অস্ত্র-ইয়াবাসহ আদাবর থানা আ.লীগ নেতা গ্রেপ্তার

আগের সংবাদ

স্মৃতিতে আবুল হাসনাত

পরের সংবাদ

নরসিংদীতে প্রণোদনায় অনিয়ম

দোকান বাকি আর ঋণে জর্জরিত সংস্কৃতিকর্মীরা

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২০ , ৯:৩৬ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ৭, ২০২০ , ৯:৪১ অপরাহ্ণ

মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, আড়িয়ালখাঁ ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীর বিধৌত প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যে লালিত জেলা নরসিংদী। এখানে রয়েছে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ঢাকার বাইরে প্রথম হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে এই জেলার পাঁচদোনা নামক স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ করে।

কথিত আছে, প্রাচীনকালে এই অঞ্চল নরসিংহ নামক একজন রাজার শাসনাধীন ছিল। আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে রাজা নরসিংহ প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে নরসিংহপুর নামে একটি ছোট নগর স্থাপন করেন। তারই নামানুসারে ‘নরসিংদী’ নামের আবির্ভাব হয়। রাজা নরসিংহের নামের সঙ্গে ‘দী’ যুক্ত হয়ে ‘নরসিংহদী’ হয়। ওই শব্দের পরিবর্তিত রূপই ‘নরসিংদী’।

নরসিংদীর আদি ভূমিতে অবস্থিত বেলাব উপজেলার ‘উয়ারী বটেশ্বর’ গ্রামে পরিত্যক্ত ভিটা ও অসমরাজার গড় আবিষ্কৃত হয়েছে, এটি নব্য প্রস্তর যুগীয় সভ্যতার নিদর্শন। উয়ারীতে খ্রিস্টপূর্বকালের ছাপাঙ্কিত পর্যাপ্ত রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া গেছে। এগুলো নরসিংদী অঞ্চলের আদি সভ্যতার স্পষ্ট ইঙ্গিত।

নরসিংদী জেলার বিশেষ ঐতিহ্য হলো তাঁত শিল্প। কলা, কাঁকরোল, শসা, শিম, বেগুন, ধান, পাট, আলু ও লটকন উৎপাদনে নরসিংদী একটি অন্যতম কৃষি শিল্পে সমৃদ্ধ জেলা। প্রাচীন সভ্যতা, গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ নরসিংদীতে হানা দিয়েছে করোনা। এর ধাক্কায় শিল্প সংস্কৃতির মানুষদের জীবন এলোমেলো হয়ে গেছে।

সূত্র জানায়, নরসিংদীতে সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংখ্যা ষাটের অধিক। সংস্কৃতি কর্মীর সংখ্যা রয়েছে প্রায় ৬ হাজার। যারা সরকারি-বেসরকারি নানা অনুষ্ঠান করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু এখন সবাই পুরোপুরি বেকার। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ১০০ জনকে সহায়তা দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন অঙ্গন সীমিত আকারে খুলে দেয়া হলেও সাংস্কৃতিক অঙ্গন এখনো স্থবির। অধিকাংশ শিল্পীর জীবনই কাটছে ধার-দেনা এবং জমানো টাকা ভেঙে। অথচ সহায়তা পেয়েছেন যা সচ্ছল এবং ৩/৪ তলা বাড়ির মালিকরাই! এতে ক্ষুব্ধ শিল্পীরা। তারা বঞ্চিতদের সহায়তা দেয়ার দাবি জানান।

জানতে চাইলে শিল্পী ও প্রশিক্ষক দুলাল সাহা ভোরের কাগজকে বলেন, করোনার ছোবলে আমার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। মুদি দোকান থেকে বাকিতে বাজার ও আত্মীয়স্বজনের সহায়তা নিয়ে কোনোভাবে বেঁচে আছি। এই দুঃসময়ে প্রশাসনের কোথাও থেকে কোনো সহায়তা পাইনি। যারা সচ্ছল, যারা ৩/৪ তলা বাড়ির মালিক তারা সরকারের ভাতা ও সহায়তাও পাচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, জীবনের ৩৫টি বছর এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে আমি কি পাপ করেছি!

সংগীত শিল্পী ও প্রশিক্ষক মনিরুল ইসলাম মনি বলেন, করোনা আমাদের ভালো থাকা কেড়ে নিয়েছে। অল্প কিছুদিন জমানো টাকায় চলেছি। এরপর লাখের উপর ঋণ। কারণ বাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে সব কিছু টানতে হচ্ছে। কেউ এক টাকাও মাফ করেনি। এমন দুরাবস্থায় পড়ে গেছি যে, যেখানে ৩ বেলা খেতাম সেখানে ২ বেলা খাচ্ছি। শিল্পকলার কাছে সহায়তার জন্য সব কিছু জমা দিলাম। কিন্তু সহায়তা পেলাম না। অথচ যাদের বাড়ি-গাড়ি আছে তারাই সহায়তা পেয়েছে!

বৈশাখী সংগীত একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, প্রশিক্ষক ও শিল্পী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, গানের ওপর নির্ভর করেই আমার বেঁচে থাকা। ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস নিতে চাইলেও করোনার ভয়ে অভিভাবকরা রাজি হচ্ছে না। এ অবস্থায় ধার করে চলতে হচ্ছে। লজ্জায় কারো কাছে হাত পেতে চাইতেও পারছি না। শিল্পকলায় কালচারাল অফিসারকে নামের তালিকা দেয়া হলেও কোনো সহায়তা পাইনি। আমার তৈরি করা শত শত ছাত্রছাত্রী পুরস্কার পাচ্ছে এবং সম্মানিত হচ্ছে। অথচ আমিই অবহেলিত!

মুক্তধারা নাট্য সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য প্রলয় জামান বলেন, যারা সংস্কৃতিকে জীবিকা হিসেবে নিয়েছে তাদের অবস্থা দুঃসহ। তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং পৌরসভা থেকে সহায়তা দিলেও তা অপ্রতুল। এই নাজুক পরিস্থিতিতে মানুষের সুকুমার বৃত্তিকে জাগিয়ে রাখতে সংস্কৃতিকে যারা আকড়ে ধরে আছেন তাদের পাশে দাঁড়ানোর দাবি জানাচ্ছি।

নরসিংদী মুক্তধারা নাট্য সম্প্রদায়ের সভাপতি জহিরুল ইসলাম মৃধা বলেন, যেসব শিল্পীরা শিল্পের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে, এককথায় তারা এখনো বেকারত্বের বোঝা টানছেন। তারা পেশা বদলেরও সুযোগও পাচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে শিল্পীরা যদি এ অঙ্গন থেকে নেই হয়ে যায় তাহলে বিশাল ক্ষতি গুনতে হবে এ অঙ্গনেরই। এই অংশটা স্তিমিত হয়ে গেলে আমরা অন্ধকারে পড়ে যাব।

এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আরো বলেন, মননশীল সৃজনশীল কার্যক্রমের জন্য শিল্পীরা যে জীবনবাদী ভূমিকা রাখছে তা ছেড়ে গেলে শিল্প সংস্কৃতির ভুবনই বিপর্যস্ত হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে সহায়তার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানাই। কারণ আমাদের শিল্প সংস্কৃতি তাদের মাধ্যমেই লালিত-পালিত হয়ে আসছে।

গাড়ি-বাড়ির মালিকরা সরকারের সহায়তা পাচ্ছে এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার শাহেলা খাতুনকে ভোরের কাগজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়