বঙ্গবন্ধু নিয়ে লেখা বই পাইরেটেড, চারজনকে কারাদণ্ড

আগের সংবাদ

ইন্টিগ্রেটেড মাস্টারপ্লান ফর ঢাকা সিটি প্রণয়ন করা হচ্ছে

পরের সংবাদ

নরক ও ফুলের কাহিনী

পাঁকে ফুটে ওঠা এক পদ্মফুলের আত্মকথা

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২০ , ৯:০৪ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ৫, ২০২০ , ৯:০৬ অপরাহ্ণ

‘জন্ম নিয়েছি ধূলিতে দয়া করে দাও ভুলিতে
নাই ধূলি মোর অন্তরে।
শুরুতেই রবীন্দ্রনাথের ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যের একটি গানের উল্লেখ করতেই হলো। প্রকৃতি যেন এখানে উজাড় করে দিয়েছেন তাঁর অন্তরের কথা। সবার উপরে হলো মানবজন্ম। যে যেখানে যেভাবেই জন্মান না কেন তার জন্মে সে নিজে দায়ী নয়। আমাদের অদ্ভুত এই সমাজব্যবস্থা মানুষকে সাদা কালোয় বিভক্ত করেছে। এনেছে ধনী গরিবের বিভেদ, মিথ্যে জাত্যাভিমানের দেয়াল তুলে মানুষের মধ্যে গড়েছে এক দু….. বিভেদ। কিন্তু তাঁর অন্তরে নেই ধুলো, তাঁর জন্ম যে আর দশজন মানুষের মতোই সত্যি। মানুষের গড়া মানুষেরই মধ্যে মিথ্যে বিভেদের বিরুদ্ধে তার সেই সরব প্রতিবাদ রবীন্দ্রনাথের কলমে মূর্ত হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির সেই অন্তরের বাণী তাই আমাদের স্পর্শ করে।
কথাগুলো উঠে এলো আনোয়ারা সৈয়দ হকের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ নরক ও ফুলের কাহিনী (২০০৬) পড়তে পড়তে। এ এক আশ্চর্য গ্রন্থ। একজন মধ্যবয়সী নারীর কলমে এই গ্রন্থরচনা এবং তাও বাংলাভাষায়- সত্যি সত্যি অত্যন্ত দুঃসাহসিক।
তার মা ব্রাহ্মণকন্যা, তার বাবা বিহার থেকে আসা এক অবাঙালি পরিবারের সন্তান, নেই মানুষটা তার আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান করেছেন অতি শৈশবকাল থেকে। জন্মেছিলেন যশোরের এক অখ্যাত পল্লী চুড়িপট্টিতে। লেখক অত্যন্ত অকপটে তার জন্মকালের ইতিহাস এইভাবে ব্যক্ত করেছেন, ‘… জন্মের আগে যদি আমার কোনো বক্তব্য থাকত তাহলে ঈশ্বরের কাছে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করতাম যে এরকম একটি সংসারে, এমন একটি সময়ে এবং এরকম একটি যুগে তিনি আমাকে জন্ম না দেন। কিন্তু আমার সে সুযোগ ছিল না। পৃথিবীর এমন একটি অবহেলিত জনপদে, এরকম একটি সংকট সময়ে, এরকম একটি বিশৃঙ্খল সময়ে সংসারে পাঠাবার আগে ঈশ্বর আমাকে কোনো লাল বিপদ সংকেত দেননি। (পৃষ্ঠা- ১০)। গ্রন্থের প্রায় শুরুতেই এমন একটি আত্মবয়ানে আমি প্রায় চমকে উঠি। বুঝতে পারি আমাদের অভ্যস্ত আত্মজীবনী অবলোকনের নির্মোক ছেড়ে এই গ্রন্থকে নির্বাচন করতে হবে। বস্তুত এমন অকপট, নির্মোহ খোলামেলা আত্মজীবনী একজন নারীর কলমে এবং তাও বাংলা ভাষায়- সত্যি সত্যি এর আগে আমি পড়িনি।
