রেনে উঠার পর সেই শঙ্কাও কেটে গেল। ট্রেন চলছে। আমি ঘুমহীন চোখে তাকিয়ে আছি। দেখছি যাত্রীদের ক্রিয়াকলাপ। একজন নারী গান ধরলেন। মনে হচ্ছে মাজার ভক্ত। তার সঙ্গে অন্য নারী-পুরুষও কণ্ঠ মেলালেন। এভাবেই কাটল ঘণ্টাখানেক। এরপর চোখ দুটো চলে গেল জানালার বাইরে। উপভোগ করছি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। আলো-আঁধারির খেলা। চোখে নেমে এল প্রশান্তির ছায়া।

পাহাড়ে মেঘমালা

কতো কতো স্টেশন রাতের অন্ধকারে পেছনে ফেলে এসেছি। কোনো স্টেশনের নামই মনে ধরেনি। তবে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের গুনবতী রেল স্টেশন। ফেনী জেলার মুহুরীগঞ্জ, চিনকি আস্তানা, কালিদহ, ফাজিলপুর স্টেশনের নামগুলো হৃদয়ে গেঁথে গেল। এছাড়া মনে ধরল চট্টগ্রামের মিরসরাই, মস্তাননগর স্টেশনের নাম। সবগুলোই লোকাল স্টেশন।

গুলিয়াখালী সি বিচে ক্যামেরার সামনে পোজ দিলেন এক তরুণ।

আমাদের সফরে নেপথ্যে দিকনির্দেশনা দেন খাইরুল ভাই। অসাধারণ এক গুণের মানুষ। খোঁজ-খবর নিয়েছেন প্রতিনিয়ত। নানাভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন সহযোগিতার হাত। সীতাকুণ্ড শহরের পরিচিত এক মুখ তিনি। ধার্মিক মানুষ। ধ্যান-জ্ঞানে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী। দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার। মেয়ের নাম সামিয়া ইসলাম রাইসা। পড়াশোনা করে সীতাকুণ্ড পাবলিক স্কুলে ক্লাস ফাইভে। তার বড় ভাই সাকিবুল ইসলাম পড়ে ক্লাস সিক্সে। স্কুলের নাম সীতাকুণ্ড সরকারি হাইস্কুল।

গুলিয়াখালী সি বিচে ক্যাওড়া বন।

রোজিনা ভাবিও অসাধারণ এক মানুষ। রান্নাটাকে তিনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেলেন। আমরা ভাবতেই পারি না অসুস্থ শরীর নিয়ে এত ভালো রান্না করবেন। খাইরুল ভাই ভাবির প্রসংশা করে বলেন, সে সুস্থ থাকলে আরও কতো পদ রান্না করে খাওয়াত, ভাবতেই পারতেন না। ভাই, ঠিকই বলেছেন। একদিনেই তার প্রমাণ পেলাম।

এবার আসি ভ্রমণ প্রসঙ্গে, ১ নভেম্বর সকালে আমরা সদলবলে গেলাম সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। এই পার্কেই রয়েছে সহস্রধারা ও সুপ্তধারা নামের দুটি ঝরনা। এসব ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট ফিটনেস ও শারীরিক শক্তি সামর্থ্য। পরিশ্রমও করতে হবে হাড় ভাঙা।

পেছনে সাগর। সৈকতে ছিটকে পড়ছে ঢেউ।

ট্রেইলের প্রতিটি ধাপেই আছে আনন্দ-বেদনা। উঁচু-নিচু পাহাড়ি সরু পথ। ঝোপ জঙ্গলের সমারোহ। হিমেল হাওয়া। ঝরনার জলের প্রবাহ। সঙ্গে আছে জোঁকের উপদ্রব। এ থেকে কম ভ্রমণার্থীই রক্ষা পায়। পথে থামলেই আক্রমণটা বেড়ে যায় জোঁকের। শুষে নেয় রক্ত। এরপর শুরু হয় ব্লিডিং। দুপুরের আগেই ঘুরে শেষ করলাম সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক।

দুপুরে লাঞ্চ সেরে আমরা গুলিয়াখালী সি বিচের পথ ধরলাম। যাত্রাপথে আমাদের সঙ্গী হওয়ার কথা ছিল খায়রুল ভাইয়ের। সকালে তিনি আমাদের কথাও দিয়েছিলেন, যাবেন। যাওয়ার আগে ফোনে জানালেন, ব্যবসায়িক কাজে আটকা পড়ে গেছেন। যেতে পারবেন না। অভয় দিয়ে তিনি আমাদের যেতে বললেন, আমি তো আছি, কোনো সমস্যা নেই।

