রিফাত হত্যাকাণ্ড: অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির রায় আজ

আগের সংবাদ

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে ১৭ বছর

পরের সংবাদ

দেশে করোনা সংক্রমণের ‘গোলকধাঁধা’ কাটছেই না

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২০ , ৯:৩৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৭, ২০২০ , ৯:৩৫ পূর্বাহ্ণ

সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় মিলছে না প্রকৃত চিত্র
সরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা তথ্যে দ্বিমত সরকারের

কোভিড-১৯ সংক্রমণ পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে আছে তা নিয়ে এখনো গোলকধাঁধার মধ্যে রয়েছে দেশবাসী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্বিকভাবে বললে দেশে করোনার সংক্রমণ কমেছে। কিন্তু কত মানুষের মধ্যে এর সংক্রমণ হয়েছে সেই পরিসংখ্যান নেই। আর কোনো পরিসংখ্যান না থাকায় বাংলাদেশে বর্তমানে কোভিড-১৯ সংক্রমণের পরিস্থিতি কেমন- বৈজ্ঞানিকভাবে বলতে গেলে তা কেউই সঠিকভাবে বলতে পারছে না।

এতদিন বলা হতো শহরের বস্তি ও ঘিঞ্জি পরিবেশে যারা থাকে তাদের মধ্যে করোনার সংক্রমণ নেই। কিংবা থাকলেও তা খুবই কম। কিন্তু সরকারি এক প্রতিষ্ঠানের গবেষণাতেই দেখা গেছে এই ধারণা ভুল। এছাড়া দেশে ৮ মার্চ করোনার সংক্রমণ শুরুর আগে থেকেই করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত তথ্য জানিয়ে আসছে। এসব তথ্য নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ছিল। তাদের ধারণা, সরকার যে সংক্রমণের তথ্য প্রচার করছে, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা তার চেয়ে যে অনেক বেশি সেটিও ওই গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে গবেষণার ওই তথ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। জানা যায়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এমন তথ্য সরকারের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। আর এ কারণেই গবেষণার ফল প্রকাশের পরের দিনই গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান জানান, তাদের গবেষণাটি ঢাকা মহানগরীর প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র তুলে ধরেছে বলে দাবি করা হয়নি। গবেষণার তথ্য এমন সময় প্রকাশ করা হয়, যখন দেশে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ অনেকটাই দোরগোড়ায়। যদিও দ্বিতীয় ঢেউ কবে আসবে তা নিয়েও রয়েছে দ্বিমত। তবে আসন্ন শীত মৌসুমে সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কাও প্রকাশ করেছে বিশেষজ্ঞরা এমনকি খোদ সরকার। এ ছাড়া দেশে কেউ কেউ দ্বিতীয় দফায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন- এমন তথ্যও পাওয়া গেছে। যা আরো ভাবিয়ে তুলছে সংশ্লিষ্টদের। আবার বাংলাদেশ করোনার হার্ড ইমিউনিটির দিকে হাঁটছে কিনা এমন প্রশ্নও উঠেছে।

গবেষণার ফল প্রকাশ ও এর ব্যাখ্যা: সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ও বেসরকারি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)

পরিচালিত এক যৌথ গবেষণার ফল ১২ অক্টোবর প্রকাশিত হয়। গবেষণার জন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্য থেকে দৈবচয়ন ভিত্তিতে ২৫টি ওয়ার্ডকে বেছে নেয়া হয়। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একটি মহল্লা বাছাই করা হয়। প্রতিটি মহল্লা থেকে ১২০টি খানা জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া ৮টি বস্তিকে এ জরিপে যুক্ত করা হয়। মোট ৩ হাজার ২২৭টি খানার সদস্যদের গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের নমুনা আরটিপিসিআর পরীক্ষায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশের করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। ৮১৭ জনের নমুনার এন্টিবডি পরীক্ষায় দেখা যায়, ৪৫ শতাংশের শরীরে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বস্তি এলাকার ১২৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে প্রায় ৭৪ শতাংশের শরীরে এন্টিবডি পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন কোনো জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হয় তখন সেখানে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়। যেহেতু ৭৪ শতাংশ এন্টিবডি বস্তিতে পাওয়া গেছে, তাহলে সেখানে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে। হার্ড ইমিউনিটির সুবিধা হচ্ছে কোথাও যদি এটি তৈরি হয়ে যায় তাহলে সেখানে সংক্রমিত ব্যক্তি গেলেও সংক্রমণের মাত্রা বাড়ে না।
ওই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে তাদের কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মাত্র ৬৯২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৪৫ শতাংশের এন্টিবডি পাওয়ার যে তথ্য গবেষণায় উঠে এসেছে এর ভিত্তিতে পুরো ঢাকার চিত্র তুলে ধরা বা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।