লেখিকা জন্মেছিলেন স্বাধীনতার বেশ কয়েক বছর আগে, বলা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। সময়টা চিল চরম অস্থিরতার। স্বাধীনতাপূর্ব সেই সময়, দাঙ্গা আর ভ্রাতৃঘাতী ঘটনা সংঘাতে ভরা। লেখিকার মানসজগতে তারই মধ্যে বাসা বুনেছে কৈশোর প্রেমের মধুমাখা অনুভ‚তি। সহপাঠী ভোলা তার মনের মুকুরে এক স্থায়ী ছাপ ফেলল এবং দেশভাগের সময়ে অজস্র দেশত্যাগী হিন্দুদের ভিড়ে ভোলার চিরকালীন প্রস্থান লেখক তাই আজও ভোলেননি। প্রথম প্রেমের এই অকাল মৃত্যু তার মনে এক স্থায়ী বিষণ্ণতার জায়গা করে নিল। আশ্চর্য ভঙ্গিমায় লেখক তার এই মনোগহনের রত্নরাজি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে লিখেছেন। কোনো অপরাধবোধ নয়, নিষ্পাপ শিশুর হৃদয় নিংড়ানো সেই ভাষা। একইভাবে তিনি হারিয়েছেন তার শৈশবের খেলার সাথী বেলিকে। তার সঙ্গে তার আবাল্যসখ্য সেই বেলিরাও একদিন কাউকে কিছু না চলে দেশত্যাগী হয়েছিল। প্রিয়বন্ধুকে হারানোর এই দুঃখ তাকে সারাজীবন তাড়া করে ফিরেছে। অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিমায় তার এই অকাল বন্ধুবিচ্ছেদের আখ্যান চোখের জলে লিখেছেন। পাশাপাশি আছে নানা মানুষ বিশেষ করে গৃহশিক্ষকদের যৌন নিগ্রহের অকপট স্বীকারোক্তি।
দেশভাগের স্মৃতি লেখককে তাড়া করে ফেলে। তাদের নিরুপদ্রব যশোরে এক সময় দেশভাগের প্রভাব এসে পড়ল। দলে দলে বিহারিরা এসে নিরীহ হিন্দুদের বাড়িঘর সম্পত্তি দখলের অনিবার্য ফলশ্রুতি হয়ে দাঁড়াল নিত্য অশান্তি, লুটপাট আর হত্যা। ফলে শুরু হলো দেশত্যাগ করার হিড়িক। কেবল প্রাণটুকু হাতে করে অজানা দেশে বহু মানুষের সেই যে কাফেলা তা দেখেই ওইটুকু ছোট্ট বয়সের মেয়েটি বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। আশ্চর্য এক নির্মোহ ভঙ্গিমায় লেখক তার সেই সময়কার অনুভ‚তি ব্যক্ত করেছেন। কীভাবে যেন তার মধ্যে তখনই এক অসাম্প্রদায়িক চেতনা দল মেলতে শুরু করেছে। পরবর্তী সময়ে যিনি একজন লেখক হবেন তার মানবিক বোধ জীবনের পাঠ নেয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ঈশ্বর যেন অলক্ষ থেকে তাকে দান করেছিলেন।