নৌকা ছুটছে সাগরপানে।

সিএনজি চলছে, গুলিয়াখালী সি বিচের অভিমুখে। আধা ঘণ্টা পর পৌছঁলাম সেখানে। কাদা জলের বিস্তীর্ণ মাঠ। সাগর পাড়ে বাইন ক্যাওড়ার বন। জোয়ার-ভাটার খেলা। নৌকায় চড়ে যেতে হবে সি-বিচের সৈকতে। দাম-দর করার সুযোগ নেই। একরেট। অল্প একটু পথ জনপ্রতি ৩০ টাকা।

আহা কী আনন্দ, পাড়ে এসে ছিটকে পড়ছে সমুদ্রের জলরাশি। সাগরের বুকে চোখে পড়ল দূরে গ্রামের মতো কিছু একটা। পড়ে জানতে পারলাম, ওটা সন্দ্বীপ। কয়েক লাখ মানুষের জনবসতি। যোগাযোগের একমাত্র পথ নৌযান। সম্প্রতি ওই দ্বীপে সাগরের তলদেশ দিয়ে চলে গেছে বিদ্যুৎ।

সহস্রধারার রূপে মুগ্ধ এক তরুণ পর্যটক।

পরদিন ২ নভেম্বর সকালে আমরা দেখতে গেলাম চন্দ্রনাথ পাহাড়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে কিছুটা পথ পাড়ি দিয়েছি। এক পর্যায়ে গিয়ে থেমে গেলাম। শরীর আর সাপোর্ট করছে না। পাশেই ঝরনা। এখানে পুরনো পরিত্যক্ত একটা দোকান ঘরও আছে। তার মধ্যেই শুয়ে বসে কাটিয়ে দিলাম কয়েক ঘণ্টা। তীর্থস্থান আর দর্শন হলো না। এতটুক পথ উঠতে সময় লেগেছে ৫০ মিনিট। চন্দ্রনাথ মন্দিরে উঠতে পারিনি এটা আমার ব্যর্থতা নয়। ক্লান্ত-অবসন্ন শরীর নিয়ে যতটুকু উঠেছি এটাই আমার জন্য সাফল্য।

মাহবুব-শিমুল জানাল, বাকি পথ উঠতে তাদের সময় লেগেছে প্রায় দুই ঘণ্টা। সজীব, শিমুল, মাহবুব মন্দিরের চূড়ায় গেছে এটা আমার জন্য সৌভাগ্য। আমি গর্ব করে বলতে পারব তারা চন্দ্রনাথ পাহাড় জয়ী। আশা করি, ভবিষ্যতে এই বন্ধুরাই এভারেস্ট জয় করবে।

সহস্রধারা ঝরনার পথে হাঁটছে পর্যটকরা।

বাড়ির নাম ইসরাইল। নামটি দেখে চোখ আটকে গেল মাহবুবের। উল্টো তাকে প্রশ্ন করলাম, বাড়ির নাম ইসরাইল হয় কী করে! দেখ তো ভালো করে। হ মিয়া। আমরা সবাই তখন সিএনজিতে বসা। যাচ্ছি চন্দ্রনাথ পাহাড়ে। বাড়ির নাম রাখার বিষয়ে একটা ব্যাখাও দিল মাহবুব। অনেক প্রবাসী নিজের বাড়ির নাম রাখে অন্য দেশের নামে। এই যেমন কেউ সৌদি আরব থাকে। তিনি শখ করে বাড়ির নাম রাখলেন সৌদি বাড়ি। সজীব যুক্তি দিয়ে বলে, ইসরায়েল তো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতিই পায়নি। কীভাবে ওই লোক সেই দেশে যাবে, কীভাবে বাড়ির নাম রাখবে? দেখনি, বাংলাদেশি পাসপোর্টে লেখা থাকে, ইসরায়েলের কোনো ভিসা-পাসপোর্ট হয় না। আকাঁবাকা পথে সিএনজি চলছেই। আলাপও জমে উঠছে, আমরাও চলে গেলাম অন্য প্রসঙ্গে।

মহামায়া ইকোপার্কে যাওয়ার আগেই হৃদয়ের সঙ্গে পরিচয়। দুপুরের খাবারটাও খেল আমাদের সঙ্গে আল-আমিন হোটেলে। সে-ই নিয়ে গেল হোটেলটায়। বন্ধুদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। এমন দৃষ্টান্ত মনে হয় খুব কম মানুষের জীবনে আছে। সঠিক গাইডলাইন পেলে এমনটা হতে না। সীতাকুণ্ডের ছেলে সে। ঢুকেছিল পুলিশের কনস্টেবলে। পোস্টিং ছিল দিনাজপুরে। এখন সে পুরোদমে গাড়ি চালক। থাকে চট্টগ্রামেই। মুক্তপাখির মতো ঘুরে বেড়ায়। সে-ই আমাদের ড্রাইভ করে মহামায়া ইকোপার্কে নিয়ে গেছে। এরই মধ্যে জুড়ে দিয়েছে নানা গল্প।

