দুর্নীতির খবর: বিচক্ষণ সায় প্রধানমন্ত্রীর

আগের সংবাদ

সাইবার অপরাধ ও আমাদের সচেতনতা

পরের সংবাদ

শিক্ষায় ফেরার চেষ্টা

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২০ , ১০:৪১ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৬, ২০২০ , ১০:৪৬ অপরাহ্ণ

শীতে করোনা প্রকোপ বাড়তে পারেÑ এমন আশঙ্কা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও করেছেন। সুতরাং নিকটবর্তী দিনগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাণ ফিরে আসবে এমনটি নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। তবে করোনা সংক্রমণের ধারা ঊর্ধ্বমুখী না হয়ে যদি নিম্নমুখী হতে থাকে তাহলে নতুন শিক্ষা বছরটি নতুনভাবেই হয়তো আমরা শুরু করতে পারব। এটি নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির ওপর। আমরা আশা করব স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামনের দিনগুলোতে আমরা ধীরে ধীরে হলেও শিক্ষায় যেন ফিরে যেতে পারি।

গত মার্চ মাস থেকে দেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও অনেকটা তাই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও কিছু কিছু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে কিছু ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখেনি। তারা এই করোনার সংক্রমণকালেও তাদের শিক্ষাক্রম যতটা পেরেছে চালিয়ে নিয়েছে। উন্নত দুনিয়ায় অবশ্য অনলাইন পদ্ধতির পাঠদান ও পরীক্ষা পদ্ধতি আগে থেকেই চলে এসেছে। সুতরাং তাদের শিক্ষাব্যবস্থা বন্ধ থেকেছে এটি বলা যাবে না। আমরা যেহেতু অনলাইন পঠন পাঠন পদ্ধতির সঙ্গে ততটা অভ্যস্ত নই তাই আমাদের এখানে অল্পসংখ্যক বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বন্ধ ছিল। ৭/৮ মাস ধরে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বইপুস্তক ও লেখাপড়া থেকে অনেকটাই দূরে আছে। শহরাঞ্চলে অভিভাবকদের একটি অংশ ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া যতটা সম্ভব চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে। সুতরাং ৭/৮ মাস ধরে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা বলতে গেলে সবচাইতে সংকটকালটি অতিক্রম করছে। দেশের অন্যতম বড় একটি পাবলিক পরীক্ষা এইচএসসি কোনোভাবেই অনুষ্ঠিত করার উদ্যোগ সরকার নেয়ার সাহস করতে পারেনি। কারণ লাখ লাখ শিক্ষক-শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠানে অংশ নেয়াটি করোনার ঝুঁকিতে ফেলার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। এ কারণে পরীক্ষাটি নেয়া না নেয়া নিয়ে নীতি-নির্ধারক মহল দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। অপেক্ষাও করেছিল করোনা প্রকোপ কমে আসে কিনা। কিন্তু তেমন সম্ভাবনা না দেখায় মন্ত্রণালয় বাধ্য হয় এই বছর এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না করার, পরীক্ষার্থীদের জেএসসি ও এসএসসির ফলাফল থেকে গড় নাম্বার দিয়ে একটি ফলাফল নিকট ভবিষ্যতে ঘোষণা করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই ঘোষণার পর পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে দুধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়। একদল এটিকে স্বাগত জানায়, অন্যদল অসন্তুষ্ট হয়। তবে দীর্ঘদিন এই পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত না হওয়ার কারণে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হওয়ার দরজা বন্ধ ছিল। এতে পরীক্ষার্থীরা যেমনি হাঁপিয়ে উঠছিল অভিভাবকরাও সন্তানদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠে। তবে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ঘোষিত সিদ্ধান্তের পর সবাই যেন নড়েচড়ে উঠে। মন্দের ভালো হলেও সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন, জট খোলার একটা সুযোগ হিসেবে সবাই মনে করতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নড়েচড়ে উঠেছে। স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বসেছিলেন। মোটামুটি বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ পদ্ধতিতে সম্মিলিতভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার প্রাথমিক সম্মতি জ্ঞাপন করে। তবে অল্প কিছুসংখ্যক পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় সম্মিলিত পদ্ধতির সঙ্গে জোর না দেয়ার কথাই উচ্চারণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতে একই সময়ে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার প্রাথমিক চিন্তাভাবনা করছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে এবং বিপক্ষে যথেষ্ট পরিমাণমতো গণমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। তবে এইচএসসির ফলাফল নির্ধারণের বিষয়টি যেখানে এখনো ডিসেম্বরের আগে হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির নিয়ম নিয়ে এখনই বিতর্কে জড়িয়ে লাভ কি? ডিসেম্বরে যদি এইচএসসির ফলাফল প্রকাশিত হয় তাহলে জানুয়ারি ফেব্রুয়ারির আগে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই এটি নির্দ্বিধায় বলা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ যদি উচ্চ পদ্ধতিতে মেডিকেল কলেজের মতো করে ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে সেটি অনেক বেশি সমর্থনযোগ্য হবে। এর জন্য অবশ্য সময় রয়েছে, এখনো সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি ঢাকার বাইরে ৭টি শহরে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের ঝুঁকি নিতে পারে তাহলে সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ক্যাম্পাসে