আর দশজন মানুষের মতো তার জীবনেও প্রেম এসেছে, এক অদ্ভুত মধুমাখা অনুভ‚তির প্রেম। কতই বা বয়সে তখন তা- বছর দশেক। শরীর ও মনের এক অনন্য সংযোগের সেই সময়ের কথা লেখক অকপটে লিখেছেন। জানিয়েছেন তার জীবনে মুকুল নামের সেই ছেলেটির কথা, যে তাকে একটি বাঁধানো খাতা উপহার দিয়ে তার ওপর লিখে দিয়েছিল, আনোয়ারা বেগম চৌধুরী। খাতার চারপাশে কালির আঁচড়ে এঁকে দিয়েছে সুন্দর নকশা, ভালোবাসার অমল মধুর সেই অভিব্যক্তি তাকে অনুপ্রাণিত করেছে লেখক হতে। সেই বয়সেই সেই ছোট্ট মেয়েটি সেই খাতার পাতা ভরে দিয়েছে নানারকম খেলায় গল্প কবিতা ইত্যাদি। তার শরীরে ও মনে তখন শিহরণ ও উন্মাদনা। সৃজনশীল মানুষের সৃজনের স্রোতমুখ হয়তো এইভাবেই খুলে যায় বাল্যপ্রেমের অমলিন মাধুর্যের প্রভাবে। সেই বালিকা বয়সেই নানা কাগজে লেখা পাঠিয়ে দেবার নেশা তাকে পেয়ে বসেছিল। সংবাদপত্রের কচিকাঁচার আসরে এইভাবেই তার হাতেখড়ি। সেই অর্থে তার লেখক হবার অনুপ্রেরণা পরোক্ষভাবে এসেছে তার বাল্যপ্রেমিক মুকুলের কাছ থেকে। কিন্তু এই প্রেমও পরিণতি পায়নি। কেননা তাকে তো ওই বদ্ধজলার মধ্যে জীবন কাটাতে ঈশ্বর পৃথিবীতে পাঠাননি। সেই অর্থে মায়ের ব্যর্থ জীবনের গøানি তাকে ঠেলে দিয়েছিল বৃহত্তর জীবনের পথে। সেই মা-ই তাকে চূড়ান্তভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন সারাজীবন। তাই অমন কালিমা লাঞ্ছিত বদ্ধ পরিবেশে জন্মেও লেখক স্বপ্ন দেখেছিলেন বৃহত্তম জীবনের। তাই তো আজকের এই সাফল্যভরা জীবনের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে এতসব ধূলিমলিন কাঁটা বিছানো পথের চড়াই-উৎরাই, যাকে ডিঙিয়ে যাবার জন্যে চাই মনের জোর ধৈর্য বা তিনি অর্জন করেছিলেন সেই শিশু বয়সেই।
এইভাবে জীবনের নানা ঘাত-সংঘাতের মধ্য দিয়ে পথ চলতে একদিন এই ছোট্ট মেয়েটি একটু একটু করে বড় হতে থাকে। স্কুলের গণ্ডি পেরোবার পথে অজস্র কাঁটাভরা পদলাঞ্ছনা আর পাঁক থেকে বেরিয়ে আসায় দুর্ময় চেষ্টায় সে এবার নতুন জীবনের পথে পা বাড়ায়। আঠারো বছরের এক পোড়খাওয়া মেয়ে ডাক্তারি পড়ার জন্য ঢাকা যাত্রার জন্য তৈরি হয়। এ যেন এক শাপমুক্ত জীবনের অনন্য এক গোত্রন্তরের পালা। যশোরের সেই হৈ হৈ আর কোলাহলমুখর জীবনের পঙ্ক থেকে সে পা দেয় বৃহত্তর জীবনের দিকে। যে বাড়ির অসহ পরিবেশ তাকে নিত্য পীড়িত করেছে আজ তাকে ছেড়ে যাবার জন্যে তার একেবারেই মন কেমন করছে না। লেখিকা অকপটেই তাই লিখে ফেলেন-
বাড়ি ছাড়ার স্বপ্ন আমার ছোটবেলা থেকে, যে স্বপ্নের বাস্তবরূপ দেয়ার জন্যে মুকলকে আমার জীবন থেকে হটিয়ে দিয়েছি। কষ্ট হয়েছে তবু হটিয়ে দিয়েছি। দুঃখ হয়েছে তবু হটিয়ে দিয়েছি।