মহামায়া ইকোপার্কটি পড়েছে মিরসরাইয়ের ঠাকুরদিঘী বাজার সংলগ্ন। মহামায়া লেকের সৌন্দর্য যে কোনো ভ্রমণবিলাসীর নজর কাড়বে। দিগন্ত জোড়া স্বচ্ছ জলরাশি। পাহাড় আর অরণ্যের সখ্যতা। মেঘের লুকোচুরি। হিমেল হাওয়া। পাহাড়িদের সংগ্রামী জীবন। মহামায়া লেকে আমরা শুয়ে-বসেই বিকেল কাটিয়ে দিয়েছি। ঘুরাঘুরি ততটা হয়নি। ইচ্ছে করলে যে কেউ প্লাস্টিকের নৌকায় ঘুরতে পারবে। তবে তা সবার সাধ্যের মধ্যে নাও থাকতে পারে। উচ্চমূল্য। একদর। সেবার মানও ভালো নয়। এমনটা হয়েছে সিন্ডিকেটের প্রভাবে। সিন্ডিকেট বাণিজ্যটা সর্বত্রই। যেন দেখার কেউ নেই। সিএনজি অটোরিকশার ভাড়াটাও এখানে ঊর্ধ্বমুখী।

সুপ্তধারা ঝরনায় জলকেলিতে ব্যস্ত পর্যটকরা।

ঠাকুরদিঘী বাজার থেকে ফেনী এলাম সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়। আরো আগে এসে পৌঁছতাম। পথে নষ্ট হয়ে গেছে গাড়ি। চলে এলো একটা বিরক্তভাব। ভ্রমণের ছন্দটাই নষ্ট করে দিল। গাড়ি থেমে থেমে চলতে শুরু করল। একটু আসার পর রাস্তার নেমপ্লেটে দেখি, ফেনী আর ৪ কিলোমিটার দূরে। মনে মনে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম, বাঁচা গেল। আর অল্প একটু পথ। বাস থেকে নেমেই রিফ্রেশ হলাম। এশার নামাজটা সেরে নিলাম, ফেনীর সড়ক বিভাগের মসজিদে। সেখান থেকে রওনা দিলাম ফেনী রেল স্টেশনের উদ্দেশ্য।

সুপ্তধারা ঝরনা

মাহবুব বলল, অল্প কিছু পথ, আমরা হেঁটেই যেতে পারব। তাতে ফেনী শহরটাও ভালোভাবে ঘুরে দেখা হবে। তাঁর কথায় আশ্বস্ত হয়ে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। হাঁটছি তো হাঁটছি। পথ যেন ফুরোচ্ছে না। বলল, ১০ মিনিটের পথ। লাগল প্রায় ১ ঘণ্টা। স্টেশনের কাছাকাছি এসে মাহবুব বলে, পথ আমরা মনে হয় ভুল করেছি। এত সময় লাগার কথা নয়। বলা যায়, ফেনী শহরটা ঢাকার মতোই উন্নত। আছে বড় বড় শপিংমল ও দোকানপাট। প্রশস্ত রাস্তাঘাট। নেই যানজট।

লাঠিতে ভর করে উঠছে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে। এখনো অনেক পথ বাকি।

এই ট্যুরের বড় এডভেঞ্চার মাহবুব। ১৩টা জোঁক তাকে জেকে ধরে। তবে কামড় দিতে পারেনি। শুরুতেই আক্রান্ত করল আমাকে। একটা-দুটা নয়। চারটা জোঁক কামড় দিয়েছে। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের একটা অংশে সে নেমে এসেছে ২০ মিনিটে। যেখানে পাহাড় আরোহীদের লাগে ৪০ মিনিট। এসেই তার সাহসিকতার গল্প শুরু করে দিল আমার সঙ্গে।


ক্লান্ত হয়ে মহামায়া লেকের পাড় বিশ্রাম নেন এক পর্যটক।

আমাদের স্মৃতিতে ঠিকই থাকবে সহস্রধারা, সুপ্তধারা ঝরনা, সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক, গুলিয়াখালী সি বিচ, চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মহামায়া লেক। তবে আমাদের মতো তরুণদের মনে রাখবে কী সীতাকুণ্ড!

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়
close