সম্মিলিতভাবে ভর্তি পরীক্ষা নিতে অসুবিধা কিসের। তাছাড়া ভর্তি পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রক্সি পরীক্ষা দেয়ার বদঅভ্যাস কতটা বেশি সেটি নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এককভাবে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে এতগুলো শহরে ভেজালমুক্তভাবে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করতে কতটা সফল হবে সেটি মস্তবড় শঙ্কার বিষয়। আবার অনলাইন পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার যে কথাটি উঠেছে সেটিও প্রক্সি মুক্ত করা কতটা সম্ভব হবে সেই প্রশ্ন রয়েছে। তবে সম্মিলিতভাবে গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মতি প্রদানটি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়ার মতো। কারণ এর আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজসমূহে ভর্তি পরীক্ষা বিহীনভাবে শিক্ষার্থী ভর্তির যে ধারাটি চালু রেখেছিল সেটি কলেজ পর্যায়ে স্নাতক সম্মানে পড়াশোনার মান ভীষণভাবে নামিয়ে দিয়েছে। পাস কোর্সে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা নিয়েও অনেকে স্নাতক সম্মানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেত। বেশিরভাগ ভর্তিকৃত শিক্ষার্থী নিয়মিত লেখাপড়ার সঙ্গে যুক্ত না থেকে কলেজ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে আসতে থাকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোর স্নাতক সম্মান অধ্যয়নের ন্যূনতম যোগ্যতা, মান এবং ফলাফল বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে কলেজগুলো থেকে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী প্রতি বছর কোনো ধরনের লেখাপড়া ছাড়াই উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে আসছে। তারা চাকরির বাজারে কোনো ধরনের প্রতিযোগিতায় খুব একটা সফল হচ্ছে না। বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষার্থী উচ্চতর ডিগ্রির সনদ পেলেও শিক্ষার কোনো মান ও দক্ষতা অর্জন না করার ফলে এরা বেকার বাহিনীতে পরিণত হচ্ছে, জাতির বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে এবং একটি সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্ম উচ্চশিক্ষা অব্যবস্থাপনার কারণে মেধার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সুতরাং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা, কলেজের মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ বাধ্যবাধকতা পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের প্রচলিত পদ্ধতি বাতিলসহ বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
এরই মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ভার্চুয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, এ বছর কোনো বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না। সব শিক্ষার্থীকে পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত করা হবে। তবে তিনি জানান, ষষ্ঠ থেকে উপরের শ্রেণিগুলো পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শিখনফল মূল্যায়ন করার জন্য ৩০ কার্যদিবসের একটি অ্যাসাইনমেন্ট লেখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যা শিক্ষার্থীদের সফলতা ও দুর্বলতাগুলো বোঝার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে থাকবে। তবে পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ার জন্য এর কোনো মার্কিং ব্যবস্থা থাকবে না। শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণার পর থেকে দেশে মাধ্যমিক স্কুল কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবার সীমিত আকারে হলেও লেখাপড়ার চাঞ্চল্য ফিরে আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিশেষত অ্যাসাইনমেন্টগুলো লেখা এবং জমা দেয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের বইপুস্তক খাতাকলম হাতে তুলে নিতে হচ্ছে। ফলে করোনার এই সময়েও শিক্ষার্থীরা আবার নতুন শিক্ষা বছরে নতুন শ্রেণিতে উঠার, নতুন বই পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। একই অবস্থা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও ঘটতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে কিন্ডারগার্টেন স্কুল মালিক সমিতি ঢাকায় মানববন্ধনের মাধ্যমে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা তাদের আর্থিক প্রণোদনা দেয়ারও দাবি জানিয়েছেন। সুতরাং ধরেই নেয়া যাচ্ছে যে নভেম্বর মাস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় অংশ নিতে যাচ্ছে। সেটি কতটা আগের মতো নিয়মিত হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কেননা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এখনো ঝুঁকির পর্যায়েই রয়ে গেছে। তাছাড়া শীত মৌসুম আসছে। শীতে করোনা প্রকোপ বাড়তে পারেÑ এমন আশঙ্কা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও করেছেন। সুতরাং নিকটবর্তী দিনগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাণ ফিরে আসবে এমনটি নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। তবে করোনা সংক্রমণের ধারা ঊর্ধ্বমুখী না হয়ে যদি নিম্নমুখী হতে থাকে তাহলে নতুন শিক্ষা বছরটি নতুনভাবেই হয়তো আমরা শুরু করতে পারব। এটি নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির ওপর। আমরা আশা করব স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামনের দিনগুলোতে আমরা ধীরে ধীরে হলেও শিক্ষায় যেন ফিরে যেতে পারি।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়