এই গবেষণার ফল প্রকাশের পরের দিন রাতে আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. তাহমিনা শিরীন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, কোনো কোনো গণমাধ্যমে গবেষণাটিতে সমগ্র ঢাকা মহানগরীর চিত্র তুলে ধরেছে বলায় এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। এত অল্প নমুনার উপর গবেষণা চালিয়ে একে ঢাকার সার্বিক চিত্র বলা যাচ্ছে না। ঢাকা মহানগরীর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হলে ভবিষ্যতে প্রতিনিধিত্বমূলক সংখ্যক নমুনা সংগ্রহ করে আরো বড় পরিসরে গবেষণা করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : গবেষণা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গবেষণাটিতে দেখা গেছে অনেকেই আছেন যারা করোনা ভাইরাস বহন করছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো লক্ষণ নেই। অনেকের ক্ষেত্রে লক্ষণ প্রকাশ পায়নি। কিন্তু তারা পরীক্ষায় পজিটিভ হয়ে আবার নেগেটিভও হয়েছেন। এখন অনেকের ক্লিনিক্যাল ইনফেকশন হয়ে এন্টিবডি ডেভেলপ করেছে। ক্লিনিক্যাল ইনফেকশনের হার প্রায় ৯ শতাংশ। আর বস্তিতে প্রায় ৬ শতাংশ। কিন্তু দেশের গ্রামাঞ্চলে কোনো গবেষণা হয়নি। সেটা হলে সারাদেশের অবস্থাটা বোঝা যেত।

কোভিড-১৯ বিষয়ে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে আমাদের সংক্রমণের হার ১০ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে আছে। শীতে এই সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। কিন্তু মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। মাস্ক ব্যবহার করছে না। বাস্তব পরিস্থিতিতে ঝুঁকি বাড়ছে। আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির গবেষণায়ও তা উঠে এসেছে। এছাড়া আমরা সবাই যে ঝুঁকির মধ্যে আছি সেটিও উঠে এসেছে। পুরো শহরকে প্রতিনিধিত্ব না করলেও এই গবেষণার ফলাফল ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে আমাদের ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণ করা উচিত। কেননা সংক্রমণের হার কত, কতজনের ক্লিনিক্যাল ইনফেকশন হচ্ছে, কতজনের এন্টিবডি আছে এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, শুরু থেকেই করোনা সংক্রমণ নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ যে তথ্য দিয়ে আসছে তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ শুরু থেকেই ছিল। এখন যখন সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু কম। সেই সময় সরকারেরই একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হলো, ঢাকা শহরের অর্ধেক মানুষের করোনা হয়ে গেছে। আক্রান্তদের ৮২ শতাংশের কোনো উপসর্গ নেই এবং রাজধানীর বস্তিবাসীর ৭৪ শতাংশের এন্টিবডি শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া ওই গবেষণায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মার্চ নয় ফেব্রুয়ারি মাসেই বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ ঘটেছিল। এসব তথ্য নতুন করে যেমন আতঙ্কও ছড়িয়েছে। তেমনি তথ্যের গরমিলও প্রকট হয়েছে। নেতিবাচক বক্তব্যটাই মানুষের মনে থাকে।

প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ ভোরের কাগজকে বলেন, সার্বিকভাবে বললে দেশে করোনার সংক্রমণ কমেছে। কিন্তু কত মানুষের মধ্যে এর সংক্রমণ হয়েছে সেই পরিসংখ্যান নেই। এটি বের করতে হলে র‌্যানডম পরীক্ষা করতে হবে। আমাদের মৃত্যুও কমেছে। কারণ, চিকিৎসা করার জ্ঞান ও সেবার পরিধি ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতিও আগের তুলনায় বেড়েছে। দ্বিতীয়বার করোনায় আক্রান্ত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, জাপান ও চীনে এমন অনেক রোগী পাওয়া গেছে, যারা একবার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার পর আবারো আক্রান্ত হয়েছেন। সংখ্যায় অনেক কম হলেও বাংলাদেশে এমন রোগী পাওয়া যাচ্ছে।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়