স্বপ্ন আমার সফল হতে চলেছে। বাড়ি ছাড়ার স্বপ্ন। এ মুহূর্তে কেউ না জানলেও আমি জানি এ বাড়িতে আমি ফিরছি নে। এ বাড়িতে আমার গণ্ডার এক ভাই আছে, অসম্ভব রাগি এক পিতৃদেব আছেন, শরীরে হাত রাখার জন্যে চারপাশে ছোঁক ছোঁক করছে কতকগুলো পুরুষ, আমার বাবাও তাদের লালসা দমন করতে অপারগ, এ বাড়ি আমার জন্মে নিরাপদ নয়, আমার স্বপ্ন সফল জন্মে অবশ্যই সঠিক জায়গা এটা নয়।
আমি বাড়ি ছাড়ছি আজ।
পড়তে যাচ্ছি ঢাকায়।
… আজ সকাল থেকে আমার প্রাণের স্বাধীনতার ঢোল দমদম করে আওয়াজ তুলছে, আমি আজ বিকেল থেকেই চুড়িপট্টির এই বদ্ধ, পচা, গন্ধ ওঠা পরিবেশের বাইরে পা রাখছি, আমি ডাক্তারি পড়তে যাচ্ছি ঢাকায়, আমি বাবার রক্তচক্ষু আড়ালে চলে যাচ্ছি, আমি গণ্ডিবদ্ধ শিকল ছিঁড়ে ফেলছি, আমি জীবনের শ্যাওলা দু’হাতে সরিয়ে দিয়ে বেগবান স্রোতের ভেতরে নিজেকে নিমজ্জিত করছি। আমি ঢাকা যাচ্ছি। (পৃ.-
এই গ্রন্থ পড়তে পড়তে মাঝে মাঝেই শিহরিত হতে হয় লেখকের নিজেকে উন্মোচিত করার সাহস দেখে। এই গ্রন্থে আর দশটা আত্মজীবনীর মতো নয়। নিজেকে আড়াল করার কোনো চেষ্টাই লেখক করেননি। বরং তার চারপাশের পরিবেশ পরিস্থিতি ও মানুষজনের ছবি এমন বিশ্বাস্য ভঙ্গিতে এঁকেছেন যে আমরা কল্পনার পাখার ভর দিয়ে পৌঁছে যাই চল্লিশ দশকের সেই দুঃসময়ে। আশ্চর্য হয়ে যাই তার সেই হয়ে উঠার উত্তরণের বর্ণনায়।
রবীন্দ্রনাথের গানের উদ্ধৃতি দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। সেই রবীন্দ্রনাথেরই আরেকটি গানের প্রাসঙ্গিক কয়েকটি চরণ দিয়ে এই লেখা শেষ করতে চাই। কারণ আমাদের সমস্ত সহায় সম্পদে বিপদে ও অগ্রবর্তিতায় তিনিই তো আমাদের একমাত্র ভরসা।
দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে তব মঙ্গল- আলোক
তবে তাই হোক।
মৃত্যু যদি কাছে আনে তোমার অমৃতময় লোক
তাকে তাই হোক।
পূজার প্রদীপে তব জ্বলে যদি মম দীপ্ত শোক
তবে তাই হোক।
অশ্রু-আঁখি পরে যদি ফুটে ওঠে তব স্নেহচোখ
তবে তাই হোক।
বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে আনোয়ারা সৈয়দ হক কথাসাহিত্যিক হিসেবে একটি স্থায়ী আসনের অধিকারী হয়েছেন। মনোচিকিৎসক হিসেবেও তার নাম সুবিদিত। সৈয়দ শামসুল হকের যোগ্য সহধর্মিণী হিসেবে শুধু নয়, আত্মপরিচয়ের একটি স্বতন্ত্র অভিধায় নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন স্বীয় মেধা মনন ও ক্ষমতার জোরে। তার দীর্ঘজীবনের একটি পর্বের অনুপুঙ্খ বর্ণনায় সমৃদ্ধ এই গ্রন্থটি পড়তে পড়তে আমরা ক্রোধান্ধ হই স্নিগ্ধতায় আপ্লুত হই, প্রীতিময়তায় ঋদ্ধ হই। এমন গ্রন্থ বাংলাভাষায় খুব বেশি লেখা হয়নি, বিশেষ করে কোনো নারীর কলমে।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়